Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২২ শনিবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৭ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়: মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের ৫০ বছর

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১২:১৬ PM আপডেট: ১৬ ফেব্রুয়ারী ২০১৮, ১২:১৬ PM

bdmorning Image Preview


রাকিবুল হাসানঃ

উপমহাদেশের প্রথম উচ্চতর মৎস্য শিক্ষা ও গবেষণার প্রতিষ্ঠান হিসাবে খ্যাত বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ। ১৯৬১সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ৩বছর পর ১৯৬৭ সাল থেকে যাত্রা শুরু করেছিল মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ। ২০১৭ সালে এসে বিশ্বমানের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর গ্রাজুয়েট তৈরির মাধ্যমে সফলতার ৫০ বছরে পদার্পন করেছে বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অনুষদটি। ৫০ বছর উদযাপন উপলক্ষে বাকৃবি মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ মার্চের ২ থেকে ৪তারিখ ৩ দিনব্যাপী সকল গ্রাজুয়েট ও অধ্যায়নরত শিক্ষার্থীদের নিয়ে আয়োজন করছে সুর্বন জয়ন্তী।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবন থেকে উত্তর দিকে প্রায় ২০০ মিটার দক্ষিণে অবস্থিত অনুষদটি। ভৌগোলিক দিক থেকে আবহাওয়া কিছুটা সিক্ত থাকায় পরীক্ষণমূলক পুকুরে মাছ চাষ বিষয়ক পড়াশুনায় অনেকটায় সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অনুষদটি দুটি ভবন নিয়ে গঠিত। প্রধান ভবনে রয়েছে মাছ ও মাছ ধরার বিভিন্ন উপকরণের সঙ্গে পরিচিত করার জন্য প্রতিটি বিভাগের নিজস্ব গবেষণাগার, ক্লাসরুম এবং শিক্ষকদের অফিসরুম। এসব গবেষণাগারগুলি আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য অবকাঠামোগত দিক দিয়ে সু-সমৃদ্ধ। অন্যটি অধ্যাপক আমীনুল হক ভবন। এখানে রয়েছে অনুষদের ডিন অফিস, কনফারেন্সরুম সহ শিক্ষার্থীদের জন্য ক্লাসরুম। ভবনের পিছনেই রয়েছে গবেষণা পুকুর এবং গবেষণা কমপ্লেক্স যেখানে অনুষদের শিক্ষক তাদের গবেষণা কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীরা গবেষণাসহ ব্যাবহারিক শিক্ষা নিয়ে থাকেন।

এছাড়াও অনুষদের অধীনে রয়েছে ২১ একর বিশিষ্ট মৎস্য মাঠ গবেষণা কেন্দ্র যেখানে স্নাতোকোত্তোর ও পিএইচডির শিক্ষার্থীরা শিক্ষা, গবেষণা, ও প্রশিক্ষণ নিতে পারে। রয়েছে মাছের প্রজনন, বংশবৃদ্ধি, বিস্তারের জন্য বাকৃবি মৎস্য খামার ও শতাধিক গবেষণা পুকুর। এছাড়াও অনুষদীয় প্রফেসর ড. মোস্তফা আলী রেজা হোসেন এর অক্লান্ত পরিশ্রম ও চেষ্টার ফলে প্রতিষ্ঠিত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সর্ববৃহৎ ‘মৎস্য জাদুঘর ও বায়োডাইভার্সিটি সেন্টার’।

এই অনুষদে বিপুল কর্মযজ্ঞকে বাস্তবরূপ দেওয়ার জন্যে অনুষদে রয়েছে ৪ টি অনুষদীয় ডিপার্টমেন্ট। এগুলো হলো, ফিশারিজ বায়োলজি এন্ড জেনেটিক্স ডিপার্টমেন্ট, একোয়াকালচার ডিপার্টমেন্ট, ফিশারিজ ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্ট ও ফিশারিজ টেকনোলজি ডিপার্টমেন্ট। ৪ টি ডিপার্টমেন্টে মোট ৫৮ জন শিক্ষক রয়েছেন যার ৯৫ ভাগ শিক্ষকই বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চ শিক্ষা (পিএইচ.ডি. ও পোস্ট ডক্টরাল) সম্পন্ন করেছেন। এছাড়াও নিয়মিতভাবে অনুষদের শিক্ষকেরা বিভিন্ন শিক্ষণ-প্রশিক্ষণের জন্য বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে দুর-দুরান্তের বিশ্ববিদ্যালয় ও সংস্থা সমূহ পরিদর্শন করে থাকেন।

গত ৫০ বছরে মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ গবেষণার ক্ষেত্রে অসাধারণ সফলতার সাক্ষ্য বহন করে যাচ্ছে । এর মধ্যে বাইম, মাগুর, শিং, তারা বাইম, গুচি বাইম, ও বাটা মাছের কৃত্রিম প্রজননসহ ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষ পদ্ধতি, একসাথে সবজি ও মাছ চাষের আধুনিক পদ্ধতি (একুয়া পনিক্স), স্বল্প খরচে বরফ বক্স, রিং টানেল পদ্ধতিতে শুটকী, খাঁচায় পাঙ্গাস মাছের চাষ, ডাকউইড দিয়ে মিশ্র মাছ চাষ, মাছের বিষ্ঠা দিয়ে সবজি চাষ,মাছের জীবন্ত খাদ্য হিসাবে টিউবিফেক্স ( এক ধরনের কীট) উৎপাদনের কলাকৌশল, ইলিশ মাছ আরহণের পর মানসম্মত উপায়ে বাজারজাতকরণ, দেশি পাঙ্গাসের কৃত্রিম প্রজনন, মাছের পোনা চাষের জন্য রটিফারের চাষ, কুচিয়া মাছের কৃত্তিম চাষ পদ্ধতি আবিষ্কার, খাঁচায় দেশি কৈ মাছ চাষ পদ্ধতি এবং ইলিশ মাছের স্যুপ এবং নুডুলস উদ্ভাবন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

এছাড়াও মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের জীন টেকনোলজি, মৎস্য জীব ও শারীরতত্ত্ব, মৎস্যচাষ, মৎস্য পুষ্টি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, পানি ও মাটির ভৌত রসায়ন, মৎস্য আহরণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ গবেষণাগারগুলি ইতোমধ্যেই বিশ্বমানে উন্নীত হয়েছে।

মৎস্য সেক্টর উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি হলো দেশে কর্মরত মৎস্যবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, মাঠকর্মী ও সম্প্রসারণকর্মী। যাদের শতকরা ৯০ ভাগই হচ্ছে এই অনুষদের গ্রাজুয়েট। যারা আজ তাদের নিরলস পরিশ্রম ও উদ্ভাবিত তথ্যপ্রযুক্তি প্যাকেজ এর মাধ্যমে মৎস্য সেক্টরে বিশ্বে অবস্থান করে নিয়েছে।

২০১৭ সালে এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত ১০ বছরে বাংলাদেশের চাষের মাছের উৎপাদন দ্বিগুণের বেশি বেড়েছে। ২০১২ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী চাষের মাছের উৎপাদন ছিল ১৭ লাখ ২৬ হাজার মেট্রিক টন। এ উৎপাদন বেড়ে ২০১৭ সালে হয়েছে প্রায় ২১ লাখ মেট্রিক টন। আর এই বিপুল উৎপাদনের জন্যই পৃথিবীতে মুক্ত জলাশয় এবং চাষ ভিত্তিক মৎস্য উৎপাদনে বাংলাদেশ আজ পঞ্চম।

আর এই বিপুল মাছ উৎপাদনে নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন দেশে কর্মরত মৎস্যবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, মাঠকর্মী ও সম্প্রসারণকমী। যাদের বেশিরভাগই বাকৃবি মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদের গ্রাজুয়েটবৃন্দ। মাছের জাত উন্নয়ন, মৎস্য সংরক্ষণ, মাছচাষ, মাছের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা, উন্মুক্ত জলাশয় ব্যবস্থাপনা, মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ ও মৎস্যপণ্য উৎপাদন সংক্রান্ত প্রায় সব তথ্যপ্রযুক্তি প্যাকেজের সুতিকাগার হচ্ছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের মাৎস্যবিজ্ঞান অনুষদ।

এখানে উদ্ভাবিত প্রায় সব প্রযুক্তিই দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বাকৃবি মাৎস্যবিজ্ঞান গ্রাজুয়েট ও মৎষ্যচাষি, হ্যাচারি মালিক ও মাঠকর্মীদের মাধ্যমে পরিবর্তিত, পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।

অনুষদ থেকে এখন পর্যন্ত মোট ৫৪৬৬ জন ডিগ্রী প্রাপ্ত গ্রাজুয়েট (১২ ডিসেম্বর, ২০১৭ পর্যন্ত - ২৮৭৮ জন স্নাতক, ২৫১৭ জন স্নাতকোত্তর ও ৭১ জন পিএইচ.ডি.) দেশে ও দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বহির্বিশ্বে বিভিন্ন সংস্থায় কর্মরত থেকে মৎস্য সেক্টরের উন্নয়নে অসামান্য অবদান রেখে চলেছেন।

অনুষদের ৫০ বছর উপলক্ষে এই পর্যন্ত অধ্যায়নরত সকল গ্রাজুয়েটদের একত্র করে দিনটিকে উদযাপন করতে সুবৃহৎ পরিসরে বাকৃবি সবুজ চত্বরে, ২০১৮ এর মার্চের ৩ দিনব্যাপী (২, ৩ ও ৪ মার্চ - শুক্রবার, শনিবার ও রবিবার) সুবর্ণ জয়ন্তী অনুষ্ঠান আয়োজন করছে।

অনুষ্ঠানে মৎস্য সেক্টরের সাথে জড়িত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গ - মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, সচিব, মহাপরিচালকসহ অন্যান্য পলিসি মেকারগণ, আন্তর্জাতিক, বহুজাতিক সংস্থা, দাতাগোষ্ঠির প্রতিনিধিবৃন্দ, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার ও কোম্পানির প্রতিনিধি, ব্যক্তিউদ্যোক্তা, মৎস্যচাষী ও হ্যাচারি মালিকগণ, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ব বিদ্যালয় ও অন্যান্য সরকারি-বেসরকারি বিশ্ব বিদ্যালয়ের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ অনুষ্ঠানে যোগদান করবেন।

তিন দিনের অনুষ্ঠানমালাকে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান, মৎস্য র‌্যালী, মৎস্য গবেষণা ভিত্তিক সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, মৎস্য-মেলা, পোস্টার প্রদর্শনী, স্মৃতিচারণ, সাস্কৃতিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি দিয়ে সজ্জিত করা হয়েছে।

বর্তমান অনুষদীয় ডিন অধ্যাপক ড. গিয়াস উদ্দীন আহমেদ বলেন, বিশ্বমানের স্নাতক ও স্নাতকোত্তর গ্রাজুয়েট তৈরির মাধ্যমে দেশের জলজ সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা ও উন্নয়ন এবং দেশের মাছের উৎপাদনের উত্তরোত্তর বৃদ্ধি সাধন, সেই সাথে যুগোপযোগী ও মানসম্মত মৌলিক ও প্রায়োগিক গবেষণার মাধ্যমে মাঠ-উপযোগী তথ্য ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও সমগ্র দেশের মৎস্যচাষি, হ্যাচারি মালিক, প্রক্রিয়াজাতকারী ও সম্প্রসারণ কর্মীদের মধ্যে তা ছড়িয়ে দেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।

অনুষদের শিক্ষা-গবেষণা ও গ্রাজুয়েটদের নিরন্তর কর্মযজ্ঞ একদিন বাংলাদেশ ও তথা সমগ্র বিশ্বের মানুষকে ক্ষুধা ও দারিদ্রমুক্ত এবং সুস্বাস্থ্যবান হওয়ার অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছে দেবে- এই আমাদের ঐকান্তিক কামনা।

Bootstrap Image Preview