Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ শনিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৪ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

আমি অমরত্ব লাভ করতে চাইঃ কুদ্দুস বয়াতি

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ জানুয়ারী ২০১৮, ১০:১০ AM
আপডেট: ০৬ মে ২০১৮, ০৮:৫৩ PM

bdmorning Image Preview


‘গ্রামগঞ্জের কাঁদামাটি থেকে উঠে আসা একজন মানুষ আমি। এমন কোন কাজ নেই যা আমি করিনি। এমন একটি অবস্থান থেকে বিশ্ব পরিসরে উঠে আসাটা কষ্টের’ কথাগুলো বলছিলেন বাউল শিল্পী কুদ্দুস বয়াতি। আজকের অবস্থানে আসার পিছনে তার কষ্টগুলোর সঙ্গে নতুন স্বপ্নের কথা জানতে বিডিমর্নিং এর সাথে কথা হলো কুদ্দুস বয়াতির। সাক্ষাতে ছিলেন নিয়াজ শুভ-

আজকের এই অবস্থানে আসার গল্পটা জানতে চাই...

কুদ্দুস বয়াতিঃ আমি একটি গান লিখেছি, আমার পাগলা ঘোড়া রে কই মানুষ কই নিয়ে যাও। একজন মানুষ সবসময় উপরে উঠার চেষ্টা করে। নিজেকে প্রসার করে। আমি লেখাপড়া করিনি। সেখান থেকে যতটুকু চেষ্টা করা যায় আমি ততটুকুই করেছি। আমি চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখিনি। যে কারণে তৃণমূল কাঁদা মাটি থেকে ধীরে ধীরে কত নদী-নালা, পাহাড়-পর্বত পেরিয়ে আজ আমার এই অবস্থান। এসব বলে শেষ করা যাবে না।

কোন বাঁধার সম্মুখীন হয়েছেন?

কুদ্দুস বয়াতিঃ আমাকে কত বাঁধার সম্মুখীন হতে হয়েছে তা আমি আর আমার সঙ্গে থাকা মাবূত দেখেছেন। আমি কতটা লাঞ্চনা, যতনা সহ্য করেছি তিনি এটা বুঝেছেন মনে হয়। কত প্রেম ভালোবাসায় সাগর সাঁতরে, মায়ানদীর জলে কত কষ্ট করে, কত অনাহারে এসব বলার শেষ নেই। সেই দিনগুলোতে কষ্ট করেছি বলেই আমাকে আমি এতটুকু পৌঁছাতে পেরেছি।

উপরে উঠার সিঁড়িতে কারো সাহায্য পেয়েছেন?

কুদ্দুস বয়াতিঃ আমার উপরে উঠার সিঁড়িতে কত সাধু, কত মানুষের সাথে দেখা হয়েছে। আমার এই উপরে উঠার সিঁড়িতে প্রথম সহযোগিতার হাত বাড়ান মোঃ সাইদুর। তার বাড়ি কিশোরগঞ্জে। তিনি বাংলা একাডেমীর একজন কর্মকর্তা ছিলেন। এছাড়াও শামছুজ্জামান খান থেকে শুরু করে হারুনুর রশিদ অনেকেই আছে। সকলের নাম বলে আমি শেষ করতে পারব না। আমাকে সহযোগিতা না করেছে এমন ব্যক্তি মনে হয় নেই। আমি এক টাকা থেকে উঠে এসেছি। একজন ব্যক্তি কুদ্দুইসা থেকে কুদ্দুস বয়াতি কিভাবে হয়ে উঠতে পারে? প্রেম ভালোবাসায় কত মানুষের মন জয় করার পরে কেউ বিশ্ব দরবারে উঠে আসে।

কত বছর বয়সে গান শুরু করেছেন?

কুদ্দুস বয়াতিঃ ১৩ বছর বয়স থেকে।

বাউল শিল্পীদের বর্তমান দিন কেমন যাচ্ছে?

কুদ্দুস বয়াতিঃ আমাদের দেশ পীর আউলিয়ার দেশ। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো এই দেশে এখন শান্তি বলতে আর কিছুই নেই। আগে আমাদের হাজার হাজার লোকজ শিল্পীরা গ্রামগঞ্জে গান গাইত। এখন আর সে গানগুলো হচ্ছে না। গান বন্ধ হওয়ায় আমাদের বেশ কষ্টে দিন পার হচ্ছে।

এমন পরিস্থিতির কারণ কি?

কুদ্দুস বয়াতিঃ এই দেশে রোহিঙ্গা সমস্যা। বন্যায় চলে গেলো ছয় মাস। বাংলাদেশের যত ভেজাল সব ভেজালের জন্য ক্ষতি হয় শুধু শিল্পীদের। কারণ শিল্পীকে চেয়ে দেখবার মতো মানুষ এই দেশে নাই। এদেশের মানুষ শুধু নিজের চিন্তা করে। সে কিভাবে বড় হবে, তার বংশ কিভাবে বড় হবে শুধু সেটাই ভাবে। বাহিরেও যে তার কিছু করার আছে সেটি ভুলে যায়। আমি নিজেই যে কষ্টে আছি তাহলে আমাদের লোকজ শিল্পীরা কেমন কষ্টে আছে একবার ভাবুন। তারা একটি বাদ্যযন্ত্রের জন্য গান গাইতে পারছে না।

তাদের জন্য আপনি কিছু করেছেন?

কুদ্দুস বয়াতিঃ আমি আমার সংসার চালিয়ে, ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া করিয়ে সবকিছু পরিচালনা শেষে যা থাকে সেটি জমিয়ে তাদের জন্য কাজ করছি। এই সুবাদে আমি কুদ্দুস বয়াতি ফাউন্ডেশন করেছি। সেখান থেকে আমি লোকজ ইনস্টিটিউট ও লোকজ জাদুঘর নির্মাণ করবো। আমি করতে চেয়েছিলাম হুমায়ূন আহমেদ জাদুঘর। কিন্তু সেটি আর হলো না। আমার ওস্তাদের স্ত্রী শ্রদ্ধেয় শাওন ম্যাডাম উনি এটি করবেন। এজন্য আমি হুমায়ূন আহমেদ নাম বাদ দিয়ে লোকজ জাদুঘর নাম দিয়েছি।

লোকজ জাদুঘরে কি কি সংরক্ষিত থাকবে?

কুদ্দুস বয়াতিঃ আমাদের লোকজ সংগীতের যারা প্রয়াত হয়ে গেছে তাদের প্রতিচ্ছবি আমি রাখতে চাই।

জাদুঘরটি কোথায় হবে?

কুদ্দুস বয়াতিঃ নেত্রকোনার কেন্দুয়ায়। হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি কেন্দুয়ায় আমার বাড়িও কেন্দুয়ায়। তাই সেখানেই জাদুঘর রেখেছি।

কাজ শুরু হয়েছে?

কুদ্দুস বয়াতিঃ সাধ্যমত কিছু কাজ শুরু করেছি। ২০১৩ সালে রেজিস্টেশন করেছি। ৫০ শতাংশ জমিতে ২০০০ ফুট বর্গ একটি একতলা ভবন করেছি। ভবনটি চারতলা ফাউন্ডেশন দিয়েছি। আমি এখন আর কাজ আগাতে পারছি না। তিন বছর যাবৎ কাজ বন্ধ। সরকার ও বেসরকারি সংস্থার কেউ যদি সাহায্য করেন তাহলে আমি আমার স্বপ্ন সত্যি করতে পারবো। আমার এই লোকজ ইনস্টিটিউটের কাজ শেষ করার জন্য কুদ্দুস বয়াতি ফাউন্ডেশনে যদি কেউ সাহায্য করেন তার নাম আমার ইনস্টিটিউটের সামনে কষ্টি পাথরে লেখা থাকবে।

শেষ বয়সে শিল্পীদের দৈনতা নিয়ে কিছু বলুন...

কুদ্দুস বয়াতিঃ সরকার একজন শিল্পীকে ভাতা দেন ১৩০০-২০০০ টাকা। এই টাকায় শিল্পীর সংসার চলে না। যারা সরকারি চাকরি করছে তারা বেতন পাচ্ছে, পেনশন পাবে। আমরা শিল্পীরা মানুষকে আনন্দ দিলাম, দেশের জন্য গান গেয়ে গেলাম বিনিময়ে কি পেলাম? শেষ মুহূর্তে আমাদের হাতে ভিক্ষার ঝুলি থাকে। ভিক্ষা করে মরতে হয়। একজন মানুষ বেঁচে থাকতে সম্মান দাও। সে মরে গেলে অসম্মান করার দরকার নাই। মরার পর তাকে তার প্রাপ্তি দিলে লাভ কি, সে তো দেখে যেতে পারলো না।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কি?

কুদ্দুস বয়াতিঃ সবাই যখন মরে যায়, কিছু না কিছু রেখে যায়। আমি কি রেখে যাবো? আমি আমার সৃষ্টি রেখে যেতে চাই। সবার মধ্যে বেঁচে থাকতে চাই। লোকজ গানকে বাঁচিয়ে রাখতে চাই। আমি অমরত্ব লাভ করতে চাই।

এতক্ষণ সময় দেয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

কুদ্দুস বয়াতিঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

Bootstrap Image Preview