Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৪ সোমবার, সেপ্টেম্বার ২০১৮ | ৯ আশ্বিন ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

শিক্ষদের  আন্তরিকতায় বদলাচ্ছে গাইবান্ধার প্রতিবন্ধী শিশুদের জীবন

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৬ জানুয়ারী ২০১৮, ০৩:১২ PM আপডেট: ০৬ জানুয়ারী ২০১৮, ০৩:১৪ PM

bdmorning Image Preview


ফরহাদ আকন্দ,গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ

তিন বছর ধরে এমপিওভুক্তির আশায় সরকারের দিকে চেয়ে রয়েছেন গাইবান্ধার সাত উপজেলার ১১৬টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের দুই সহস্রাধীক শিক্ষক-কর্মচারী। এসব বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষকরা বিনাবেতনে পাঠদান করছেন। বর্তমানে এসব বিদ্যালয় ও প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য নেই সরকারি সহযোগিতা। কোন বেতন ভাতা না পেলেও বেশ আন্তরিকতার সাথেই পাঠদান ও অন্যান্য কর্মকান্ড পরিচালনা করছেন বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা।

সুইড বাংলাদেশ গাইবান্ধা জেলা শাখা সুত্রে জানা যায়, সমাজ কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্পের অধীনে গাইবান্ধার সাত উপজেলায় ২০১৫ সাল থেকে ১১৬টি বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা সুইড বাংলাদেশ এসব বিদ্যালয় পরিচালনা করে থাকে। এসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন দুই হাজারের বেশি আর প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তি লেখাপড়া করছে দশ হাজারেরও বেশি। বর্তমানে স্বেচ্ছাশ্রমে এসব প্রতিবন্ধীদের পাঠদান করাচ্ছেন শিক্ষকরা।

বিদ্যালয়গুলোতে প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশু ও ব্যক্তিরা ভর্তি হওয়ার পর থেকে বদলে যাচ্ছে তাদের জীবন। আগে যারা স্পষ্ট করে কথা বলতে ও লিখতে পারতো না,  চিনতো না বাংলা ও ইংরেজী বর্ণমালা, বুঝতো না পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা। তারাই এখন স্পষ্ট করে কথা বলতে পারে, লিখতে পারে, চেনে বর্ণমালা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও তারা এখন অনেক সচেতন। এ সবকিছুই সম্ভব হচ্ছে বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্তরিকতায়। এসব প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের যাতায়াতের জন্যও রয়েছে রিকসা-ভ্যানসহ বিভিন্ন যানবাহন।

আর তাই এসব বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের সুদিন ফিরতে শুরু করেছে। এমতাবস্থায় এই ধারা অব্যাহত রাখতে হলে খুব দ্রুত বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়গুলো এমপিওভুক্ত করতে হবে। তা না হলে এসব বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীরা অন্যপেশায় চলে যাবেন। বন্ধ হবে বিদ্যালয়গুলো। ফলে আবারও অবহেলা ও অসহযোগিতায় পিছিয়ে যাবে প্রতিবন্ধীরা। এসব বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ইতোমধ্যে ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে।

সাদুল্লাপুর উপজেলার রসুলপুর ইউনিয়নের জয়দেব বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ২০১৫ সালে। বিদ্যালয়ে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৪২জন আর প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তি ভর্তি রয়েছেন ১৭৩জন। গাইবান্ধা জেলা শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায়, শিক্ষকরা শ্রেণিকক্ষে প্রতিবন্ধী শিশুদের পাঠদান করছেন। ফিজিওথেরাপিস্ট গোলাম মোস্তফা এক শিশুর দাঁত ব্রাশ করে দিচ্ছেন।

অভিভাবক জোসনা বেগম বলেন, আমার মেয়েটা আগে কিছু বুঝতো না। এখন মানুষের সাথে মেশে। কথা বলার চেষ্টা করে, বাবা-মা বলে ডাকে। ইশারার মাধ্যমে পায়খানা-প্রসাব করার কথা বোঝায়। দিন-দিন তাদের অনেক উন্নতি হচ্ছে।

প্রধান শিক্ষক রফিকুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবন্ধীদের জীবনপট পাল্টে উন্নতির দিকে ধাবিত হচ্ছে। তারা এখন অনেক কাজে পারদর্শী হয়ে উঠছে। কিন্তু আমাদেরই কেবল কোন উন্নতি হচ্ছে না। বিদ্যালয় থেকে কেউ কোন প্রকার বেতন ভাতা পাচ্ছি না। ফলে অনেক কষ্ট করে সংসার চালাতে হচ্ছে শিক্ষক-কর্মচারীদের। এসব বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির আওতায় আনা জরুরী। তা না হলে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাবে। এমপিওভুক্তির জন্য আমরা সরকারের সুদৃষ্টি কামনা করছি।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের উত্তর ধানঘড়া এলাকায় সরকারপাড়া বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ২০১৫ সালে। এতে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছেন ৪২ জন আর প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তি ভর্তি রয়েছে ১৮৩ জন। প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের শিক্ষা উপকরণসহ ব্যায়াম করার জন্য বিভিন্ন উপকরণ রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীদের আন্তরিকতায় এই বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিশুরাও এখন অনেক কাজে পারদর্শী হয়ে উঠেছে। রয়েছে ফিজিওথেরাপিষ্টসহ সংগীত ও বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষক।

প্রধান শিক্ষক জাহানারা আক্তার বলেন, বিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের অনেক উপকার হচ্ছে। আমরা সেবা দিয়ে যাচ্ছি কিন্তু কোন আর্থিক সুবিধা পাচ্ছি না। বিদ্যালয়টিকে তাড়াতাড়ি এমপিওভুক্তি করার জন্য সরকারের প্রতি আহবান জানাই।

বিদ্যালয়টির সভাপতি আব্দুর রশিদ বলেন, প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তিদের উন্নয়নে তাদের চাহিদা মতো সকল প্রকার শিক্ষা ও ব্যায়ামের উপকরণ রয়েছে। জমি কেনা, অবকাঠামো তৈরিসহ বিভিন্ন খাতে ইতোমধ্যে এসব বিদ্যালয়ের পেছনে ১০ থেকে ২৫ লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। এতকিছু করার পরও বিদ্যালয়গুলোতে সরকারের কোন সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না। তাই এসব বিদ্যালয়গুলোকে টিকিয়ে রাখতে হলে শীঘ্রই এমপিওভুক্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।

গাইবান্ধা জেলা শহর সংলগ্ন সদর উপজেলার খোলাহাটি ইউনিয়নের নতুন ব্রীজ এলাকায় রহিম-আফতাব বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়টি স্থাপিত হয় ২০১৬ সালে। এখানে শিক্ষক-কর্মচারী রয়েছে ১৮জন আর প্রতিবন্ধী শিশু ভর্তি রয়েছে ৭০জন। এই বিদ্যালয়েও রয়েছে প্রতিবন্ধী শিশুদের ব্যায়ামসহ বিভিন্ন ধরনের শিক্ষা উপকরণ এবং খেলার সরঞ্জামাদি।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক এস কে এ টি এম রওশন হাবীব বলেন, প্রতিবন্ধী এসব শিশুদের টিফিনে নাস্তা, অসচ্ছল শিশুদের যাতায়াতের টাকা, স্কুলের ব্যাগ ও পোষাক দিতে হয়। এবার তাদেরকে সোয়েটার ও কম্বল দেওয়া হয়েছে। আমাদের বিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী শিশুরা ইতোমধ্যে লং জাম্প, দৌড় ও বল নিক্ষেপে জেলা পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় চারটি পুরষ্কার পেয়েছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের আরও উন্নয়ন ও উৎসাহিত করতে বিদ্যালয়টি এমপিওভুক্ত করা প্রয়োজন।

সুইড বাংলাদেশ গাইবান্ধা জেলা শাখার সমন্বয়কারী ময়নুল ইসলাম রাজা বলেন, বিদ্যালয়গুলোর কারণে প্রতিবন্ধী শিশু, ব্যক্তি ও পরিবারের সদস্যদের অনেক উপকার হচ্ছে। বিদ্যালয়গুলো চালু রাখতে হলে খুব দ্রুত এমপিওভুক্ত করতে হবে। কেননা বিদ্যালয়গুলো প্রতিষ্ঠার পর থেকে শিক্ষক-কর্মচারীরা কোনপ্রকার বেতনভাতা পাচ্ছেন না। যদি খুব দ্রুত এসব বিদ্যালয় এমপিওভুক্ত করা না হয় তবে বিদ্যালয়গুলো বন্ধ হয়ে যাবে।

এসব বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক বিদ্যালয়ের মত জেলার আরও ১১৩টি বিদ্যালয়ের মাধ্যমে ১০ সহস্রাধীক প্রতিবন্ধী শিশু ও ব্যক্তির সুদিন ফিরছে। তাই এসব বিদ্যালয়কে খুব দ্রুত এমপিওভুক্তির আওতায় আনার দাবী জানিয়েছেন গাইবান্ধার সচেতন সমাজ।

Bootstrap Image Preview