Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘জোর করে মদ পান করিয়ে একের পর এক পুরুষ পাঠানো হতে’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ জুন ২০১৮, ১১:৫৫ AM
আপডেট: ১৩ জুন ২০১৮, ১১:৫৫ AM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্ক-

ভ্যানচালক বাবার সংসারে সচ্ছলতা ফিরিয়ে  আনতে গৃহকর্মী হিসেবে জর্ডানে গিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার  হালিমা(ছদ্মনাম)। কিন্তু সেখানে একটি চক্রের হাতে পড়ে দীর্ঘদিন ধরে যৌন-নিপীড়নের শিকার হয়েছেন। যার ফলশ্রুতিতে তিনি এখন সন্তানসম্ভবা। ৮ মাসের গর্ভবতী।

অবশেষে নির্যাতন সইতে না পেরে দেশে ফিরেছেন তিনি। গত সোমবার বিদেশফেরত নির্যাতিত যে ২২ জন নারীকর্মী ফিরে  এসেছে হালিমা তাদের একজন।

জানা গেছে, তিনি ২০১৪ সালের শুরুর দিকে জর্ডান গিয়েছিলেন গৃহকর্মীর কাজ নিয়ে। সেদেশে পৌঁছানোর পর তাকে একটি বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ দেয়া হয়। মাসিক বেতন নির্ধারিত হয় ১৫ হাজার টাকা। মালিক ভালো হলেও তার ছেলে প্রায়ই তাকে নির্যাতন করতো। মারধর করতো। এই নির্যাতন থেকে রেহাই পেতে একদিন তিনি ওই বাসা থেকে পালিয়ে যান। এরপর আশ্রয় নেন পূর্বপরিচিত মানিকগঞ্জেরই আরেক মেয়ে সোনিয়া খাতুনের কাছে। সে তাকে কাজ দেয়ার কথা বলে নিয়ে যায় তার বাড়িতে। নির্যাতিত মেয়েটি সেখানে গিয়ে দেখেন পাঁচ তলা বাড়ির পুরোটাই ভাড়া নিয়েছে সোনিয়া। ওই বাসাতেই প্রায় অর্ধশত মেয়ে।

তিনি এত মেয়ে একসঙ্গে থাকার কারণ জানতে চান। সোনিয়া তাকে জানায়, এরা যে কাজ করে, তাকেও একই কাজ করতে হবে। তখন সেখান থেকে চলে যেতে চাইলে বাধা দেয়া হয়। ফলে বাধ্য হয়ে সেখানেই থেকে যান তিনি। এরপর চলতে থাকে তাকে দিয়ে অসামাজিক কাজ করানোর চেষ্টা। রাজি না হলে চলে মারধর, নির্যাতন। জোর করে মদ খাওয়ানো হয়।

এরপর একের পর এক পুরুষ পাঠানো হয় তার কাছে। বলেন, আমার কাছে প্রতিদিনই ৪-৫ জন করে পুরুষ মানুষ পাঠাতো। কখনো কখনো একসঙ্গে দু’জন করে আসতো। তাদের কাছে অনুনয়-বিনয় করেও রেহাই পাইনি। উল্টো মারধর করতো, জোর করে মদ খাওয়াতো। এতে করে মাঝে মাঝে বমিও করে দিতাম। কিন্তু নিস্তার পেতাম না।

নির্যাতিত মেয়েটি জানান, প্রতি বৃহস্পতিবারে রাতে তাদের ওপর নির্যাতন বেশি হতো। ওইদিন রাতে খদ্দেররা আসতো, সারারাত থাকতো, এরপর শুক্রবার সকালে চলে যেতো। যারা আসতো তারা কারা- জানতে চাইলে মেয়েটি জানান, বিভিন্ন দেশের লোক ছিল এরা। বিশেষ করে ইন্ডিয়ান, ফিলিপাইন ও শ্রীলঙ্কান। দু’একজন বাংলাদেশিও যেতো তাদের কাছে।

কিন্তু তাকে কোনো টাকা-পয়সা দিতো না। সব দিতো সোনিয়ার কাছে। সেই তাদের কাছে লোক পাঠাতো। বাড়িতে কিছু টাকা-পয়সা পাঠানোর জন্য অনুনয় বিনয় করলেও সোনিয়া কোনো টাকা দেয়নি তাকে। বরং উল্টো মারধর করতো।

সোনিয়া মদ খেয়ে এসে তার বুট জুতা এবং কোমরের বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পেটাতো। তার ইন্ডিয়ান স্বামী নিষেধ করলেও শুনতো না। এভাবে এক বছর পর সেখান থেকে পালিয়ে যাই। পাশেই এক দোকানে একটি বাঙালি মেয়ের সঙ্গে দেখা হয়। সে তার মালিকের বাড়িতে নিয়ে যায়। তাকে অন্য একটি বাড়িতে কাজ দেয়। কিন্তু কিছুদিন পর সোনিয়া তাকে সেখান জোর করে নিয়ে আসে। ওই বাড়িতে কাজ করার কোনো কাগজপত্র না থাকায় বাড়ির মালিকও তাকে বাধা দিতে পারেনি। এরপর তাকে ফিরিয়ে এনে বেদম মারধর করেছে। মেয়েটির বাবার কাছে ফোন দিয়ে বলেছে, তার মেয়ে কোথা থেকে আকাম করে আসছে। তাই মারধর করেছি।

মেয়েটি বলেন, সোনিয়া তার বাড়িতে প্রায়ই ফোন দিয়ে বলতো তাদের মেয়ে পতিতাবৃত্তি করে। এ কথা বলার কারণ, তার পিতা-মাতা যেন তাকে গ্রহণ না করে। কথা বলার একপর্যায়ে মেয়েটি কেঁদে ওঠেন।

 বলেন, আমার প্রতিদিনই খুব কষ্ট হতো। বাধা দিলে আরো বেশি নির্যাতন চালাতো। এভাবে একসময় তিনি এই কষ্টে অভ্যস্ত হয়ে পড়েন। এরমধ্যে সোনিয়া একবার দেশে আসে। ওই সময় চেষ্টা করেছিলো পালাতে কিন্তু বাড়ির মালিক তাকে পালাতে দেয়নি।

 সোনিয়ার গ্রামের বাড়িতে গিয়ে তার বাবা দেখা করে। মেয়েকে ফেরত পাঠাবে বলে কথা দেয়। কিন্তু জর্ডান ফিরে গিয়ে কথা রাখেনি সে। একইভাবে নির্যাতন চালায়। বরং মাত্রা বাড়তে থাকে। এক সময় অসুস্থ হয়ে পড়লে সোনিয়া তাকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়। এরপর দু’মাস কাটে জেলে। পরে তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়।

নিপীড়িত মেয়েটি বলেন, গত ১৭ই এপ্রিল তাকে দেশে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তিনি ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়েন।

পরে আল্ট্রাসনোগ্রাম করালে চিকিৎসক জানান, তিনি ৬ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। এ সময় গর্ভপাত করানোরও উপায় ছিল না বলে জানান তিনি। বলেন, তিনি এখন ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ঘটনাটি ইতিমধ্যে এলাকায় জানাজানি হয়েছে। সমাজ তাদের একঘরে করে রেখেছে। তার পিতা ভ্যান চালান। তিনি বাজার-ঘাটে যেতে পারেন না। তার ভ্যানেও কেউ ওঠতে চায় না। কথা বলে না। পাড়া-প্রতিবেশীরা তাকে ও তার মাকে নানাভাবে গালমন্দ করে। তাদের বাড়িতে কেউ আসে না। তারা কোনো বাড়িতে যেতে পারেন না।

তিনি বলেন, আব্বাও আমাকে খুব গালমন্দ করে। আমার খুব খারাপ লাগে। কথাটি বলতে বলতে, ডুকরে কেঁদে ওঠেন তিনি। পাড়ার মানুষ আরো খারাপ ভাষায় বলে। সন্তান ভূমিষ্ট হওয়ার পর কী করবেন জানতে চাইলে তিনি অসহায় দৃষ্টিতে তাকান। এরপর বলেন, আমি তো রাখতে পারবো না। তিনি জানান, তার নানী বলে, তোর তো বিয়ে হয়নি, তুই ক্যামনে রাখবি এই সন্তান? বলেন, কাউকে পালতে দেবো। কাকে পালতে দেবেন জানতে চাইলে বলেন, তাও জানি না।

মেয়েটিকে বিশেষভাবে দেখাশুনা করছেন ব্র্যাকের মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম। তাকে আর্থিকসহ নানা ধরনের সহযোগিতাও দিচ্ছে তারা।

Bootstrap Image Preview