Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৪ রবিবার, মার্চ ২০১৯ | ৯ চৈত্র ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

হাউজিং ব্যবসায়ীদের লোভের মুখে নিঃস্ব হচ্ছে মধ্যবিত্ত পরিবার

ইসতিয়াক ইসতি
ক্রাইম রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৬:৪১ PM
আপডেট: ০৭ মার্চ ২০১৯, ০৬:৫৭ PM

bdmorning Image Preview


'আমারে বালুতে পুইতা যাও, আমার কোনো ঠিকানা নাই, পাওনাদারদের টাকা কেমনে দিমু, সন্তানের লেখাপড়া কেমনে চালামু। আমার সব শেষ।'

গণমাধ্যমকর্মী দেখে এভাবেই প্রলাপ করতে দেখা গেল বুড়িগঙ্গা নদীর কোল ঘেঁষে গড়ে ওঠা কেরানীগঞ্জের মধ্যেরচর এলাকার চল্লিশোর্ধ এক নারীকে।

তার নাম সামীমা বেগম। ১০ বছর আগে হাজারীবাগের পৈতৃক সূত্রে পাওয়া ২ শতাংশ সম্পত্তি বিক্রি করে কেরানীগঞ্জের কোনাখোলা মৌজার দক্ষিণ বালুচর ও উত্তর বালুচর নিয়ে গড়ে ওঠা মধু সিটি হাউজিং-এ আড়াই কাঠা জমি কিনেছিলেন তিনি। কিন্তু বিআইডব্লিউটিএ'র উচ্ছেদ অভিযানে জীবনের শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে এখন প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছেন সামীমা বেগম।

সামীমা বেগমের সাথে কথা বলার চেষ্টা করলেও তার কথা বলার অবস্থা ছিলেন না। পরে কথা হয় তার বড় ছেলে সাব্বির হোসেন সায়হানের সাথে। তিনি বিডিমর্নিংকে বলেন, নানার বাড়ি থেকে পাওয়া সম্পত্তি বিক্রি করে আমরা এখানে জমি রেখেছিলাম ২০০৯ সালে। আর দেড় মাস আগে সমিতি থেকে ঋণ নিয়ে আমরা বাড়ি করেছিলাম।

তিনি আরো বলেন, অভিযান শুরুর পরে (প্রথম ধাপের অভিযান) আমরা বেশ কয়েকবার এই হাউজিং-এর মালিকদের সাথে যোগাযোগ করেছি। তারা আমাদের বলেছিল 'আমার এই জমি নদীতে পরেনি, তাই চিন্তার কিছু নেই।' কিন্তু ৫ মার্চে বিআইডব্লিউটিএ'র অভিযানে আমাদের সব শেষ।

এখানে তো কোনো হাউজিং-এর সাইনবোর্ড বা পোস্টার দেখা যাচ্ছে না, এটা আসলে কোন হাউজিং- এমন প্রশ্নের উত্তরের সামীমা বেগমের পাশের বাড়ির মালিক (তারও বাড়ি ভাঙা হয়েছে) মোখলেছুর রহমান বিডিমর্নিংকে বলেন, আসলে এটা মধু হাজীর ছেলেদের প্রজেক্ট। এখানে কোনাখোলা মৌজার দক্ষিণ বালুচর ও উত্তর বালুচরের কিছু গ্রামবাসীর জায়গা আছে এবং বাকি জায়গা মধু হাজীর ছেলেরা বালু ভরাট করে বের করেছেন। আর স্থানীয়রা মধুসিটি নামেই এটিকে চেনে।

আপনারা তো হাউজিং থেকে জমি কিনেছেন, হাউজিং কর্তৃপক্ষ এখন কি বলছে? মোখলেছুর রহমান ও সামীমা বেগমের ছেলে সাব্বির হোসেন সায়হান এই প্রশ্নের উত্তরে জানান, অভিযানের দিন থেকে এখন পর্যন্ত হাউজিং-এর কারো সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছে না। তাদের নাম্বার বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে এবং তাদের অফিসে গেলেও ভেতরে প্রবেশ করতে দেওয়া হচ্ছে না।

এ সময় অভিযানে ভাঙে ফেলা বাড়িগুলোর একাধিক মালিক অভিযোগ করেন, আমাদের কাছে ৪ পর্চার কাগজ দেখিয়ে হাউজিং কোম্পানি জমি বিক্রি করেছে, তাই কিনেছি। কিন্তু অভিযানে হাউজিং কোম্পানিগুলো কোনোই জরিমানা করা হচ্ছে না। আমরা গরীব তাই আমাদের ওপর দিয়ে সব চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এ বিষয়ে বিআইডব্লিউটিএ'র নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমানের কাছে প্রশ্ন করা হয়- 'নদী দখলমুক্ত করার জন্য অবৈধ দখল বলে যে স্থাপনাগুলো গুঁড়িয়ে দেওয়া হলেও কেন মূল দখলদারীদের আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না?'

এমন প্রশ্নের জবাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোস্তাফিজুর রহমানের বলেন, আমরা মূলত ঘটনাস্থল উপস্থিত বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করি। তাছাড়া আমাদের এ বিষয়টি নিয়ে কি করণীয় তা জানতে চেয়ে বিআইডব্লিউটিএ'র উর্ধ্বতন কর্মকর্তা কাছে একটি বার্তা ইতিমধ্যে দেওয়া হয়েছে।

বিআইডব্লিউটিএ'র যুগ্ম পরিচালক (বন্দর) এ কে এম আরিফ উদ্দিনের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমাদের বলতে গেলে কিছুই করার নেই। কারণ আমরা অভিযানের ক্ষেত্রে কে বা কারা দখল করে আছে তা দেখছি না। আমাদের লক্ষ নদীর (বুড়িগঙ্গা ও তুরাগ) জায়গা উদ্ধার করে এর গতিপথ ফিরিয়ে আনা।

তিনি আরো বলেন, আমরা আদালতের কাছে একটা আবেদন করবো। যারা নদী দখল করে নামে-বেনামে হাউজিং করছে তাদের যাতে জরিমানার আওয়াত আনা হয় এবং এই অভিযানগুলোতে ব্যয়কৃত অর্থ যাতে তাদের থেকে আদায় করা হয়।

বিআইডব্লিউটিএ'র যুগ্ম পরিচালক (বন্দর) এ কে এম আরিফ উদ্দিনের কাছে প্রশ্ন করা হয়- 'এই জায়গা যদি আপনাদের হয় তাহলে কিভাবে রাজউক ও ভূমি অফিস থেকে কাগজ বের হল?'

প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, আসলে কিছু অসৎ কর্মকতা ভূমিদস্যু হাউজিংগুলো'র সাথে হাত মিলিয়ে এই অসৎ কাজের সাথে লিপ্ত হয়েছে। কিন্তু নৌপরিবহন সচিব মো. আবদুস সামাদ ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসন, রাজউক, পানি উন্নয়ণ বোর্ড, পরিবেশ অধিদফতর, ঢাকা ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে জানিয়েছেন। নদী দখলের সাথে যদি কেউ জড়িত থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রসঙ্গত, শুধুমাত্র মধু সিটিতে অভিযানে বিআইডব্লিউটিএ ৮৮টি আবাসিক স্থাপনা উচ্ছেদ করেছে। মধু সিটি হাউজিং কিভাবে নদীর ওপরে ৪ পর্চা কাজ বের করে জমি বিক্রি করল তা জানার জন্য তাদের অফিসে গেলে প্রবেশ করা সম্ভব হয়নি এবং কর্তৃপক্ষের কাউকে মুঠোফোনে পাওয়া যায়নি।

Bootstrap Image Preview