Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ০৪ বৃহস্পতিবার, জুন ২০২০ | ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ | ঢাকা, ২৫ °সে

বঙ্গোপসাগরে রহস্যে ঘেরা সেন্টিনেল দ্বীপের আপন মানুষ বাঙ্গালি নারী!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:১৭ PM
আপডেট: ২৫ নভেম্বর ২০১৮, ০৬:১৭ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত ছবি


বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দীপপুঞ্জের অন্তর্গত একটি দ্বীপ হলো নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড।  নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপে মানুষ থাকে ঠিকই! এখানে  ‘সেন্টিনেলী’ নামক এক প্রাচীন উপজাতিদের বসবাস। তবে, সেই উপজাতি অন্য কোনও মানুষের সংসর্গ একেবারেই পছন্দ করে না।

আন্দামানের নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের উপজাতিদের তিরে তরুণ মার্কিন ভূপর্যটক-ধর্মপ্রচারক জন অ্যালেন চাওয়ের মৃত্যু নিয়ে বিশ্ব যখন উত্তাল, তখন দিল্লিতে সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকের যুগ্ম অধিকর্তা মধুমালা চট্টোপাধ্যায়ের মনে পড়ছে সাতাশ বছর আগের কথা। হাওড়ার মেয়ে, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী, নৃতত্ত্বের গবেষক মধুমালা সেই দ্বীপে গিয়েছিলেন ভারত সরকারের ‘গিফ্ট ড্রপিং’ মিশনের অন্যতম সদস্য হিসাবে। তির ধেয়ে এসেছিল তাঁদের দিকেও। কিন্তু এক সেন্টিনেলি উপজাতিমহিলার হস্তক্ষেপে সেটি এসে পড়ে সমুদ্রের জলে। 

বিশ্বাস হল না? মনে হচ্ছে আধুনিক সভ্যতা থেকে দূরে থাকা শিকারি-খাদ্য সংগ্রাহকরা কি সত্যিই এতটা দয়াপরবশ হতে পারে? উত্তরটা মধুমালার বয়ানেই শোনা যাক।

‘দিনটা ছিল ১৯৯১ সালের ৩ জানুয়ারি। রাতে এম ভি তারমুগলি জাহাজে করে নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপের উদ্দেশে রওনা হই আন্দামান ও নিকোবর প্রশাসনের উপজাতি কল্যাণ বিভাগের অধিকর্তা এস আওয়ারাদি, ডাক্তার অরুণ মল্লিক, সাধারণ পোশাকে দশ নিরাপত্তারক্ষী এবং আমি। পর দিন সকাল আটটা নাগাদ প্রচুর নারকেল নিয়ে একটি সরকারি নৌকায় চেপে আমরা এগিয়ে যাই দ্বীপের দিকে। প্রথমে চোখে পড়ে কয়েকটি কুঁড়েঘর। খানিক পরে সমুদ্রতীরে দেখা গেল অল্প কিছু সেন্টিনেলিকে। তাদের মধ্যে কয়েক জনের হাতে তির-ধনুক।’

বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত আন্দামান দীপপুঞ্জের অন্তর্গত একটি দ্বীপ হলো নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড।  নর্থ সেন্টিনেল দ্বীপে মানুষ থাকে ঠিকই! এখানে  ‘সেন্টিনেলী’ নামক এক প্রাচীন উপজাতিদের বসবাস। তবে, সেই উপজাতি অন্য কোনও মানুষের সংসর্গ একেবারেই পছন্দ করে না।  বহিরাগতদের ওপর আক্রমণাত্মক মনোভাবের জন্য সেন্টিনেলবাসী বিশেষভাবে পরিচিত। সেন্টিনেলী জাতি প্রধানত একটি শিকারী-নির্ভর জাতি। তারা তাদের বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ শিকার, মাছ ধরা, এবং বন্য লতাপাতার মাধ্যমে  পূরন করে থাকে। এখন পর্যন্ত তাদের মাঝে কৃষিকাজ করা বা আগুন ব্যবহারে প্রমাণ পাওয়া যায় না। সেন্টিনালিসদের কাছে তাদের ৭২ বর্গকিলোমিটার (১৮,০০০ একর) আয়তনের  দ্বীপটিই যেন পৃথিবী।

১৯৭৫ সালে ন্যাশনাল জিওগ্রাফির একজন পরিচালক একটা তথ্যচিত্র বানাবার উদ্দেশ্যে গিয়ে পৌঁছিয়েছিলেন সেই দ্বীপে। কিন্তু হিংস্র উপজাতিরা তার পায়ে বিষাক্ত তীর মারে ফলে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হন। তখন থেকেই সেখানে কারও প্রবেশাধিকার নেই। তারপর আর কেউই সেখানে যেতে খুব একটা ঝুঁকি নেয় না।

কাগজে কলমে সেন্টিনেল ভারতের অধিকারে থাকলেও বাস্তবে তারা সম্পূর্ণ স্বাধীন। এখন পর্যন্ত ভারত সরকারও সেন্টিনেল দ্বীপ সম্পর্কে তেমন তথ্য সংগ্রহ করতে পারে নি। উল্লেখ্য কুট জাতি হিসেবে পরিচিত ব্রিটিশদের ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৮৮০ সালে দ্বীপটি দখলের পায়তারা করে । এ উদ্দেশ্য তারা দ্বীপ থেকে কয়েকজন অধিবাসী ধরে নিয়ে আসে।  অপহরনের উদ্দেশ্য ছিল তাদের ভাল খাবার দাবার পরিবেশ দিয়ে তাদের মন জয় করে দ্বীপের দখল নেওয়া। কিন্ত ব্রিটিশদের এই চেষ্টা গোড়াতেই শেষ হয়ে যায় । কারন দ্বীপবাসীদের ধরে আসার পর পরই দ্বীপবাসীরা মারা । এর কারন হিসেবে ধারনা করা হয় তাদের দুর্বল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। সভ্য জগত থেকে অনেক কাল দূরে থাকায় ধারনা করা হয় সর্দি-কাশির মত সাধারন রোগে এরা মারা যেতে পারে !

১৯৬৭ সাল থেকে পোর্ট ব্লেয়ারে অবস্থিত ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সেন্টিনেলদের সাথে যোগাযোগ করার জন্যে বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়ে আসছে। এসব অভিযানে তাঁদেরকে উপহার হিসেবে সমুদ্র সৈকতে খাবার ছড়িয়ে (যেমন: নারকেল) বন্ধুত্ব স্থাপনের চেষ্টা করা হয়। এসব প্রচেষ্টার মাধ্যমে সেন্টিনেলদের মধ্যে তৈরি বহিরাগতদের সম্পর্কে সৃষ্ট হিংস্র মনোভাব দূর করার চেষ্টা করা হয়। কিন্ত বাস্তবে এসব কোন কাজে আসে নি।

সরকারি দল একটুও না ঘাবড়ে একটা একটা করে নারকেল গড়িয়ে দিতে থাকে সেন্টিনেলিদের দিকে। অন্য দিকে তারাও আহ্লাদের সঙ্গে কুড়িয়ে নিতে থাকে। ১৯৮৯ সালে আন্দামানে আসার পর ওঙ্গে উপজাতিদের নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা ছিল মধুমালার। তাঁদের ভাষাও কিছুটা রপ্ত হয়েছিল। তার উপরে ভর করে মধুমালা যখন সেন্টিনেলিদের উদ্দেশে বলেন, ‘কাইরি ইচেইরা’ (আমি তোমাদের মায়ের মতো। এ দিকে এসো), সেন্টিনেলিরা বলে, ‘নারিয়ালি জাবা, জাবা (আরও নারকেল পাঠাও)। কিন্তু তত ক্ষণে নারকেলের ভাণ্ডার শেষ। 

ওই দিনই দুপুর দুটো নাগাদ চটের বস্তায় করে প্রচুর নারকেল নিয়ে ফিরলেন মধুমালারা। এ বার নৌকার আরও কাছাকাছি এসে সেগুলি নিয়ে গেল সেন্টিনেলিরা। এল না শুধু এক জন। আঠারো-উনিশ বছরের এক তরুণ মধুমালাদের উদ্দেশে তির-ধনুক তাক করতেই তাকে ধাক্কা দিল এক মহিলা। একশো মিটার দূরত্বের মধ্যে সেন্টিনেলিদের নিশানা একেবারে অভ্রান্ত। কিন্তু এ বার সেটি জলে পড়ল। এর পর সরকারি দল তীরে উঠে উপজাতিদের হাতে উপহার দিল নারকেল। প্রথম বার সফল হল এই দ্বীপে ‘গিফ্ট ড্রপিং’ অভিযান। মধুমালার মতে, সরকারি দলে এক মহিলার উপস্থিতি উপজাতিদের বিশ্বাস অর্জনে সক্ষম হয়েছিল। অথচ এই ঘটনার মাস কয়েক আগে আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ওই দ্বীপের কাছাকাছি পৌঁছতেই সেন্টিনেলিদের তিরের আঘাতে জখম হন। হেলিকপ্টারে করে তাঁকে পোর্ট ব্লেয়ারে ফিরিয়ে আনতে হয়েছিল। 

১৯৯১-এর ২১ ফেব্রুয়ারি বিশিষ্ট নৃতত্ত্ববিদ টি এন পণ্ডিতের নেতৃত্বে যে দলটি ওই দ্বীপে যায়, তারও সদস্য ছিলেন মধুমালা। সেন্টিনেলিরা যাতে তাঁকে সহজে চিনতে পারে তাই আগের বারের মতোই তিনি পরেছিলেন নীল চুড়িদার ও সাদা ওড়না। এ বার নারকেল নিতে সেন্টিনেলিরা সরাসরি নৌকাতেই উঠে আসে। এর পরে মধ্য-নব্বইয়ে আন্দামানের আদিম উপজাতিদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের নীতি থেকে সরে আসে কেন্দ্র। 

১৯৮৯ থেকে ১৯৯৬, রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হিসাবে মধুমালা এই দ্বীপপুঞ্জের ছ’টি উপজাতি -- গ্রেট আন্দামানিজ, ওঙ্গে, জারোয়া, সেন্টিনেলি, শম্পেন এবং নিকোবরিজ – প্রত্যেককে নিয়ে কাজ করেছেন। এর জন্য সফর করেছেন প্রত্যেকটি উপজাতির মূল আবাসস্থলে। লিটল আন্দামান থে কে মিডল আন্দামান, গ্রেট নিকোবর থেকে কার নিকোবর। সেখানে তাঁর নামই হয়ে গিয়েছিল ‘জংলি ম্যাডাম’। এই বিষয়ে প্রকাশ করেছেন কুড়িটি গবেষণাপত্র। তাঁর লেখা বই ‘ট্রাইবজ অফ কার নিকোবর’ স্থান পেয়েছে ব্রিটিশ মিউজিয়াম, অক্সফোর্ড ও হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগারে। ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ নাগপুরে ভারতীয় নৃতাত্ত্বিক সর্বেক্ষণের একটি প্রকল্পে কাজ করার পর মধুমালা পাকাপাকি ভাবে দিল্লিতে সামাজিক ন্যায় ও ক্ষমতায়ন মন্ত্রকে যোগ দেন। 

নৃতত্ত্ব বিশেষজ্ঞ মধুমালার সাফ কথা, ‘আন্দামান ও নিকোবরের উপজাতিদের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতেই হবে। মূলস্রোতে তাদের ফেরানোর চেষ্টা করলে হিতে বিপরীত হবে।’ 

২০০৬ সালে আন্দামান দ্বীপের দুইজন জেলে এ দ্বীপের কাছাকাছি মাছ ধরতে যায়।  রাতের বেলা অত্যধিক মদ পানে ঘুমিয়ে পড়লে সমুদ্র স্রোতে ভেসে তারা দ্বীপে চলে যায়। দ্বীপ বাসীরা জেলেদের নিসংসভাবে হত্যা করে। ভারতীয় কোস্ট গার্ড জেলেদের লাশ উদ্ধার করতে হেলিকপ্টার পাঠায় দ্বীপ বাসীরা তাদের হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে তীর ছুড়তে থাকে।  যদিও উদ্ধার অভিযানে আসা হেলিকপ্টার থেকে তাঁদের মরদেহ দেখা গিয়েছিলো। উদ্ধারকারী হেলিকপ্টারের পাখার ঘূর্ণনে সৃষ্ট প্রবল বাতাদের তোড়ে সেন্টিনেলদের অল্পগভীর কবরের মাটি সরে গিয়ে ঐ দুজন জেলের মৃতদেহ দেখা যায়। কোস্ট গার্ড তীরের মুখে লাশ উদ্ধার না করেই ফিরে আসে।

এর পর ভারত সরকার সিদ্ধান্ত নেয় সেন্টিনল বাসীদের জীবন যাত্রা বাইরের প্রভাবমুক্ত রাখার। ভারত সরকার তাদের স্বাভাবিক জীবন যাত্রা রক্ষার্থে দ্বীপের তিন কিলোমিটারের মধ্যে যাওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে।

এখন পর্যন্ত সঠিকভাবে সেন্টিনেলীদের জনসংখ্যার কোনো পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না। তবে, ধারণা অনুযায়ী এদের জনসংখ্যা সর্বনিম্ন ৩৯ থেকে ২৫০-এর মধ্যে, এবং সর্বোচ্চ ৫০০ পর্যন্ত হতে পারে বলে ধারনা করা হয়। । ২০০১ সালে ভারত সরকার কর্তৃক পরিচালিত  জনপরিসংখ্যানে ৩৯ জন পৃথক ব্যক্তির উপস্থিতি রেকর্ড করা হয় যাদের মাঝে ২১ জন পুরুষ ও ১৮ জন নারী। তবে নিরাপত্তাজনিত কারনে জরিপটি অনেক করায় এর সঠিক জনসংখ্যা পাওয়া যায় না।

চমৎকার একটি দ্বীপ নর্থ সেন্টিনেল আইল্যান্ড। দ্বীপটি খুব সহজেই আকর্ষণ করবে যে কাউকে। তবে চাইলেই আপনি এর সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন না !

Bootstrap Image Preview