Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৫ সোমবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৩০ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

অপার সৌন্দর্য নিয়ে বঙ্গোপসাগরের কোলে জেগে আছে ‘সোনার চর’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ মার্চ ২০১৮, ০৩:২৯ PM
আপডেট: ১১ মার্চ ২০১৮, ০৬:৪৫ PM

bdmorning Image Preview


জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধিঃ

পটুয়াখালীর সর্বদক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের কোলে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য নিয়ে জেগে আছে সোনার চর। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের বুকে নেই ঘন বসতি। ফলে যান্ত্রিক শব্দ কিংবা মানুষের কোলাহলের পরিবর্তে কানে ভেসে আসে দ্বীপে উড়ে আসা পাখিদের কলকাকলি, সাগরের ঢেউয়ের গর্জন আর ঝাউ বাগানে বয়ে চলা বাতাসের শো শো শব্দ। সবুজের নীলিমার ফেনিল নোনা জলের ভেজা তটরেখায় রয়েছে লাল কাঁকড়ার ছুটাছুটি। নগরের কর্মচাঞ্চল্যতা থেকে বহুদূরে এই সৈকতের সৌন্দর্য এখনও অনেকের কাছে রয়েছে অজানা। স্থানীয়দের অভিমত চরটিকে সরকারীভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করলে পর্যটন শিল্পে যোগ হবে এক নতুন মাত্রা।

সোনার চরে নেই কোন স্বর্ণ। সকালে কিংবা শেষ বিকেলের রোদের আলো চরের বেলাভূমিতে পড়লে দূর থেকে পুরো দ্বীপটাকে সোনারি রঙের থালার মতো মনে হয়। বালুর ওপরে সূর্যের আলোয় চোখের দৃষ্টিতে সোনা রঙ আভা ছড়িয়ে যায়। মনে হয় দ্বীপটিতে যেন কাঁচা সোনার প্রলেপ দেয়া হয়েছে। এই বৈশিষ্ট্যের কারণেই দ্বীপটির নামকরন হয়েছে সোনারচর। আবার কারো মতে, এক সময়ে দ্বীপটিতে প্রচুর পরিমাণে সোনালী ধান জন্মাতো বলে এই নামকরণ হয়েছে। আবার অনেকে মৎস্য আহরণের ক্ষেত্র হিসাবে এটিকে সোনার চর বলে অখ্যায়িত করেন।

ভূখন্ড পরিমাপের হিসাবে অনেকটা বাদাম আকৃতির সোনার চরের আয়তন ৭ হাজার একর। পূর্বদিকে নতুন চর পড়ায় এই আয়তন ১০ হাজার একরে উন্নীত হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। সোনারচরের পার্শ্ববর্তী চর আন্ডার মাঝখানে একসময় বড় নদী ছিল। চর পড়ে সে নদী এখন ছোট হয়ে গেছে। শুকনো সময়ে পায়ে হেঁটেই পার হওয়া যায়। সোনারচর চ্যানেল সরু হয়ে গিয়ে বনের সৌন্দর্য্য আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমন অগনিত চ্যানেলের দুই পাশ জুড়ে বন বিভাগের রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ রেঞ্জের সোনারচর বিটের আওতাধীন ম্যানগ্রোভ আর ঝাউ বন।

চরের কোল ঘেঁষে সারা বছর থাকে জেলেদের অবস্থান। শুকনো মৌসুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে ব্যবসার জন্য আশ্রয় নেয় অসংখ্য জেলে। সমুদ্রের বালু খনন করে তারা তোলে খাবার পানি। যার স্বাধ অসাধারন। প্রায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ সমুদ্র সৈকতে একই স্থানে দাড়িয়ে উপভোগ করা যায় সূর্যাস্ত আর সুর্যোদয়ের মনোরম দৃশ্য। দ্বীমুখি সমুদ্রের স্রোতের কারণে পানির নিম্নমুখী টান না থাকায় সমুদ্রে টেনে নেয়ার বিন্দু মাত্র ভয় জাগেনা কারো মনে। সৈকতের গা ঘেঁসে দাড়িয়ে থাকা ঝাউবনে রয়েছে হরিণ, বুনো মহিষ, মেছোবাঘ, শুঁকর, উদরসহ নানা প্রজাতির প্রাণি। শীত মৌসুমে স্থানীয় পাখির দলে যোগ দেয় হাজারো অতিথি পাখি। সাইবেরিয়ান হাঁস, ব্লাকহেড, সরাইল, গাঙচিলসহ নানা জাতের অতিথি পাখি।

সোনারচরে সরাসরি সড়ক কিংবা নৌপথে সহজ যোগাযোগ ব্যবস্থা আজও হয়ে ওঠেনি। জেলা শহর পটুয়াখালী থেকে গলাচিপা উপজেলায় পৌঁছাতে হবে কোন দর্শনার্থীকে। সেখান থেকে যে কোন ভাড়াটে মোটরসাইকেলের মাধ্যমে পৌছাতে হবে আগুনমুখা নদীর মোহনায়। কোন তৃষ্ণার্থ ব্যক্তি আগুন মুখার তীরে পৌঁছালে বুড়াগৌরাঙ্গ ও দাঁড়ছিড়া নদী পাড়ি দিতেই দু’পাশ জুড়ে ঘন ম্যানগ্রোভ বনের দৃশ্য তার মনকে দ্বীগুন প্রানবন্ত করে তুলবে। ট্রলার কিংবা লঞ্চযোগে আগুনমুখার মোহনা থেকে ঘণ্টা দুয়েক এগুলেই চোখে পড়বে মায়াবী দ্বীপ চর তাপসী। তাপসীর দুই পাশ জুড়ে বিরল দৃশ্য অতিক্রম করলেই দেখা মেলে সোনার চরের হাতছানি। তাপসী থেকে ৩০ মিনিটের পথ দক্ষিণে এগুলেই সোনারচর। স্পিডবোট ছাড়াও ইঞ্জিন চালিত ছোট ট্রলার নিয়ে কুয়াকাটা, গলাচিপা থেকে সমুদ্র পাড়ি দিয়ে যাওয়া যায় সোনারচরে।

সোনারচরে রাত্রি যাপনের ব্যবস্থা এখনও গড়ে ওঠেনি। তবে প্রশাসনের উদ্যোগে পর্যটকদের জন্য নির্মাণ করা হয়েছে ছোট্ট তিন কক্ষের একটি বাংলো। রয়েছে বন বিভাগের ক্যাম্প। বন বিভাগ, বেসরকারি সংস্থা স্যাপ-বাংলাদেশ ও মহিলা উন্নয়ন সমিতির বাংলো। এসব স্থানে রাতে থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে সারাদিন সোনার চরে কাটিয়ে ইঞ্জিন চালিত নৌকা বা ট্রলারে মাত্র আধাঘন্টার মধ্যে রাঙ্গাবালী উপজেলার চরমোন্তাজ ইউনিয়নে গিয়ে থাকার সুযোগ রয়েছে।

সোনার চরকে পর্যটনকেন্দ্র ঘোষণার দাবি জানিয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটিয়ে এই চরের সম্ভাবনা জাগিয়ে তুলতে হবে। যথাযথ উদ্যোগ নেয়া হলে এটি হবে দেশের অন্যতম পর্যটন কেন্দ্র। এখানে পর্যটকদের ভিড় জমবে। পাশাপাশি পর্যটকরা সোনারচরের পাশেই জাহাজমারা, তুফানিয়া ও শিবচরসহ আরো কয়েকটি দ্বীপের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ পাবেন। সরকার আয় করতে পারবে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব।

প্রভাত আর গোধুলি লগ্ন সোনারচরের অন্যতম আকর্ষণ। পূর্ব আকাশের দিগন্ত ছুঁয়ে উঁকি দেয় ভোরের নতুন সূর্য। শেষ বিকেলে রক্ত রঙ সূর্য রক্তিম আভা ছড়িয়ে সমুদ্রের কোলে নীড় খোঁজে। তখন সোনারচরের স্বর্ণময় রূপের নীল জলকে স্বর্ণালী করে তোলে। গোধুলির আচ্ছন্নতায় ম্লান হয় সোনারচরের আলো। নিজের রূপের আয়নায় ঘোমটা টেনে আরেকটি নতুন সকালের অপেক্ষায় ঘুমিয়ে পড়ে সমুদ্রের কোলে জেগে ওঠা স্বর্নালি বর্ণের সোনারচর।

Bootstrap Image Preview