Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৫ সোমবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ফ্রিডরিখ হোল্ড্যার্লিন ও তাঁর একটি কবিতা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ মার্চ ২০১৮, ০৮:৫৫ PM
আপডেট: ২৩ মার্চ ২০১৮, ০৯:১০ PM

bdmorning Image Preview


সোহানুজ্জামান।।

জন ক্রিস্টোফার ফ্রিডরিখ হোল্ড্যার্লিনের জন্ম দক্ষিণ জার্মানীর সোবিয়ার লফেন এম নেকারে, ১৭৭০ সালের ২০ মার্চ। জার্মানিতে তিনি মূলত গীতিকবি হিসেবে সুপরিচিত। তবে তাঁর আরো একটি পরিচিতি আছে। জার্মানিতে ১৮ শতকে যে রোমান্টিক আন্দোলন হয়েছিল তিনি ছিলেন তার অগ্রপথিক।

শুধু সাহিত্য রচনার মধ্যেই যে তিনি সীমাবদ্ধ ছিলেন তা নয়, জার্মানির চিরায়ত দর্শনের উন্নতিতেও তাঁর বিশেষ অবদান ছিল। বিশেষ করে জার্মান আইডিয়ালিজমের উন্নতিতে তাঁর অবদান স্মরণীয়। একথা বিখ্যাত দার্শনিক জর্জ উইলহেম ফ্রিডরিখ হেগেলও স্বীকার করেছেন।

মাত্র দু’বছর বয়সে তিনি তাঁর পিতাকে হারান। মাতা দ্বিতীয় বিবাহ করেন। হোল্ড্যার্লিনের বয়স যখন মাত্র নয় বছর সেসময় তিনি তাঁর বিপিতাকেও হারান। ফলে তাঁর শৈশব কাটে মাতৃতন্ত্রে। গোঁড়া প্রোটেস্টান্ট মা তাঁকে ধর্মযাজক বানাতে চেয়েছিলেন। তাই মা তাঁকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিলেন স্থানীয় ধর্মীয় বিদ্যালয়ে। তবে ধর্মীয় বিদ্যালয়ে শিক্ষার পূর্বে তিনি নুরটিনিগেনের একটি গ্রামার স্কুলে কিছুদিন পড়ালেখা করেন।

১৭ বছর বয়সে বাগদত্তা হয়েছিলেন এক কিশোরীর সাথে। কিন্তু, এক বছরের মাথায় নিজেই সে সম্পর্ক ভেঙে দেন। এরপর ভর্তি হন জার্মানির টুবিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ে। অধ্যয়নের বিষয় ছিল ধর্মতত্ত্ব। বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি পরিচিত হন জর্জ উইলহেম ফ্রিডরিখ হেগেল (১৭৭০-১৮৩১) ও উইলিয়াম ভন শিলিং (১৭৭৫-১৮৫৪) এর সাথে। পরে তাঁরা তাঁর খুবই ভালো বন্ধু হয়ে ওঠেন। হোল্ড্যার্লিনের সাহিত্যিক জীবনে এঁদের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।

সহিত শব্দ থেকে সাহিত্য শব্দের উৎপত্তি। সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, রাজনীতি সহ নানা বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত সাহিত্য। যে সময় হোল্ড্যার্লিন কবিতা রচনা করেছেন সে সময় জার্মানিতে আলোকপ্রাপ্তির  যুগ চলছে। এই সময়েই জার্মানিতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, দর্শন, ইতিহাস, সঙ্গীত সহ নানা বিষয়ের সর্বোচ্চ উৎকর্ষ সাধিত হয়েছিল।

আর এ যুগেই আবির্ভাব হয়েছিলো হোল্ড্যার্লিনের। ফলে তাঁর সাহিত্য যুগের এ নানা আলোড়ন, নানা অভিজ্ঞতাকে ধারণ করেছিল। হোল্ড্যার্লিনের লেখকসত্তার বিকাশে যিনি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছেন তিনি হলেন ফ্রিডরিখ শিলার (১৭৫৯-১৮০৫)। শিলারের সাথে সাক্ষাৎ তাঁর জীবনের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। ১৭৯৪ সালে তিনি জেনা বিশ্ববিদ্যালযে ভর্তি হন। পাঠ্য বিষয় হিসেবে বেছে নেন পূর্বের বিষয় ধর্মতত্ত্ব। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এসে তিনি পরিচিত হন জন উলফগং ভন গ্যাটের (১৭৫৯-১৮৩২) সাথে। তাঁর সাহিত্যিক জীবনে গ্যাটের ভূমিকাও কম নয়।

দু-দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব নিয়ে পড়ার পর তিনি যাজকবৃত্তি করে ভালোভাবে জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি নিঃসন্দেহ ঈশ্বরভক্ত ছিলেন। কিন্তু চার্চ বা ধর্মযাজকবৃত্তিকে তিনি কোনদিনই সমর্থন করেননি। তিনি কোনদিন যাজকবৃত্তি করবেন না সে কথা বহুবার নিজ মুখে অনেকের কাছেই বলেছেন। পেশা হিসেবে তিনি যে কাজ বেশ কিছুদিন করেছিলেন তা হল টিউশনি। সেসময় জার্মানির বহু অভিজাত পরিবারে তিনি টিউশনি করেছেন। তবে টিউশনিতেও তিনি ঠিকমতো মনস্থির করতে পারেননি। ফলে দায়িত্বমাফিক টিউশনি না করার কারণে তিনি একটি পরিবারে বেশিদিন টিউশনি করাতে পারেননি। কিছুদিন টিউশনি করার পর তাঁর দায়িত্বশীলতার অভাবে তাঁকে সকলে বিদায় করে দিত। এমনকি একসময় অর্থকষ্টে ভুগে তিনি টিউশনি করার জন্য সুইজারল্যান্ডের হপ্টাইলে গমন করেছিলেন।

তিনি অধিকাংশ সময়েই আর্থিক দীনতায় ভুগতেন। যার পেশা নেই সে তো আর্থিক কষ্টে ভুগবে, এটাই স্বাভাবিক। চরম আর্থিক দীনতায় ভোগার সময় তাঁর মা তাঁকে সাহায্য করেছিলেন। আর যিনি তাঁকে সবসময় সাহায্য করেছিলেন তিনি তাঁর অগ্রজ কবি শিলার। শিলার সবসময় তাঁর অভিভাবকের মতো তাঁকে সাহায্য করেছেন, নানা দিকনির্দেশনা দিয়েছেন, যেটুকু পেরেছেন সেটুকু সাহায্য করেছেন।

এই আর্থিক দীনতা তিনি কাটাতে পারবেন না এ ব্যাপারে তিনি যেন নিশ্চিত ছিলেন। নিজের অবস্থা নিজে পরিবর্তন না করে আর্থিক দীনতায় ভুগবেন, এ যেন ছিল তাঁর এক বিশেষ স্বিদ্ধান্ত! জীবনের শেষ পর্যন্ত তিনি এই আর্থিক দীনতা কাটিয়ে উঠতে পারেননি। টিউশনি করাতে গিয়ে ব্যাংকার জোসেফ গনটাডের্র স্ত্রী সুসিতি গনটার্ডের প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়ে পড়েছিলেন।

 তবে তাঁর কাছে তেমন কোনো অর্থ-কড়ি ছিল না যা দিয়ে তিনি ঐ মহিলাকে নিজের করে রাখবেন। তিনি নিজেই বলেছেন আমার তেমন কোনো অবস্থা নেই যা দিয়ে আমি কোনো স্ত্রীকে ঘরে রাখতে পারবো। সুসিতি গনটার্ডই পরে তাঁর দিয়োতিমা  কবিতার দিয়োতিমা হিসেবে এসেছে।

১৮০২ সালে হোল্ড্যার্লিন ফ্রান্সের বোর্ডাতে অবস্থান করেছিলেন। সেখানে তিনি হ্যামবার্গের কনসাল ও মেয়ার নামের একজন মদ ব্যবসায়ীর বাচ্চাদের পড়াতেন। মাত্র কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি তাঁর পিতৃভূমিতে ফিরে আসেন। এর মাঝে তাঁর স্বাস্থ্যের অবনতি হয়, এবং সুসিতি গনটার্ড মৃত্যুবরণ করেন। এ সময় তিনি বেশ ভেঙে পড়েছিলেন। ফলে তিনি তাঁর মায়ের কাছে নুরেনটেনে চলে আসেন এবং পিন্ডার ও সফোক্লিসের সাহিত্য অনুবাদ শুরু করেন।

হেসে-হ্যামবার্গের প্রধান, তাঁর বন্ধু সিনক্লেয়ার ১৮০৪ সালে তাঁকে সেখানকার কোর্ট লাইব্রেরিয়ান হিসেবে নিয়োগ দেন। এসময় প্রকাশিত হয় তাঁর বিখ্যাত কবিতা হাফ অফ লাইফ ঐধষাবং ড়ভ খরভব বা ঐধষভব ফধং খবনবহং. সামান্য কিছুদিন তিনি আর্থিক কষ্ট হতে মুক্ত থাকলেও শেষমেশ এই চাকরিই তাঁর জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।

চাকরির কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বন্ধু সিনক্লেয়ারকে দেশদ্রোহী হিসেবে আটক করা হয়। এর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগে একই সাথে হোল্ড্যার্লিনকেও আটক করা হয়। স্বাস্থ্য পরীক্ষার পর তাঁকে উন্মাদ হিসেবে মুক্তি দেওয়া হয়। তাঁকে টুবিনগানের অথেনরিথ ক্লিনিকে ভর্তি করানো হয়।

এ ক্লিনিক টুবিঙ্গেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথেই সংযুক্ত ছিলো। হাসপাতাল থেকে ১৮০৭ সালে তাঁকে আর্নেস্ট জিমার নামক এক ছুতোর মিস্ত্রির বাড়ীতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই তিনি আমৃত্যু বসবাস করেছিলেন। তিনি ছোট একটি ঘরে থাকতেন যা পরে হোল্ড্যার্লিন টাওয়ার ইন জিমার’স হাউস  নামে পরিচিতি পায়। এইখানেই ১৮৪৩ সালের ৭ জুন ফ্রিডরিখ হোল্ড্যার্লিন মৃত্যুবরণ করেন

হোল্ড্যার্লিনের সবচেয়ে বিখ্যাত সাহিত্যকর্ম তাঁর উপন্যাস হাইপেরিয়ন (ঐুঢ়বৎরড়হ, ১৭৯৭-১৭৯৯). গ্রীক মিথলজি অবলম্বনে তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর এই বিখ্যাত উপন্যাস। এই উপন্যাস ভাষা, কাহিনি, কাঠামো তিন দিক থেকেই ছিল শিল্পসফল। তাঁর এই উপন্যাসের পূর্বে ও পরে তিনি অনেক কবিতা রচনা করেছেন।

তাঁর বিখ্যাত কিছু কবিতা ইস্তার, মানুষ, প্রভাত, শীত , যৌবন, হাইপেরিয়ন-এর অদৃষ্টের গান, দিওতিমা, মধ্যজীবন ইত্যাদি। তিনি অনুবাদক হিসেবেও সফল ছিলেন। ১৮০৪ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর অনূদিত সফোক্লিসের নাটক।

ভাষার ব্যাপারে তিনি সবসময় অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। নিজ জীবনের অভিজ্ঞতা ও চারপাশের মানুষের নানা অভিজ্ঞতা তিনি তাঁর সাহিত্যে নিয়ে এসেছেন, ভাষার ব্যাপারেও ছিলেন একই রকম। স্যোসুর বা প্লেটো লিখিত ও মৌখিক ভাষার যে প্রভেদ দেখিয়েছেন তা তিনি ভেঙে দিয়েছিলেন। ফলে বিপক্ষ শিবির তাঁর বিরুদ্ধে নানা মন্তব্য করেছে। তবে তা তাঁর বিরুদ্ধে এক ধরনের ভীরু মন্তব্য ছাড়া আর কিছইু নয়। ভীরুরাইতো অযথা ভীরু মন্তব্য করে নিজেদের অদক্ষতা ঢাকতে ওস্তাদ!

তাঁর সাহিত্যে বিষয় হিসেবে এসেছে সম্মান, উদ্দেশ্য, গৌরবমুকুট, সাহসিক পথ ইত্যাদি। তবে এ সমস্ত বিষয় তো তাঁর নিজেরই বিপরীত! তাহলে কেমন করে তাঁর সাহিত্য তাঁর বাস্তব জীবনাশ্রয়ী? এ প্রশ্নের উত্তর দেওয়া কঠিন হলেও সহজ এই কারণে যে কবিদের বাস্তবতা তো তাঁদের ভেতরের বাস্তবতা। অর্থাৎ, যে সমস্ত বিষয় হোল্ড্যার্লিনের সাহিত্যের উপজীব্য বিষয় তার সবই ছিল তাঁর নিজের অধরা ।

আর এই অধরা বিষয়ই বাস্তব হয়ে, তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার ফুলঝুরি হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর কবিতায়। অনেকে এই বিষয়টিকে তাঁর নিজস্ব আকাক্সক্ষার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেছেন। নিজ প্রিয়ার কাছে এবং বন্ধুদের কাছে তিনি যে চিঠি চালাচালি করেছেন সেগুলোতে এই বিষয়গুলো উঠে এসেছে। কিন্তু অবস্থার বিবেচনায় তাঁর বাস্তবসম্মত কল্পনাগুলো আর বাস্তবের খোঁজ পায়নি, তাঁর মতো মানুষের পক্ষে তা সম্ভব ছিলো না। যে কিনা ছিলেন নিজের ও নিজের পেশার ব্যাপারে অতি মাত্রায় উদাসীন, তাঁর জন্য তো সম্ভবই নয়।

আইডেন্টিটি বা স্বরূপের স্বন্ধান তাঁর সাহিত্যের অন্যতম বিষয়। তিনি নিজেও নিজ আইডেন্টিটির ব্যাপারে বেশ সচেতন ছিলেন। কোনো এক সেমিনারে তাঁকে এক ব্যক্তি অভিবাদন না জানানোয় তিনি তার মাথার টুপি খুলে ফেলে দেন। এর মাধ্যমেই তাঁর ভেতরের আউডেন্টিটির অহমিকাবোধের বিষয়টি সুস্পষ্ট হয়ে ওঠে। একটি অদৃশ্য অহমিকাবোধ, বলা যায় তা তো তাঁর নিজের অতৃপ্ত আকাক্সক্ষারই একটি বিষয়, তাঁর ভেতরে ছিল। এ বিষয়টিকে যদি বলা হয় এটা ছিল হোল্ড্যার্লিনেরই একটি বিপ্লবী মনোভাব, তাহলে তা তো কোনোভাবেই তাঁর মানসের বাইরে যায়না, তা তো তাঁর মানসের সাথেই মিলে যায়। এর মাধ্যমে মূলত হোল্ড্যার্লিনের আমিত্বের বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে

অতিশয় ধ্বংসশীলতা তাঁর সাহিত্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য। অর্থাৎ, তুরীয়বাদী সাহিত্যের বৈশিষ্ট্য তাঁর সাহিত্যে এসেছে। ধ্বংস ও ধ্বংসের মধ্যেই যোগাযোগ ঘটানো এবং তা হতে পরিত্রাণের বিষয়ও তিনি তাঁর সাহিত্যে এনেছেন। হেগেল কথা বলেছেন শুধু আদর্শবাদিতার বিষয়ে। কিন্তু হোল্ড্যার্লিন শুধু আদর্শবাদিতা নয়, আদর্শের সাথে আদর্শহীনতা এবং এ দুইয়ের সংযাগ ঘটিয়ে আদর্শের দিককে বড় করাই ছিল তাঁর মূল লক্ষ্য। তিনি আস্তিক্যবাদী সাহিত্যেরই সাধনা করেছেন। হেগেলের দর্শন থেকে হোল্ড্যার্লিনের দর্শনের মৌলিক পার্থক্য রয়েছে।

নস্টালজিক হয়ে স্মৃতিতে বিচরণ করা তাঁর সাহিত্যের আর একটি বৈশিষ্ট্য। নস্টালজিক হতে গিয়ে তিনি কোনো সময় আবেগের বর্শবর্তী হয়ে যাননি। বরং নিজের ভেতরের যে আইডেন্টিটির অহমিকাবোধ তা এক সাথে যুক্ত হয়েছে তাঁর সাহিত্যে। ফলে নস্টালজিয়া উৎরে গেছে আবেগ থেকে।

নস্টালজিায়ার মাঝে কবি খুঁজে পেয়েছেন তাঁর কাক্সিক্ষত বিষয়, যদিও তাঁর নস্টালজিয়া শুধুমাত্র অতীতের মধ্যে সীমাদ্ধ নয়, তা বিচরণ করেছে অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতে। হোল্ড্যার্লিনের নস্টালজিয়া অন্যদের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন। হোল্ড্যার্লিনের নস্টালজিয়া তাঁর মগ্নচৈতন্যের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত। তিনি প্রথাগত নস্টালজিয়ার ধারণাই ভেঙে দিয়েছিলেন।

হোল্ড্যার্লিনের সাহিত্যের একটি অন্যতম বিষয় অসুস্থতাবোধ, তিমিরাচ্ছন্নতা ও কুলষিত ভাব। নিজের জীবনের যে বাস্তব অভিজ্ঞতা আছে তা তো সাহিত্যে আসবে, এই রীতিতে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন, সেই বিশ্বাসের প্রতিফলন তিনি তাঁর সাহিত্যে ঘটিয়েছেন। যদিও তিনি রোমান্টিক কবি ছিলেন, তবু বাস্তবিক নানা বিষয় তাঁর সাহিত্যে এসেছে যেমনটা দেখা যায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সাহিত্যে।

রোমান্টিক কবি হলেও সমাজের সাথে রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যের গূঢ় সম্পর্ক বিদ্যমান। রবীন্দ্রনাথ সমাজকে বাদ দিয়ে সাহিত্য রচনা করেননি। কারণ সাহিত্য তো পরিপ্রেক্ষিত উৎরে যেতে পারে না, যাওয়া সম্ভবও নয়। শিলারকে লেখা চিঠিতে তিনি নানা হতাশাবাদী ও সংশয়বাদী কথা তুলে ধরেছেন।

 তিনি বলেছেন শীতে জমে যাচ্ছেন এবং আকাশ নোংরায় গড়া। এ সমস্ত বিষয় হতে তাঁর ভেতরে জমে থাকা সংশয় ও হতাশার নানা চিত্র ফুটে উঠেছে। আর এ সব বিষয়কেই তিনি তাঁর সাহিত্যে রূপদান করেছেন। আর এ সমস্ত বিষয় সমাজ ও দেশের সাথে সম্পর্কিত।

ধর্মতত্ত্ব নিয়ে নিজে পড়ালেখা করেছেন। ধর্মের প্রতি তাঁর ছিল বিশ্বাস। নিজেই নিজেকে আস্তিক হিসেবে ঘোষণা দিয়েছেন। তবে কোনো আধ্যাতিকতাই তাঁর বিশ্বাস ছিল না, কিন্তু, বিশ্বাস ছিল আস্তিক্যবাদীতায়। নিজেতো চার্চ বা ধর্মযাজকতার তীব্র বিরোধিতা ও নিন্দা করেছেন। তিনি তাঁর প্রায় প্রত্যেক কবিতায় বার বার ধর্ম, ঈশ্বর, স্বর্গ, এসো, যাও প্রভৃতি শব্দ ব্যবহার করেছেন। এ সকল শব্দের মাধ্যমে আস্তিক্যবাদী চিন্তারই প্রকাশ পেয়েছে। প্রকাশ পেয়েছে ধর্ম বিষয়ে তাঁর সুস্পষ্ট অবস্থানের।

হোল্ড্যার্লিন ছিলেন সিজফ্রেনিয়ার রোগী। ফ্রয়েডের ভাষায় বলা যেতে পারে সাইকোসিস . পরিবেশ থেকে সংযোগ বিচ্ছিন্নতা ও ব্যক্তিত্বের বিচ্ছিন্নতা নামক মানসিক ব্যাধিকেই শাস্ত্রে বলা হয় সিজফ্রেনিয়া। হোল্ড্যর্লিন এ ব্যাধিতেই ভুগেছিলেন আমৃত্যু। অনেক তাত্ত্বিকই একে ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা করেছেন। ফ্রয়েড কিন্তু এ ব্যাধিকে ঠিক ব্যাধি হিসেবে বিবেচনা না করে এর সুদিকগুলো তুলে ধরেছেন। অস্তিত্ববান মানুষ হয়ে ওঠার জন্য ফ্রয়েড সাইকোসিসের উপর বেশ জোর দিয়েছেন। স্বর্গ, মেঘ, জ্যোতি, আঘাত, প্রজ্বলন, তন্দ্রার যে বিষয় তিনি তাঁর কবিতায় বার বার নিয়ে এসেছেন তা তো তাঁর সাইকোসিসেরই ফল এ বিষয় উৎরে যাওয়ার কোনো উপায় নেই। সাইকোসিস বা সিজফ্রেনিয়া, যাই বলা হোক না কেন তা যে হোল্ড্যার্লিনের কবি-মানসের উপর বিশেষ প্রভাব ফেলেছে তা সকলে স্বীকার করতে বাধ্য।

ইস্তার

এখন সময় প্রজ্বলনের

ব্যগ্রতা আনন্দের জন্য,

আমরা প্রার্থনার জন্য নতজানু

নিঃশেষিত অপেক্ষায়।

ঠিক তখন, নীরবে

আমরা শুনি বনভূমির অশ্রুতপূর্ব ডাক

মধ্যকালে, আমরা ইন্দুস থেকে গাই

যা দূর থেকে আসে, এবং

আলফিউসের থেকে, যেহেতু আমরা

ভব্যতার জন্য অভিকাক্সক্ষী

এটা স্বাপ্নিক ঝঙ্কার ছাড়া কিছু নয়

যা উপলব্ধি করে

সোজা এগিয়ে,

অন্য পার্শ্বে পৌঁছনোর।

কিন্তু, এখানে আমরা গড়ে তুলতে চাই।

নদী মাটিকে উর্বর করে

এবং পত্রালিকে জন্মাতে দেয়

এবং গ্রীষ্মে জলাভূমিতে

প্রাণীকুল জমায়েত হয়,

মানুষও সেখানে যায়, সাথে।

এই নদীর নাম ইস্তার।

যার বসবাস সৌন্দর্যে।

পর্ণ সরিতের স্তম্ভে সক্রিয়।

তারা বনভূমিতে দন্ডায়মান

একে অপরকে সহযোগিতায়; উপরে।

দ্বিতীয় মাত্রায় বেরিয়ে গেল

একটি পাথুরে গম্বুজ থেকে। ফলে আমি

বিস্মিত নয় ক্ষীণ দীপ্তির দূরবর্তী নদীতে

হারকিউলিস যাকে অতিথি করেছিল,

যখন ছায়ার সন্ধানে

সে নেমে এসেছিল অলিম্পাস থেকে

এবং ইসমাসের উত্তাপের উপর থেকে।

তারা সেখানে ছিল পরিপূর্ণ নির্ভয়ে,

যা সবসময় কুশলী, ঠিক ঠাণ্ডা পানির মতো

এবং অনুসরণীয় নৈতিক পথের জন্য

তার জন্য এই বীর অগ্রাধিকার পাই

এই জলের উৎসে, সুগন্ধির উৎস হলুদ তট

দেবদারুর আলোহীনতা, গভীরতায়

শিকারী ঘুরতে ভালোবাসে

দুপুরে এবং আঠালো গাছ

কাঁদে যেহেতু তারা মবর্ধমান।

এখনো নদীটিকে মনে হয়

পেছনে প্রবহমান,

এটা নিশ্চয় আসে

পূর্ব থেকে।

আরো হতে পারত,

আবারো বলা হল। কিন্তু কেন

তা পাহাড় থেকে সোজা ঝুলে থাকে?

অন্য নদী, রাইন,

কাত হয়ে চলে গেছে। মিছে শুষ্কতায়

কেন নদী প্রবহমান? কিন্তু কিভাবে?

আমাদের নিদর্শন দরকার,

এছাড়া কিছু নয়, যা সমতল ও সাধারণ,

চাঁদ সূর্যকে স্মরণ করে, খুবই অনুস্যূত,

যা চলে যায়- দিনে ও রাতে-

এবং উভয়ে উষ্ণ হয় স্বর্গে।

তারা হ্লোদ পৌঁছে দেয় মহত্তম ঈশ্বরকে। কেন

অবরোহণ করে তাদের মাঝে?

এবং পৃথিবীর আদি অপক্কতার

মতো তারা স্বর্গের শিশু। কিন্তু সে

আমার কাছে ইচ্ছাপূরক, স্বাধীনতর নয়,

এবং প্রায় ঘৃণিত, সেই সময়ের জন্য

তেজোদীপ্ততায় দিনের শুরু,

যেখানে এর বৃদ্ধির সূত্রপাত

দোসরার অবস্থানও সেখানে

আরো সৌন্দর্য বর্ধনে, ক্ষয়িতে

অশ্বশাবক প্রসবের মতো স্তোক।

এবং সে যদি খুশি হয়

দূরবর্তী মলয়ানীল শোনে আলোড়ন;

কিন্তু পাষাণটির চাহিদা ক্ষোদনের

এবং মৃত্তিকার চাহিদা কর্ষণের

যদি না থাকে একটি সীমাহীন ঊষরতা

একটি নদী কি করবে,

কেউ জানে না।

Bootstrap Image Preview