Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ১ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ঘুরে এলাম গোলাপ গ্রাম

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১১:৪৬ AM
আপডেট: ২১ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১১:৪৬ AM

bdmorning Image Preview


আল আমীনঃ

মনটা যেন আজ পাখির ডানা হারিয়ে যেতে তাই নেইতো মানা চুপি, চুপি স্বপ্ন ডাকে হাত বাড়িয়ে মন চায়, মন চায় যেখানে চোখ যায় সেখানে যাব হারিয়ে।

মনের ডানায় ভর করে আমরাও হারাতে চলেছি। তবে উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যে নয়। আবার আমাদের এ দুর্নিবার ছুটে চলা অজানা কোন স্বপ্নের ডাকেও নয়। আমরা চলেছি গোলাপের টানে। প্রকৃতির অপরূপ এক অনুসঙ্গ গোলাপের মোহনীয় সৌন্দর্য্য উপভোগের উদ্দেশ্যে গোলাপের রাজ্যে আমাদের এ আনন্দযাত্রা। শত ব্যস্ততাকে ক্ষণিকের জন্য ছুটিতে পাঠিয়ে, হাজারো পিছুটানকে পেছনে ফেলে আমরা ক’জন চলেছি গোলাপ গ্রামে!

কোন রকম পূর্ব পরিকল্পনা ছাড়াই ৬ বন্ধু (আল আমীন, আরিফ, মল্লিক, হেনা, রাসেল ও শাহীন) মিলে হুট করেই এ সিদ্ধান্তটি নেয়া। যেই ভাবা সেই কাজ! দ্বিতীয়বার ভাবার সময় না নিয়েই হল থেকে বেরিয়ে পড়লাম সবাই। না, আজ আর কোন পিছুটান রাখা যাবে না। টানা ক্লাস পরীক্ষায় বিপর্যস্ত জীবনে একটুখানি প্রশান্তির দেখা পেতে কারো যেন বিন্দুমাত্র আপত্তি নেই। দল বেঁধে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন সিএন্ডবি এলাকায় চলে গেলাম। সেখান থেকে অটোরিক্সা ভাড়া করে দিলাম ছুট। দ্রুত চল, পালাতে হবে এই জঞ্জাল থেকে।

দারুচিনি দ্বীপ সিনেমার সেই গানটি গুনগুন করছিলাম। আরিফ আর শাহিনের অম্ল-মধুর খুনসুটিতে মনবাবা জিতড়িৎ গতিতে মনোযোগের দিক পরিবর্তন করে বসল। আজকের এ ভ্রমণ যাত্রার উদ্যোক্তা কে এ নিয়ে দুজনের মধ্যে চলছে তুমূল বাকযুদ্ধ। কারো অবদান যেন কারো চেয়ে কোন অংশে কম নয়! খুনসুটি-আড্ডা-গল্প বেশ জমে উঠেছে ততোক্ষণে। রাসেল তার শৈশব স্মৃতিভান্ডার নিয়ে বসেছে।তার হাবি-জাবি কথার গতিরসাথে আমাদের বহনকারী যানের গতির সাথে তাল মিলিয়ে চলতে থাকলো।

অন্যদিকে আরিফকে তার স্বদেশি অটোরিক্সা ড্রাইভারের সাথে ভাব জমাতে ব্যস্ত দেখে মল্লিক খেকিয়ে উঠলো, এখানেও জেলা কোরাম শুরু করলি, আরিফ!!

শাহিন এবার প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে সকলের উদ্দেশ্যে একটি প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল, আমরা সম্ভবত এইবারই প্রথম অটোরিক্সা করে একসাথে কোথাও ঘুরতে যাচ্ছি, তাই না? কিন্তু কারো কাছ থেকেই উত্তর এলো না। এমনকি এতোক্ষণ ধরে নিশ্চুপ বসে থাকা মল্লিক কিংবা দলের একমাত্র নারী সদস্য হেনাও প্রশ্নটিকে এড়িয়ে গেল। সবার মন তখন চোখের গতিতে তাল মিলিয়ে আশে-পাশের আবহে আবদ্ধ।

সুযোগটি লুফে নিল রাসেল। জানালো একমাত্র উড়োজাহাজ ছাড়া প্রায় সকল ধরণের যানেই তার ভ্রমণ করবার অভিজ্ঞতা আছে। প্রশ্ন করলাম, স্পিডবোটে? উত্তর এলো, না, তবে...। আরো কিছু বলতে যাচ্ছিল রাসেল। ততোক্ষণে সমস্ত অটোরিক্সা জুড়ে হাসির সুতীব্র রোল পরে গেছে। যা কিনা মল্লিক আর হেনাকেও ছুঁয়ে গেল শেষ পর্যন্ত।

মূল সড়কের যানজট এড়াতে আমরা বিকল্প রাস্তা ধরে চলছি। রাস্তার অবস্থা ভয়াবহ রকম বাজে। একবার উপরে তো অন্যবার ধপাস করে নিচে নামছে পুরো অটোরিক্সাটি। রাস্তার দু’ধারে গ্রামীণ আবহ দেখতে দেখতে যাচ্ছিলাম। চোখের অবিরাম প্রশান্তিতে রাস্তার দুর্ভোগটুকু খুব বেশি একটা ভোগাতে পারেনি। শহরের ধূলা-দূষণমুক্ত একেবারে ঝকঝকে-তকতকে গ্রাম। চারিদিকে লক্ষ্যনীয় মাত্রায় সবুজের উপস্থিতি আমাদেরকে ভাবতে বাধ্য করেছে, সত্যিই কি আমরা ঢাকার ভেতরকার কোন জায়গায় আছি? কিন্তু আমাদের এ ভ্রম বেশিক্ষণ স্থায়ী হলো না। খানিকক্ষণ পরেই দেখলাম কিভাবে বাঁশ ঝাড় উঠিয়ে সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে কংক্রিটের মজবুত ভিত্তি।

কুম-কুমারী বাজার পেরিয়ে মাঝে আক্রান, সেটিও ছাড়িয়ে বউবাজার প্রবেশ করলো আমাদের বহনকারী যান। বাজার পেরোতেই আবারো খাঁটি বাংলার গ্রামীণ আবহ নজরে এলো। সহসাই কোন এক বাড়ির উঠোনের কোণে বিশাল আকারের একটি মোরগ দেখতে পেলাম। সবাইকে মোরগটিকে দেখিয়ে বললাম, দেখেছিস গ্রাম বলেই কেমন তর-তাজা আর হৃষ্ট-পুষ্ট আকার হয়েছে মোরগটি!

এই দুপুর রোদে গায়ে খানিকটা শীতল বাতাসের ঝটকা এসে লাগলো সহসাই। মৃদু সুগন্ধ বয়ে নিয়ে চলা বাতাস আমাদের শুধু দোলাই দিয়ে গেল না হৃদয়কে ভরিয়ে তুললো অপার প্রশান্তিতে। বুঝতে আর বাকি রইলো না, সামনেই কোথাও রয়েছে কোন গোলাপ বাগান। বাগানটিকে দেখে বেশ অবাকই হলাম বটে। বাগান বললে ভুল হবে। বাড়ির পেছনের অতিরিক্ত জমিতে গোলাপের চারা লাগানো হয়েছে অনেকখানি জায়গা জুড়ে। বাগানে ফুলের পরিমাণ গাছের তুলনায় কম হলেও যা আছে তা নেহাৎ মন্দ নয়।

গ্রামের বুক চিঁড়ে বয়ে গেছে সংকীর্ণ একটি অর্ধপাকা রাস্তা। তার দু’পাশে মানুষের আবাসস্থল। এখানে পতিত জমি বলে যেন কিছুই নেই। আছে শুধু বিস্তীর্ণ গোলাপ বাগান। গ্রামটির ধরে যতো সামনে এগুচ্ছি, ততোই মুগ্ধতা বাড়ছে। হেনা তো বলেই ফেলল, আসলেই গ্রামটির নামকরনের যথার্থতা আছে।

সামনে বেশ বড় একটা বাগান দেখে আমরা অটোরিক্সা থেকে নেমে পড়ার সিদ্ধান্ত নিলাম। বাগানে প্রবেশমুখে একটি সাইনবোর্ডের দিকে চোখ আটকে গেল। সেখানে বলা হয়েছে ফুল কেনার উদ্দেশ্য ব্যতিত বাগানে প্রবেশের ক্ষেত্রে প্রতি জনে ১০ টাকা হারে দিতে হবে। রাসেলের সুপরামর্শে আমরা সবাই মিলে ফুল কেনার সিদ্ধান্ত নিলাম। প্রতিটি ফুল ১০ টাকা দরে কেনার শর্তে বাগানে প্রবেশ করার অনুমতি দিলেন বাগানটির স্বত্ত্বাধিকারী।

বাগান তো নয় এ যেন গোলাপের আলাদা রাজত্ব। পুরো বাগানজুড়ে মাথা তুলেছে একেকটি লাল টুকটুকে গোলাপ। যেন আমাদেরই সাদরে বরণ করে নিতে তাদের এ আয়োজন। সবুজ গালিচার উপর টুকটুকে লাল গোলাপের চমৎকার বিস্তৃতি- ভাবুন তো এমন দৃশ্যের কথা।

এতো জীবন্ত গোলাপ আগে কখনোই একসাথে দেখা হয়নি। গোলাপের মৃদু সৌরভে চারদিক মৌ মৌ করছে। মনে হচ্ছে ফুলের রাণী তার পাপড়ির সুনিপুণ মাধুর্য্য ছড়িয়ে তার সৌন্দর্যের শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রমাণ করছে। পাশের তুরাগ নদী থেকে আগত মৃদু বাতাসে শরীর দুলিয়ে প্রকাশ করছে তার গৌরব। এমন সুনিপুন ও চোখ জোড়ানো কারুকার্যের পাপড়ি আর সাথে লাল টুকটুকে রঙের আভিজাত্য দেখে আপনার সৌন্দর্য পিপাসু মননাদোলে পারবেই না!

বাতাসের গোলাপের দোলা আমাদের মনকেও দুলিয়ে দিয়ে গেল। এমন মুহূর্তের স্মৃতিগুলো ক্যামেরা বন্দি করবো না, তা তো আর হয় না। সবাই হুড়মুড়িয়ে পড়লাম, ছবি তুলতে হবে। সে কি পোজ একেক জনের! একেক জন তখন নানান ঢঙে ছবির পোজ দিতে ব্যস্ত, উত্তেজনায় কেউ নড়ছে না পর্যন্ত। মাথার উপরে তখনো সূর্য্যি মামার কর্তৃত্ব। রোদেলা আলোর তীব্রতাই ক্যামেরার দিকে টানা তাকিয়ে থাকাটা বেশ দুঃসাধ্য তখন। এরপরও সকলেরই যার যার পোজ ঠিক রাখার চেষ্টায় মত্ত। একেক জন যেন চোখ জোর টেনে টেনে খুলে রেখেছে। যে করেই হোক ছবিতে নিজেকে ভালো দেখাতেই হবে।

কিন্তু বিধিবাম, ক্লিক করার চরম মুহূর্তে রাসেল হাঁচি দিয়ে বসলো। এমন অবস্থায় কাঁদবো না হাসবো বুঝে উঠতে পারলো না কেউ, আমিও না । অভিমানে তো মল্লিকের মুখ ফসকে বেরিয়ে এলো, আর ছবি উঠার প্রয়োজন নাই। অবশেষে একটি ভালো ছবির জন্য সকল প্রচেষ্টাই মাটি হয়ে গেল।

তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত এ গ্রামটির সৌন্দর্য্য বর্ননাতীত। এর মানুষগুলোও বেশ সরল। গ্রামের প্রায় ৯০ ভাগ মানুষইকোন না কোনভাবে গোলাগ চাষের সাথে জড়িত।গোলাপের প্রাচুর্য্যে এলাকাটির স্থানীয় নামকে দ্রুত হটিয়ে দিয়ে বিশেষ এই ফুলটি সেখানে তার নামের পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। ফলে সবাই এলাকাটিকে গোলাপ গ্রাম হিসেবেই চেনে। প্রকৃতপক্ষে গোলাপ গ্রাম বলতে সাদুল্লাহপুর ও এর আশেপাশের এলাকাকে ধরা হয়। সাভার উপজেলায় বিরুলিয়া ইউনিয়নে এ গ্রামটির অবস্থান।

মানুষকে প্রকৃতির এ সুন্দর উপাদানটি তুলে দিতে পারার মধ্যেইআমাদের আনন্দ লুকায়িত। সাথে ব্যবসায়িক লাভ ক্ষতি তো আছেই - কথা গুলো জানাচ্ছিলেন বাগানটির স্বত্তাধিকারী মো: শাহজাহান। টানা প্রায় ১৭/১৮ বছর ধরে গোলাপ ফুল ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন। লাভজনক হওয়ায় তার ছেলেদেরকেও এ ব্যবসার প্রতি অনুপ্রাণিত করেছেন। মাস শেষে তার যে পরিমাণ টাকা থাকে তা তার পরিবারের জন্য যথেষ্ঠ বলে তিনি মনে করেন।

ফিরে আসার ব্যাপারে রাসেল শুরু থেকেই বেশ তাড়া দিচ্ছিল। অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও ফেরার জন্য পা বাড়ালাম। কিন্তু গোলাপের কাঁটায় হঠাৎ আটকে গেলাম। আমরা যেমন গোলাপকে ভালবেসে দেখতে গিয়েছি, তেমন গোলাপও কি আমাদেরকে ভালবেসে আটকে রাখতে চায় নাকি? পরে আবার কখনো তাকে দেখতে যাবার সান্তনা দিয়ে তবেই না বাড়ির পথ ধরলাম।

Bootstrap Image Preview