Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৩ বুধবার, নভেম্বার ২০১৯ | ২৯ কার্তিক ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

বাবা-মা নবীর নামে নাম রেখেছিলেন হারুন, কিন্তু হলো ঘৃণ্য ধর্ষক-খুনি, আফসোস!

আনিসুর রহমান
প্রকাশিত: ০৮ জুলাই ২০১৯, ০৮:২৪ PM
আপডেট: ০৮ জুলাই ২০১৯, ০৮:২৪ PM

bdmorning Image Preview
সংগৃহীত


স্বস্তির খবর হলো ফুলের পাপড়ির মতো ফুটফুটে ৭ বছরের নিষ্পাপ শিশু সায়মার খুনি ও ঘৃণ্য ধর্ষক হারুন ধরা পড়েছে। ঘটনার একদিনের মাথায়ই শনিবার রাতে তাকে কুমিল্লার মেঘনার গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই ঘাতক সায়মাদের ফ্লাটেই আত্মীয়ের বাসায় মাঝে মাঝে এসে থাকতো। শুক্রবার (৫ জুলাই) রাত সাড়ে ৮টার পর যখন এই নৃশংস বর্বর ধর্ষণ ও হত্যার খবর ফুটফুটে সায়মার ছবিসহ ফেসবুকে ভাইরাল হয়, তখন এই খবর ছাড়া যেন আর আর কিছুই ফেসবুকে ছিল না। এই নিষ্পাপ শিশুটির সাথে এমন নিষ্ঠুরতার ঘটনায় ফেসবুকে প্রতিবাদের ঝড় ওঠে। দাবি ওঠে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির। ঘটনার সঙ্গে সঙ্গে এর বিচার চেয়ে এলাকায় বিক্ষোভ মিছিলও হয়েছে।

এই খুনিকে ধরতে পারায় আমি পুলিশকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। কারণ এই নির্মম খুনি-ধর্ষকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি শুধু সায়মার বাবা-মা কিংবা তার স্বজনের নয় দেশের লাখো মানুষের। আমরা সায়মার খুনির এমন শাস্তি আমরা চাই, যেন তা দেখে দেশের সকল ধর্ষক-খুুনিদের আত্মা ভয়ে কেঁপে ওঠে, তাদের হৃৎকম্পন শুরু হয়। আর যেন কোনো ধর্ষক কোনো নারী বা শিশুর সাথে পাশবিক আচরণ করার চিন্তা কেউ না করে।

রাজধানীর ওয়ারী থানার ১৩৯ বনগ্রামের বাড়ির ৬ তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে বাবা-মা ভাই বোনের সঙ্গে থাকতো সামিয়া আফরিন সায়মা তার। নিহত সায়মা সিলভারডেল স্কুলে নার্সারিতে পড়তো। তার বাবা আব্দুস সালাম পুরান ঢাকার নবাবপুরের ব্যবসায়ী। দুই ভাই দুই বোনের মঝে সায়মা ছিল সবার ছোট। বাবা-মা ভাই-বোনদের কাছে সে ছিল সাত রাজার ধন। দেখতে ফুটফুটে হওয়ায় আশপাশের সবাই তাকে একটু বেশিই আদর করতো। প্রতিদিনের মতো বিকালের দিকে সায়মা ওপর তলার একটি ফ্ল্যাটে তার সমবয়সী একটি শিশুর সাথে খেলতে বের হয়।

অন্যদিনের মতোই খুব স্বাভাবিকভাবে মাকে বললো, মা আমি ওপেরর ফ্লাটে খেলতে যাচ্ছি। মা বললো, যেয়ো না, তোমার অনেক পড়া আছে, সায়মা বললো, আম্মু ১০ মিনিটিরে জন্য যাবো। ফিরে এসে পড়া শেষ কররো। সায়মা চলে গেল। কিন্তু কে জানতো এটাই হবে তার মায়ের সাথে শেষ কথা। কে জানতো তার আর কোনো দিন বাসায় ফেরা হবে না, তার হাতে আর কেনোদিন উঠবে না ক্লাসের বই। পড়ার জন্য আর কোনোদিন মায়ের বকুনি খেতে হবে না। মা মা, আব্বু আব্বু করে আর ঘর মাতাবে না।

কারণ ততক্ষণে সে হারুন নামের এক বর্বর পাপিষ্ঠ নরাধমের কুনজরে পড়ে গেছে। সায়মা তার খেলার সমবয়সী সঙ্গীকে না পেয়ে বাসায় ফিরে যাওয়ার জন্য লিফটে উঠবে। ঠিক সেই মুহূর্তে হারুণ তাকে একা পেয়ে বললো, চলো ছাদে যাই। তোমাকে ঘুরিয়ে ছাদ দেখাবো। ছোট্ট সায়মা রাজি হয়ে গেল। ছাদ দেখার আনন্দ নিয়ে সে ওপরে উঠে গেল। ৯ তলা নির্মাণাধীন নির্জন ফ্লাট। সন্ধ্যার আগ মুহূর্ত। ছাদে ওঠার পরপরই বদলে গেল হারুন ভাইয়ার কথার ধরন, চোখের ভাষা, শরীরের ভাষা। এ কী! শুরু হলো তার কুরুচিপূর্ণ আচরণ। যেসব আচরণের বিষয়ে সায়মার কোনো ধারণা বা জ্ঞান নেই। ৭ বছরের আদুরে ফুটফুটে শিশুটির কোমল শরীরে চরম নিষ্ঠুরতা ও পাশবিকতায় হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়লো। এ কী ভাইয়া, আমার সাথে এমন করছেন কেন, আমাকে ছেড়ে দিন, আমি বাাসায় চলে যাব। ভাইয়া ছেড়ে দিন আমাকে, আম্মু ডাকছে। এভাবে হারুন ভাইয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছে এই ছোট্ট শিশু। কিন্তু সায়মার কোনো কথা আর কান্নায় যে হারুন ভাইয়ার হৃদয় গলেনি। স্বাধীনভাবে ধর্ষণ করতে পারছে না বলে সায়মার মাথা থেতলে কাবু করে হারুন তার মুখ চেপে ধরলো। তারপর বর্বরতা আর নিষ্ঠুরতার যা কিছু আছে সবই দেখালো পাষণ্ড জানোয়ার। চরম যন্ত্রণার মাঝেও সায়মা শব্দ করতে পারছে না, আম্মু-আব্বু বলে চিৎকারও দিতে পারছে না। চিৎকার দিয়ে বলতে পারছে না আমাকে ছেড়ে দাও। কারণ হারুন তার শক্ত হাত দিয়ে সায়মার মুখ চেপে ধরেছে। এ জঘন্য নিষ্ঠুরতার মাঝেই এক পর্যায়ে সায়মার দম বন্ধ হয়ে গেল। জীবন প্রদীপ নিভে গেল তার।

হারুন যখন দেখলো সায়মার দেহ নিস্তেজ হয়ে গেল। তার বুঝতে আর বাকি নেই, তার এই নিষ্ঠুরতার যন্ত্রণা থেকে সায়মা বেঁচে গেছে। পড়ে আছে সায়মার প্রাণহীন নিথর দেহ। এ অবস্থায় পাষণ্ড হারুন সায়মার গলায় রশি পেঁচিয়ে কিচেনের মধ্যে সিঙ্কের নিচে রেখে সটকে পড়ে।

সায়মার বাবা মাগরিবের নামাজ শেষে ঘরে এসে তাকে না পাওয়ার পর শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। রাত সাড়ে ৮টায় তারা সায়মার নিথর দেহ পড়ে থাকতে দেখে ৯ তলার সেই খালি ফ্লাটে। মরদেহ উদ্ধার করতে পুলিশে খবর দেন। এভাবে নিভে যায় কত প্রাণ! ধর্ষখ-খুনিরা যে কতো নির্মম হয় তা সায়েমারা জানে। আরে কেউ জানে না। কিন্তু মৃত্যুর আগে তারা কারো কাছে এই যন্ত্রণার কথা বলে যেতে পারে না।

দেশের মানুষের বড় জিজ্ঞাসা- কেন ধর্ষক-খুনিরা পার পেয়ে যায়, কার টেলিফোনে এরা পার পায়? কেন এসব ঘৃণ্য ও জঘন্য মানুষের পক্ষ নেয় পুলিশ ও প্রভাবশালীরা। দেশের মানুষ যেমনিভাবে রিফাতের খুনিদের মৃত্যদণ্ড চেয়েছে, যেভাবে রিফাত ফরাজীর মৃত্যুদণ্ড চেয়েছে- তেমনই সায়মার ধর্ষক ও খুনিরও মৃত্যুদণ্ড চাচ্ছে। আমি বলবো, গত এক বছরের মধ্যে যতগুলো খুন হয়েছে এর মাঝে সবচেয়ে আলোচিত ও হৃদয়স্পর্শী বরগুনার রিফাত হত্যাকাণ্ড এবং যতগুলো শিশু ধর্ষিত ও খুন হয়েছে তার মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ঘটনা শিশু সায়মাকে ধর্ষণ করে হত্যা। রিফাত হত্যার বিচার যেভাবে শুরু হয়েছে, একজনকে ক্রসফায়ার দেওয়ার মধ্য দিয়ে শাস্তি শুরু হয়েছে, তেমনি সায়মা হত্যার বিচার অবশ্যই করতে হবে। না হয় দেশের মানুষ প্রয়োজনে এই বিচারের দাবি নিয়ে মাঠে নামবে। আহা, আর কত সায়মার প্রাণ গেলে বন্ধ হবে ধর্ষণ-খুন। আর কত সায়মা হারুনদের বলি হলে ধর্ষণকারীদের জামিনের কোনো প্রভাবশালীর টেলিফোন আসবে না!

Bootstrap Image Preview