Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ রবিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বন্ধ করা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ আগস্ট ২০১৮, ০১:২০ AM আপডেট: ১৫ আগস্ট ২০১৮, ০১:৩৭ AM

bdmorning Image Preview


ফারুক আহমাদ আরিফ-

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট কলঙ্কিত রাতে বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করে একটি কালো সুড়ঙ্গে প্রবেশ করে বাংলাদেশ। ইতিপূর্বে পৃথিবীর কোথাও এমন জঘন্যতম হত্যাকাণ্ড ঘটেনি। বঙ্গবন্ধু পরিবারের ১০ জন, আবদুর রব সেরনিয়াবাত পরিবারের ৬ জন ও শেখ মনির পরিবারের ২ জনসহ মোট ১৯ জন মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এরা সকলেই বঙ্গবন্ধুর পরিবারের সদস্য।

একমাত্র বাঙালি জাতিকে কলঙ্কিত করতেই সেনাবাহিনীর একটি ক্ষুদ্রদল এই হত্যাকাণ্ডটি ঘটান। এটি কোনভাবেই পূর্ণাঙ্গ সেনাবাহিনীর কোন অভ্যুত্থানও নয়। বরং মেজর বজলুল হুদা, মেজর (আর্টিলারি) মুহিউদ্দিন, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহারিয়ার রশিদ খান ও ল্যান্সার মহিউদ্দিন আহমেদ, খন্দকার আবদুর রশিদ, রিসালদার মোসলেমউদ্দিন, শরিফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, নূর চৌধুরী, আবদুল আজিজ পাশা ও ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদদের একটি ষড়যন্ত্র।

বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মাত্র ৯ দিনের মাথায় অর্থাৎ ২৪ আগস্ট ১৯৭৫ এ সেনাবাহিনীর প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন জিয়াউর রহমান। আর মোশতাক সরকার ছিলো সমপূর্ণভাবে সেনাসমর্থিত সরকার। জিয়াউর রহমান সেনাপ্রধান থাকাকালীন অর্থাৎ ১৯৭৫ সালের ২৬ সেপ্টম্বর অঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদ ইনডেমনিটি (দায়মুক্তি) অধ্যাদেশ জারি করেন। ‘দি বাংলাদেশ গেজেট, পাবলিশড বাই অথরিটি’ লেখা অধ্যাদেশটিতে খন্দকার মোশতাকের স্বাক্ষর রয়েছে। মোশতাকের স্বাক্ষরের পর আধ্যাদেশে তত্কালীন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এম এইচ রহমানের স্বাক্ষর করেন। এই ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে বন্ধ করা হয় বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার।

[caption id="attachment_424250" align="aligncenter" width="749"]                                                    (১৫ আগস্ট, ১৯৭৫ সালে হত্যাকাণ্ডে নিহতরা)[/caption]

তাতে বলা হয় '' The ordinance may be called indemnity ordinance 1975

Restrictions on the taking of any legal or other proceeding against persons in response in respect of certain acts and thing-(1) Notwithstanding anything contained in any law, including law relating to any defense service, for the time being in force, no suit, prosecution or other proceeding, legal or disciplinary, shall lie, or be taken, in, before or by any court, including the Supreme Court and Court Material, or other authority against any person, including a person who is or has, at any time, been subjected to any law relating to any defense service, for or on account of or in respect of any act, mater or things done or step taken by such person in connection with, necessary step toward, the change of government of the people’s republic of Bangladesh and the proclamation of martial law of the morning of the 15 august, 1975. For the purpose of this section or certificate by the president or a person authorized by him on this behalf, that any act, matter or thing was done or in preparation or execution of any plan for, or as necessary step towards the change of the government of the republic of Bangladesh and the proclamation of martial law on the morning of the 15th august, 1975 shall be sufficient evidence of such act, matter or thing having been done or step having been taken in connection with or in preparation of execution of any plan for, or as necessary step towards, the change of government and proclamation of martial law on that morning.'' অর্থাৎ এই অধ্যাদেশটি দু’ভাগে ভাগ করা হয়। প্রথম অংশে বলা হয়েছে, ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোরে বলবৎ আইনের পরিপন্থী যা কিছু ঘটুক না কেন, এ ব্যাপারে সুপ্রিমকোর্টসহ কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না।

দ্বিতীয় অংশে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রপতি উল্লিখিত ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে যাদের প্রত্যয়ন করবেন তাদের দায়মুক্তি দেওয়া হলো। অর্থাৎ তাদের বিরুদ্ধে কোনো আদালতে মামলা, অভিযোগ দায়ের বা কোনো আইনি প্রক্রিয়ায় যাওয়া যাবে না। ১৫ আগস্টের ঘটনা, বেতার কেন্দ্র থেকে ঘোষণা, সেনাবাহিনীর মধ্যে উস্কানি দেওয়া ইত্যাদি বিষয়ে কোনো আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা কর্তৃপক্ষের নিকট কোনো কারণেই প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না, ইত্যাদি।

যেহেতু মোশতাক সরকার ছিলো সেনাসমর্থিত। জিয়াউর রহমান ছিলেন সেনাপ্রধান সেহেতু এর দায় তিনি এড়াতে পারেন না! ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান রাষ্ট্রক্ষমতা নিয়ন্ত্রকারী হিসাবে আবিভূর্ত হন। সে সময় বিচারপতি আবু সা’দাত মোহাম্মদ সায়েম রাষ্ট্রপতি ছিলেন। ১৯৭৬ সালের ২৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি সায়েম জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাছে প্রধান সামরিক আইন প্রশাসকের দায়িত্ব হস্তান্তর করেন। ১৯৭৭ সালের ২১ এপ্রিল সায়েম রাষ্ট্রপতির পদ থেকে সরে দাঁড়ান এবং জিয়া রাষ্ট্রপতি হন। ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি সামরিক আইনের অধীনে দেশে দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ওই নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের দল বিএনপি দুই-তৃতীয়াংশ আসনে বিজয়ী হয়। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট থেকে ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল পর্যন্ত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশসহ চার বছরে সামরিক আইনের আওতায় সব অধ্যাদেশ, ঘোষণাকে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে আইনি বৈধতা দেওয়া হয়। সংশোধনীটি পাস হয় ১৯৭৯ সালের ৯ এপ্রিল। সংসদে উত্থাপিত আইনটির নাম ছিল ‘সংবিধান (পঞ্চম সংশোধনী) আইন, ১৯৭৯’। এবং এই সংশোধনীর মাধ্যমে ইনডেমনিটি অধ্যাদেশকে বৈধতা দেওয়ায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত অপরাধীরা দায়মুক্তি পেয়ে যায়।

১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল সংক্রান্ত আইনগত দিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ের সচিব আমিন উল্লাহর নেতৃত্বে যে কমিটি গঠন করা হয়, তাদের রিপোর্টেই জানা যায়, এই কুখ্যাত আইনটি বাতিলের জন্য সংবিধান সংশোধনের প্রয়োজন নেই।

যুক্তি হিসেবে কমিটি রিপোর্টে প্রধানত ১৬টি আইনের কথা তুলে ধরে। সেগুলো ইনডেমনিটি অধ্যাদেশের মতোই ৫ম সংশোধনীর অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা পরবর্তীকালে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়েই সংসদে বাতিল করা হয়েছে। কমিটির এই রিপোর্ট আইন কমিশনের মতামতের জন্য পাঠানো হলে সাবেক প্রধান বিচারপতি এফকেএম মুনীরের নেতৃত্বাধীন এই কমিশনও তা সমর্থন করে। এরপর তৎকালীন আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট আবদুল মতিন খসরু ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বিল বাতিলের জন্য 'দি ইনডেমনিটি রিপিল অ্যাক্ট-১৯৯৬' নামে একটি বিল উত্থাপন করেন। ১৯৯৬ সালের ১২ নভেম্বরের ঐতিহাসিক দিনে সংসদে পাস হয় মানবতা ও সভ্যতাবিরোধী কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ বাতিল বিল। ঘোচানো হয় ২১ বছরের জাতীয় কলঙ্ক। যার মাধ্যমে বাতিল হয়ে যায় কুখ্যাত ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ, খুলে যায় বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচারের পথ।

[caption id="attachment_424252" align="alignnone" width="900"] বঙ্গবন্ধুর ৫ হত্যাকারীর ফাঁসি কার্যকর[/caption]

এরই পথ ধরে ২ অক্টোবর ধানমন্ডি থানায় বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত সহকারী আ ফ ম মহিতুল ইসলাম বাদী হয়ে মামলা করেন। প্রথম রায়: ১৯৯৮ সালের ৮ নভেম্বর তত্কালীন ঢাকার দায়রা জজ কাজী গোলাম রসুল মামলার রায়ে ১৫ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন। দ্বিতীয় রায়: নিম্ন আদালতের এই রায়ের বিরুদ্ধে আসামিদের আপিল ও মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিতকরণের শুনানি শেষে ২০০০ সালের ১৪ ডিসেম্বর হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ বিভক্ত রায় দেন। বিচারপতি এম রুহুল আমিন ১৫ আসামির ১০ জনের মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। খালাস দেন পাঁচ আসামিকে। অপর বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ১৫ আসামির সবার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। তৃতীয় রায়: এরপর ২০০১ সালের ৩০ এপ্রিল হাইকোর্টের তৃতীয় বেঞ্চের বিচারপতি মোহাম্মদ ফজলুল করিম ১২ আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন। খালাস দেন তিনজনকে। এই ১২ আসামির মধ্যে একজন মারা গেছেন, ছয়জন পলাতক রয়েছেন। অপর পাঁচজন কারাগারে আটক আছেন। দীর্ঘ ছয় বছর পর বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলে আপিল বিভাগে একজন বিচারপতি নিয়োগ দেওয়ার পর ২০০৭ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর আপিল বিভাগের বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্ব তিন বিচারপতির বেঞ্চ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত পাঁচ আসামির আপিল শুনানির জন্য গ্রহণ করেন।

[caption id="attachment_424251" align="alignnone" width="685"] বঙ্গবন্ধুকে হত্যাকারী পলাতক ৬ খুনি[/caption]

চতুর্থ রায়: এর প্রায় দুই বছর পর ২০০৯ সালের ২৪ আগস্ট আপিল শুনানির জন্য রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আপিল বিভাগের চেম্বার বিচারপতি ওই বছরের ৫ অক্টোবর শুনানির দিন ধার্য করেন। আপিল শুনানির জন্য তত্কালীন প্রধান বিচারপতি এম এম রুহুল আমিন ৪ অক্টোবর, ২০০৯ প্রধান বিচারপতি মো. তাফাজ্জাল ইসলামের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বিশেষ বেঞ্চ গঠন করেন। আপিল বিভাগ গত ৫ অক্টোবর, ২০০৯ থেকে টানা ২৯ কর্মদিবস শুনানি করার পর গত ১৯ নভেম্বর চূড়ান্ত রায় ঘোষণা করেন। ২৬ জানুয়ারি ২০১০ সালে বজলুল হুদা, আর্টিলারি মুহিউদ্দিন, সৈয়দ ফারুক রহমান, সুলতান শাহারিয়ার রশিদ খান ও ল্যান্সার মহিউদ্দিন আহমেদের ফাঁসি কার্যকর হয়। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আরও ৭ আসামি পলাতক আছেন। তাঁরা হলেন খন্দকার আবদুর রশিদ, রিসালদার মোসলেমউদ্দিন, শরিফুল হক ডালিম, এ এম রাশেদ চৌধুরী, নূর চৌধুরী, আবদুল আজিজ পাশা ও ক্যাপ্টেন আবদুল মাজেদ। আজিজ পাশা জিম্বাবুয়েতে ২০০২ সালে মারা যান।

Bootstrap Image Preview