Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৬ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ১ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

'বাণী বন্দনা' শুদ্ধ ধর্ম চর্চার এক অব্যার্থ মূলমন্ত্র

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২০ জানুয়ারী ২০১৮, ০২:০০ PM
আপডেট: ২০ জানুয়ারী ২০১৮, ০২:০০ PM

bdmorning Image Preview


'বাণী বন্দনা' শুদ্ধ ধর্ম চর্চার এক অব্যার্থ মূলমন্ত্র

মাঘ মাসে শুক্ল পক্ষ, শ্রীপঞ্চমী তিথি, সরস্বতী পূজা হয় ধূমধাম অতি। ধান্যদূর্বা, আম্রশাখা, সুগন্ধি চন্দন, ঘৃত, মধু, গঙ্গাজলে দেবী আবাহন।

দেবীর গলায় শোভে, শ্বেত ফুল মালা, ফল ফুল, বড় কুল, প্রসাদের থালা। গুড় দুধ চিঁড়া দই, নারকেল কলা, শাঁকালু বাতাবি লেবু, আপেল কমলা,

পূজারি ব্রাহ্মণ এক বসিয়া আসনে, করিছেন মন্ত্রপাঠ, শুদ্ধ ভক্তি মনে। চারিপাশে আছে বসে, যত শিশুগণ, পুষ্পাঞ্জলি দেয় সবে, হয়ে শুদ্ধ মন।

বাক্ দেবী বীণাপানি, প্রণমি তোমায়, বিদ্যাদায়িনী দেবী, বিদ্যা দাও আমায়।

সরস্বতী হলেন জ্ঞান, বিদ্যা, সংস্কৃতি ও শুদ্ধতার দেবী। সৌম্যাবয়ব, শুভ্র বসন, হংস-সম্বলিত, পুস্তক ও বীণা ধারিণী এই দেবী বাঙালির মানসলোকে এমন এক প্রতিমূর্তিতে বিরাজিত, যেখানে কোনো অন্ধকার নেই, নেই অজ্ঞানতা বা সংস্কারের কালো ছায়া।

আমরা যে দেবী সরস্বতীকে হিমালয়কন্যা পার্বতীর কন্যা ও লক্ষ্মী-কার্তিক-গণেশের সহোদরা ভগ্নীরূপে দেখি, সেটা নিতান্তই বাঙালিদের ঘরোয়া মনগড়া গল্প, এর পিছনে কোন শাস্ত্রীয় অনুমোদন নেই। সরস্বতী সৃষ্টিদেবতা ব্রহ্মার সহধর্মিণী এবং বিষ্ণুপত্নী  লক্ষ্মী ও মহেশ্বরজায়া পার্বতীর সঙ্গে একযোগে ত্রিদেবী নামে অর্চিত।

গরুড় পুরাণে সরস্বতী শক্তি অষ্টবিধা। শ্রদ্ধা, ঋদ্ধি, কলা, মেধা, তুষ্টি, পুষ্টি, প্রভা ও স্মৃতি। তন্ত্রে এই অষ্টশক্তি যথাক্রমে যোগ, সত্য, বিমল, জ্ঞান, বুদ্ধি, স্মৃতি, মেধা ও প্রজ্ঞা।

তন্ত্র শাস্ত্রমতে সরস্বতী বাগীশ্বরী - অং থেকে ক্ষং পঞ্চাশটি বর্ণে তাঁর দেহ। আবার পদ্মপুরাণে উল্লেখিত সরস্বতীস্তোত্রম্-এ বর্ণিত হয়েছে দেবী ; শ্বেতপদ্মাসনা শ্বেতপুষ্পোশোভিতা শ্বেতাম্বরধরা, নিত্যা শ্বেতগন্ধানুলেপনা শ্বেতাক্ষসূত্রহস্তাশ্বেতচন্দনচর্চিতাশ্বেতবীণাধরা শুভ্রা শ্বেতালঙ্কারভূষিতা ইত্যাদি। এর অর্থ দেবী সরস্বতী শ্বেতপদ্মে আসীনা, আদ্যন্তবিহীনা, শ্বেতপুষ্পে শোভিতা, শ্বেতবস্ত্র-পরিহিতা এবং শ্বেতগন্ধে অনুলিপ্তা। অধিকন্তু তাঁহার হস্তে শ্বেত রুদ্রাক্ষের মালা; তিনি শ্বেতচন্দনে চর্চিতা, শ্বেতবীণাধারিণী, শুভ্রবর্ণা এবং শ্বেত অলঙ্কারে ভূষিতা। সরস্বতী পূজা হিন্দু বিদ্যা ও সংগীতের দেবী সরস্বতীর আরাধনাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠেয় একটি অন্যতম প্রধান হিন্দু উৎসব। শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে মাঘ মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে সরস্বতী পূজা আয়োজিত হয়। তিথিটি শ্রীপঞ্চমী বা বসন্ত পঞ্চমী নামেও পরিচিত।

ধ্যানমন্ত্রে দেবী সরস্বতীকে শ্বেতবর্ণা, শ্বেতপদ্মাসনা, মুক্তা হারে ভূষিতা, পদ্মলোচনা ও বীণা-পুস্তকধারিণী এক দিব্য নারী প্রতিমা রূপে কল্পনা করা হয়েছে। ধ্যান বা স্তোত্র-বন্দনায় উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভুজা অথবা চতুর্ভুজা এবং মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভুজা সরস্বতী পূজিত হন। ইনি অক্ষমালা, কম-ুল, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভুজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীন। সরস্বতী বৈদিক দেবী হলেও সরস্বতী পূজার বর্তমান রূপটি আধুনিককালে প্রচলিত হয়েছে।

সাধকদের মতে, দেবীর দেহে ছয়টি পদ আছে। বিশুদ্ধ পদে আরোহণ করলে সারস্বত জ্ঞান লাভ হয়। সরস্বতীকে পদ্মাসীনা দেখিয়ে দেহস্থ প্রাণবায়ুকে উত্তোলন করার কৌশল নির্দেশ করা হয়েছে। তিনি শুভ্রবর্ণা। তার এই শুভ্রবর্ণ শুচিতা, শুভ্রতা, শুদ্ধতা ও পবিত্রতার প্রতীক; যা আমাদের মনকে শুচি, শুভ্র ও শুদ্ধ রাখার নির্দেশ দিচ্ছে। কারণ মন শুদ্ধি না হলে চিত্ত শুদ্ধি হয় না আর চিত্ত শুদ্ধি ছাড়া জ্ঞান লাভ করা যায় না।

সরস্বতী দেবী হংসবাহনা। হংসের একটি বিচিত্রতা আছে। হংসকে দুধ ও জলের মিশ্রণ খেতে দিলে সে অনায়াসে জল রেখে সারবস্তু দুধ গ্রহণ করে। সংসারে নিত্য ও অনিত্য দুটি বস্তুই বিদ্যমান। বিবেক বিচার দ্বারা নিত্য বস্তুর বিদ্যমানতা স্বীকার করে তা গ্রহণ শ্রেয়, অসার বা অনিত্য বস্তু সর্বতোভাবে পরিত্যাজ্য। সার ও অসার মিশ্রিত এই জগৎ সংসারে মানুষ যেন সারবস্তু গ্রহণ করে এ নির্দেশই হংসবাহনতায় প্রকাশিত। হাঁস জলে বিচরণ করে কিন্তু তার দেহে জল লাগে না। মহাবিদ্যা প্রতিটি জীবের মধ্যে থেকেও জীবদেহের কোন কিছুতে তাঁর আসক্তি নেই, তিনি নির্লিপ্তা।

দেবীর হাতের পুস্তুক জ্ঞানর্চ্চার প্রতীক। জ্ঞানের মতো পবিত্র এ জগতে আর কিছুই নেই। এই জ্ঞান সব যোগের পরিপক্ব ফল। সংযতেন্দ্রিয় ও তৎপর হয়ে তত্ত্ব জ্ঞানে শ্রদ্ধাবান ব্যক্তি এই জ্ঞানলাভ করেন এবং অচিরেই তিনি পরাশাস্তিপ্রাপ্ত হন। সরস্বতী বিধৌত ব্রহ্মাবর্ত ভূমি বেদ-বেদাঙ্গ-বেদান্ত আশ্রয় করে সাধনা করতেন আশ্রমবাসী ঋষিগণ। সেই ভাবটি নিয়েই দেবী 'পুস্তক হস্তে', গ্রন্থ রচনার সহায়ক লেখনীটিও তাঁর সঙ্গে।

সরস্বতী মায়ের হাতের বীণা সঙ্গীতবিদ্যার প্রতীক। কল্যাণময়ী নদীতটে সাম গায়কেরা বেদমন্ত্র উচ্চারণে ও সাধনে নিমগ্ন হতো। তাদের কণ্ঠে উদ্গীত সাম সঙ্গীতের প্রতীকী বীণা দেবীর করকমলে। মনের ভাব প্রকাশ হয় ভাষায় আর প্রাণের ভাব প্রকাশ পায় সুরে। সুর মানুষকে বিমোহিত করে। প্রাণে আনন্দের সঞ্চার ঘটায়। সুরের লহরি সবাই শুনতে চায়, কিন্তু বেসুর কেউ শুনতে চায় না। দেবীর হাতের বীণা বেসুর সৃষ্টিকারী নয়। এ যে প্রাণের বৈরাগ্য সৃষ্টিকারী ছন্দময় সুর। সেই বীণা তারে সা-রে-গা-মা-পা-ধা-নি এই সপ্তস্বর বাঁধা আছে। এদের প্রথম দুটি বর্ণ ‘স’ এবং ‘র’ যোগে দেবীর নামের আদ্যাক্ষর সূচিত হয় ‘গ’ এবং ‘ম’ যোগে ঊর্ধ্ব গমন করা বোঝায়। ‘প’অর্থে পবিত; পবিত্রতার পরিচয় বহন করে এবং ‘ধ’ অর্থে ধারণ ও ‘ন’ অর্থে আনন্দকে বোঝায়।

শব্দ বিজ্ঞানের ভাষায়, কম্পনের ফলে সৃষ্টি হয় স্বর আর স্বরের সম্মিলিত রূপই হলো শব্দ। ঋগ বেদে বলা হয়েছে, ‘শব্দ ইত:স্ততে ব্রহ্ম।’ অর্থাৎ শব্দই ব্রহ্ম। আর ব্রহ্মকে নিয়ে যে বিজ্ঞান তা-ই শব্দবিজ্ঞান। শব্দহীন দেহ অসার, তাই দেহে যতক্ষণ শব্দ থাকে অর্থাৎ ব্রহ্ম থাকেন ততক্ষণই জীবন আছে বলা যায়। শব্দ নিঃশেষ হলে দেহ অকেজো। অতএব, ব্রহ্মহীন বিজ্ঞানও তখন অর্থহীন।

আবার যোগতত্ত্ব অনুসারে, বীণা মেরুদন্ডের প্রতীক। দেবীর বীণায় তিনটি তার। সেই তার তিনটি জরা প্রকৃতিজাত সত্ত, রজঃ ও তমো গুণকে নির্দেশ করে যা দ্বারা জীব আবদ্ধ থাকে। তেমনি মেরুদন্ডে রয়েছে তিনটি তার, যাদের বলা হয় ঈড়া, পিঙ্গলা ও সুষমা। পরিশেষে বলা যায়, সরস্বতী দেবীর পদধর্মিতা, হংসধর্মিতা, বীণাধর্মিতা, জ্ঞানধর্মিতা জীবনে অনুশীলন করলে জীবন হয় সার্থক ও সুন্দর।

সরস্বতী প্রাচীনতম হিন্দু ধর্মগ্রন্থ বেদসমূহের প্রসূতি।  ঋগ্বেদে বাগ্দেবী ত্রয়ীমূর্তি ভূ: ভুব: স্ব:, জ্ঞানময়ীরূপে সর্বত্রব্যাপিনী। বিশ্বভূবন প্রকাশ তারই জ্যোতিতে। হৃদয়ে সে আলোকবর্তিকা যখন প্রজ্বলিত হয়, তখন জমাট বাধা অজ্ঞানতারূপ অন্ধকার যায় দূর হয়ে। অন্তরে, বাইরে সর্বত্র তখন জ্বলতে থাকে জ্ঞানের পুণ্য জ্যোতি। এই জ্যোতিজ্ঞানই ব্রহ্মজ্ঞান, এই জ্যোতিই সরস্বতী। আলোকময়ী, তাই তিনি সর্বশুক্লা। তিন গুণের মধ্যে তিনি সত্ত্বগুণময়ী, অনন্ত জ্ঞানময় ঈশ্বরের বাক্শক্তির প্রতীক বাগদেবী।

সরস শব্দের অর্থ জল। সরস্বতী=সরস (জল)+মতুন+ঙীন (স্ত্রী)। সরস্বতী শব্দের আদি অর্থ হলো জলবতী অর্থাৎ নদী। স্কন্দ পুরাণে প্রভাসখ-ে দেবী সরস্বতীর নদীরূপে অবতরণের কাহিনী বর্ণিত আছে। গতিময় জ্ঞানের জন্যই  ঋগ্বেদ তাঁকে নদীরূপা কল্পনা করা হয়েছে, যিনি প্রবাহরূপে মহার্ণব বা অনন্ত সমুদ্রে মিলিত হয়েছেন।

মার্কয় পুরাণে শ্রীশ্রীচন্ডী উত্তরলীলায় শুম্ভ নিশুম্ভ নামক অসুরদ্বয়কে বধ করার সময় দেবীর যে রূপ কল্পনা করা হয়েছিল তা ছিল মহাসরস্বতী। এ মূর্তি অষ্টভূজা - বাণ, কার্মূক, শঙ্খ, চক্র, হল, মুষল, শূল ও ঘন্টা ছিল তাঁর অস্ত্র। তাঁর এই সংহারলীলাতেও কিন্তু জ্ঞানের ভাবটি হানি ঘটেনি, কেননা তিনি 'একৈবাহং জগত্যত্র দ্বিতীয়াকা মমাপরা' বলে মোহদুষ্ট শুম্ভকে অদ্বৈত জ্ঞান দান করেছিলেন।

বায়ু পুরাণ অনুযায়ী কল্পান্তে সমুদয় জগৎ রুদ্র কর্তৃক সংহৃত পুনর্বার প্রজাসৃষ্টির জন্য প্রজাপতি ব্রহ্মা নিজ অন্তর থেকেই দেবী সরস্বতীকে সৃষ্টি করেন। সরস্বতীকে আশ্রয় করেই ব্রহ্মার প্রজাসৃষ্টি সূচনা।

ধ্যান বা স্তোত্রবন্দনায়উল্লেখ না থাকলেও সরস্বতী ক্ষেত্রভেদে দ্বিভূজা অথবা চতুর্ভূজা এবং মরালবাহনা অথবা ময়ূরবাহনা। উত্তর ও দক্ষিণ ভারতে সাধারণত ময়ূরবাহনা চতুর্ভূজা সরস্বতী পূজিত হন। ইনি অক্ষমালা, কম-লু, বীণা ও বেদপুস্তকধারিণী। বাংলা তথা পূর্বভারতে সরস্বতী দ্বিভূজা ও রাজহংসের পৃষ্ঠে আসীনা।

সরস্বতী শব্দের দুই অর্থ - একটি ত্রিলোক্য ব্যাপিনী সূর্যাগ্নি, অন্যটি নদী। সরস্ + বতী = সরস্বতী, অর্থ জ্যোতির্ময়ী। আবার সৃ ধাতু নিস্পন্ন করে সর শব্দের অর্থ জল। অর্থাৎ যাতে জল আছে তাই সরস্বতী। ঋগ্বেদে আছে 'অম্বিতমে নদীতমে দেবীতমে সরস্বতী', সম্ভবত সরস্বতী নদীর তীরেই বৈদিক এবং ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির উদ্ভব। শুধু বৈদিক যুগেই নয়, পরবর্তীকালে মহাভারত, পুরাণ, কাব্যে পূতসলিলা সরস্বতীর মহিমা বর্ণিত হয়েছে। সরস্বতী নদীর উৎপত্তিস্থল ছিল হিমালয়ের সিমুর পর্বতে, সেখান থেকে পাঞ্জাবের আম্বালা জেলার আদবদ্রী নামক স্থানে সমভূমিতে অবতরণ করেছিল।

ঋগবেদের যুগে গঙ্গা যমুনা ছিল অপ্রধান নদী, সরস্বতী নদীই ছিল সর্বপ্রধান ও সর্বাপেক্ষা প্রয়োজনীয়। এর তীরে ছিল প্রসিদ্ধ তীর্থভূমি। সরস্বতী ও দৃষদ্বতীর মধ্যস্থান দেবনির্মিত স্থান হিসেবে বিবেচ্য হত। ব্রাহ্মণ ও মহাভারতে উল্লেখিত সারস্বত যজ্ঞ এই নদীর তীরে অনুষ্ঠিত হত। মহাভারত রচনা হওয়ার আগেই রাজপুতানার মরুভূমিতে সরস্বতী নদী অদৃশ্য হয়ে গেলেও কয়েকটি স্রোতধারা অবশিষ্ট ছিল। এই স্রোতধারা হল চমসোদ্ভেদ, শিবোদ্ভেদ ও নাগোদ্ভেদ। রাজস্থানের মরুভূমির বালির মধ্যে চলুর গ্রামের নিকটে সরস্বতী অদৃশ্য হয়েভবানীপুরে দৃশ্য হয়, আবার বলিচ্ছপুর নামকস্থানে অদৃশ্য হয়েবরখের নামক স্থানে দৃশ্য হয়।

প্রাচীনকালে তান্ত্রিক সাধকরা সরস্বতীসদৃশা দেবী বাগেশ্বরীর পূজা করতেন বলে জানা যায়। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পাঠশালায় প্রতি মাসের শুক্লা পঞ্চমী তিথিতে ধোয়া চৌকির ওপর তালপাতার দোয়াত-কলম রেখে পূজা করার প্রথা ছিল। শ্রীপঞ্চমী তিথিতে ছাত্ররা বাড়িতে বাংলা বা সংস্কৃত গ্রন্থ, শ্লেট, দোয়াত ও কলমে সরস্বতী পূজা করত। ইংরেজি বিদেশি ভাষা হওয়ায়সরস্বতী পূজার দিন ইংরেজি বইয়রে পূজা নিষিদ্ধ ছিল।

হিন্দুদের দেবী হওয়া সত্ত্বেও বৌদ্ধ ও জৈনদের কাছেও পুজো পেয়েছেন সরস্বতী। গান্ধারে পাওয়া বীণাবাদিনী সরস্বতীর মূর্তি থেকে বা সারনাথে সংরক্ষিত মূর্তিতে এর প্রমাণ মেলে। অনেক বৌদ্ধ উপাসনালয়ে পাথরের ছোট ছোটো মূর্তি আছে তাতে সরস্বতী বীণা বাজাচ্ছেন, অবিকল সরস্বতীমূর্তি। মথুরায় জৈনদের প্রাচীন নিদর্শনে সরস্বতীর যে মূর্তি পাওয়া গেছে সেখানে দেবী জানু উঁচু করে একটি চৌকো পীঠের উপর বসে আছেন, এক হাতে বই। শ্বেতাম্বরদের মধ্যে সরস্বতী পুজোর অনুমোদন ছিল। জৈনদের চব্বিশজন শাসনদেবীর মধ্যে সরস্বতী একজন এবং ষোলজন বিদ্যাদেবীর মধ্যে অন্যতমা হলেন সরস্বতী। শ্বেতাম্বর ও দিগম্বর উভয় জৈন সম্প্রদায়েই সরস্বতীর স্থান হয়ে গেল ব্রাহ্মণ্য ধর্ম থেকে গৃহীতা একজন প্রধান দেবীরূপে।

জ্ঞান, সংগীত ও শিল্পকলার দেবী হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের বাইরে জাপান, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া এবং মায়ানমারেও সরস্বতী পূজার প্রচলন রয়েছে।

আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরস্বতী পূজার প্রচলন হয়বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে। ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে সরস্বতী দেবী হলেও মেয়েরা অঞ্জলি দিতে পারত না। কিছু প-িতের মতে, সমাজপতিরা ভয় পেতেন হয়তো এই সুযোগে যদিশাস্ত্রের নামে মেয়েরা দাবি করে বসেন লেখাপড়ার স্বাধীনতা !

শাস্ত্রীয় বিধান অনুসারে, শ্রীপঞ্চমীর দিন সকালেই সরস্বতী পূজা সম্পন্ন করা হয় সাধারণ পূজার আচারাদি মেনে। তবে এই পূজায় কয়েকটি বিশেষ উপাচার বা সামগ্রীর প্রয়োজন হয়, যেমন অভ্র-আবির, আমের মুকুল, দোয়াত-কলম ও যবের শিষ, বাসন্তী রঙের গাঁদা ফুল। লোকাচার অনুসারে ছাত্রছাত্রীরা পূজার আগে কুল ভক্ষণ করে না। পূজার দিন লেখাপড়া নিষেধ থাকে। যথাবিহিত পূজার পর লক্ষ্মী, নারায়ণ, লেখনী-মস্যাধার, পুস্তক ও বাদ্যযন্ত্রেরও পূজা করা হয়। পূজার শেষে পুষ্পাঞ্জলি। পরদিন সকালে ফের পূজার পর চিড়া ও দই মেশানো দধিকরম্ব বা দধিকর্মা নিবেদন করে পূজা সমাপ্ত হয় ও সন্ধ্যায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। বসন্ত পঞ্চমীতে অনুষ্ঠিত সরস্বতী পূজার পরের দিনটি বাংলায় শীতলষষ্ঠী। কোনো কোনো পরিবারে এদিন অরন্ধন পালন ও 'গোটা-সেদ্ধ' খাওয়ার প্রথা আছে।

দীর্ঘকাল ধরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এ পুজো হয়ে আসছে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিশেষ করে স্কুলে যেহেতু কোমলমতি কিশোরদের পদচারণা সেহেতু তাদের মনে আন্তঃধর্মীয় সুসম্পর্ক বৃদ্ধিতে এর গুরুত্ব অস্বীকার করার অবকাশ নেই। সরস্বতী পুজো শুধুই বিশুদ্ধ পুজো নয়। পুজোর শাস্ত্রীয় কাজটুকুর বাইরে এর রয়েছে সম্প্রদায়-উত্তীর্ণ সার্বজনীন আবেদন। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক কর্ম বা অনুষ্ঠান যখন এর সঙ্গে সম্পৃক্ত তখন শ্রীপঞ্চমীর ওই দিবসটি এক মহামিলনের দিন হিসেবেই উঠে আসে। অন্য ধর্মের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত হয় এ প্রাণবন্যার সঙ্গে, ধর্মীয় বিভেদ তুচ্ছ হয়ে যায় এ জোয়ারে। বিগত দিনে যখন সরস্বতী পুজো প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রতি বছর অনুষ্ঠিত হতো, তখন বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের পরস্পরের ধর্ম সম্পর্কে জ্ঞান ও শ্রদ্ধা ছিল ব্যাপক।

এ দেশের সংস্কৃতি বহু ধর্ম ও মতের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে। আন্তঃধর্মীয় জ্ঞানচর্চা রুদ্ধ হলে এক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা পায় এবং তা অন্যের জন্য অমর্যাদাকর ও রাষ্ট্রের জন্য মারাত্মক হয়ে ওঠে। দেশের প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আজও আর সরস্বতী পুজো অনুষ্ঠিত হয় না। এমনকি রাজধানী ঢাকাতেও নয়। এর মূল কারণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান ও পরিচালনা পরিষদের অনাগ্রহ এবং পূজারিদের অগ্রর্বতী হওয়ার সাহসের অভাব। কিন্তু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ধর্ম নির্বিশেষে ওই প্রতিষ্ঠানের সব ছাত্রছাত্রী। বৃহৎ অংশের ছাত্রছাত্রী তার সহপাঠী বা বন্ধু বা প্রতিবেশীর ধর্মচর্চা সম্পর্কে থেকে যাচ্ছে সম্পূর্ণ অন্ধকারে। এ অন্ধকার সারাজীবন তার পিছু ছাড়বে না।

আবার একটি জিনিস গত কয়েক বছর ধরে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে চাঁদাবাজিতে মেতে উঠছে একটি গোষ্ঠী। যত্র তত্র সরস্বতী পূজার নাম করে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে তারা মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। বিদ্যার দেবীকে আরাধনা করতে নিজের কষ্টার্জিত আয়ই যথেষ্ট-এর জন্য মানুষের কাছে টাকা ভিক্ষার প্রয়োজন পড়ে না। চাওয়া পয়সায় সাড়ম্বরে না হোক সাদামাটাভাবে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দেবীকে আরাধনা করলেই দেবী তুষ্ট হবেন এটাই সত্য। আমাদের নৈতিকতা নষ্ট হতে হতে আমরা এত বেশী নীচে নেমে গেছি যে, পূজার নামে টাকা তুলে নিজের পকেটে ভরতেও এখন আর কুন্ঠা বোধ করি না। সরস্বতী পূজার সংখ্যা বাড়–ক এটা যেমন আমাদের কাম্য তেমনি পূজাকে কেন্দ্র করে কেউ যেন চাঁদাবাজি করে আমাদের সনাতনধর্মেরসুনামকে ক্ষুন্ন না করে সেদিকেও সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।

তারপরও আমরা নতুন আশায় স্বপ্ন বুনি। সে যার অবস্থানে থেকে যার যার প্রতিষ্ঠানে বিদ্যার দেবীকে আরাধনার চেষ্টা করি। আর এখানে মিলিত হয় জনতার স্রোত। সংহতি ও সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত, সার্বজনীন মিলনমেলার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হয়ে ওঠে প্রতিটি আনন্দময় পূজা প্রাঙ্গণ। সরস্বতী তখন শুধুই বিশেষ ধর্মেরদেবী থাকেন না, হয়ে ওঠেন প্রশান্তির আলোকস্নাত অনাবিল ঋদ্ধির নাম।

সরস্বতী মাতা জ্ঞান-বুদ্ধি-চেতনা দিয়ে আমাদের বিবেক জাগ্রত করুন, আমরা যেন সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে জাতি-ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে সকল হানাহানি-ভেদাভেদ ভুলে মানবতা আর মনুষ্যত্বের জয়গান গেয়ে এই পৃথিবীতে আমাদের জন্মকে স্বার্থক করতে পারি। জগতের সকল জীব সুখী হোক এবং সাম্প্রদায়ীক সম্প্রীতির জয়গান ছড়িয়ে পড়ুক সবর্ত্র  বাণী বন্দনার শুভলগ্নে এই হোক আমাদের প্রার্থনা।

হৈমন্তী স্নেহা ২য় বর্ষ তড়িৎ কৌশল বিভাগ, ঢাকা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়

Bootstrap Image Preview