Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ সোমবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৭ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

তাসফিয়াকে ‘ধর্ষণের পর হত্যা’ খোঁজ মিলেছে বহনকারী সেই অটোরিকশার

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ মে ২০১৮, ০৩:০৪ PM
আপডেট: ০৫ মে ২০১৮, ০৩:৫৫ PM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্ক-

চট্টগ্রামে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া আমিনকে বহনকারী সিএনজি অটোরিকশাটির খোঁজ মিলেছে। নগরের গোলপাহাড় মোড়ের চায়নাগ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে স্কুলছাত্রী তাসফিয়া সেই অটোরিকশাটিতে করে বেরিয়ে যায়। একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ দেখে অটোরিকশাটি সনাক্ত করেছে পুলিশ।

নগর পুলিশের কর্ণফুলী জোনের সহকারী কমিশনার (এসি) মো. জাহেদুল ইসলাম জানান, ‘স্কুলছাত্রী তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে একাধিক ইস্যু নিয়ে সামনের দিকে । নগরের গোলপাহাড় মোড়ের চায়নাগ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে বেরিয়ে তাসফিয়া নিজ বাসায় না গিয়ে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের ১৮ নম্বর ব্রিজঘাটে কেন গেলো, কিভাবে গেলো? এবিষয়টি নিয়ে আমরা কাজ করছি। ইতিমধ্যে চায়নাগ্রিল রেস্টুরেন্ট, জিইসিসহ পতেঙ্গায় যাওয়ার পথে থাকা একাধিক সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করেছি। তাসফিয়াকে বহনকারী সেই সিএনজি অটোরিকশাটি আমরা সনাক্ত করেছি। অটোরিকশা ও চালককে গ্রেফতারে অভিযান চলছে।’

এদিকে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় প্রকাশ পেয়েছে সুরতহাল রিপোর্ট। যেখানে চট্টগ্রামের সানশাইন গ্রামার স্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী তাসফিয়ার ওপর চালানো ভয়াবহ নির্যাতনের চিত্র উঠে এসেছে। তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিনের দাবি, গণধর্ষণের পর তাসফিয়াকে হত্যা করা হয়েছে।

ময়নাতদন্ত শেষে বৃহস্পতিবার রাতে কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলা সদর ডেইলপাড়ায় পারিবারিক কবরস্থানে দাফন সম্পন্নের পর শুক্রবার সকালে চট্টগ্রামে সাংবাদিকদের এসব তথ্য দেন মোহাম্মদ আমিন।

তিনি বলেন, 'তাসফিয়ার গোপনাঙ্গে পাষণ্ডদের গণধর্ষণের ছাপ রয়েছে। আদনান মির্জা ও তার বন্ধুরা মিলে তাসফিয়ার ওপর গণধর্ষণ চালিয়েছে।এরপর তার বুকে, পিঠে আঘাত করে তাকে হত্যা করা হয়েছে। পরে অত্যন্ত গোপনে তাসফিয়ার লাশ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের নেভালে ফেলে দিয়েছে।'

তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিনের দেয়া তথ্যের সঙ্গে মিল রয়েছে সিআইডির প্রদত্ত সুরতহাল প্রতিবেদনেও। প্রতিবেদনে ওঠে এসেছে তাসফিয়ার ওপর চালানো নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র। নিহত তাসফিয়ার পিঠজুড়ে রয়েছে অসংখ্য আঘাত। বুক ও সপর্শকাতর অঙ্গসহ সব স্থানেই আঁচড়ের দাগ রয়েছে। এ ছাড়া মুখমণ্ডল থেঁতলানো, চোখ দুটোও নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। নিহতের হাতের নখগুলোও ছিল নীলবর্ণ। সুরতহাল রিপোর্টের এ তথ্য প্রকাশ করেছেন পতেঙ্গা মডেল থানার উপপরিদর্শক ও মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা মোহাম্মদ আনোয়ার।

তিনি জানান, তাসফিয়ার বয়স ১৫ বছর। চট্টগ্রাম নগরীর সানশাইন গ্রামার স্কুল অ্যান্ড কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্রী। চট্টগ্রাম নগরীর ও আর নিজাম রোডে নাসিরাবাদ আবাসিক এলাকায় মা-বাবার সঙ্গে থাকে তাসফিয়া। তার বাবা মোহাম্মদ আমিন একজন সিএন্ডএফ ব্যবসায়ী।

গত ২রা মে বুধবার সকাল সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের নেভালে ১৮ নম্বর ব্রিজের উত্তর পাশে পাথরের ওপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা তাসফিয়ার লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। প্রথমে তার পরিচয় পাওয়া না গেলেও বুধবার দুপুরের দিকে থানায় এসে লাশ শনাক্ত করেন বাবা মোহাম্মদ আমিন। বাবার দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে পুলিশ বুধবার রাতে তাসফিয়ার প্রেমিক আদনান মির্জা (১৬) কে গ্রেপ্তার করে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বৃহস্পতিবার দুপুরে আদনান মির্জা ও তার ৬ বন্ধুকে আসামি করে মোহাম্মদ আমিন পতেঙ্গা থানায় একটি হত্যা মামলা করেন।

এর আগে তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের সময় সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন পতেঙ্গা থানার এসআই মোহাম্মদ আনোয়ার। আর যাবতীয় তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেন সিআইডি। পতেঙ্গা থানার এসআই মোহাম্মদ আনোয়ার বলেন, লাশ উদ্ধারের পর ময়নাতদন্তের জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুমন মুর্শিদীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টিম দীর্ঘ এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ময়নাতদন্ত শেষ করেন। বৃহস্পতিবার বিকালে তাসফিয়ার লাশ তার বাবার হাতে তুলে দেয়া হয়। সন্ধ্যার দিকে লাশ নিয়ে টেকনাফে গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে মোহাম্মদ আমিন। সেখানে শোকের ছায়া নেমে আসে। রাতে হাজার হাজার মানুষের জানাজা শেষে তাসফিয়ার লাশ দাফন করা হয়।

তাসফিয়ার চাচা নুরুল আমিন বলেন, আদনান কথিত বড় ভাই ও তার তৈরি করা রিচকিডস গ্যাংয়ের সদস্যরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঠান্ডা মাথায় তারা হত্যা করে লাশটি সমুদ্র উপকূলে ফেলেছে, যাতে তাদের কেউ ধরতে না পারে। এরা শুধু একজন বা দু’জন নয়। এই গ্যাংস্টার গ্রুপের অনেক সদস্যই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। আদনানকে তিনি ঠান্ডা মাথার খুনি বলে মন্তব্য করেন।

তিনি বলেন, ফেসবুকে পরিচয় থেকে আদনানের সঙ্গে তাসফিয়ার প্রেম গড়ে ওঠে। বিষয়টি জানাজানির পর তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন আদনানকে ডেকে শাসিয়ে দেয় এবং তাসফিয়ার পথ থেকে সরে যেতে কড়া নির্দেশ দেয়। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আদনান তাসফিয়াকে গণধর্ষণের পর এই হত্যাকাণ্ড ঘটায়।

তিনি বলেন, গত মঙ্গলবার বিকালে তাসফিয়া কাউকে কিছু না বলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। পরে খোঁজাখুঁজি করে না পেয়ে আমিন তার বন্ধুদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আদনানের ফোন নম্বর সংগ্রহ করে। আদনান এ সময় নগরীর গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্টে খাওয়ার পর বাসায় আসার জন্য তাসফিয়াকে সিএনজি অটোরিকশায় তুলে দেয়ার পর কিছুই জানে না বলে জানান। পরে মঙ্গলবার রাতে আদনানকে অভিযুক্ত করে নগরীর পাঁচলাইশ থানায় অভিযোগ দায়ের করেন আমিন।

এরপর পাঁচলাইশ থানা পুলিশ আদনানকে আটক করে নিয়ে এলেও এক ঘণ্টা পর তার সন্ত্রাসী দুই বড় ভাই ফিরোজ ও আকরাম চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী এক নেতার প্রভাব খাটিয়ে আদনানকে ছাড়িয়ে নেয়। আর পরদিন বুধবার তাসফিয়ার লাশ পাওয়া যায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে।

সুরতহাল রিপোর্ট ও তথ্য-উপাত্ত থেকে পুলিশ বুধবার রাতে আবার আদনানকে গ্রেপ্তার করে। ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার প্রমাণ পেয়ে বৃহস্পতিবার দুপুরে আদনান ও তার ৬ বন্ধুর নামে থানায় হত্যা মামলা করে পুলিশ। এরপর সন্ধ্যায় আদনানকে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে নেয়া হয়। সেখানে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে আবেদন করা হলেও আদালত ৬ই মে রোববার রিমান্ড শুনানির দিন ধার্য করে আদনানকে কারাগারে পাঠায় বলে জানান পতেঙ্গা মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল কাশেম ভূঁইয়া।

তিনি বলেন, বুধবার দিনগত মধ্যরাতে নগরীর দক্ষিণ খুলশীর জালালাবাদ আবাসিক এলাকা থেকে আদনান মির্জাকে গ্রেপ্তার করা হয়। জব্দ করা হয়েছে মোবাইল ফোন সেট। তার মোবাইলের কললিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। ঘটনায় জড়িত আদনানের বন্ধুরা পলাতক রয়েছে।

এদিকে নগর পুলিশের পাশাপাশি তাসফিয়ার মৃত্যুর রহস্য উন্মোচনে কাজ শুরু করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) বিশেষায়িত এই ইউনিট। তদন্তের অগ্রগতির বিষয়ে তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কর্ণফুলী) মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, ‘যে অটোরিকশায় চড়ে তাসফিয়া পতেঙ্গা গেছে, সেটি শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু রাতের অন্ধকার হওয়ায় ভিডিও ফুটেজে অটোরিকশার নম্বর স্পষ্টভাবে ধরা পড়েনি। তাই অটোরিকশার নাগাল পাওয়া যায়নি। তবে পুলিশ এই অটোরিকশার নাগাল পেতে কাজ করছে।’ তিনি বলেন, ‘শুধু অটোরিকশা নয়, পাশাপাশি আরো অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে পুলিশের একাধিক টিম মাঠে কাজ করছে। তদন্তের স্বার্থে এখনই সব বলা সম্ভব নয়।’

পুলিশের দায়িত্বশীল একজন কর্মকর্তা বলেন, তাসফিয়া বাসা থেকে বের হওয়ার সময়ের ভিডিও পাওয়া গেছে পাশের বাসার একটি ক্লোজড সার্কিট (সিসি) টিভি ক্যামেরায়। এরপর সিআরবিসহ কয়েকটি রেস্টুরেন্টে যাওয়ার কথা বলেছে তাসফিয়ার বন্ধু আদনান মির্জা। সেসব রেস্টুরেন্ট থেকেও ভিডিও ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। এসব ফুটেজে তাসফিয়া ও আদনানের উপস্থিতি পাওয়া গেছে। সন্ধ্যায় গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল নামের রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে একটি অটোরিকশায় ওঠে তাসফিয়া। সেই ভিডিও চিত্রের পর পুলিশ তাসফিয়ার বাসায় যায়, সে বাসায় প্রবেশ করেছে কি না এমন প্রমাণ পাওয়ার আশায়। কিন্তু তাসফিয়ার বাসার পাশের ভবনের সিসি ক্যামেরায় এ ধরনের ফুটেজ পাওয়া যায়নি।

এ ছাড়া গোলপাহাড় মোড় থেকে তাসফিয়াকে বহনকারী অটোরিকশা জিইসির মোড় যাওয়ার সময় মেডিক্যাল সেন্টারের সামনের সড়কে সামান্য সময়ের জন্য অপেক্ষা করেছিল। এরই মধ্যে তাসফিয়া অটোরিকশা থেকে নামে, পরে আবার গাড়িতে ওঠে। এরপর গাড়িটি জিইসির মোড় হয়ে পতেঙ্গা চলে যায় বলে পুলিশ ধারণা করছে। তাসফিয়া সন্ধ্যা ৬টা ৪৮ মিনিটে জিইসির মোড় এলাকায় ছিল। আর রাত ৮টা ১৫ মিনিটে তাকে পতেঙ্গার ১৮ নম্বর ঘাট এলাকায় দেখেছে প্রত্যক্ষদর্শীরা।

তাসফিয়ার যাত্রাপথের এমন তথ্য জানার পর পুলিশ জানতে চেষ্টা করছে যাত্রাপথে প্রায় দেড় ঘণ্টা সময়ে তাসফিয়া কোথাও দাঁড়িয়েছিল কি না। এই তথ্য জানা যাবে অটোরিকশাচালকের কাছ থেকে। তাসফিয়ার হাতে একটি সোনার আংটি ছিল। মরদেহ উদ্ধারের সময় এই আংটি পাওয়া যায়নি। তাহলে কি তাসফিয়া পথে কোথাও দাঁড়িয়েছিল, কিছু নিয়েছিল? কারো সঙ্গে কথা বলেছিল—এসব প্রশ্নের উত্তর পাচ্ছে না পুলিশ। আবার রাত ৮টা ১৫ মিনিটের পরের কোন সময়ে কিভাবে তাসফিয়া মারা গেল—এমন প্রশ্নের উত্তরও নেই পুলিশের কাছে।

পিবিআই চট্টগ্রাম মহানগর অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মঈন উদ্দিন বলেন, ‘তাসফিয়ার মৃত্যুরহস্য উন্মোচনে পিবিআই ছায়া তদন্ত শুরু করেছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি পাওয়া যায়নি।’

তাসফিয়ার মৃত্যুর ঘটনায় বন্ধু আদনান মির্জাসহ ছয়জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতপরিচয় আরো পাঁচ-ছয়জনের বিরুদ্ধে পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তাসফিয়ার বাবা ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আমিন।

Bootstrap Image Preview