Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘চিরকুট পাঠালেন, আমি বেঁচে আছি-ভালো আছি’

আল আমিন হুসাইন
রিপোর্টার
প্রকাশিত: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:২৯ AM আপডেট: ০৯ সেপ্টেম্বর ২০১৮, ১১:২৯ AM

bdmorning Image Preview


ফারুক আহমাদ আরিফ ও বিপ্লব মল্লিক-

 

যুদ্ধে অনেক সময় নিজ ভূমির মায়া ছেড়ে পাড়ি জমাতে হয় ভিনদেশে। নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করতে ঘোরে বেড়াতে হয় নানাপ্রান্তে। কখনো পরিবার-পরিজন নিয়ে, আবার কখনো শুধু নেতাকেই যেতে হয় অজানা ঠিকানায়। বাংলাদেশ গড়ার অন্যতম কারিগর অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আজিজুর রহমান (এমএনএ) মুক্তিযুদ্ধে ৭ নং সক্টর সমগ্র ও ৬ নং সেক্টরের আংশিক লেফটেন্যান্ট জেনারেল পদমর্যাদায় সিভিল এ্যাফেয়ার্স এ্যাডভাইজার এবং পশ্চিম অঞ্চল ক জোনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা। ব্রিটিশ তাড়িয়ে ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা, ১৯৫২ র ভাষা আন্দোলন, ৬২, ৬৮, ৬৯, ৭০ নির্বাচন ও ৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ১৯৭২ সালে কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেম্বলি অব বাংলাদেশ (এমসিএ) হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে নিয়োজিত হন তিনি। ২০১৬ সালের ১৩ ডিসেম্বরে তাঁর চতুর্থ সন্তান বিশিষ্ট কবি, গল্পকার ও প্রখ্যাত সিনিয়র সাংবাদিক মুজতবা আহমেদ মুরশেদ এর মুখোমুখি হয় বিডিমর্নিং। অ্যাড. মো. আজিজুর রহমান এমএনএ’র জীবন ও মুক্তিযুদ্ধের নানা ঘটনা নিয়ে কথা হয় তাঁর সাথে।

সাক্ষাৎকারে অংশ নেন বিডিমর্নিং এর হেড অব নিউজ ফারুক আহমাদ আরিফ, প্রতিবেদক বিপ্লব মল্লিক, ক্যামেরায় ছিলেন আনোয়ার হোসেন ও রাশেদ হাসান। ৪ পর্বের সাক্ষাৎকারটির আজ দ্বিতীয় পর্বটি তুলে ধরা হলো-

ফারুক আহমাদ আরিফ: ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে আপনাদের পরিবারের অবস্থাটি কেমন ছিল, যেহেতু আপনারা রাজনৈতিক পরিবারের লোক? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: আমাকে একটু পিছনে ফিরে যেতে হবে। আব্বা যখন থেকে রাজনীতি শুরু করেছেন তখন থেকে তিনি হরিপুর, বিরামপুর, ঘোড়াঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে চলে যেতেন। আব্বার অভাবটি আম্মা বুঝতে দেননি। তিনি আমাদের আগলে রাখতেন। পরিবারে নানা-নানী, আত্মীয়-স্বজন, রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরা বাসায় আসতেন। এই সময় আমরা সেই অভাবটি বুঝিনি। তবে বিশেষ করে ১৯৬৯ সালের গণ-অভুত্থানের সময় পরিবারের অবস্থা খুব কঠিন ছিল। তার নামে হুলিয়া ছিল। আগরতলা মামলা পরিচালনার জন্যে আব্বা প্রচুর টাকা দিয়েছেন। এখানকার রাজনৈতির সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিরাও টাকা দিতেন। ফান্ড সংগ্রহ ছিল তার তত্ত্বাবধানে। সেই সময় আন্দোলন তুঙ্গে হওয়ায় আব্বা যেকোনো সময় গ্রেফতার হতে পারেন এমন একটি অবস্থা সব সময়ই চলত। আইয়ুবের পতন হবে হবে সময়ে খবর এলো পুলিশ আসতেছে আব্বাকে গ্রেফতার করা হবে। তখন তাঁকে  বাড়ির পিছন দিক দিয়ে বের করে দেয়া হয়। তখন বাসায় যেসব রাজনৈতিক বা অন্যান্য কাগজপত্র ছিল তা পুড়িয়ে ফেলা হয়।

‘চিরকুট পাঠালেন, আমি বেঁচে আছি-ভালো আছি’

বিপ্লব মল্লিক: বাংলাদেশের জন্মের সাথে আপনাদের পরিবার জড়িত। সেখানে সব ভাই-বোন শিক্ষিত তথা প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। এই জায়গাটা কত কঠিন ছিল? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: এটি দুটিভাগে বলতে হবে। প্রথমটি যুদ্ধের আগে ও দ্বিতীয়টি পরে। আম্মা ১৯৪৯ সালে মেট্রিক পাস করেন। তখন মেট্রিক পাস মানে শিক্ষিত। রাজনীতিতে তাঁর অবদান ও সহযোগিতা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের প্রচুর ধন-সম্পত্তি ছিল। অর্থ-কড়ির কোন অভাব ছিল না। সংসারের দেখভালের দায়-দায়িত্ব ছিল আম্মার হাতে। আর মুক্তিযুদ্ধ যখন শুরু হলো তখনতো আমরা শরণার্থী। সেখানে পড়াশোনা করা সম্ভব হয়নি।

বিপ্লব মল্লিক: ভারতে গিয়েছিলেন? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: হ্যাঁ, ভারতে তো যেতেই হয়েছে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর আমরা ততটা অর্থনৈতিক চাপ অনুভব করিনি। যুদ্ধোত্তর বৃহত্তর দিনাজপুরে যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে জড়িত তারা নিজেদের স্বার্থে আব্বার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এটির মূল শেকড় ১৯৭১ সালের মধ্যে লুকানো ছিল। মুক্তিযুদ্ধের দলিল অনুযায়ী একটি গ্রুপ প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে সহ্য করতে পারতো না। সেখানে দুটি গ্রুপের ষড়যন্ত্র ছিল। এদের মধ্যে প্রথমটি খন্দকার মোশতাক আহমেদের ও দ্বিতীয়টি কামরুজ্জামান ও অধ্যাপক ইউসুফ আলীর নেতৃত্বে। সেই সময় গোয়েন্দারা তাজউদ্দীন আহমেদকে এই রিপোর্টটি দেন (দলিলটি ২০০২ সালের ২৫ মার্চ প্রথম আলো পত্রিকা প্রকাশ করে)। কামরুজ্জামান ও অধ্যাপক ইউসুফ আলী রাজশাহী অঞ্চলের নেতা। তারা তাজউদ্দীন আহমেদকে মেনে না নিয়ে ষড়যন্ত্র শুরু করে। এই দলিলে লেখা আছে উত্তরাঞ্চলের শক্তিশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব অ্যাডভোকেট মো. আজিজুর রহমান এমএনএ’র কারণে ষড়যন্ত্রকারীরা তাদের ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারছে না। তারা প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে যাচ্ছে অ্যাড. মো. আজিজুর রহমানের ক্ষমতা খর্ব করতে। বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরলে (১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি) আমরা বলাবলি করি না যে, তারাই বঙ্গবন্ধুকে ঘিরে রেখেছিল যারা তাঁর কাছ থেকে সুবিধা আদায় করতে চেয়েছিলেন। সেই সূত্রেই তাজউদ্দীন আহমেদকে ক্ষমতা (অর্থমন্ত্রীর পদ) থেকে সরিয়ে দিতে সমর্থ হয়। আর সেই কারণেই অ্যাড. মো. আজিজুর রহমানের বিরুদ্ধে তারা ষড়যন্ত্রে সফল হয়। কেননা ১৯৭১ সালে তারা আব্বার কারণে সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করতে পারেনি। তারা আব্বার বিরুদ্ধে বঙ্গবন্ধুর কাছে বিভিন্ন ধরনের কথা বলে ষড়যন্ত্রে সফল হয়। ফলে ১৯৭৩ সালের নির্বাচনে আব্বাকে বঙ্গবন্ধু নির্বাচনে নমিনেশন দেননি। তখন নেতারা এসেছিল তাকে স্বতন্ত্র থেকে নির্বাচন করার জন্যে কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি বলেছেন- আমি আওয়ামী লীগ করি স্বতন্ত্র থেকে কেন নির্বাচন করবো? তখন আব্বা বঙ্গবন্ধুকে বিশাল একটি চিঠি লেখেন (সেটি আমাদের হাতে আছে)। পরে অবশ্য বঙ্গবন্ধু তার ভুল বুঝতে পেরে আব্বাকে ফোন দিয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধু আব্বাকে সৌদি আরবে রাষ্ট্রদূত হিসেবে যোগ দিতে বললেও তিনি যাননি। আব্বা অনেকগুলো ভাষা জানতেন, তার মধ্যে আরবি ভাষা মাতৃভাষার মতই পারদর্শী ছিলেন। কেননা তিনি বলেন, আমি রাজনীতিবিদ, চাকরি করার জন্যে রাজনীতি করি না। তিনি পরবর্তীতে আইন পেশাতেও ফিরে গিয়ে মাইলর্ড বলতে পারছিলেন না। সেখান থেকেই আমাদের পরিবারের অর্থনৈতিক ধ্বংস শুরু হয়। কেননা এর আগে ৬৯ এর আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা পরিচালনায় অর্থযোগানদাতা ছিলেন তিনি। এক টাকা, আট আনা, চার আনা চাঁদা তুলেছেন, আর নিজের সহায়-সম্পদতো দিয়েই দিয়েছেন আওয়ামী লীগ গড়তে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের সময় কখনো আধ পেট, কখনো না খেয়ে আমাদের থাকতে হয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়ালো যে, আমাদের পাড়ার মুদির দোকান থেকে দেড় পোয়া আটা ধার করে নিয়ে এসেছিলেন আব্বা (এ সময় তিনি আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েন)। আমাদের পরিবার প্রচুর দুঃখ-কষ্টের মধ্যে অতিবাহিত হয়। নিজস্ব কোন ঘরবাড়ি নেই, সত্যিই নেই, এখনো নেই। সরকারের কাছ তেকে একটি বাড়ি লিজ নিয়েছিলেন সেটি সে রকমই আছে। আব্বা বাড়ি করার সময়-সুযোগ কোনটিই পাননি। অসৎ রাজনীতিবিদদের ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে তিনি আর রাজনীতিতে ফিরতে পারেননি।

‘চিরকুট পাঠালেন, আমি বেঁচে আছি-ভালো আছি’

বিপ্লব মল্লিক: শরণার্থী জীবনটা কেমন ছিল? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: ন্যাশনাল এ্যাসেম্বলি বাতিল হয়ে গেল। ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু রেসকোর্স ময়দানে ঘোষণা করলেন এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম। আমরা ভাষণটি শুনি ৮ মার্চ সকাল সাড়ে ৮টায়। কেননা পাকিস্তান রেডিও সেটি ৭ মার্চে প্রচার করেনি, পরের দিন করেছে। দিনাজপুরের অমীয় কুটি নামের একটি বাসা ছিল সেখানে পাকিস্তানের মেজর রাজা থাকতেন। তিনি বাঙালি নারীকে বিয়ে করেছিলেন। মার্চের উত্তপ্ত সময়ে যুদ্ধ, যুদ্ধভাব। সেই বাড়ির চিলেকোঠায় মেশিনগান বসিয়ে আমাদের বাসার দিকে ব্যারলটি ঘুরিয়ে দেয়, যাতে ভয় দেখানো যায়। কেননা রাজনীতিবিদরা তখন দলে দলে আমাদের বাসায় আসতেন। তখন খবর আসলো যে, বিহারিরা অস্ত্র-সস্ত্র সংগ্রহ করছে (তারা মহররম পালন করত বিভিন্নভাবে খবর পেত)। তাদের কলোনিটি ছিল কাঞ্চন নদীর ধার ঘেসে। কিন্তু আমাদের কাছে কোন অস্ত্র ছিল না। অস্ত্র বলতে যা ছিল তা হলো কাঠ ও বাঁশ চোকা করে কাটা, কোন কাঠের চোকায় টিন পেচানো, আর দেশিয় দা-লাঠি ও স্থানীয় অস্ত্র। আমার বড় দুই ভাই টিনের কিছু ডিব্বা, কেরোসিন তেল সংগ্রহ করে ছাদে রাখে বোমা বানানোর জন্যে। তখন চিন্তাটি এমন ছিল যে, এগুলো দিয়ে পাকিস্তানীদের মারলেই যুদ্ধ জয় হয়ে যাবে! পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর অস্ত্র-সস্ত্র সম্পর্কে তরুণদের কোন ধারণা ছিল না। তারা মনে করতো সৈন্যদের ওপর এগুলো নিক্ষেপ করলেই যুদ্ধ জয়!

বিপ্লব মল্লিক: যতটুকু নিজেদের আত্মরক্ষা করা যায় সেটাই ভাবতো? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: হ্যাঁ, সেটাই। তরুণরা দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ। ক্যান্টনমেন্ট ছিল সৈয়দপুরে। আমরা সেনাবাহিনীকে দেখতে পেতাম না, তবে শুধু ১৯৭০ এর নির্বাচনে দায়িত্বপালন করতে দেখেছি। ২৫ মার্চের রাতে ঢাকা পাকিস্তানিরা হামলা করেছে সে বিষয়টি তখন আমরা জানতাম না। কেননা তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা মোবাইল ছিল না, টেলিফোনও আমাদের বাসায় ছিল না। সেদিন রাতেই যে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেফতার হয়েছেন সেটি আমরা জানতাম না। মাঝরাতে হঠাৎ ভারি লরির শব্দ, আমাদের বাড়ির সামনে দিয়ে যাচ্ছে। সাথে সাথে শ্লোগান, জয় বাংলা, তবে ঠিক জয় বাংলা নয় জয় বোংলা! তারপর ফায়ার, ফায়ার, ব্রাশ ফায়ার। মেজর রাজার বাড়ির মেশিনগান থেকে গুলি ছুঁড়া হচ্ছে আমাদের বাড়ির দিকে। তবে বাড়িতে লাগছে না উপর দিয়ে যাচ্ছে। কিছুক্ষণ একটু বিরাম দেয়, আবার গুলি। আমরা হামাগড়ি দিয়ে আম্মার ঘরের চকির নিচে আশ্রয় নিই। একপর্যায়ে গুলির শব্দ কমলে বাড়ির অন্যকোণে আমাদের দুই ভাই থাকতেন আব্বা সেখানে গিয়ে দেখলেন ওরা বেঁচে আছে কিনা? অবস্থা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হলো। ভোরবেলা কারফিউ ঘোষণা করা হয়। সকালে একজন একটি স্লিপ নিয়ে এসে জানান জেলাপ্রশাসক আব্বাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। তিনি আমাদের পাঠিয়ে দিয়ে ডিসির কাছে গেলেন। তিনি চিন্তা করেননি সেখানে গেলে বন্দি হয়ে যেতে পারেন। কাঞ্চন নদীর পাশে আমাদের আত্মীয় বাড়িতে পৌঁছে গেলাম। সেদিন তিনি আর আসেননি। পরদিন তিনি চিরকুট পাঠালেন আমি বেঁচে আছি-ভালো আছি। বিহারি কলোনির দুই কিলোমিটার দূরে কুটিবাড়ি। গ্রামবাসীর কিছু মানুষ অস্ত্র নিয়ে বিহারি কলোনির দিকে যেতে চাইলে তারা দু’জনকে গুলি করে মেরে ফেলে। আমরা যখন নদী পাড় হচ্ছি তখন দেখলাম সেই লাশ দুটি নিয়ে যাচ্ছে। টপ টপ করে রক্ত পড়ছে। নদী পার হলে সেখানকার মানুষরা পথে পথে আব্বার সাথে দেখা করলেন, তিনি বিভিন্নস্থানে ভাষণ দিলেন। সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের কনভেনার ছিলেন আব্বা। শরণার্থীর কথা বলতে গেলে সে অনেক কথা?

‘চিরকুট পাঠালেন, আমি বেঁচে আছি-ভালো আছি’

বিপ্লব মল্লিক: সেই সময়কার কষ্টের কথাগুলো স্যার।

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: সৈয়দপুর-দিনাজপুর শহরের মধ্যে ভুসিরবন্দরের ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়া যায় কিনা তা নেতারা আলোচনা করেন। আর তখন এতো সরঞ্জাম ছিল না। তাই সেখানকার নেতারা সিদ্ধান্ত নিল আব্বা তার ক্ষমতাবলে ভারতে গিয়ে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে আসবে। তিনি গেলেন। এই ব্রিজটি উড়িয়ে দেয়া হয়। ১৩ এপ্রিল দিনাজপুরের পতন হয় পাকিস্তানের কাছে। তারা অন্যপ্রান্ত দিয়ে শহরে ঢুকে পড়ে। আমরা এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে পালাতে থাকি। ১৮ এপ্রিল নানার বাড়িতে ফিরে আসি। কাকতালীয়ভাবে আব্বা সেদিন ৮ জন ইপিআরকে দিয়ে নানার কাছে একটি স্লিপ পাঠিয়ে দিলেন আমাদেরকে যেন বর্ডারের কাছে পাঠিয়ে দেয়া হয়। সেখানে একটি ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকবে তারা রিসিভ করবে। তখন নানার বাড়িতে দেড় শতাধিক মানুষ আশ্রয় নিয়েছে। গভীর রাতে (৩/৪টা হবে) আমাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে দিয়ে বলা হয় প্রস্তুত হতে, তবে মুখে আঙুল দিয়ে যেন শব্দ না হয় (যেন চোর চোর ভাব)। আমরা পালিয়ে যাচ্ছি এটি যেন কেউ না জানতে পারেন। তখন আমাদের দুটি রাইফেল। ভাইয়েরা সেগুলো চালানো শিখে গেছে, কিন্তু ওজনের কারণে আমার শিখা হয়নি। ডিসট্রিক রোড ছিল দুটি, তা ক্রস করতে পারলেই আমরা সেভ (নিরাপদ)। আমরা গরুর গাড়ি দিয়ে যাচ্ছি, চিড়াগুড় সাথে নিয়ে। যেতে যেতে বিকাল হয়ে যায়। আমাদের যে খামার বাড়িতে (আখ কালেকটিং সেন্টার) যাওয়ার কথা ছিল তার পরিবর্তে ভুল করে অন্যটিতে চলে যায়। তখন খবর পেলাম আমাদের যেখানে যাওয়ার কথা সেখানে ঘণ্টাখানেক আগে পাকিস্তান বাহিনী হামলা করে ট্রাক পুড়িয়ে দিয়েছে। অনেক মানুষকে হত্যা করেছে। সেক্ষেত্রে আমাদেরকে যারা গ্রহণ করার কথা তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। সন্ধ্যা হবে হবে সময়ে ঝুপঝাড় পার হয়ে যাচ্ছি। তখন একজন লোক বললো অস্ত্র নিয়ে আপনারা ইন্ডিয়া (ভারত) যেতে পারবেন না, আপনাদেরকে বিজিবি গুলি করে মেরে ফেলবে। আমরা বললাম কি করা যায়? তিনি বললেন আমার কাছে রেখে যান। তখন তাকে দিয়ে দেয়া হলো। পরে শুনেছিলাম লোকটি ডাকাত ছিল। পরে তার কাছ থেকে আবার অস্ত্রগুলো উদ্ধার করা হয়।

ফারুক আহমাদ আরিফ: তখন নাকি ডাকাতরাও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কাজ করেছে, অংশ নিয়েছে? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: হ্যাঁ, মানুষ তো। বাঙালি তো। তারা যখন দেখেছে পাকিস্তানিরা তাদের চেয়েও বড় ডাকাত তখন দেশের পক্ষে অস্ত্র তুলে নিয়েছে। ওই বড় দস্যুদের কারণে তারাও বাঁচবে না। আমরা মালংয়ে গিছে পৌঁছলাম। এটি ভারতের অংশ। আমরা যখন গরুর গাড়ি দিয়ে এবড়ো থেবরু রাস্তা পার হচ্ছি। ওইটাই (মালং) ভারত।

‘চিরকুট পাঠালেন, আমি বেঁচে আছি-ভালো আছি’

বিপ্লব মল্লিক: এটি বাংলাদেশের কোথায় পড়েছে? 

মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: এটি পীরগঞ্জ থানার বর্ডারে। আমরা সেখানে গিয়ে স্থানীয় লোকজনকে বললাম এমন এমন আকৃতির মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা (অ্যাড. মো. আজিজুর রহমান) চিনেন নাকি? কারণ আমাদের কাছে কোন তথ্য নেই। যেভাবেই হোক আব্বাকে পেতে হবে। পরে দূরে দেখলাম একটি রিকশা। আরে আব্বাই তো!!! আব্বার সাথে আরেকজন মানুষ। তখন আব্বা আমাদের কাছে আর আব্বা ছিলেন না, দেবদূতের মতো ছিলেন। ফিনফিনে সাদা পাঞ্জাবি। এটি আব্বার তখনকার ছবি। এটি ১৯৬৯ সালের ছবি।

ফারুক আহমাদ আরিফ: দেখতে অনেকটা বঙ্গবন্ধুর মতোই।

 মুজতবা আহমেদ মুরশেদ: তখন প্রায় এমনি। বেশিরভাগ নেতারাই এমন ছিল। সেখানে স্থানীয় খোশ মোহাম্মাদ নামের কংগ্রেস নেতার বাড়িতে নিয়ে গেলেন। সেখানে থাকার তেমন কিছুই নেই। গরুর গাড়ির বিছানা নামিয়ে নেয়া হলো। সেটি বিছিয়ে আমরা শুয়ে পড়লাম। খাবার কিছু নেই। হাতে আছে মাত্র ১৪ টাকা। এই নিয়েই শরণার্থী জীবন শুরু। সেখান থেকে আরো নিরাপদস্থানে পাঠিয়ে দেয়া হলো ভারতীয় আর্মির গাড়িতে করে হিন্দুল নামক স্থানে (কুলিখ নদী যা বাংলাদেশ ‘পূর্বপাকিস্তান’ ভারতকে ভাগ করেছে)। সেখানে আমাদের আত্মীয়ের বাড়ি। যার নাম জওহরলাল নেহরু। কেন, সে নেহরুর হাত থেকে গমচাষের জন্যে পুরস্কার পেয়েছিলেন হেন্ডসেক করেছিলেন এই জন্যে তার আসল নাম গায়েব, সবাই তাকে নেহরু নামেই ডাকে। সেখানে দু’রাত ছিলাম। সেখানে থাকাটা দূরুহ হয়ে উঠে কেননা খবর ছড়িয়ে পড়েছিল আমরা সেখানে আছি। মুসলিম লীগারসহ অন্যরা এটি ছড়িয়ে দেয়। তো কংগ্রেস নেতারা বসে সিদ্ধান্ত নিলেন এখানে আমাদের থাকা নিরাপদ নয়, অন্যস্থানে চলে যেতে হবে।

Bootstrap Image Preview