Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ শনিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৫ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

কুড়িগ্রামে মাদকের ছড়াছড়ি; নেপথ্যে আ’লীগ নেতা ও পুলিশ কর্মকর্তার নাম

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ মে ২০১৮, ০২:১৫ PM
আপডেট: ১৭ মে ২০১৮, ০২:১৫ PM

bdmorning Image Preview


মোঃ মনিরুজ্জামান, কুড়িগ্রাম প্রতিনিধিঃ

প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রতিবেদন-৪ মোতাবেক কুড়িগ্রামে শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ী ৪৩ জন। যোগসাজশ রয়েছে আ’লীগ নেতা, জনপ্রতিনিধি ও ৯ পুলিশ কর্মকর্তা।

জানা যায়, জেলার ইয়াবাসহ বিভিন্ন মাদকের শীর্ষ ব্যবসায়ী অন্তত ৪৩ জন। এদের অধীনে আছে অসংখ্য মাদক ব্যবসায়ী ও বিক্রেতা। আর এসব মাদক ব্যবসায়ীকে নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের মাধ্যমে শেল্টার দেয়া, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে আটক হলে টাকার বিনিময়ে ছাড়িয়ে নেয়াসহ নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা করেন কমপক্ষে ৭ জন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও আওয়ামী লীগ নেতা।

এছাড়া জেলার মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ৯ পুলিশ কর্মকর্তার যোগসাজশ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের উদ্যোগে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে সম্প্রতি সারা দেশের মাদক ব্যবসায়ীদের যে তালিকা করা হয়েছে তাতে কুড়িগ্রাম জেলার এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে উল্লিখিত তালিকা অনুয়ায়ী ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দিয়ে পুলিশ সদর দফতর থেকে এরই মধ্যে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপারের কাছে একটি চিঠিও এসেছে।

প্রতিবেদনে কুড়িগ্রাম জেলার শীর্ষ ৪৩ জন মাদক ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, ফুলবাড়ী থানার সাইফুর রহমান, ফারুক হোসেন, এরশাদুল হক, কায়ছার আলী, আ. রউফ ভোগলা, রফিকুল ইসলাম, লুৎফর রহমসান, আবদুল গফুর, ইসরাইল হোসেন ওমর ফারুক, আবদুল মজিদ, লিটন মিয়া, নাগেশ্বরী এলাকার আজিজুল হক, ধর্মপুরের বিপ্লব, কাশীপুরের দুলাল, রৌমারী নওদাপাড়ার নুর আলী, খাটামারি এলাকার শহিদুল ইসলাম, কুড়িগ্রাম সদরের সরদারপাড়া ছত্রপুরের রফিকুল ইসলাম, কাঁঠালবাড়ী এলাকার দুলু মিয়া, মাসুদ রানা, ভেলাকুপা এলাকার শফিকুল ইসলাম, ফুলবাড়ীর আবুল কালাম আজাদ, নাগেশ্বরী পশ্চিম রামখানা এলাকার মিজানুর রহমান, রাজারহাট মিরেরবাড়ীর আবু বক্কর, উলিপুর ডাবারপাড় এলাকার মমিনুল ইসলাম মমিন, কুড়িগ্রাম নাজিরা ব্যাপারীপাড়ার শহিদুজ্জামান, নাগেশ্বরী নাখরাজ এলাকার আনসার আলী, কুড়িগ্রাম মিয়াপাড়া এলাকার রুবেল মিয়া, আমিনুল ইসলাম, রাজারহাটের হজরত আলী, কচাকাটার মেহের আরী, নাগেশ্বরী পশ্চিম রামখানার আবদুর রহিম, রাজিবপুরের বাবু মিয়া, সরবত আলী, আরিফুল ইসলাম, আনোয়ার হোসেন, রৌমারীর আবদুল হামিদ, মন্টু, কাছিবর আলী, হায়দার আলী প্রমুখ।

এসব মাদক ব্যবসায়ীর প্রধান পৃষ্ঠপোষকদের তালিকায় আছেন জেলার রৌমারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও সাবেক এমপি জাকির হোসেন, একই উপজেলার যুবলীগ সভাপতি হারুন-অর রশিদ, রাজিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান নূর আলম (শফিউল আলম), চিলমারি উপজেলার রমনা ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নুর-ই-এলাহী তুহিন, রাজিবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান কামরুল আলম বাদল, ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ারছড়া গ্রামের সিরাজুল ইসলাম সেরা ও রৌমারী উপজেলার দাঁতভাঙ্গা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম বিএসসি।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক এমপি জাকির হোসেন বলেন, আমি সবসময় মাদকবিরোধী কার্যক্রম পরিচালনা করি। আমার নির্বাচনী এলাকার বর্তমান সর্বোচ্চ পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি ও তার ভাই-ভাতিজাসহ অনেকে মাদক ব্যবসায় জড়িত। এলাকায় আমার জনপ্রিয়তা এখন তুঙ্গে। আমি যেন সামনের নির্বাচনে নমিনেশন না পাই সেজন্য একটি পক্ষ ষড়যন্ত্র করে মাদকের তালিকায় আমার নাম জড়িয়েছে। তালিকার কিছু নাম সঠিক থাকলেও কিছু নাম অযথা জড়ানো হয়েছে।

তিনি বলেন, পৃষ্ঠপোষকের তালিকায় নুর-ই-এলাহী তুহিন এবং শফিউল আলমের নাম ঠিক আছে। আমিনুল ইসলাম বিএসসি, কামরুল আলম বাদল এবং হারুন-অর-রশিদের নাম ষড়যন্ত্রমূলকভাবে ঢোকানো হয়েছে।

মাদকের সঙ্গে নিজের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে রাজিবপুর উপজেলার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান কামরুল আলম বাদল বলেন, সারা জীবন আওয়ামী লীগ করলেও নির্বাচনের সময় আমাকে আওয়ামী লীগ থেকে নমিনেশন দেয়া হয়নি। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করে আমি জয়লাভ করেছি। তাই প্রতিপক্ষরা শত্রুতা করে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মাদকের সঙ্গে আমার নাম জড়িয়েছে।

পৃষ্ঠপোষকের তালিকায় থাকা সদ্য বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়া এলাকার সিরাজুল ইসলাম সেরা বলেন, আমি তো দূরের কথা। আমার বংশের কেউই মাদকের সঙ্গে জড়িত নন।

রৌমারী উপজেলা যুবলীগের সভাপতি হারুন-অর-রশিদ বলেন, গোয়েন্দা প্রতিবেদনে মাদকের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে আমার নাম থাকার বিষয়টি থানার ওসি আমাকে জানিয়েছেন। ওসি আমাকে আশ্বস্ত করেছেন যে, ‘তালিকায় নাম থাকুক আর না থাকুক এতে আপনার কোনো সমস্যা নেই।’

হারুন বলেন, মাদককে পৃষ্ঠপোষকতা করা তো দূরের কথা, জীবনে কোনো মাদকদ্রব্য স্পর্শ করিনি।

রাজিবপুর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান শফিউল আলম বলেন, আমি সবসময় মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার। একটি বেনামি আবেদনের প্রেক্ষিতে গোয়েন্দা প্রতিবেদনে আমার নাম জড়ানো হয়েছে।

আমিনুল ইসলাম বিএসসি বলেন, আমি শিক্ষকতার পাশপাশি স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতি করি। এর বাইরে যতটুকু সময় পাই টিউশনি করি। মাদকের বিরুদ্ধে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করি। আমার নাম কীভাবে পৃষ্ঠপোষক হিসেবে এলো তা ভাবতেও পারছি না।

অন্যদিকে প্রতিবেদন অনুযায়ী, যেসব পুলিশ সদস্য মাদক ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে সহযোগিতা করছেন তারা হলেন- নাগেশ্বরী থানার এসআই মশিউর রহমান, ভুরুঙ্গামারী থানার এসআই ফারুক হোনে, কনস্টেবল মোকাদ্দেস আলী, কুড়িগ্রাম ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মাহফুজুর রহমান, ডিবির আবদুস সোবহান, খাইরুল ইসলাম, ডিবির কনস্টেবল আনোয়ার হোসেন, সদর থানা ফাঁড়ির এসআই আবু তালেব, এএসআই কামরুল ইসলাম এবং কুড়িগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরিদর্শক জাহেদুল ইসলাম।

এ বিষয়ে নাগেশ্বরী থানার ওসি জাকির উল ইসলাম বলেন, মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মাসোয়ারা গ্রহণকারী হিসেবে আমার থানার যার নাম এসেছে তাকে এরই মধ্যে অন্য জেলায় বদলি করা হয়েছে।

ভুরুঙ্গামারী থানার ওসি ইমতিয়াজ কবির জানান, মাদক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ইতিমধ্যে এসআই ফারুক হোসেন এবং কনস্টেবল মোকাদ্দেস আলীকে অন্যত্র বদলি করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা তদন্তাধীন।

কুড়িগ্রাম জেলা ডিবির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাহফুজুর রহমান বলেন, তালিকায় ডিবির যে চারজনের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে একজনের নাম ভুল। তালিকায় আবদুস সোবহানকে ডিবি সদস্য বলা হলেও তিনি সদর থানার ওসি হিসেবে কর্মরত। আমিসহ অন্যদের বিষয়ে এসপি অফিস থেকে তদন্ত হয়েছে। আমাদের বিরুদ্ধে আসা অভিযোগের বিষয়ে এসপি অফিস কোনো সত্যতা পায়নি। মাদক উদ্ধারের ক্ষেত্রে আমি ৫ বার শ্রেষ্ঠ অফিসার নির্বাচিত হয়েছি।

কুড়িগ্রাম সদর থানার ওসি আবদুস সোবহান বলেন, মাদকের সঙ্গে তার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। এসআই আবু তালেব এবং এএসআই কামরুল ইসলামের বিরুদ্ধে এসপি অফিস থেকে তদন্ত হয়েছে। এর মধ্যে তালেবকে বদলি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুসারে, কুড়িগ্রাম জেলার ভুরুঙ্গামারী থানার পাথরডুবি, ধলভাঙ্গা ও সোনারহাট এলাকা দিয়ে চোরাকারবারীরা ভারতীয় ফেনসিডিল ইয়াবা, মদ ও গাঁজা আনে। তাছাড়া নাগেশ্বরী উপজেলার রামখানা ও কচাকাটা এলাকা এবং ফুলবাড়ী থানার শিমুলবাড়ী, ভুড়িয়াকুঠি, জুম্মারপাড়, গংগারহাট, গোড়ক মণ্ডল, বালারহাট, কাশিরপুর এবং অন্তপুর এলাকা দিয়েও ভারতীয় মাদক আসে।

এছাড়া জেলার অন্তত ৪২টি স্থানে মাদক বিক্রি হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- কুড়িগ্রাম পৌরসভার পুরনো স্টেশন, গড়েরপাড়, পশু হাসপাতাল মোড়, কালীবাড়ি, চামড়াগোলা, ত্রিমোহিনী, কলেজপাড়া, খলিলগঞ্জ, হলোখানা, নতুন স্টেশন, তালতলা, সদর উপলোর যাত্রাপুর, পাচগাছি ও কাঁঠালবাড়ী, নাগেশ্বরী উপজেলার, গাগলা, নারায়ণপুর, উত্তর ব্যাপারী হাট, দিঘীরপাড় ও রামখানা, ফুলবাড়ী উপজেলার দাসিয়ার ছড়া সিটমহল, খড়িবাড়ী, পাখিরহাট, বালারহাট, গঙ্গারহাট, কাশিপুর, বেড়াকুঠি, শিমূলবাড়ী, বুড়িয়ারকুঠি, জুম্মারপাড়, গোড়ক মণ্ডল এবং অন্তরপুর, চিলমারী উপজেলার রমনা এবং মাটিকাটা মোড়, রাজিবপুর উপজেলার বালিয়ামারী, উলিপুর উপজেলার সাহেবের আলগা, দুর্গাপুর এবং নারিকেলবাড়ী।

Bootstrap Image Preview