Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৫ মঙ্গলবার, জুন ২০১৯ | ১০ আষাঢ় ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

সরকারি, বেসরকারি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাজেটের আওতায় আনুন

ফারুক আহমাদ আরিফ
প্রকাশিত: ১৮ মে ২০১৯, ০৫:১০ PM
আপডেট: ১৮ মে ২০১৯, ০৫:৫২ PM

bdmorning Image Preview


বিশ্বের বুকে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান হারিয়ে মানুষের মাঝে সম্প্রীতির পরিবর্তে তৈরি হচ্ছে হিংসা, বিদ্বেষ, হানাহানী, রক্তপাত। নারীরা যৌন নির্যাতনের শিকার হচ্ছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় উপাসনালয়ে। এসব অন্যায় ও বিভ্রান্তমূলক কাজের পেছনে রয়েছে সুশিক্ষার অভাব। একজন শিক্ষিত ও সজ্জন ব্যক্তি কখনো অন্যকে আঘাত করতে পারে না। অন্যের অধিকারহরণ করতে পারে না। জাতি গঠনে, বিশ্বে শান্তি ও সম্প্রীতি স্থাপনে সুশিক্ষার কোন বিকল্প নেই। কিন্তু সুশিক্ষার দায়িত্ব কে নেবে? এটি হতে পারে ব্যক্তি পর্যায়ে, পঞ্চায়েত পর্যায়ে এবং রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে।

এখন ইন্টারনেটের যুগ হওয়ায় সকলেই প্রায় বিশ্ব নাগরিক। শিক্ষা কোন দেশকালের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। শিক্ষার পাখা দিয়ে দেশের মানচিত্র ছাড়িয়ে বিশ্ব মানচিত্র বিজয়ে এগিয়ে যাচ্ছে প্রত্যেকেই। তাই শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাপী একক ধরনের একটি চিন্তা ধারায় আসা প্রয়োজন। মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস ‘শিক্ষাই সম্প্রীতির বন্ধন’ শ্লোগানকে ধারণ লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যই নির্ধারণ করেছে জাতিসংঘের মাধ্যমে বিশ্বের সব বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেবাস ৫০ শতাংশ এক হওয়া ও আন্ত:রাষ্ট্রীয় সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে ন্যূনতম ২০ শতাংশসহ মোট ৭০ শতাংশ এক সিলেবাসে আনায়নের জন্যে রাষ্ট্রগুলোকে উদ্বুদ্ধ করা। বাকি ৩০ শতাংশ সিলেবাস বিশ্ববিদ্যালয়গুলো নিজস্ব চিন্তা-চেতনা ও প্রয়োজনের দ্বারা ঠিক করবে। তবে মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেশিয় বিষয়টিই প্রাধান্য পাবে।  

অনেক সময় আমাদের শিক্ষকরা বেতন-ভাতার জন্যে খোলাকাশের নীচে, রাজপথে, শহিদ মিনারসহ দেশব্যাপী যখন নিজেদের ব্যর্থ জীবনযাপন নিয়ে কথা বলেন, আন্দোলন করেন তখন আমাদের আহত করে, কষ্ট হয়, দুঃখ হয়। অর্থবিত্তহীন সংসার তাদেরকে অসহায় করে তোলে। এই অন্যায়ের সমাধান হওয়া দরকার। যুগ যুগ ধরে রাষ্ট্রে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে নিজেরাই থেকে যায় দুঃখের সংসারে। এক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই এগিয়ে আসতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যুরো অব এডুকেশনাল ইনফরমেশন অ্যান্ড স্টাটিসটিক্স (ব্যানবেইজ) এর ২০১৮ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী বর্তমানে দেশে মোট শিক্ষার্থী আছে ৫ কোটি ৬৯ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৩ জন। এদের মধ্যে বাজেটের আওতায় আছে ২ কোটি ১৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৪৯। বাবা-মার অর্থ ব্যয় করে পড়াশোনা করে ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৪ জন শিক্ষার্থী। ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে বাজেটের আওতায় রয়েছে ৮০ হাজার ৪৪৫টি। ৮০৪৪৫টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১২ জন শিক্ষক ও ২ কোটি ১৩ লাখ ৮৭ হাজার ২৪৯ জন শিক্ষার্থীর জন্যে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেট ছিল ৫২ হাজার ৫৩ কোটি টাকা। অন্যদিকে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ১২ লাখ ৮৫ হাজার ১৫৪ জন শিক্ষক ও ৩ কোটি ৫৫ লাখ ৭৪ হাজার ৫৪৪ জন শিক্ষার্থীর দায়িত্ব সরকার কেন বহন করবে না? এদের কর্মজীবনের ফলাফল কি রাষ্ট্র গ্রহণ করে না?

অপরদিকে দেশে বেফাকুল মাদারিসিল আরাবিয়া বাংলাদেশ (বেফাক) ও বেফাক বহির্ভূত মাদরাসা, এনজিও চালিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কমপক্ষে হলেও ২০ হাজার হবে। সেখানে গড়ে ৫ লাখ শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছে। তাহলে সবমিলে প্রায় সাড়ে ৩ কোটি শিক্ষার্থী বাজেটের বাইরে।

মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড একডুকেশন রাইটসের দাবি হচ্ছে সরকারি, বেসরকারি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে পর্যায়ক্রমে বাজেটের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। কেননা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে গঠিত ড. কুদরাত-ই-খুদা শিক্ষা কমিশনের শিক্ষাব্যবস্থায় সংস্কারে অগ্রাধিকারের ১৪টি বিষয়ের মধ্যে ২এর (ঝ) বলা হয়েছিল, সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষায়তনগুলোর মধ্যে বিরাজমান বর্তমান বৈষম্য যত শীঘ্রই সম্ভব দূরীভূত করতে হবে। পর্যায়ক্রমে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয়করণ করার জন্য ১০ বছরের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। এবং (ঢ) বলা হয়েছে, শিক্ষাকে ব্যয়বহুল সমাজসেবামূলক কর্ম হিসেবে নয়, সম্পদ সৃষ্টির উপায় হিসেবে গণ্য করতে হবে। শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয়বরাদ্দের অনুপাত বর্তমানের শতকরা সাত থেকে অন্তত শতকরা পঁচিশে উন্নীত করতে হবে। এই ব্যয় এখন মোট জাতীয় আয়ের (জি.এন.পি) পাঁচ শতাংশে বর্ধিত করে যত অল্প সময়ে সম্ভব শতকরা ৭ শতাংশে উন্নীত করা দরকার। (বাংলাদেশ সরকার-১৯৭১-৭৫, এইচ টি ইমাম, ২৯৮ পৃষ্ঠা)।

আমাদের প্রস্তাব: ২০১৯-২০ অর্থবছরে সরকারি, বেসরকারি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে বাজেটের আওতায় নিয়ে আসতে হবে (তবে সেটি যোগ্যতানুযায়ী)। আর সে জন্য ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। এতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় এবং মাধ্যমিকে ৫৫ হাজার কোটি টাকা। এতে উন্নয়ন খাতে ২৫ হাজার কোটি ও অনুন্নয়নখাতে ৩০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। আর উচ্চ মাধ্যমিক, মাদরাসা ও উচ্চশিক্ষায় ৮০ হাজার কোটি টাকা দিতে হবে। আর উচ্চ মাধ্যমিকে ২০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে উন্নয়ন খাতে ৮ হাজার কোটি ও অনুন্নয়নখাতে ১২ হাজার কোটি টাকা। মাদরাসায় ৮ হাজার কোটি টাকার মধ্যে উন্নয়ন খাতে ৩ হাজার ও অনুন্নয়নখাতে ৫ হাজার কোটি টাকা। উচ্চশিক্ষায় ৪৭ হাজার কোটি টাকার মধ্যে উন্নয়ন খাতে ২২ হাজার কোটি টাকা ও অনুন্নয়ন খাতে ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং শুধু গবেষণাখাতে আলাদাভাবে ১০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিতে হবে। অর্থাৎ জাতীয় বাজেটের ২৫ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ৭ শতাংশ শিক্ষাখাতে বিনিয়োগ করতে হবে বরাদ্দ নয়।

বাজেটে আয়ের খাতসমূহ: আয়ের খাতের মধ্যে সরকারি উৎস হতে ৮০ হাজার কোটি টাকা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো দিবে ৪০ হাজার কোটি টাকা ও ২০ হাজার কোটি টাকা বৈদেশিক অনুদান।
উল্লেখ্য বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো টিউশন ফি বাবদ শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে যে অর্থ আদায় করে সেখানে ১ একাডেমিক ব্যয়, ২. অবকাঠামো উন্নয়ন ব্যয় বাদ দিয়ে যে অর্থ রয়ে যাবে তা সরকারকে দিয়ে দিতে বাধ্য থাকবে। সরকার সেই অর্থ দিয়ে সরকারি-বেসরকারি ১. প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্যে জমি প্রদান, ২. শিক্ষকদের বেতন-ভাতা, পেনশন, উন্নত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, ৩. কর্মকর্তা-কর্মচার্রীদের বেতন-ভাতা ও পেনশন, ৪. সিলেবাস ও পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও বিতরণ করবে ৫. শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঋণ দিবে, ৬. শতভাগ আবাসন (শিক্ষার্থী-শিক্ষক), ৭. যাতায়াত, ৮. গবেষণা, ৯. চিকিৎসা, ১০. পুষ্টিকর খাবার, ১১. বিদেশি বৃত্তিসহ শিক্ষা সংক্রান্ত যাবতীয় কার্যক্রম গ্রহণ করবে।

উৎপাদন ভিত্তিতে জিডিপি নিরূপিত ১৫টি খাত নিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্যমতে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ৯ দশমিক ৬৬ শতাংশ। শিক্ষা খাতটি লোকপ্রশাসন ও প্রতিরক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক সেবা এমনকি বিদ্যুৎ খাত থেকেও বেশি জিডিপি প্রবৃদ্ধি হয়েছে।  

ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট ইন্ডিকেটরস (ডব্লিউডিআই) তথ্যানুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শিক্ষাখাতে জিডিপির পরিমাণ ছিল ডেনমার্ক ৮ দশমিক ৫, কম্বোডিয়া ২.৬, পাকিস্তান ২.৫, উগান্ডা ২.২ বাংলাদেশ ১.৯ এবং শ্রীলঙ্কা ১ দশমিক ৭ শতাংশ। সে হিসেবে শেষের দিকে দ্বিতীয় অবস্থানে ছিল বাংলাদেশ।
এই সংস্থার তথ্যানুযায়ী ২০১২-১৩ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাতীয় বাজেটে শিক্ষাখাতে বাজেট ছিল ভিয়েতনাম ও নেপালে ২১.৪, সেনেগাল ও ভেনিজুয়েলায় ২০.৭, চিলি ১৯.৩, বাংলাদেশ ১১.৬, পাকিস্তান ১১.৬, ইকোয়েডর ১০.৩ ও শ্রীলঙ্কায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ২০১৩ সালের Seeding fertile ground: Education that works Bangladesh A Policy nite education Quality প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১২ সালে প্রাইমারিতে পাসের হার ছিল ৯৭ দশমিক ৩৫, ইবতেদায়ীতে ৯২ দশমিক ৪৫, জেএসসিতে ৮৬ দশমিক ১১, জেডিসিতে ৯০ দশমিক ৮৭, এসএসসির মানবিকে ৮১ দশমিক ২৬, বিজ্ঞানে ৯৪ দশমিক ৪৮, ব্যবসায় শিক্ষায় ৮৭ দশমিক ৩৯, ভোকেশনালে ৮০ দশমিক ৬৯, দাখিলে ৮৭ দশমিক ৭৩, এইচএসসির মানবিকে ৭০ দশমিক ৭৪, বিজ্ঞানে ৭৮ দশমিক ৩৮, ব্যবসায় শিক্ষায় ৮৪দশমিক ১৭ এবং আলিমে ৯১ দশমিক ৭৭ শতাংশ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় কৃতকার্য হয়েছিল। তার অর্থ হচ্ছে দেশের মানুষ শিক্ষার দিকে সচেতন হচ্ছে, অগ্রসর হচ্ছে। এই অগ্রসরতা ধরে রাখতে হলে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষাঋণ দিতে হবে। যা পরে সে চাকরিজীবনে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করবে। এমন কি হাইস্কুল পর্যায় থেকেও এই শিক্ষাঋণ চালু করা যেতে পারে। এ জন্যে সরকার এডুকেশন ব্যাংক বা শিক্ষা ব্যাংক নামের একটি বিশেষায়িত ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করতে পারে যেখানে দেশের এবং বিদেশের বিভিন্ন শিল্প-কারখানা, প্রতিষ্ঠান তাদের লাভের শতকরা ৩ শতাংশ অর্থ অনুদান হিসেবে দিবে। তা ছাড়া প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তিবর্গও বিশেষ একটা অংশ অনুদান হিসেবে দিবে। এসব অর্জিত অর্থের মধ্যে শিক্ষাখাতে ২ শতাংশ রেখে বাকি এক শতাংশ স্বাস্থ্যখাতের জন্যে প্রদান করা হবে। এটি সম্পূর্ণ অনুদান হিসেবে গৃহীত হবে। ২০৪১ সালের মধ্যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করতে হবে।

আমাদের বিশেষ প্রস্তাবগুলো হচ্ছে-
১. জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান লিখিত ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’টি অনার্স ও ডিগ্রির প্রথম বর্ষে ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক একটি তথ্য সম্বলিত সংক্ষিপ্ত বই রচনা করে অনার্স ও ডিগ্রির দ্বিতীয় বর্ষে পাঠ্যসূচিতে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
২. শিক্ষার্থীদের শিক্ষাঋণ দিতে হবে, যা কর্মজীবনে গিয়ে পর্যায়ক্রমে পরিশোধ করবে।
৩. শিল্প-কারখানা, প্রতিষ্ঠান তাদের লাভের শতকরা ৩ শতাংশ অর্থ সরকারকে দিবে, সরকার সেসব অর্থ দিয়ে এডুকেশন ব্যাংক নামে শুধু শিক্ষাসংক্রান্ত ব্যাংক হিসেবে চালু করবে।
৪. ২০৪১ সালে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যখাত সম্পূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে বিনামূল্যে প্রদান করতে হবে।
৫. এসব কার্যক্রম মনিটরিং করার জন্য একটি কমিটি করতে হবে যেখানে সদস্য থাকবে ক. শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধি, খ. প্রতিষ্ঠিানগুলোর প্রতিনিধি এবং গ. সরকারে প্রতিনিধি থাকবে।

আহ্বায়ক: মুভমেন্ট ফর ওয়ার্ল্ড এডুকেশন রাইটস

[email protected]

Bootstrap Image Preview