Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘ইজ্জতটুকু’ বাঁচিয়ে ঘরে ফেরাটাও ভাগ্যের ব্যাপার!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৯ নভেম্বর ২০১৭, ১০:০১ PM
আপডেট: ১০ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৯:১৭ PM

bdmorning Image Preview


মেরিনা মিতু।।

সমাজের চোখে একজন নিপীড়ক ও একজন ভুক্তভোগীর চেহারা কেমন? খবরের কাগজে ফলাও হয়ে না আসা যে ঘটনাগুলো রোজ রাজধানীতে ঘটে যাচ্ছে, সেসব ঘটনা খুঁজে বের করে এমন পাঁচজন নারীর সন্ধান পাওয়া গেছে।যাদের মধ্যে চারজনের সাথেই বিভতস সব সহিংসতা ঘটেছে এই নভেম্বর মাসেই, আর একজন; যিনি নিপীড়ত হয়ে আসতেছেন গত তিন বছর ধরে।পর্ব আকারে শুনবো সেসব ভুক্তভোগীদের সাথে ঘটে যাওয়া সেসব ঘটনার সম্পর্কে।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে গত ২৭ নভেম্বর সোমবার রাতে, শাহবাগ থেকে ফার্মগেটগামী একটি বাসে। ভুক্তোভোগী মাহিয়া তাবাসসুম বিডিমর্নিং কে তার সাথে ঘটে যাওয়া সহিংসতার কথা তুলে ধরেন। মাহিয়া বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী।

যখন একজন নারী ধর্ষণের শিকার হন, কিংবা অন্য কোনো সহিংসতার শিকার হন; অবশ্যই সেটা যদি বড় আকারের কোনো সহিংসতা হয়, কেবল সেই ক্ষেত্রেই আমরা সেটা বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম, বিশেষকরে এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দ্বারা জানতে পারি। তবে এর বাইরে যেসকল ঘটনা রোজ রাজধানীতে ঘটে যাচ্ছে সে সম্পর্কে আমরা তেমন অবগত নই। আমরা জানিনা কিভাবে কোন অবস্থায় একটি মেয়ে ধর্ষণ হতে হতে বেঁচে আসলো একটুর জন্য, কিভাবে একটি মেয়ে বছরের পর বছর ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে জীবন কাটাচ্ছে একজন নিপীড়কের কাছে বন্দি হয়ে। কিভাবে একটি মেয়ে গত রাতেই সামাজিক চক্ষুতে যেটাকে নারীর ইজ্জত বলা হয় সেই ‘ইজ্জত’ টুকু বাঁচিয়ে ঘরে পৌঁছেছেন। আমরা জানিনা সেসব, আমরা শুধু জানতে পারি তনুরা ধর্ষণ হয়েছে। সেই বিবেচনায় তুলে ধরবো পাঁচজন নারীর সাথে ঘটে যাওয়া এবং ঘটতে থাকা নৃশংসতার ঘটনাগুলো।

প্রথম ঘটনাটি  যদি ভিক্টিম মাহিয়ার মুখ থেকে শুনি তাহলে দাঁড়ায়, 'অনন্যা(ছদ্ম নাম) আপুকে শামসুন্নাহার হলের গেট পর্যন্ত পৌঁছায় দিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য হাঁটা ধরলাম। উদ্দেশ্য শাহবাগ থেকে বাসে করে ফার্মগেট যাবো, সেখান থেকে রিকশাই করে নাখালপাড়া মানে আমার বাসাই যাবো। যদি তখনকার পরিবেশটাকে বর্ণনা করতে চাই তাহলে বলবো রাত ১০ টা বাজতেই ঢাকা শহর ঘুমিয়ে যায় তা বোধহয় আমার এই প্রথম দেখা। টিএসসি ক্রস করে উদ্যানের অপোজিটে হাঁটতেসি। কোন কিছুর বিকার নেই। রাস্তার পাশে গোটা-কতক মানুষ তার উপর তারা গান-বাজনাই মেতে আছে। বিশ্বাস হবে কিনা জানিনা, রাস্তায় তার বাইরে কোনো মানুষ নেই, এমনকি ফুটপাতের দোকানগুলোও মালামাল গুটিয়ে নিচ্ছে। এই প্রথমবার একটু বেকায়দায় পড়ে বাসায় ফিরতে লেট হয়েছে আমার। হাটতে হাটতে শাহবাগ এসে তেমনভাবে বাসও চোখে পড়তেছেনা, কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ট্রাস্টের একটি বাসে উঠি। বাসে যাত্রী ছিলো হাতেগুনে ৫/৬ জন।সামনের দিকে উঠে বসি। এরইমধ্যে হাঁটতে হাঁটতে শাহবাগ চলে আসলাম। হাতে গোনা কিছু মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাস্তার পাশে বসা। রাত কেবল সাড়ে দশটার মত বাজে, অথচ ঢাকার রাস্তার এই চেহারা।

রাস্তা ফাঁকা। বাস মেট্রো রেলের গতিতে ছুটতেসে। হঠাৎ গায়ে গরম নিঃশ্বাসের টের পেয়ে ঘুরে তাকালাম। দেখি এক মধ্যবয়স্ক লোক, চোখ দুইটা কোটর থেকে বেরিয়ে আসবে এইরকম দৃষ্টি নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছে, আর এতো কাছে এসে বসেছে, না পারে আমার ভিতরে ঢুকে যায়। " এক্সকিউজ মি " বলে একটু সরে বসলাম।বাস বাংলা মোটর পার করে ফেলছে হেল্পার ভাড়া চাইতে আসতেসে না তখনো, বলে রাখা ভালো যে বাস বাংলা মোটর পর্যন্ত আসার আগেই একজন বাদে বাকিসব যাত্রীরা অলরেডি নেমে গেছেন। আমি টাকা হাতে নিয়ে হেল্পারকে ডাকতেসি, পাশে থাকা লোকটি বলে, " তোমার ভাড়া আমি দিয়ে দিসি, তুমি কি ফার্মগেট যাবা?"

ইতিমধ্যে আমার মধ্যে ভয় ঢুকে গেছে, পুরো বাসে আমি একটাই মাত্র মেয়ে, দ্বিতীয়ত লোকটির অস্বাভাবিক আচরণ, হেল্পারকে বলবো কিনা ভাবতে গিয়ে মাথায় এলো যদি হেল্পারও এই অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ঘটনার সাথে সম্পৃক্ত থেকে থাকে! তখন হয়তো আরো বিপদে পড়বো। লোকটির কথায় মাথা নেড়ে বললাম হে ফার্মগেটই। উনি ঘুরে আমার দিক হয়ে বসলো। মিনিট দুয়েক ধরে তাকিয়ে আছে, চোখে পলক ফেলতেসে না। সাথে সাথে শরীর ঘিনঘিন করে উঠলো।

আমি মুখ ঘুরিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফার্মগেট কখন পৌঁছাবো চিন্তা করতেসি। হুট করে উনি আমার বাম উরুর উপর হাত রেখে বলে, " তুমি কোথায় পড়াশুনা করো? " আমি উঠে দাঁড়াইতে নিলাম, টেনে ধরে বসায় দিলো। বললো, " ফার্মগেট কই যাইতেসো? তোমার বাসা? " তখনো হেল্পার অপলক তাকায় আছে বা বুঝতে পারতেছে, একসময় মনে হলো এরাও হয়তো জড়িত কিংবা আমার হয়ে বাসের ভাড়া দিলো আবার পাশে বসে রয়লো প্রথম থেকেই, তাতে হয়তো সে (হেল্পার) ভাবতেছে লোকটি আমার সাথের কেউ। তাই কিছু হয়তো বলতেছে না।

এরইমধ্যে বুঝে ফেলতে বাকি নাই যে ঘটনা ভালো না।চলন্ত বাস থেকে লাফ দিব টাইপ ভাব নিয়ে উঠে দরজায় এসে দাঁড়াইলাম, লোকটা এসে আমার সামনে দরজা ব্লক করে দাঁড়াইলো। আমি চিল্লানি দিতেই বাস থামলো (ভাগ্যিস!) আমি কারওয়ান বাজার নেমে পড়লাম। রীতিমতো দৌড়ে দৌড়ে হাঁটতেছি এই ভেবে যে লোকটি যেনো আমায় হারিয়ে ফেলে, খুঁজেনা পায়। রাস্তায় তেমন মানুষ নেই, ভয়ে কোনো গলিতেও ঢুকতে পারতেছিনা, মেইন রোড দিয়েই হেঁটে যাচ্ছি। হঠাৎ দেখি লোকটা আমার পাশেই হাঁটতেসে। বিকট আকারে হাসি দিয়ে বললো, " তোমাকে বাসায় দিয়ে আসি, চলো।" আমি কোনো কিছু বুঝে উঠতে না পেরেই বললাম, " চলেন " কারওয়ান বাজার থেকে ফার্মগেট অবধি দম না ফেলে হেঁটে আসলাম। ' লোকটি' তখনও পিছু ছাড়ে নাই। ওনাকে বললাম, " বাসা আরেকটু সামনে, হেঁটেই যাওয়া লাগবে "মেইনরোড ধরে হাঁটতে হাঁটতে ফার্মগেট থেকে বিজয় সরণীর দিয়ে তেজগাঁও থানার সামনে এসে বললাম, " এই যে আমার বাসা, বাবা রিটায়ার্ড করসে, তবে ওসি পরিচিত। আসেন, ভিতরে আসেন, চা খেয়ে যান " বলতেই লোকটি প্রথমে আমার দিকে এমনভাবে তাকালো যে এখনি আমাকে মারবে বা কিছু করবে, আমি তখন থানার ভেতর ঢুকে যাচ্ছিলাম তখন লোকটি উলটা ঘুরে ফার্মগেটের দিকে হাটা ধরলো।

তখনো মনে হলো, বিপদ থেকে উদ্ধার হয়নি, কোনোরকম আবার ভয় আর আতঙ্ক নিয়ে ফার্মগেট গেলাম। হঠাৎ দেখি লোকটা আশেপাশেই, তখন কেবল গলির মধ্যে, মাথায় কাজ করলো লোকটি আমার কোনো ক্ষতি করে দিবেই, দৌড় দিয়ে সামনে থেকে রিকশা নিলাম। নাখালপাড়া যেতে যে রাস্তা ব্যবহার করা হয় তাতে অনেকটুকু রাস্তায় আবার লাইটও নেই। কিভাবে বাসা পর্যন্ত এসেছি তা আমিই জানি, দম বন্ধ হয়ে আসার অবস্থা ছিলো। বাসায় ঢুকার পর কিছু আর ভাবার মতো অবস্থা ছিলো না।মনে হল এই সমাজ যেটাকে নারীর কলঙ্ক হিসেবে প্রচার করে একজন ভিক্টিমের পাশে না দাঁড়িয়ে একজন নিপীড়কের পাশে দাঁড়ায়, সে সমাজের কাছে হয়তো কলঙ্কীত হওয়া থেকে একটুর জন্য বেচে গেলাম'।

ঘটনা শুনতে শুনতে আরো দুজনের থেকেও ঠিক একিরকম অভিযোগ পাওয়া যায়।যে পাবলিক ট্রান্সপোর্টে তারা কতোটা অসহায় আর আতংকে থাকেন। নারীর উন্নয়নের একটা বড় অংশ 'শিক্ষিত নারী ও কর্মজীবী নারী'।তাদের কে দমিয়ে দেয়ার জন্যই সমাজ তার এই কুতসিত রুপ টা প্রকাশের মাধ্যমে বারবার একজন নারীকে সহিংসতার মুখোমুখী করেন।

ঘটে যাওয়া বীভৎস এই ঘটনা বলতে গিয়ে মাহিয়া আবারো বলেন, 'সেই বাসে উঠা থেকে বাসা পর্যন্ত আসা' এই সময়টুকুতে যা যা হলো তা খানিকটা বিপরীতে মোড় নিলে হয়তো আজ সকাল টা আমার কাছে স্বাভাবিক থাকতো না।হয়তো এই সমাজের আংগুলগুলোর চাপে আমি হারিয়ে যেতাম। এই ঘটনা থেকে সমাজে কোনো নারী আরো সচেতন হবেন নাকি থানা পর্যন্ত যাওয়ার মতো মানসিকতা তৈরি করবে তা জানিনা। তবে সবার জানা প্রয়োজন, অবগত হওয়া প্রয়োজন সমাজের এই রুপ সম্পর্কে'।

এরকম ঘটনার শিকার দ্বিতীয় তরুণী সাথে যোগ করেন যে,  ‘বাসটি চলাচলের রোড যদি অল্প পরিসরে না হতো মানে শাহবাগ থেকে ফার্মগেট গামী না হতো, অন্য কোনো দূর যাত্রার বাস হতো তাহলে মাহিয়ার ঘটনাটা তনুর মতো হতো না, বা হতে পারতোনা সে ব্যাপারে অনেক সন্দেহ আছে'।

উল্লিখিত এই তরুণীও একজন সহিংসতার শিকার হওয়া ভিক্টিম। তবে তার ঘটনাটি একটু আলাদা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলের শিকার হয়ে হত তিন বছর ধরে একজন নিপীড়কের কাছে ভুক্তভোগী।অনেকবার চেষ্টা করেও যে আইন পর্যন্তও যেতে পারেনি। গত তিন বছর ধরে মানসিক ভাবে তিনি জেল খাটতেছেন, বন্দী তিনি আরেকজনের কাছে।পরের পর্বে আমরা তার সাথে হয়ে যাওয়া এবং হতে থাকা সহিংসতার কথা জানাবো।

Bootstrap Image Preview