Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ সোমবার, জানুয়ারী ২০১৯ | ৮ মাঘ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

৮৪৮ প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থী ৬৮ জন; আনুপাতিক হারে আশানুরূপ নয়

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৭:৪১ PM
আপডেট: ২৩ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৭:৪১ PM

bdmorning Image Preview
ফাইল ছবি


১৯৭৩ সালে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারী প্রার্থী দুই জন থেকে ২০১৮ সালে একাদশ নির্বাচনে সে সংখ্যা এসে দাঁড়িয়েছে ৬৮ তে। এবারের নির্বাচনে ৩০০ আসনের ৮৪৮ প্রার্থীর মধ্যে ৬৭ টি আসনে আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৬৮ জন নারী প্রার্থী। এই সংখ্যা অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে বেশি হলেও আনুপাতিক হারে তা খুবই কম।

এবারের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রার্থী হতে চেয়েছিলেন ১১৮ জন নারী। এর মধ্যে বিএনপির ৪৩, আওয়ামী লীগের ১৯, স্বতন্ত্র ১৮, জাতীয় পার্টির ১১ ও অন্যান্য দলের ২৭ জন। তাঁদের মধ্যে রিটার্নিং অফিসারের বাছাইয়ে বাদ পড়েন বিএনপির খালেদা জিয়াসহ ১০, জাতীয় পার্টির তিন এবং স্বতন্ত্র ১২ সহ মোট ২৬ জন। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন নির্বাচন কমিশনে আপিলে প্রার্থিতা ফিরে পান।

পরে টিকে থাকাদের অনেকেই তাঁদের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নেওয়ায় চূড়ান্তভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন ৩০০ আসনের মোট এক হাজার ৮৪৮ প্রার্থীর মধ্যে ৬৭ আসনে ৬৮ জন।

একাদশ সংসদ নির্বাচনে যে ৬৮ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন; এদের মধ্যে আওয়ামী লীগের হয়ে ‘নৌকা’ প্রতীকে ২০ জন, বিএনপির হয়ে ‘ধানের শীষ’ প্রতীকে ১৪ জন, জাতীয় পার্টির ‘লাঙল’ নিয়ে ৫ জন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ৬ জন ভোট করছেন।

এছাড়া ন্যাশনাল পিপল্স পার্টির (এনপিপি) ৪ জন, বাংলাদেশ ন্যাশনালিস্ট ফ্রন্টের (বিএনএফ) ৩ জন, জাকের পার্টির ৩ জন, বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির ২ জন, বাংলাদেশ মুসলিম লীগ-বিএমএলের ২ জন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির ২ জন নারী প্রার্থী রয়েছেন ভোটের মাঠে।

এছাড়া জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি- জাগপা, বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ, গণফ্রন্ট, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক দল, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি-সিপিবি, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির একজন করে নারী প্রার্থী নির্বাচন করছেন।

এর মধ্যে জাতীয় পার্টির রওশন এরশাদ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন দুটি আসনে। একটি আসন থেকে তিনি পরে প্রার্থিতা প্রত্যাহারের ঘোষণা দিলেও নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর ওই আসনের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার আর সুযোগ নেই।

কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া এবার তিনটি আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও দুর্নীতি মামলায় সাজা হওয়ায় তার মনোনয়নপত্র বাতিল হয়ে গেছে।

ইসি সচিব হেলালুদ্দীন বলেন, ‘কয়েকটি আসনের প্রার্থিতা নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। তাতে কিছু পরিবর্তন আসতে পারে। আদালতের নির্দেশনার পর প্রার্থী বাড়তে ও কমতে পারে। ৩০ ডিসেম্বরের আগে তা চূড়ান্ত হবে।‘

৩০০ আসনে মোট প্রার্থীর মধ্যে নারী প্রার্থীর সংখ্যা এখনও আটকে আছে ৪ শতাংশের মধ্যে, যা নিয়ে সন্তুষ্ট নন নারী অধিকারকর্মীরা।

‘নিঃসন্দেহে বিগত বছরগুলোর তুলনায় রাজনীতিতে নারীদের বিচরণ বেড়েছে। এবারের প্রার্থীর সংখ্যাও তুলনামূলকভাবে বেশি। তবে এটি কখনোই আশানুরুপ নয়। ৩৩ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিবন্ধন নেয় রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু বাস্তবিকভাবে এর প্রতিফলন আমরা লক্ষ্য করছিনা। সেটি নিশ্চিত করতে পারলেই নারীর সত্যিকারের ক্ষমতায়ন সম্ভব।‘ বলে বিডিমর্নিংকে জানান মানবধিকার কর্মী খুশি কবির।

বিগত বছরগুলোতে নারী প্রার্থী ও বিজয়ীদের সংখ্যা-

প্রথম নির্বাচন : বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ। এ নির্বাচনে দুজন নারী প্রার্থী তিনটি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেও শেষপর্যন্ত তাঁরা নির্বাচিত হতে পারেননি। সে সময় দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ থেকে কোনো নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন না।

দ্বিতীয় নির্বাচন : ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় সাধারণ নির্বাচনে ১১টি আসনে আওয়ামী লীগের তিনজনসহ ১২ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিএনপির কোনো নারী প্রার্থী ছিলেন না। এই নির্বাচনেও নারী প্রার্থীরা কেউ জয়ী হতে পারেনি।

তৃতীয় নির্বাচন : ১৯৮৬ সালের ৭ মে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট বর্জন করে। এ নির্বাচনে শেখ হাসিনাসহ তিনজন নারী প্রার্থী নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা নির্বাচিত হন তিনটি আসন থেকে এবং বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী হিসেবে সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। এই নির্বাচনে ১৫টি আসনে মোট ১৩ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন। আওয়ামী লীগের ছিলেন পাঁচজন আর জাতীয় পার্টির দুজন।

চতুর্থ নির্বাচন : ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ অনুষ্ঠিত চতুর্থ সাধারণ নির্বাচন বর্জন করে আওয়ামী লীগের শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আটদলীয় জোট এবং বিএনপির খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাতদলীয় জোট। এই নির্বাচনে ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে তিন নারী নির্বাচিত হন।

পঞ্চম নির্বাচন : ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্যাপক অংশগ্রহণমূলক পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৪৬টি আসনে ৩৯ জন। এই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া এবং এর পর থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়টুকু বাদে নারীরাই রাষ্ট্রের নির্বাহী প্রধানের দায়িত্বে রয়েছেন।

ষষ্ঠ নির্বাচন : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ নির্বাচন ছিল দেশের অন্যতম একটি ব্যর্থ নির্বাচন। গঠিত সংসদ মাত্র ১২ দিন স্থায়ী হয়। এ নির্বাচনের তথ্যও নির্বাচন কমিশন সংরক্ষণ করেনি। তবে গণমাধ্যমে সে সময় প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, এই নির্বাচনে খালেদা জিয়াসহ তিন নারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।

সপ্তম নির্বাচন : ১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের সপ্তম সাধারণ নির্বাচনে ৪৯টি আসনে ৩৭ জন নারী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ছিলেন।

অষ্টম নির্বাচন : ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অনুষ্ঠিত অষ্টম সাধারণ নির্বাচনে ৪৬টি আসনে নারী প্রার্থী ছিলেন ৩৮ জন। তাঁদের মধ্যে নির্বাচিত হন ছয়জন।

নবম নির্বাচন : ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নবম সাধারণ নির্বাচনে নারী প্রতিদ্বন্দ্বীর সংখ্যা ছিল ৬৪ আসনে ৫৯ জন। এর মধ্যে ২৩টি আসনে ১৯ জন বিজয়ী হন।

দশম নির্বাচন : দশম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি। নিবন্ধিত দলগুলোর মধ্যে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটসহ ২৮টি দল নির্বাচন বর্জন করেন। বিএনপি-জামায়াত জোট নির্বাচন প্রতিহত করার ঘোষণা দেয়। অংশ নেয় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও তাদের সমমনা দলগুলোসহ ১২টি দল। ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এ অবস্থায় এই নির্বাচনে মোট নারী প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৩০ আসনে ২৯ জন। এর মধ্যে ১৯ আসনে ১৮ জন নির্বাচিত হন।

যদিও নারীদের জন্য সংরক্ষিত ৫০টি আসনে সরাসরি নির্বাচনের দাবি ছিল নারী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে, তবে সে দাবি এবারও পূরণ হয়নি। গত ৮ জুলাই সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীর মাধ্যমে আরো ২৫ বছরের জন্য সংরক্ষিত এই ৫০টি আসনের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের জন্য কাজ করে আসা বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘নারীরা  এখন সর্বত্র ঝলঝল করছে। কোথাও যে কমতি নেই তা যোদ্ধানীরা প্রমাণ করে দিচ্ছে সর্বক্ষণ। নারীর ক্ষমতায়ণের এক আমূল অংশ রাজনীতি হলেও, এই জায়গাটায় যেনো পিছিয়ে রয়েছে নারীরা। নারী নেতৃত্বে এগিয়ে যাওয়া দেশে এমন চিত্র খুবই দুঃখজনক। আমরা চেষ্টা চালিয়ে  যাচ্ছি  এখনো সেই দুর্বলতা কাটিয়ে সামনে অগ্রসর হওয়ার জন্য।' 

নারীরা সরাসরি নির্বাচনে সফলতা লাভ করেন তৃতীয় সাধারণ নির্বাচনে। এ নির্বাচনে বাংলাদেশের ইতিহাসে শেখ হাসিনাসহ তিনজন নারী প্রার্থী নির্বাচিত হন। শেখ হাসিনা নির্বাচিত হয়ে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একজন নারী হিসেবে সংসদে বিরোধীদলীয় নেত্রীর দায়িত্ব পালন করেন।

এরপর পঞ্চম সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব লাভ করেন খালেদা জিয়া। পরের ২৭ বছরের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আড়াই বছর বাদ দিয়ে বাকি সময় দেশের প্রধান নির্বাহী তথা প্রধানমন্ত্রী এবং সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার দায়িত্বে নারীরাই রয়েছেন।

কিন্তু এই শীর্ষপদগুলো ছাড়া রাজনীতিতে নারীর অবস্থানে তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি।

Bootstrap Image Preview