Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ মঙ্গলবার, নভেম্বার ২০১৮ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

নাশকতার পরিকল্পনা করতে ছদ্মবেশে মেসে উঠে ওরা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জানুয়ারী ২০১৮, ০৯:১৩ PM
আপডেট: ১৩ জানুয়ারী ২০১৮, ০৯:১৩ PM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্কঃ রাজধানীর তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়ার একটি বাড়ির মেসের কক্ষে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) অভিযানে সন্দেহভাজন তিন জঙ্গি নিহত হয়েছে। গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে শুরু হওয়া ওই অভিযান গতকাল শুক্রবার বিকেলে শেষ হয়। ওই কক্ষ থেকে তিনটি গ্রেনেড, দুটি পিস্তলসহ বিস্ফোরক উদ্ধার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। নাখালপাড়ার ‘রুবি ভিলা’ নামের ওই বাড়িটি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় এবং সংসদ সদস্যদের আবাসিক ভবন ‘ন্যাম ফ্ল্যাটের’ কাছেই। ওই তিন জঙ্গির গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপর হামলার পরিকল্পনা ছিল বলে র‌্যাবের  দাবি। র‌্যাব কর্মকর্তারা বলছেন, নিহত তিন তরুণ জঙ্গি সংগঠন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) সদস্য। তাদের বয়স ২০ থেকে ৩০ বছরের মধ্যে। গতকাল রাত পর্যন্ত তাদের পরিচয় জানা যায়নি। তবে মেসের কক্ষ থেকে একই ছবি থাকা দুটি জাতীয় পরিচয়পত্র উদ্ধার করেছে র‌্যাব। ওই পরিচয়পত্রে জাহিদ ও সজীব নাম লেখা আছে। র‌্যাব সূত্রে জানা গেছে, জাহিদ নামের যে পরিচয়পত্র পাওয়া গেছে তাতে বাবার নাম জুবায়ের এবং বাড়ি কুমিল্লা উল্লেখ আছে। আর সজীব নামের পরিচয়পত্রে বাড়ির ঠিকানা আছে ব্রাক্ষণবাড়িয়া এবং বাবার নাম  জামান হোসাইন। র‌্যাবের একাধিক সূত্র জানায়, সম্প্রতি দারুস সালামসহ কয়েকটি এলাকায় অভিযানের সূত্র ধরে এই মেসে আশ্রয় নেওয়া ওই তিন জঙ্গিকে শনাক্ত করা হয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগে জঙ্গিরা দলগতভাবে বাসা ভাড়া নিয়ে থাকলেও গতকালের অভিযানে দেখা গেছে, অপরিচিত অন্যদের সঙ্গে মেসের একটি কক্ষ ভাড়া নিয়ে থেকেছে তিন জঙ্গি। অভিযান পরিচালনাকারীরা বলছেন, অভিযানের মুখে জঙ্গিরা মেসের গ্যাসের চুলার ওপর গ্রেনেড রেখে বড় ধরনের বিস্ফোরণ ঘটানোর চেষ্টা করেছিল। তবে অভিযানের শুরুতেই বাসার গ্যাস সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়ায় তাদের সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। র‌্যাব ও স্থানীয় লোকজনের ভাষ্যমতে, বাড়িটির মালিক শাহ মোহাম্মদ সাব্বির হোসেন (৫৫) বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের ফ্লাইট পারসার। রুবেল নামের একজন মেসে লোক তুললেও সেখানে কোনো তথ্য রাখা হয়নি। ওই বাড়িতে গত তিন বছরে দুবার এবং পাশের একটি বাড়িতে একবার অভিযান চালিয়েছিল আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব অভিযানে বেশ কয়েকজন সন্দেহভাজনকে আটক করা হলেও মালিকপক্ষ সতর্ক হয়নি। গতকাল সকাল সোয়া ১০টার দিকে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র‌্যাবের মহাপরিচালক (ডিজি) বেনজীর আহমেদ। ওই সময় তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘জাহিদ নামে এনআইডি (জাতীয় পরিচয়পত্র) দিয়ে তারা এখানে ঢুকেছিল। আরেকটি এনআইডির ফটোকপি রয়েছে, সেখানে জাহিদের ছবি আছে; কিন্তু নাম সজীব। আমরা ধারণা করছি, জাহিদ একটি ভুয়া এনআইডি দিয়ে এই বাড়িতে ঢুকেছিল। কারণ একই ছবি দিয়ে দুটি এনআইডি। একটি ফটোকপি, দেখতে মনে হয় আসল। একটি বা দুটিই নকল হতে পারে। আমরা ডিএনএ নমুনা রাখব এবং তদন্ত করে দেখব।’ র‌্যাব মহাপরিচালক জানান, মেসের একটি কক্ষে অভিযান চালানোর পর নিহত তিন জঙ্গির লাশ পাওয়া গেছে। তারা গত ৪ জানুয়ারি ওই কক্ষ ভাড়া নিয়েছিল। তবে বেনজীর আহমেদ জানান, বাড়িওয়ালা সাব্বির হোসেন তাঁর বাড়ি ভাড়া দেওয়ার জন্য রুবেল নামে একজনকে মেস ম্যানেজার নিয়োগ করেছিলেন। রুবেলই ভাড়াটিয়া ওঠানো-নামানোর কাজ করত। বাড়িওয়ালা দেখেননি সে কাকে ঢোকাচ্ছে, কাকে বের করছে। বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমি সবাইকে বলব, বাড়ি যাঁরা ভাড়া দেন, তাঁরা বিষয়গুলো দেখবেন। কোনো ধরনের অসংগতি দেখলে আমাদের জানাবেন।’ গত সেপ্টেম্বরে দারুস সালামের বর্ধনবাড়ি এলাকায় পাঁচ দিনব্যাপী অভিযানে জঙ্গি আব্দুল্লাহসহ সাতজন নিহত হয়। এর সূত্র ধরে বিমানের একজন পাইলটসহ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। ওই পাইলটকে পরে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পেছনে স্পর্শকাতর এলাকায় জঙ্গিদের এই অবস্থান নিয়ে জানতে চাইলে বেনজীর আহমেদ বলেন, ‘আমরা পেশাদার; কিছু মনে বা অনুমান করি না। যা ঘটনা তা নিয়ে তদন্ত করে কথা বলব।’ অভিযান : সকাল থেকেই আশপাশের রাস্তা বন্ধ করে দিয়ে বাড়ির ভেতরে তল্লাশি অভিযান চালায় র‌্যাব। দুপুরে নিহতদের লাশ, বিস্ফোরকসহ আলামত উদ্ধার শুরু হয়। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৩টার দিকে ছয়তলা বাড়ির পঞ্চম তলার পূর্ব পাশের ফ্ল্যাটে তল্লাশি চালাতে গেলে একটি কক্ষের দরজা খুলে জঙ্গিরা গুলি ও গ্রেনেড ছোড়ে। তবে গ্রেনেড বিস্ফোরিত হয়নি। র‌্যাব তখন গুলি করে। গোলাগুলি শেষে তিনজনের মৃতদেহ পাওয়া যায়। মুফতি মাহমুদ খান আরো জানান, অভিযানের সময় আরিফুল ইসলাম (৩২) এবং আজিম (২৯) নামে দুই র‌্যাব সদস্যও আহত হন। তাঁদের ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। এই র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, মেসের ম্যানেজার রুবেল বলেছে, জাহিদ নামের এক যুবক গত ২৯ ডিসেম্বর এসে দুই হাজার টাকা অগ্রিম দিয়ে পাঁচ তলার কক্ষটি সাড়ে পাঁচ হাজার টাকায় ভাড়া নেয়। জাহিদ তাকে বলেছিল, সে তেজগাঁওয়ের একটি সিরামিক কম্পানিতে চাকরি করে। তার সঙ্গে দুই ভাই থাকবে। ৪ জানুয়ারি সে বাসায় ওঠে। বাকি দুজন ওঠে ৮ জানুয়ারি। তবে তারা বাসায় ওঠার সময় ভাড়াটিয়া ফরম পূরণ করেনি। র‌্যাবের পরিচালক আরো জানান, ভবনটিতে ১০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে পঞ্চম তলায় একটি এবং ষষ্ঠ তলায় দুটি ফ্ল্যাটে মেস। বাকিগুলোতে পরিবার থাকে। মেসে ছিল ২১ জন। অভিযানের আগে বাড়ির অন্য ৫৭ বাসিন্দাকে দ্বিতীয় তলায় মালিকের বাসায় নিয়ে রাখা হয়। মুফতি মাহমুদ খান বলেন, যে কক্ষে অভিযান চালানো হয় সেই ফ্ল্যাটের বাকি দুই কক্ষে আগে থেকেই চারজন থাকত। তারা র‌্যাবকে জানিয়েছে, জাহিদ পরিচয় দেওয়া ব্যক্তি খুব ভোরে বের হয়ে যেত। অন্য দুজনের ব্যাপারে তারা কিছুই জানে না। গতকাল বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে অভিযান শেষ জানিয়ে কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, তেজগাঁও থানা পুলিশ লাশের সুরতহাল করেছে। ময়নাতদন্তের জন্য সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়েছে। জঙ্গিদের কক্ষটি সিলগালা করে দেওয়া হয়েছে। র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, র‌্যাব-পুলিশের নজর এড়াতেই নিজস্ব বাসা না নিয়ে জঙ্গিরা অন্যদের সঙ্গে মেসে উঠেছে। তবে ভবনটিতে তাদের কোনো আশ্রয়দাতা আছে কি না, তা যাচাই করে দেখা হচ্ছে। র‌্যাবের ভাষ্য মতে, দারুসসালামের ভবনটিতে জঙ্গি আব্দুল্লাহকে বাড়িওয়ালা সহায়তা করতেন। বাড়িওয়ালার পাইলট ছেলেও জঙ্গি দলে ভিড়ে বিমান নিয়ে হামলার পরিকল্পনা করেন। গতকাল সকালে নাখালপাড়ায় গিয়ে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের দক্ষিণ-পূর্ব কোণে ন্যাম ভবনের পেছনেই ফার্মগেট-নাখালপাড়ার রাস্তার পাশের একটি গলিতে নাখালপাড়ার ১৩/১ নম্বর হোল্ডিংয়ে ‘রুবি ভিলা’। ওই গলি ও আশপাশের বেশ কিছু জায়গায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রেখেছে র‌্যাব। স্থানীয় লোকজন জানায়, বৃহস্পতিবার রাত ৩টার দিকেই গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙে তাদের। তবে এর আগেই র‌্যাব সদস্যদের আনাগোনা দেখেছে কেউ কেউ। রুবি ভিলার পেছনের বাড়িতে বসবাসকারী বদরুল বলেন, ‘রাতে প্রচণ্ড গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। ওই সময় বাইরে দৌড়াদৌড়ির শব্দ পাওয়া যাচ্ছিল। থেমে থেমে গুলির শব্দ হচ্ছিল।’ পাশের ভবনের বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ‘রাত ২টার পর র‌্যাবের লোকজন আমাদের এখানেও আসে। অভিযানের সময় সেল্টারের জন্য তারা আমাদের গেট খোলা রাখতে বলে। আমরা গেট খোলা রাখি।’ পাঁচ তলার ফ্ল্যাটের চারজনসহ বাড়ির অন্য বাসিন্দাদের ব্যাপারে জানতে চাইলে কমান্ডার মুফতি মাহমুদ খান বলেন, তাদের হেফাজতে রাখা হয়েছে। কাউকে এখনো আটক করা হয়নি। যাচাই-বাছাই করে যদি কারো সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তবে তাকে আটক করা হবে। নাসির ও মাহতাব জানান, ২০১৬ সালের ১৪ আগস্ট রুবি ভিলার মেসে অভিযান চালিয়ে জঙ্গি সন্দেহে ১০-১২ জনকে ধরে নিয়ে গিয়েছিল র‌্যাব-পুলিশ। এর তিন বছর আগেও অভিযান চালানো হয়। এক বছর আগে পাশের ৭৪ নম্বর ভবনেও অভিযান চালায় র‌্যাব। রফিকুল ইসলাম নামে আরেক ব্যক্তি বলেন, ‘এর আগে জামায়াত-শিবিরের লোকজন ধরা হয়েছে। মনে হচ্ছে বাড়িটিতে উগ্রপন্থী কোনো লোক আছে। তা না হলে এখানেই কেন বারবার ঝামেলা হবে।’ তিনি জানান, অভিযানের পর পুলিশ ও র‌্যাব মেস না চালাতে বলেছিল। র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক মুফতি মাহমুদ খান বলেন, ২০১৬ সালে এবং ২০১৩ সালে দুইবার এই ভবনে অভিযান চালানো হয়েছিল। তখনো উগ্রপন্থী ধরা পড়ে।
Bootstrap Image Preview