Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ মঙ্গলবার, আগষ্ট ২০১৯ | ৫ ভাদ্র ১৪২৬ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘নারীর ক্ষমতায়নে অপারগতার নাম সংরক্ষিত আসন’

মেরিনা মিতু
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রকাশিত: ২৩ জানুয়ারী ২০১৯, ০৪:৪১ PM
আপডেট: ২৩ জানুয়ারী ২০১৯, ০৪:৪১ PM

bdmorning Image Preview
ছবিঃ বিডিমর্নিং


বাংলাদেশের ইতিহাসে সংসদ নির্বাচনে এবারই সবচেয়ে বেশি সংখ্যক নারী নির্বাচিত হয়েছে। শূণ্য থেকে শুরু হওয়া এই অগ্রসরতা নারীর ক্ষমতায়নে আজ ২২ এর ঘরে পৌঁছেছে। তারপরেও প্রশ্ন থেকে যায়, খটকা রয়ে যায় একটি জায়গায়। আর তা হলো সংরক্ষিত নারী আসন।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বেসরকারি ফলাফল অনুযায়ী সরাসরি নির্বাচিত নারীর সংখ্যা ২২ জন। নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা ছিল ৬৯ জন, যা এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সব নির্বাচনের মধ্যে ছিল সর্বোচ্চ নারী প্রার্থী।

সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ নির্বাচিত হন জাতীয় নির্বাচনে ৩০০ আসনে বিজয়ী হয়ে সাংসদ হিসেবে শপথ গ্রহণ করা প্রতিনিধিদের ভোটের মাধ্যমে। নিজ-নিজ দলের সংসদ সদস্যের আনুপাতিক কোটায় মনোনয়ন পেয়ে নির্বাচত হওয়ার কারণে তাদের কোনো নির্বাচনি এলাকা নেই। ফলে তাদের দায়-দায়িত্বও নেই।

যখন সারাদেশের ৩০০টি নির্বাচনী আসন থেকে সাধারণ মানুষের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদে থাকছেন তখন এই সংরক্ষিত নারী আসনের প্রয়োজনীয়তা এবং গুরুত্ব আসলে কতটা?

এ বিষয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের সভাপতি আয়শা খানম। তিনি বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ণে অপরাগতার নাম সংরক্ষিত আসন। আমরা সেই প্রথম থেকেই এর বিরোধিতা করে এসেছি। নারীরা এখন সর্বত্র সমানভাবে এগিয়ে চলেছে, সেখানে সংরক্ষিত আসন একরকম তামাশার বিষয়। সরাসরি ভোটে এবারই সর্বোচ্চ নারী প্রার্থী জয়লাভ করেছে; যদিও এ বিজয় তুলনামূলক সন্তুষ্টজনক নয়। সেখানে হা ভোট কিংবা না ভোটের মতো প্রহসনের কোনো প্রয়োজন আছে বলে আমি মনে করিনা।‘

সংরক্ষিত আসন কেন?

পুরো বাংলাদেশে নির্দিষ্ট ভৌগলিক সীমার ভিত্তিতে ভাগ করা ৩০০টি আসনের প্রত্যেকটিতে জনগণের ভোটে নির্বাচিত একজন সাংসদ থাকার পরও সংরক্ষিত আসনের তাৎপর্য কী?

আইনজীবী কাজী ওয়াসিমুল হক বিডিমর্নিংকে বলেন, ‘নারীর ক্ষমতায়ন ও রাষ্ট্র পরিচালনায় নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সংরক্ষিত আসনের আইন তৈরি করা হয়েছিল। ১৯৭২ সালে যখন এই আইনটি তৈরি করা হয় তখনকার প্রেক্ষাপটে তা ছিল যুক্তিসঙ্গত ও সময়োপযোগী। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এটি অনেকটাই অকার্যকর।‘

কীভাবে নির্বাচিত হন সংরক্ষিত আসনের এমপিরা?

বাংলাদেশের সংসদে, প্রথাগতভাবে, সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের মনোনিত প্রার্থীরাই নির্বাচিত হতেন; কখনো কখনো বিরোধী দলের নারী প্রার্থীদের কয়েকটা আসন দেয়া হয়ে থাকে।

তবে সংবিধানের চতুর্দশ সংশোধনী অনুযায়ী, ২০০৪ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদের একাদশ অধিবেশনে নির্ধারণ করা হয় যে সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে (সেসময় ৪৫টি) একটি দল থেকে নির্দিষ্ট সংখ্যক নারী সাংসদকে সুযোগ দেওয়া হবে; এবং তা হবে সংসদে ঐ দলের কতজন প্রতিনিধি রয়েছে তার অনুপাতে।

অর্থাৎ একটি রাজনৈতিক দলের ৬ জন যদি নির্বাচিত সাংসদ হন, তাহলে ঐ দল থেকে একজন প্রার্থী সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ হবেন।

তখন ঐ সংরক্ষিত আসনের নির্বাচনে ঐ বিশেষ রাজনৈতিক দল থেকে একাধিক নারী প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন এবং সেই দলের নির্বাচিত সাংসদদের ভোটে বিজয়ী হয়ে সংরক্ষিত আসনের সাংসদ হতে পারবেন ঐ প্রার্থী।

সেই সমীকরণ অনুযায়ী, একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত আসনে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রতিনিধি থাকবেন ৪৩ জন, জাতীয় পার্টির ৪ জন, জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ২ জন এবং স্বতন্ত্র এবং অন্যান্য দলের আরো ১ জন।

নির্বাচিত সাংসদের সাথে সংরক্ষিত আসনের সাংসদের পার্থক্য কী?

সংরক্ষিত আসনের সাংসদদের কার্যপরিধির ব্যপ্তি বা দায়িত্বের বিষয়ে বাংলাদেশের সংবিধানে আলাদাভাবে উল্লেখ নেই বলে জানান সংবিধান বিশেষজ্ঞ মি. মালিক।

"সংবিধানে শুধু বলা আছে সংরক্ষিত আসন থাকতে হবে, সেটির সংখ্যা বিভিন্ন সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে সংরক্ষিত আসনের সাংসদদের বিষয়ে আলাদা করে কিছু বলা নেই।"

তিনি আরও বলেন, "রাজনৈতিক বিবেচনায় বা রাজনৈতিক পরিবার থেকেই সাধারণত সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ নির্বাচন করা হয়। কাজেই রাষ্ট্র পরিচালনায় বা সংসদের কার্যক্রমে অবদান রাখতে পারবেন - এরকম বিবেচনায় সাধারণত সংরক্ষিত নারী আসনে সাংসদ নির্বাচন করা হয় না।"

একাদশ সংসদ নির্বাচনের সংরক্ষিত নারী আসন

বাংলাদেশে একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচনরে জন্য দলীয় মনোনয়ন বিক্রি ও জমা নেয়ার কাজ শেষ করেছেন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ ও অন্যান্যরা। নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমেদের থেকে জানা যায়, সংরক্ষিত ৫০টি নারী আসনের তফসিল ঘোষণা করা হবে ১৭ ফেব্রুয়ারি।

এদিকে বাংলাদেশের সংবিধানে সপ্তদশ সংশোধনী এনে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিধি আরও ২৫ বছর বহাল রাখার প্রস্তাবে সায় দিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত সোমবার (২১ জানুয়ারি) মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সংবিধান (সপ্তদশ সংশোধন) আইন, ২০১৮’ এর খসড়ায় চূড়ান্ত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, মংগলবার (২২ জানুয়ারি) দুপুরে একাদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত মহিলা আসনে নির্বাচনের জন্য ঘোষিত তফসিল বাতিল চেয়ে রিট দায়ের করা হয়েছে। একইসঙ্গে সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনীও বাতিলের আবেদন করেছেন আইনজীবী ইউনুছ আলী আকন্দ। তিনি নিজেই বিডিমর্নিংকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

রিট আবেদনে বলা হয়েছে, ষোড়শ সংশোধনীর রায়ে আপিল বিভাগ বলেছে, ‘সংসদে এখন আর সংরক্ষিত ৫০টি মহিলা আসনের দরকার নেই। আমাদের দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র অপরিপক্ক।’ তাছাড়াও সংবিধানের ১১ এবং ৬৫ অনুচ্ছেদে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হওয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু তা না করে দলীয়ভাবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টি এবং বিএনপি থেকে সংরক্ষিত আসনে সংসদ সদস্য করা হয়। তাই সংবিধানের সপ্তদশ সংশোধনী সংবিধানের ৭, ১৯, ২৬, ২৭, ২৮ ও ৩১ অনুচ্ছেদের সঙ্গেও সাংঘর্ষিক।

উল্লেখ্য, ১৯৭৩ সালে জাতীয় সংসদে ১০ বছরের জন্য ১৫টি সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। নীতিনির্ধারকেরা হয়তো ভেবেছিলেন, মুক্তিযুদ্ধ বা বিপ্লবের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশে অচিরেই নারী-পুরুষের সমতা প্রতিষ্ঠিত হবে এবং আর সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন হবে না। পরবর্তীকালে সংরক্ষিত আসনসংখ্যা বাড়িয়ে প্রথমে ৩০, পরে ৪৫ এবং বর্তমানে ৫০ করা হয়েছে। আর মেয়াদ বাড়িয়ে করা হয়েছে ২৫ বছর।

‘জাতীয় পার্টির আমলে যখন সংরক্ষিত নারী আসন সংখ্যা ত্রিশ ছিল তখন এই সংরক্ষিত এমপিদের ঠাট্টা করে ‘ত্রিশ সেট অলঙ্কার’ বলা হতো। এখন সংখাটা পঞ্চাশ হয়েছে, কিন্তু গুণগতভাবে তেমন কোনো পরিবর্তন এসেছে বলে মনে হয় না। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্বামী কিংবা বাবা মারা গেলে স্ত্রী কিংবা মেয়েকে ‘সান্ত্বনা-পুরস্কার’ হিসেবেও এই সংরক্ষিত আসনে বসানো হয়। বাস্তবিকভাবে যার কোনো মূল্যই নেই, প্রহসন ছাড়া।‘ বলেন মানবধিকারকর্মী খুশি কবির।

তিনি আরও বলেন, "'সংরক্ষিত নারী আসন' এখন অনেকটাই তামাশায় পরিণত হয়েছে, যোগ্যতাসম্পন্ন নারীদের জন্য এটি তেমনি বিব্রতকর ও অপমানজনকও বটে। এখন সংসদ ও সংবিধান থেকে 'সংরক্ষিত নারী আসন' প্রথাটি তুলে দিয়ে সাধারণ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য নারীদেরকে উৎসাহিত করা উচিত কিনা সেটা ভাবার সময় এসে গেছে।"

বর্তমান সংসদে বর্তমানে সংরক্ষিত আসনে ৫০ জন সংসদ সদস্য রয়েছেন। এর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ৪২ জন, জাতীয় পার্টির ৬ জন এবং জাসদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির একজন করে সংরক্ষিত আসনের নারী এমপি রয়েছেন। এর বাইরে চলতি সংসদে ২০ জন নারী সংসদ সদস্য রয়েছেন যারা সরাসরি নির্বাচিত। যার মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের ১৮ জন, জাতীয় পার্টির তিনজন ও জাসদের একজন।

এই সংরক্ষিত নারী এমপিরা নির্বাচন কমিশনে তাদের যে সম্পদের হিসেব দিয়েছেন, তাতে দেখা যায়, তাদের ২৪ শতাংশ কোটিপতি এবং ২৬ শতাংশ ব্যবসায়ী। যারা নির্বাচিত হয়েছেন তাদের বড় একটা অংশ আত্মীয়তার সূত্রে মনোনয়ন পেয়েছেন। অতীতে কখনও রাজনীতি করেননি এমন এমপিও রয়েছেন প্রায় দুই হালি। এ সব ‘কোটিপতি’ নারীরা সংখ্যাগরিষ্ঠ নারীর স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা পালন করেছেন, তেমন দৃষ্টান্ত নেই বললেই চলে।

Bootstrap Image Preview