Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৭ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

হামাস-ফাতাহ দ্বন্দ্বে গাজা পরিণত হয়েছে উন্মুক্ত কারাগারে

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৯:৩৩ PM
আপডেট: ১৩ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ০৯:৩৩ PM

bdmorning Image Preview


আন্তর্জাতিক ডেস্ক : এক দশকের বেশি সময় ধরে ইসরায়েল ও মিসরের অবরোধের মুখে পড়ে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উন্মুক্ত কারাগারে পরিণত হয়েছে ফিলিস্তিনের গাজা। তার ওপর ফিলিস্তিনের ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ফাতাহ ও জাতিমুক্তি আন্দোলনের সংগঠন হামাসের দ্বন্দ্বের কারণে অবস্থা ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। হামাসকে চাপে রাখতে গাজার বিদ্যুৎ সুবিধা বন্ধ করাসহ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কেটে নেওয়া আদেশ দিয়েছেন প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। ফাতাহ পরিচালিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অধীনে কর্মরত গাজার অনেক বাসিন্দার বেতন বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি ইসরায়েল ও মিসর গাজায় পণ্য আমদানি-রফতানির সুড়ঙ্গ পথ বন্ধ করে দেওয়ায় ভেঙে পড়েছে গাজার অর্থনীতি ব্যবস্থা। আর এতে ২০ লাখ অধিবাসীর ভূখ- গাজায় দেখা দিয়েছে চরম মানবিক বিপর্যয়। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের মূল শক্তি হলো ফাতাহ। দলটি ইসরায়েলি দখলদার সরকারের সমর্থনপুষ্ট। অন্যদিকে হামাস ফিলিস্তিনের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘদিন সশস্ত্র সংগ্রাম করে আসলেও ২০০৭ সালে নির্বাচনে অংশ নেয়। গাজায় নির্বাচনে জয়লাভের পর তারা সেখান ফাতাহর নিয়ন্ত্রণ কেড়ে নেয়। সে সময় থেকেই হামাস ও ফাতাহর মধ্যে টানাপোড়েন বৃদ্ধি পেতে থাকে। আর তখন গাজায় অবরোধ আরোপ করে রেখেছে ইসরায়েল ও মিসর। তারা গাজায় যেকোনও পণ্যসামগ্রী আমদানি-রফতানিতে কড়া নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে। ইসারায়েল মনে করে, এতে হামাস চাপে থাকবে আর গাজাবাসীও নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আশায় তাদের ক্ষমতা উৎখাত করবে। নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর হামাস এতদিন সুড়ঙ্গ ব্যবহার করে পণ্যসামগ্রী আনা-নেওয়া করতো। সুড়ঙ্গ দিয়ে মিশর চোরাচালানের মাধ্যমে আনা পণ্যসামগ্রীর ওপর নির্ধারিত করই ছিল তাদের আয়ের উৎস। তবে মিশরে আল সিসি ক্ষমতায় আসার পর চোরাচালানের ব্যবহৃত এসব সুড়ঙ্গ বন্ধ করে দেয়। কারণ হামাসের সঙ্গে মিসরের বিরোধী দল মুসলিম ব্রাদারহুডের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। সিসির এমন পদক্ষেপের কারণে হামাস ‘সিনাই টানেল’ বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়েছে। ইসরায়েলও এই ধরনের সুড়ঙ্গ খুঁজে খুঁজে ধ্বংস করে দিচ্ছে। গত কয়েক মাসে তারা হামাস ও ইসলামিক জিহাদের তৈরি কয়েকটি সুড়ঙ্গ ধ্বংস করেছে। সুড়ঙ্গগুলোতে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহের পাশাপাশি বাতাস প্রবাহের সুব্যবস্থা ছিল। অন্তত শ’খানেক শ্রমিক পালাক্রমে কাজ করে সুড়ঙ্গগুলো খনন করেছিল। এছাড়া নতুন সরবরাহ সুড়ঙ্গ তৈরির পথও বন্ধ করে দিতে উদ্যোগ নিয়েছে ইসরায়েল। নতুন সুড়ঙ্গ তৈরি ঠেকাতে তারা ৩৪ কিলোমিটার এলাকায় ভূগর্ভে বিশেষ দেওয়াল নির্মাণ কাজ শুরু করেছে। এই স্থাপনা নির্মাণে দেশটি প্রায় ৮,২০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছে। মিসর ও ইসরায়েল সরকারের পাশাপাশি খোদ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কাছ চাপের মুখে পড়েছে হামাস ও গাজাবাসী। এতদিন গাজা ভুখ-ে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য হামাস ও ইসরায়েলকে অর্থ সহায়তা দিতো ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। তবে গতবছর হামাসের নিজস্ব কর ব্যবস্থা নিয়ে রেষারেষির কারণে ওই অর্থ সরবরাহ বন্ধের নির্দেশ দেন ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস। এরপর গাজায় মানবিক বিপর্যয় ভয়াবহ রূপ নেওয়া শুরু করে। সেখানকার হাসাপাতালগুলোতে ১২ ঘন্টা বিদ্যুৎ থাকছে না। জেনারেটর দিয়ে রকমে চিকিৎসা সেবা চালু রাখা হচ্ছে। আর সাধারণ গাজাবাসীর মোট চাহিদার মাত্র ৩৭ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে সেখানকার মানবিক বিপর্যয় আরও বেড়েছে। শুধু বিদ্যুৎ সংকট বাড়িয়েই ক্ষ্যান্ত হয়নি ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ। ফিলিস্তন কর্তৃপক্ষের অধীনে চাকরি করা গাজার বাসিন্দাদের বেতনে বড় কেটে নেওয়া শুরু করেছে প্রতিষ্ঠানটি। চাকরিরতদের বেতন প্রায় ৪০ শতাংশ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর প্রায় ৪০ হাজারের মতো হামাস সমর্থকের বেতন কয়েক মাস ধরে বন্ধ রাখা হয়েছে। এসব সমর্থকদের বেশির ভাগই পুলিশ সদস্য। ফলে এসব মানুষ ও তাদের পরিবার এখন মানবেতর জীবন যাপন করছে। ৪৫ বছর বয়সী মুহাম্মাদ আবু শাবান গাজায় এমন অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হওয়া ব্যক্তিদের একজন। দুই মাস আগে তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে। ফিলিস্তিনের প্রেসিডেনশিয়াল গার্ডের সদস্য হিসেবে চাকরি করার সময় তার মাসিক বেতন ছিল ১ লাখ টাকারও বেশি। এখন তাকে অবসর ভাতা হিসেবে মাসে মাত্র ২৩ হাজার টাকা দেওয়া হয়। এই অর্থে তার জীবন ধারণ অনেক কঠিন পড়েছে। মাংস তো দূরের কথা, ছয় সন্তানের পরিবারের জন্য সবজি কেনাই তার পক্ষে দুরূহ উঠেছে। খরচ দিতে না পারায় এক ছেলের কলেজে যাওয়া বন্ধ গেছে। পেনশনের টাকার প্রায় পুরোটাই আগের মাসের বাকি শোধ করতে চলে যায়। আবু শাবানের মতো এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন গাজার বহু সরকারি চাকরিজীবী। গাজায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণে শুধু সরকারি কর্মচারীরাই নয়, শ্রমিক, ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব পেশার মানুষই চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন। সেখানকার মুদি দোকানগুলোতে মধ্যবিত্তের সঙ্গে সঙ্গে অনেক গরিব মানুষও ভিড় করেন। অর্থাভাবের কারণে তারা মূলত অপেক্ষাকৃত খারাপ খাবার সংগ্রহ করার চেষ্টা করেন। এমনই একজন ৫৭ বছর বয়সী জাকিয়া আবু আজওয়া। তার ঘরে তিন নাতি রয়েছে। তাদের জন্য একটু সবজি যোগাড় করার চেষ্টা তার। এজন্য প্রয়োজনে পশু খাদ্যের উপযোগী আংশিক পচে যাওয়া সবজি হলেও তা সংগ্রহ করেন তিনি। ফিলিস্তিনের এই উপত্যকার সংকট এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দোকানদারের বাকি শোধ করতে না পেরে অনেককে জেলে যেতে হয়েছে। এমনকি অভাবের কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও অবনতি ঘটছে ব্যাপক হারে। সেখানে বিভিন্ন স্থানে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত। শিশুরা এখন স্কুল বাদ দিয়ে শাক তুলতে যায়। অনেকেই আবার গাড়ির কাঁচ পরিষ্কার করে অর্থ আয়ের চেষ্টা করছে। দোকানগুলোতে মালামাল থাকলেও ক্রেতার অভাব। তাই তাদের আয়েও ভাটা পড়েছে। গাজায় হামাসের সঙ্গে ফাতাহ নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তন কর্তৃপক্ষের দ্বন্দ্বের বিষয়টি এখন পারস্পারিক জেদে পরিণত হয়েছে। হামাস বলছে, গাজার সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন আগের হারে দিতে হবে। নইলে তারা কর সংগ্রহ বন্ধ করবে না। আর ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ বলছে, হামাস কর নেওয়া বন্ধ করলেই সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন আগের হারে দেওয়া হবে। এই সংকট কাটাতে গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের মধ্যেই সমাধান দেখছেন অনেকে। তবে হামাস কয়েকবার গাজার নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের সময় নির্ধারণ করলেও তা হস্তান্তর করেনি। আর বিষয়টি নিয়ে মধ্যস্থতা করে আসা মিসরের গোয়েন্দা প্রধানকেও কয়েকদিন আগে অপসারণ করা হয়েছে। এতে করে সেই সম্ভাবনাটিও আপাতত ঝুলে পড়েছে। ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষের অংশ মনে করে, হামাসকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি তাদের সামরিক শাখা বিলুপ্ত করা জরুরি। কিন্তু বিশাল সংখ্যক ফিলিস্তিনির সমর্থন থাকায় তা অনেকটা অসম্ভব। কারণ বেশিরভাগ ফিলিস্তিনি তাদের জাতিমুক্তি আন্দোলনের জন্য ফাতাহ’র চেয়ে হামাসকে বেশি বিশ্বস্ত মনে করেন। তারপরও হামাসকে চাপে রাখতে তাদের কৌশল কাজ করছে বলে মনে করছে ফিলিস্তিন কর্তৃপক্ষ। তবে শুধুমাত্র হামাসকে চাপে রাখতে গিয়ে বিপর্যস্ত পড়েছে গাজার অর্থনীতি। সংকট ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়েছেন গাজার বাসিন্দারা। অর্থনীতির এই ছন্নছাড়া অবস্থায় ক্ষতে মলম লাগানোর চেষ্টা করছেন গাজার দানশীল ব্যক্তিরা। অনেক ব্যবসায়ী দেনাদারদের ঋণ মাফ করে দিয়েছেন। গাজা ব্যবসায়ী সমিতি প্রায় ২৯ লাখ টাকা পরিশোধ করে ১০৭ জনকে ঋণমুক্ত করেছে। একজন দাতা জেনারেটর চালু রাখার লক্ষ্যে হাসপাতালে এক হাজার লিটার তেল অনুদান দিয়েছেন। তবে সংকট ঘনীভূত হওয়ায় ইসরায়েলের মনে এখন নতুন আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। গাজার অর্থনৈতিক দুরাবস্থা সামজিক অস্থিরতার জন্ম দেবে বলে মনে করছে তারা। আর হামাস তাদের দুরাবস্থার জন্য ইসরায়েলকে দায়ী করে বিক্ষোভ উস্কে দিয়ে সংঘাতে রূপ দিতে পারে। আর তাতে সেখানকার অর্থনৈতিক অবস্থা আরও খারাপ হতে থাকবে। এতে গাজা পাক খেতে থাকবে এক নিরন্তর দুরাবস্থার ঘুর্ণিপাকে। নিজ দেশের দুই রাজনৈতিক দলের এমন জেদাজেদি বন্ধ করে সাধারণ মানুষের কথা আগে ভাবার দাবি জানিয়েছেন গাজার বাসিন্দারা। আবু শাবান খেদোক্তি করে বলেন, ইসরায়েল সঙ্গে চলা যুদ্ধই কি যথেষ্ট নয়! নাকি এখন নিজেদের ভেতরও সংঘাতে জড়াতে হবে? একই সুর হামাসের মুখপাত্রের ফাওজি বারহুমে কণ্ঠেও। তিনি বলেন, মাহমুদ আব্বাস হামাসকে শায়েস্তা করতে গিয়ে পুরো গাজাবাসীকেই শাস্তি দিচ্ছেন।
Bootstrap Image Preview