Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৮ বৃহস্পতিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৩ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বাজেটের লক্ষ্য ঠিক হলেও পৌঁছানোর পথ জানা নেই

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৮ জুন ২০১৮, ১০:৫৬ AM
আপডেট: ২৫ জুন ২০১৮, ০৫:৪৮ PM

bdmorning Image Preview


বিডিমর্নিং ডেস্ক-

কিভাবে এ লক্ষ্য পূরণ হবে তার ছক না কষে আগামী অর্থবছরে অভ্যন্তরীণ সম্পদ এবং সাধারণ মানুষের কাছ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেই দায় সারলেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, আদায়ে যথাযথ কৌশল না রেখে লাগাম ছাড়া রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ অর্থনীতিকে ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।

অর্থনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, নির্বাচনকালীন বাজেট বলে অনেক ক্ষেত্রেই রাজস্ব আরোপের বদলে ছাড় দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মুষ্টিমেয় খাতে সুবিধা দিয়ে কিছু মানুষকে পক্ষে টানার চেষ্টা রয়েছে। সাধারণ মানুষ কতটা সুবিধা পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে।

আগামী অর্থবছরে এনবিআর এর জন্য দুই লাখ ৯৬ হাজার ২০১ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। চলতিবারের মতো ভবিষ্যতেও ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক) হচ্ছে রাজস্ব আদায়ের প্রধান খাত। ভ্যাটে চলতিবারের সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ৮২ হাজার ৭১৩ কোটি থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ১০ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। ভ্যাটের চেয়ে সামান্য কমিয়ে আয়করে চলতিবারের সংশোধিত  লক্ষ্যমাত্রা ৭৭ হাজার ৭৩৬ কোটি থেকে বাড়িয়ে এক লাখ ৭১৯ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সম্পূরক শুল্ক ৩৪ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা বাড়িয়ে ৪৮ হাজার ৭৬৬ কোটি টাকা, আমদানি শুল্ক ২৬ হাজার ৫৩৮ কোটি থেকে বাড়িয়ে ৩২ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা, আবগারি শুল্ক এক হাজার ৬৬৪ কোটি থেকে বাড়িয়ে দুই হাজার ৯০ কোটি টাকা ধরা হয়েছে। তবে কমানো হয়েছে অন্যান্য কর—এক হাজার ৫৪৩ কোটি থেকে এক হাজার ৪৮২ কোটি টাকা এবং রপ্তানি শুল্ক ৪০ কোটি টাকার বদলে ৩৬ কোটি টাকা ধরা হয়েছে।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, বাজেটের আকারের সঙ্গে সঙ্গে হিসাব মেলাতে এনবিআরের রাজস্ব আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। এটি যুক্তিসংগত নয়। এর ফলে ঘাটতিতে পড়তে হবেই। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নও সম্ভব হবে না। সরকারকে ঋণ করতে হবে। সঞ্চয়পত্রে নির্ভরশীলতা বাড়বে। এতে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।

এনবিআরের কাছ থেকে প্রতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ বাড়ালেও এনবিআরবহির্ভূত আয় তেমন বাড়ানো হয় না। আগামীবারও এর ব্যতিক্রম নয়। এনবিআরবহির্ভূত আয় মাদক শুল্ক, যানবাহন কর, ভূমি রাজস্ব, স্ট্যাম্প বিক্রি থেকে সাত হাজার ২০২ থেকে বাড়িয়ে ৯ হাজার ৭২৭ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।

গতকাল জাতীয় সংসদে বাজেট প্রস্তাব পেশকালে অর্থমন্ত্রী লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে আগামী অর্থবছরে করনীতি সংস্কারে সফলতার কথা বলেন। অথচ বর্তমান সরকারের গত এবং চলতি মেয়াদে আয়কর, ভ্যালু অ্যাডেড ট্যাক্স (ভ্যাট) বা মূল্য সংযোজন কর (মূসক), শুল্ক আইন এখনো চূড়ান্ত করতে পারেননি। এনবিআর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে করদাতাদের হয়রানি করার অভিযোগ। এমন প্রেক্ষাপটে অর্থমন্ত্রী আকাশছোঁয়া লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অকূল সাগরে খড়কুটা ধরে ভেসে থাকার মতো বললেন, এনবিআর কর্মকর্তাদের মানসিকতার পরিবর্তন হয়েছে, যা লক্ষ্যমাত্রা পূরণে সহায়ক হবে।

বছর বছর জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও করমুক্ত আয়সীমা বাড়ালেন না। ফলে যেসব খেটে খাওয়া মানুষ কর দিচ্ছে তাদের ওপরই রাজস্বের চাপ রাখা হলো। আগামী পাঁচ বছরে করদাতার সংখ্যা এক কোটি এবং রিটার্ন দাখিলের সংখ্যা ৮০ লাখে উন্নীতের কথা বললেও বাজেট প্রস্তাবে রাজস্ব জালের বাইরে থাকা কর প্রদানে সক্ষম ব্যক্তিদের চিহ্নিতকরণে কার্যকরী কৌশলের কথা জানালেন না। বিশেষভাবে উপজেলা পর্যায়ের সম্পদশালীদের খুঁজে পেতে এনবিআরের প্রতি নির্দেশনা নেই।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা মির্জ্জা এ বি আজিজুল ইসলাম বলেন, ১৬ কোটি মানুষের এ দেশে করদাতার সংখ্যা মাত্র ৩০ লাখ ছাড়িয়েছে। তাদের বেশির ভাগই সরকারি চাকরিজীবী। অসংখ্য মানুষ করজালের বাইরে আছে। যারা কর দিচ্ছে, লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে তাদের ওপর ভার বাড়ানো হচ্ছে। অতীতের মতো এবারও করদাতা এক কোটি করবেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু করজাল সম্প্রসারণে অর্থমন্ত্রী এনবিআরের সামনে কার্যকরী কোনো কৌশল রাখেননি। কঠোর কোনো নির্দেশনা দেননি।

রাজস্বসংক্রান্ত মামলাজটে আটকে আছে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। রাজস্ব বাজেট প্রস্তাবে বছরের পর বছর অনাদায়ি এসব অর্থ আদায়েও সমাধান দেওয়া হলো না। ভ্যাট আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা সবচেয়ে বেশি ধার্য করেও অনেক ক্ষেত্রেই ছাড় দেওয়া হয়েছে। এতে সরকারের রাজস্ব আদায় কমবে। ভ্যাটের স্তর কমিয়ে আনা হয়েছে। ফেসবুক, গুগল, ইউটিউবের মতো অধিক ব্যবহৃত খাত থেকে রাজস্ব আদায়ের কথা বলা হয়েছে। কোন কৌশলে আদায় হবে, তা স্পষ্ট করেননি। সারা দেশে আট লাখের কিছু বেশি প্রতিষ্ঠান এনবিআরে ভ্যাট নিবন্ধিত।

সারা দেশে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান ভ্যাট না দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে ভ্যাটের জালে এনে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ সম্ভব হলেও আগামী বাজেটে এনবিআর সে পথে যায়নি, বরং মোট ভ্যাটের শতকরা ৬০ ভাগ পরিশোধকারী বৃহৎ করদাতা ইউনিটের (ভ্যাট) আওতায় থাকা দেশের বড় মাপের ১৫৭ প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায় বাড়াতে চেপে ধরা হলো। আগামীবারও এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আদায়ে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভরতায় অনেক দেশই রাজস্ব আদায়ে প্রায় শতভাগ সফল অর্জন করেছে। অথচ প্রযুক্তি ব্যবহারে এনবিআরকে আগামী অর্থবছরেও বাধ্য করা হলো না।

সীমিত আকারে অনলাইন ব্যবহারের কথা জানানো হলো, একই সঙ্গে ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলেরও সুযোগ রাখা হলো। বাজেট প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পরীক্ষামূলকভাবে বৃহৎ করদাতা ইউনিটে (ভ্যাট) অনলাইন চালু হবে। পাশাপাশি প্রচলিত পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিলের সুযোগ থাকছে। বড় মাপের কিছু প্রতিষ্ঠানে ইসিআর ব্যবহারের কথা থাকলেও সারা দেশে এর ব্যবহারের কথা বলা হলো না।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আব্দুল মজিদ বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্যে লাভবান না হলেও বড় মাপের এসব প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর অর্থই হলো পরিশোধে চাপ সৃষ্টি করা। অর্থাৎ যারা রাজস্ব দিচ্ছে, তাদের ওপর আবারও চাপানো হলো। যারা দিচ্ছে না তারা আবারও আড়ালেই থাকছে। বাজেটে ফাঁকিবাজদের চিহ্নিতে কিছু নেই।

জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হলেও সরকারি সংস্থার বিভিন্ন প্রশ্নের মুখে পড়ার ভয়ে অনেকে এ সুযোগ নেয় না, বরং গোপনে বিদেশে অর্থ পাঠিয়ে নিশ্চিন্তে থাকে।

এনবিআরের প্রাক-বাজেট আলোচনাকালে এনবিআরের চেয়ারম্যান মো. মোশাররফ হোসেন ভুঁইয়া অনেকবারই বলেছেন, অর্থপাচার রোধে দেশের অর্থ দেশে বিনিয়োগ ও ব্যবহারের সুবিধা দিতে হবে। এতে অর্থনীতি গতশীল হবে; সরকারের রাজস্ব আয় কয়েক গুণ বাড়বে। পরবর্তী বাজেটে এ বিষয়গুলো গুরুত্ব দিয়ে দেখা হবে বলেও তিনি আশ্বাস দেন।

তবে বাজেট প্রস্তাবে উল্টো পথে হেঁটেছে এনবিআর। নতুন বিধি-বিধান যোগ করে সৎ ধনী ব্যক্তিদের রাজস্বের ভার আরো বাড়ানো হলো। বাজেট প্রস্তাবে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হলো, বেশি সম্পদশালীদের আগের মতোই নিয়মিত রাজস্বের সঙ্গে বাড়তি যোগ করে পরিশোধ করতে হবে। এর সঙ্গে নিজ নামে দুটি গাড়ি বা সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট আট হাজার বর্গফুট আয়তনের গৃহ-সম্পত্তি থাকলে আরো  ১০ শতাংশ হারে সারচার্জ পরিশোধ করতে হবে।

বাজেট প্রস্তাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘সারচার্জের ক্ষেত্রে কিছুটা সংস্কার করে নিট পরিসম্পদের ভিত্তিতে সারচার্জ আরোপের পাশাপাশি যাদের নিজ নামে দুটি করে গাড়ি আছে বা সিটি করপোরেশন এলাকায় মোট আট হাজার বর্গফুট আয়তনের গৃহ-সম্পত্তি আছে, তাদেরও সারচার্জের আওতায় আনার প্রস্তাব করছি।’ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন প্রতিবেদনে আমদানি-রপ্তানিতে মিথ্যা তথ্য ব্যবহার করে হাজার হাজার কোটি টাকা পাচারের হিসাব পাওয়া যায়। ব্যবসায়ীদের দাবি মানতে গিয়ে শিল্পের অনেক খাতে ছাড় দেওয়া হলেও আগামী অর্থবছরে এ দুর্নীতি রোধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, মানুষ অর্থ উপাজন করে বিনিয়োগ, ভোগ এবং সঞ্চয়ের জন্য। এ দেশে সঞ্চয় করা হলে প্রশ্ন তোলা হয়। বিনিয়োগের রাস্তা কঠিন করা হয়। অন্যদিকে ভোগের সুযোগ কমানো হয়। ফলে আয় করা অর্থ বিদেশে পাঠিয়ে দিয়ে ভোগ ও সঞ্চয় করে থাকে। এভাবে দেশ থেকে অর্থপাচার বাড়ছে।

Bootstrap Image Preview