Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ বৃহস্পতিবার, ফেব্রুয়ারি ২০২৪ | ১০ ফাল্গুন ১৪৩০ | ঢাকা, ২৫ °সে

বাংলাদেশে চা শিল্প ও চা শিল্পের ইতিহাস

৮ পর্বের সিরিজ প্রতিবেদনের ১ম পর্ব

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ০৩:৩৮ PM
আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০২৩, ০৫:৫২ PM

bdmorning Image Preview


হৃদয় দেবনাথ, সিলেট ।। বাংলাদেশের চায়ের বাণিজ্যিক চাষাবাদ শুরু হয় আজ থেকে ১৫০ বছর আগে। ১৮৫৪ সালে সিলেট জেলার  মালনিছড়ায় বাংলাদেশের প্রথম চা-উৎপাদন শুরু হয় । তারপর মৌলভীবাজার জেলা ও শ্রীমঙ্গলের বিস্তির্ণ এলাকাজুড়ে চা বাগান প্রতিষ্ঠা হওয়ার পরে ধীরে ধীরে বৃহত্তর সিলেট ও চট্রগ্রাম এবং উত্তরবঙ্গ এলাকায় বিস্তৃত হয় চায়ের ভূবন।

একশত বছরেরও পুরোন এই চা শিল্পকে বৈজ্ঞানিকভাবে সমর্থন দেয়ার লক্ষ্যে পাকিস্তান সরকার ১৯৫৭ সালে পাকিস্তান চা গবেষণা প্রতিষ্ঠান (পিটিআরএস) স্থাপন করে। তবে তা খুব একটা কার্যকরী হয়নি। প্রতিষ্ঠার সময়কালে শীর্ণকায় এ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অফিসার ও সাধারণ কর্মচারীদের সংখ্যা  ছিল অত্যন্ত সীমিত। পরবর্তীতে সংশ্লিষ্ট সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা পূর্বকালে ৪২৬৮৮ হেক্টর জমি চা আবাদী এলাকার আওতায় চলে আসে। ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশ সরকার স্বাধীন হওয়ার প্রায় দেড় বছরের মধ্যে রাষ্ট্রের চা শিল্পকে বৈজ্ঞানিক ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে এর উত্তরোত্তর উন্নতি সাধনের লক্ষ্যে গবেষণা প্রতিষ্ঠানটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ গবেষণা ইনষ্টিটিউটএ রূপান্তর করে। এর নামকরণ করা হয় বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনষ্টিটিউট (বিটিআরআই)।বিটিআরআই এর মাধ্যমে অধিক ফলন ও মানসম্মত চা পাওয়ার লক্ষ্যে ছাঁটাই, চয়ন, রোপণ দূরত্ব ইত্যাদির উন্নতকরণ সম্ভব হয়েছে। এছাড়া চা প্রক্রিয়াজাত করণ পদ্ধতির আধুনিকায়ন, চায়ের বিকল্প ব্যবহার ইত্যাদি বিষয়ে এখানে পবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।

শ্রীমঙ্গলে অবস্থিত এই বাংলাদেশ চা গবেষণা প্রতিষ্ঠানে ইতোমধ্যে প্রস্তুত চায়ে বালাইনাশক বা অন্য কোন ক্ষতিকর পদার্থের উপস্থিতি নিরূপণের জন্য অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতির সমন্বয়ে রেসিডিউ এনালাইটিক্যাল গবেষণাগার স্থাপন করা হয়েছে। প্রায় দেড় শ বছরের পুরোনো বাংলাদেশের এই প্রাকৃতিক পরিবেশসমৃদ্ধ চা শিল্পের ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি যাতে নতুন প্রজন্ম ধরে রাখতে পারে সে লক্ষ্যে টি মিউজিয়াম বা চা জাদুঘর স্থাপন করেছে চা বোর্ড। ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০০৯ এ বাংলাদেশ চা বোর্ড এই চা জাদুঘর  উদ্বোধন করা হয়।

ব্রিটিশ আমলে চা-বাগানগুলোতে ব্যবহূত বিভিন্ন সামগ্রী সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের সঙ্গে এ শিল্পের ঐতিহ্যের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার জন্য দেশের চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলে স্থাপিত হয়েছে চা জাদুঘর। জাদুঘরের জন্য এ পর্যন্ত ব্রিটিশ আমলে চা-বাগানে ব্যবহৃত প্রায় শতাধিক আসবাবপত্রসহ বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাধীনতার আগে চা বোর্ডের দায়িত্ব পালনকালে বাংলাদেশের স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ব্যবহূত চেয়ার-টেবিলও। এখনে থাকবে চায়ের উপকারিতা, চায়ের আবিষ্কার কাহিনীসহ চায়ের এ পর্যন্ত বাংলাদেশে উদ্ভাবিত সকল প্রকার বিটি ক্লোনের উপস্থিতি। 

শ্রীমঙ্গল উপজেলার টি রিসোর্টের তিনটি কক্ষে এখন চা জাদুঘর করা হয়েছে। প্রথম দিকে রিসোর্টের একটি ভবনের তিনটি ঘর নির্ধারণ করে সে ঘরগুলোয় সংগৃহীত প্রাচীন এসব জিনিসপত্র আনার কাজ চলে। পরবর্তীতে চা শ্রমিকদের জন্য ব্যবহূত বিশেষ কয়েন,  ঘড়ি, ১৯৫৭-৫৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান চা বোর্ডের চেয়ারম্যান ছিলেন। আর সেই সুবাদে তিনি এসেছিলেন শ্রীমঙ্গলের নন্দবানী চা বাগানে। তৎকালিন সময়ে বঙ্গবন্ধু যে চেয়ারে বসে মিটিং করেছিলেন সেই চেয়ার ও টেবিল, পাথর হয়ে যাওয়া আওয়াল গাছের খণ্ড, ব্রিটিশ আমলের ফিলটার, ফসিল, কম্পাস, চা গাছের মোড়া ও টেবিল, তীর-ধনুকসহ নাম না-জানা আরও কিছু সামগ্রী সংগ্রহ করা হয়েছে এবং এখনো সংগ্রহের কাজ বন্ধ হয়নি। এই অঞ্চলের গৌরবান্বিত চা শিল্পের ইতিহাস ধরে রাখার জন্যই এত সকল পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কারণ ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে চা উৎপাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে বর্তমানে শ্রীমঙ্গলে রয়েছে ৪০ টি চা-বাগান। যা ৪৫,৫৩৮ একর ( ১৮৪.২৯ বর্গ কিলোমিটার) এলাকা জুড়ে অবস্থান করছে।

চা শিল্পের সাথে জড়িত চা শ্রমিকদের ইতিহাস : চা রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে ওঠেনি। বর্তমান জনপ্রিয়তার পশ্চাদভূমিতে দীর্ঘ বিবর্তনের ইতিহাস লুকিয়ে আছে। চীনের অনুকরণেই ভারতবর্ষে চা চাষ শুরু করে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। তাই পরীক্ষামূলকভাবে চা-বীজ, চারা ও যন্ত্রপাতির পাশাপাশি চীন থেকে দক্ষ শ্রমিক আনে তারা। বিদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে বনাবনি না হওয়ায় অবশেষে শ্রমিক আমদানি বন্ধ করে দেশীয় শ্রমিক দিয়েই চা-বাগানের কার্যক্রম পরিচালনার সিদ্ধান্ত নেয় কোম্পানি। 

সুরমা ও বরাক উপত্যকাজুড়ে (বর্তমান সিলেট ও আসাম অঞ্চল) ছিল ভারতবর্ষের চা-বাগানের একটা বড় অংশ। ড. সুকুমার বিশ্বাস রচিত ‘আসামে ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি—প্রসঙ্গ ১৯৪৭-১৯৬১’ গ্রন্থ থেকে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষভাগে আসামে শ্বেতাঙ্গ চা-করেরা যখন চা-বাগান প্রতিষ্ঠা শুরু করেন, তখন স্থানীয়ভাবে চা-শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছিল না। আসাম সরকারের সহায়তায় তাঁরা ভারতবর্ষের বিভিন্ন স্থান থেকে হাজারো চা-শ্রমিক আনার ব্যবস্থা করেন। বিহার, উড়িষ্যা (ওডিশা), মাদ্রাজ (চেন্নাই), নাগপুর, সাঁওতাল পরগনা, মধ্যপ্রদেশ ও উত্তর প্রদেশ থেকে এসব চা-শ্রমিককে নিয়ে আসা হয়। এ জন্য একটি স্বতন্ত্র বিভাগও চালু হয়। এ সময় আসাম সরকার ‘ইমিগ্রেশন অব লেবার অ্যাক্ট’ কার্যকর করে।

চা-বাগানের শ্রমিকদের ডাকা হতো ‘কুলি’ নামে। চা-শ্রমিকের ব্যবস্থা হলেও চা-বাগানের বিভিন্ন স্তরে তখনো পরিচালনব্যবস্থায় যোগ্য জনশক্তির অভাব ছিল। ফলে কয়েক হাজার বাঙালি এসব পদে নিয়োগ পান। বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে বেঙ্গল-আসাম রেলপথ স্থাপিত হলে পূর্ববঙ্গের ঢাকা, ময়মনসিংহ, নোয়াখালী, ত্রিপুরা, রংপুর প্রভৃতি জেলা থেকে লাখ লাখ বাঙালি কৃষিজীবী, যাঁদের অধিকাংশই ছিলেন মুসলমান সম্প্রদায়ভুক্ত, তাঁদের কলোনাইজেশন স্কিমের আওতায় এনে তৎকালীন আসামের বিভিন্ন স্থানে অনাবাদি জঙ্গলাকীর্ণ জমি চাষাবাদের ব্যবস্থা করা হয়।

শুরু থেকেই এই শ্রমজীবী মানুষগুলো চরম অবহেলিত। ১৯০১ সালে প্রকাশিত ‘দ্য ইকোনমিক হিস্ট্রি অব ইন্ডিয়া আন্ডার আরলি ব্রিটিশ রুল’-এ রমেশ দত্ত এই শ্রমজীবী মানুষদের প্রতি ব্যবস্থাপকদের অবহেলার চিত্র উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেছেন, ‘আ স্পেশাল ল, হুইচ ইজ কল্ড দ্য স্লেভ ল বাই দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া, স্টিল এক্সিস্টস ফর প্রোভাইডিং লেবারারস ফর দ্য কাল্টিভেশন অব টি ইন আসাম; ইগনোরেনট ম্যান অ্যান্ড উইম্যান আর বাউন্ড ডাউন বাই পেনাল ক্লসেস, আপন দেয়ার সাইনিং আ কন্ট্রাক্ট, টু ওয়ার্ক ইন টি গার্ডেন্স ফর আ নাম্বার অব ইয়ার্স; অ্যান্ড দ্য আটমোস্ট এন্ডিভার্স অব দ্য চিফ কমিশনার অব আসাম ডিউরিং দ্য প্রেজেন্ট ইয়ার (১৯০১) হ্যাভ ফেইল্ড টু সিকিউর ফর দিজ পুওর লেবারার্স এন এডিকিউট পে ডিউরিং দেয়ার এনফোর্সড স্টে ইন দ্য গার্ডেন্স।’ কাজের ধরন অনুযায়ী শ্রমিকদের কাজের হিসাব সংরক্ষণ করা হতো যেখানে, সেটা ‘গার্ডেন বুক: ডেইলি কামজারি বুক’ নামে পরিচিত ছিল।

এই বই থেকে তাদের কাজের বিপরীতে মজুরির প্রাপ্যতা হিসাব করা হতো। সরদার এবং মুহুরি মূলত এই হিসাব তদারকির দায়িত্ব পালন করতেন। শ্রমিকেরা সময় সময় তাঁদের বৈষম্যমূলক আচরণ ও প্রতারণার শিকার হতেন। চা-বাগানের আশপাশে জঙ্গলাকীর্ণ ভূমিগুলো ছিল প্রকট ম্যালেরিয়া ও কালাজ্বরের উর্বর ক্ষেত্র। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ কতটা প্রতিকূল ছিল, উপরিউক্ত আসাম লেবার ইনকোয়েরি কমিটির রিপোর্টটি তার অন্যতম দৃষ্টান্ত। ভারতবর্ষে মহাত্মা গান্ধীর অসহযোগ আন্দোলনের প্রভাব চা-শ্রমিকদেরও স্পর্শ করেছিল। ২০ মে ১৯২১। ‘মুল্লুকে ফিরে চল’ স্লোগানে সিলেট অঞ্চলের প্রায় ৩০ হাজার চা-শ্রমিক বিক্ষোভ শুরু করেন। উদ্যোগ নেন নিজ নিজ অঞ্চলে ফিরে যাওয়ার। কিন্তু ফিরে যাওয়া অত সহজ ছিল না। চা-শিল্পের মালিকদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে রেল দপ্তর শ্রমিকদের টিকিট দেওয়া বন্ধ করে দেয়, যাতে শ্রমিকেরা ফিরে যেতে না পারেন। বাধ্য হয়ে তাঁরা চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটমুখী হাঁটা শুরু করেন। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের ওপর চলে গুলিবর্ষণ। মারা যান শত শত আর আহত হন হাজার হাজার। কিছু পালিয়ে যান। বাকিদের ধরে নিয়ে পুনরায় চা-বাগানের কাজে বাধ্য করা হয়। গঠিত হয় গাদা গাদা কমিশন। কিন্তু তাঁদের জীবনমানে কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন ঘটেনি।

চা-শ্রমিকদের দুঃখগাথা নিয়ে রচিত হয় সাড়া জাগানো উপন্যাস ‘টু লিভস অ্যান্ড আ বাড’ (১৯৩৭)। ইংরেজ সাহেবদের অত্যাচারের পটভূমিকায় লেখা মুলকরাজ আনন্দের এই উপন্যাসে চা-কে অলংকৃত করে বলা হয়েছে ‘দুটি পাতা একটি কুঁড়ি’। অতঃপর দেশভাগের পালা। কিন্তু নতুন ভারতেও রয়ে গেল সেই চিত্র। ১৯৬১ সালের নিম্নোক্ত চিত্র চা-শ্রমিক খাতে প্রকট মজুরিবৈষম্যের প্রমাণই বহন করে: ১৯৭০ সালের নির্বাচনে চা-বাগানগুলোতে শতভাগ ভোট পায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও নৌকা প্রতীক। কিন্তু অদ্যাবধি চা জনগোষ্ঠীর ভাগ্যের শিকে ছিঁড়েনি। সাবেক ভারতবর্ষের সর্বত্র আজও ন্যূনতম মজুরি নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষের গড়িমসি! চা-শ্রমিকদের নিয়ে দীর্ঘকাল ধরে গবেষণায় সম্পৃক্ত পরিমল সিং বাড়াইকের জীবনকাব্যে সেটাই নির্মোহভাবে ফুটে উঠেছে।

Bootstrap Image Preview