Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ শুক্রবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৫ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘ঘুম’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০১৭, ০৯:৫৪ PM আপডেট: ০৪ মে ২০১৭, ০৯:৫৪ PM

bdmorning Image Preview


সাইমুম সাদ-

ডাক্তার বলছিলো, মোটেই আর তিনমাস বাঁচবো! ডেডলাইন পেরিয়েছি গতকাল। ওভারটাইম চলছে। দুপুর থেকে গুগলে কিছু মোটিভেশনাল স্পিচ ঘাঁটাঘাটি করছি। খুঁজছি কিছু সিনেমা। শুনছি বেঁচে থাকার গান। মরার আগেই আমি মরতে চাইনি। মৃত্যুর এক সেকেন্ড আগ অবধি মনটা জেগে থাকুক। মনটাকে ব্যস্ত রাখতে চাই। একা থাকলেই ভীতিরা সব হুড়মুড় করে মাথার উপর ভেঙে পড়ছে।

বাইরে প্রচুর বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টির মধ্যে ভার্সিটির পাশের রহিম মামার টঙয়ে বসে এক কাপ খেতে পারলে ভালো লাগতো। খালি পায়েই ভর সন্ধ্যায় বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে পড়লাম। মা বললো, ‘ছাতাটা নিয়ে যা। গায়ে জ্বর আসবে।’ মাকে বললাম, ‘ক্যান্সারের রোগীকে তুমি জ্বরের ভয় দেখাও?’

ভিজে জবুথুবু হয়ে টঙের টুলে বসলাম। মামা চা দিলেন। খেতে খেতে ভাবলাম, টেনেটুনে পাশ মার্ক পেয়েও যদি স্বর্গে যাই, মামার চা’টা পছন্দের খাবারের লিস্টে রাখবো। আরও কি কী ভাবার আগেই মামার সরল প্রশ্ন, ‘মন খারাপ?’ আমি মুখ লুকাই, চেপে যাই। কাউকেই রোগটার কথা বলতে ইচ্ছা করে না। শুনলেই কেমন যেনো করুণার দৃষ্টিতে তাকায় মানুষগুলো। করুণায় বিদ্ধ জীবন মৃত্যুর চেয়েও কঠিন।

অর্ধেক চা খেতে শেষ করে ভাবছি, কে কে আমাকে মিস করবে?

রাফি দু’শো টাকা পাবে আমার কাছ থেকে। ওর মুখ খুব খারাপ। দশের সামনে গালি দেবে বাপের নাম তুলে। আজই বিকাশে টাকা পাঠিয়ে দেবো। ফারিয়া মিস করবে কিনা বুঝতে পারছি না। ইদানীং আবিরের সঙ্গে চুটিয়ে প্রেম করছে। মাস ছয়েক আগে হলে হয়তো ভাবতো। তবে সাদিয়া ম্যাম মিস করবে আমাকে। উনি স্বপ্ন দেখেছিলেন, আমি একজন বাঘা রিপোর্টার হবো। কি আর করা! সুন্দরবনের বাঘও ইদানিং কমে যাচ্ছে। আমার মতো দু’একটা রিপোর্টার না থাকলে খুব একটা ক্ষতি হবে না জাতির।

ছোটবোনের সঙ্গে লাস্ট তিনমাস কথা বলি না। ওর সঙ্গে খারাপ আচরণ করি। আমার উপর বিতৃষ্ণা জন্মাক। ওর কষ্ট কম হবে। ছোটভাই একটা মোবাইল চেয়েছিলো। নতুন করে আর কিনতে যাবো না। কেচিংটা চেঞ্জ করে আমারটায় দিয়ে যাবো। কেচিংয়ের মধ্যে যেন আমাকে খুঁজে না পায়। মাথা মুণ্ডানোর পর বাবা একটা ক্যাপ কিনে দিয়েছিলো। ওটাও ছোটভাইকে দিয়ে যাবো। ও নাকি বড় হয়ে মাশরাফি হবে। আর ব্যাংক অ্যাকাউন্টটার নমিনি করা আছে ছোটবোনের নামে। শ’ পাঁচেক টাকা আছে। ও কিছু ‍কিনতে পারবে। এটিএমের পাসওয়ার্ড ৮৭৩৫।

আমার কাছে এই মুহূর্তে শ’তিনেক টাকা আছে। রাফির দু’শো রেখে বাকিটা দিয়ে ক্লিন সেভ করবো। খোঁচা খোঁচা দাড়ি দেখে মানুষ ভাববে, আহারে, ছেলেটা মরার আগে খুব ডিপ্রেশড ছিলো। আমি সবসময়ই নির্ভার থাকতে চাই। চারপাশটাও নির্ভার রাখতে চাই।

বাসার নিচের গলিতে নামলাম। সেভ করতে গিয়ে ক্ষুরের কোণায় লেগে গালটা কেটে গেলো। আগে রক্ত দেখলে খুব ভয় পেতাম। ব্যথায় কুঁকিয়ে উঠতাম। কাকতালীয়ভাবে আমার গালে ব্যথা করছে না আজ! হয়তো মনটা বলছে, বোকাছেলে সামান্য ক্ষুরের আঘাত সহ্য করতে না পারলে মরবি কোন সাহসে? দাঁত কটমট করে চেপে সেভটা শেষ করলাম।

সাড়ে এগারোটায় বাসায় ফিরলাম। কাউকে না বলে রুমের দরোজা বন্ধ করে দিলাম। অঝোরে কাঁদলাম। এক বছরে চোখে জমিয়ে রাখা সব জলে স্রোত বইয়ে গেলো বালিশে। ২৪ বছরের একটা ছেলে মৃত্যুযন্ত্রণা নিয়ে আর কতোদিন যুদ্ধ করবে? একলা লাগছিলো খুব। আর পারছি না অভিনয় করতে, বুকে কষ্টের পাথর জমিয়ে মানুষের সঙ্গে হাসিমুখে আড্ডা দিতে। পারছি না আর।

এবার ঘুমাতে চাই। মনটা শক্ত করে ঝটপট গোটা বিশেক ঘুমের ট্যাবলটে খেয়ে নিলাম। মাথাটা ‍ঘুরছে। ভয়ংকর ঘুম অক্টোপাশের মতো আঁকড়ে ধরছে আমাকে...

Bootstrap Image Preview