Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ শুক্রবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৩ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

তাসফিয়ার স্পর্শকাতর অঙ্গে নির্যাতনের ছাপ, বাবার দাবি গণধর্ষণ

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৪ মে ২০১৮, ০২:২৫ PM
আপডেট: ০৪ মে ২০১৮, ০২:৫৭ PM

bdmorning Image Preview


মেরিনা মিতু।।

তাসফিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যা করেছে পাষণ্ডরা। ধর্ষণ শেষে হত্যা করে লাশটি ফেলে দেয়া হয় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতের উপকূলে। এমনটাই দাবি করেছেন তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন।

গতকাল বৃহস্পতিবার (৩ এপ্রিল) দুপুরে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের মর্গের সামনে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন তিনি। তিনি দাবী করেন, আদনান ও তার সহযোগীরা এসব করেছে। জড়িতদের গ্রেফতার করে সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি করেন সন্তানহারা হতভাগ্য এই বাবা।

বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে আদনান মির্জাকে ১ নম্বর আসামি করে আরও ৫ জন-  সোহাইল (১৬), শওকত মিরাজ (১৬), আসিফ মিজান (২৩), ইমতিয়াজ সুলতান ইকরাম (২৪) ও ফিরোজ (৩০) এর নামে সিএমপির পতেঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেছেন তাসপিয়ার বাবা। তাদের মধ্যে ফিরোজ নগরীর শীর্ষ সন্ত্রাসী।  তার বিরুদ্ধে পাঁচলাইশসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে। কয়েক মাস আগে সে অস্ত্রসহ র‌্যাবের হাতে গ্রেফতার হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে শেভরন নামে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে ডাকাতি মামলাও রয়েছে।

তাসফিয়ার বাবা মোহাম্মদ আমিন বিডিমর্নিংকে মুঠোফোনে জানান,  'আমার ফুটফুটে মেয়েটারে কিভাবে মেরে দিলো! আমি আগেই জানতাম ছেলেটা সুবিধার না। তাই শাসন করেছিলাম আমার মেয়ের সাথে মিশতে। আর সেই আমার মেয়েরে এতো নির্যাতিত হয়ে মরতে হলো। না জানি কি কি ঘটেছিলো আমার মেয়ের সাথে। আমার ছোট্ট মেয়েটা সেটা কিভাবে সহ্য করেছে। আমার মেয়েটা আর নেই আমাদের মধ্যে। বাবা হিসেবে এখন আমি মনে করি, মেয়েটারে সঠিক বিচার পাইয়ে দিতে হবে। আর নয়তো দুনিয়ার সকল বাবারা অপরাধী হয়ে থাকবে তাসপিয়ার কাছে।'

'আমার মেয়েটারে আমি ফোন দিয়ে বাসায় আসতে বলি সেদিন সন্ধায়। কিভাবে জানবো, মেয়ে আমার লাশ হয়ে ফিরবে।' বলেই কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন তাসফিয়ার মা নাইমা।

কী আছে সুরতহালে রিপোর্টে? বুধবারে আড়ালে থাকা সূত্রগুলো-

বুধবার তাসফিয়ার লাশ উদ্ধারের পর সুরতহাল  রিপোর্ট তৈরি করেছেন সিএমপি পতেঙ্গা থানার উপপরিদর্শক আনোয়ার। প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এই কিশোরীর ওপর চালানো ভয়াবহ চিত্র। নিহত তাসফিয়ার পিঠজুড়ে পাওয়া গেছে নির্যাতনের ছাপ।

কিশোরীটির পিঠ, বুক ও স্পর্শকাতর অঙ্গসহ সব স্থানেই দেখা গেছে ভয়াবহ নির্যাতনের ছাপ। গোলাকার মুখমণ্ডল থেঁতলানো। চোখ দুটোও যেন নষ্ট করে দেয়া হয়েছে। আর বুকের ওপর একাধিক আঁচড়ের দাগও দেখা গেছে। নিহতের হাতের নখগুলো ছিল নীলবর্ণ।

জানা গেছে,  মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আদনানের সাথে দেখা করতে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়  তাসফিয়া। এর কিছুক্ষণ পর তাসফিয়াকে কল করেন মা নাঈমা সিদ্দিকা। আর মায়ের কল পেয়ে চটজলদি বেরিয়ে যান নগরীর গোলপাহাড় মোড়ের চায়না গ্রিল নামক চাইনিজ রেস্টুরেন্ট থেকে।  রেস্টুরেন্টের সিসিটিভি ফুটেজেও দেখা যায়, মংগলবার সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে বের হয়ে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় তাসফিয়াকে তুলে দেয় আদনান।

এ সময় ওই অটোরিকশায় আরও দুই ছেলে আগে থেকেই বসা ছিল। তারা কারা। তাদের ধরতে পারলে হত্যা রহস্য বের করা সম্ভব হবে।

এদিকে তাসফিয়ার পরিবারের প্রশ্ন, চায়না গ্রিল রেস্টুরেন্ট থেকে তাসফিয়ার বাসা হাঁটা দূরত্বে। এ দূরত্বে যাওয়ার জন্য সিএনজি অটোরিকশার প্রয়োজন পড়ে না। হেঁটে অথবা বড় জোর রিকশা নিয়ে যাওয়া যায়। অথচ আদনান বলছে তাসপিয়াকে রেস্টুরেন্ট থেকে নামার পর বাসায় যাওয়ার জন্য অটোরিকশায় তুলে দিয়েছে সে।

আদনান-তাসফিয়ার প্রেমের সম্পর্ক ভালোভাবে নেয়নি তাসফিয়ার পরিবার। তাই আদনানকে ডেকে শাসায় তারা। আর এটাকে ভালোভাবে নেয়নি আদনানও।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানায়, শাসানোর ‘প্রতিশোধ’ নিতেই তাসফিয়াকে নিজের গ্রুপের সদস্যদের হাতে তুলে দেয় আদনান। নগরীর গোলপাহাড় আশপাশ এলাকার ধনী বাসিন্দাদের সন্তানদের সংগঠন ‘রিচ কিডস গ্রুপ’। এর নেতৃত্বে রয়েছে আদনান।

ময়নাতদন্ত-

এদিকে, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাসফিয়ার ময়নাতদন্ত হয়। এই ময়নাতদন্তে অংশ নেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সুমন মুর্শিদীর নেতৃত্বে চার সদস্যের একটি টিম। দীর্ঘ এক ঘণ্টা সময় নিয়ে ময়নাতদন্ত শেষে দুপুর দেড়টায় তারা লাশকাটা ঘর থেকে বের হন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান প্রফেসর ডা. সুমন মুর্শিদী বলেন, 'ভিসেরা ও সিআইডি রিপোর্ট পাওয়ার আগে কিছু বলা যাচ্ছে না। এই দুই রিপোর্ট পাওয়ার পরই বিস্তারিত জানানো যাবে।'

রিচকিডস গ্যাং কি বা কারা রয়েছে এর শীর্ষে? 

নগরীর গোলপাহাড় আশপাশ এলাকার ধনী বাসিন্দাদের সন্তানদের সংগঠন ‘রিচ কিডস গ্রুপ’। এর নেতৃত্বে রয়েছে আদনান। তাসফিয়ার মামলায় অভিযুক্ত বাকি আসামিরাও এই গ্যাং এর সদস্য।

তাসফিয়ার চাচা নুরুল আমিনের দাবি, আদনান, কথিত বড় ভাই ও তার তৈরী করা ‘রিচকিডস’ গ্যাংয়ের সদস্যরাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। পূর্বপরিকল্পিতভাবে ঠাণ্ডা মাথায় তারা হত্যা করে লাশটি সমুদ্র উপকূলে ফেলেছে, যাতে তাদেরকে কেউ ধরতে না পারে।

তিনি বিডিমর্নিংকে বলেন,  'এরা শুধু একজন বা দুজনই নয়। এই গ্যাংস্টার গ্রুপের অনেক সদস্যই এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত। আদনান ছেলেটা খুব নরম সরম দেখতে হলেও, আসলে সে একজন ঠান্ডা মাথার খুনি।'

আদনানকে রিমান্ডে চায় পুলিশ-

পতেঙ্গা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আবুল কাশেম ভূইয়া মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আদনান মির্জাকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ১০ দিনের রিমান্ড চাওয়া হয়েছে আদালতে।

ওসি আরো জানান, বুধবার দিনগত মধ্যরাতে নগরীর দক্ষিণ খুলশীর জালালাবাদ আবাসিক এলাকা থেকে আদনান মির্জাকে আটক করা হয়। জব্দ করা হয়েছে মোবাইল ফোন সেট। তার মোবাইলের কললিস্ট ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপসহ অন্যান্য অ্যাপসের মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদানের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে।

রিচ কিডস গ্যাংয়ের সদস্য, ২ বড় ভাই ও অটোচালক কোথায়?

এদিকে, গ্যাংস্টার ‘রিচ কিডস’-এর চার যুবক, দুই বড় ভাই ও অটোরিকশার চালককে নিয়ে চলছে নানান গুঞ্জন। তাসফিয়া হত্যাকাণ্ডের দিন এরাই মূলত আদনানের সহযোগী হিসেবে এগিয়ে আসে বলে ধারণা করেন আইন শৃঙ্খলা বাহিনী।

মঙ্গলবার রাত ১০টায় আদনানকে আটকের পর পরই তাসফিয়াদের বাসায় হাজির হন পুলিশের তালিকাভুক্ত চিহ্নিত সন্ত্রাসী দুই বড়ভাই ফিরোজ ও আকরাম। আদনানকে ছেড়ে দিতে সময় বেঁধে দেন তারা।

বুধবার সন্ধ্যায় আদনান গ্রেফতার হওয়ার পর পরই সেই দুই বড়ভাইও এখন নিরুদ্দেশ। ধোঁয়াশায় রয়ে গেছে ‘চায়না গ্রিল’ রেস্টুরেন্টের সামনে থেকে তাসফিয়াকে নিয়ে যাওয়া সেই অটোরিকশা এবং এর চালকের বিষয়টি।

প্রসঙ্গত,  বুধবার (২ এপ্রিল) সকাল সাড়ে ৯টার দিকে পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকা থেকে অজ্ঞাত হিসেবে তাসফিয়ার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।স্থানীয় পথচারীরা মৃতদেহটি দেখতে পেয়ে থানায় খবর দেয়। খবর পেয়ে পুলিশ পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত এলাকার ১৮ নম্বর ব্রিজের উত্তর পাশে পাথরের উপর উপুড় হয়ে পড়ে থাকা লাশটি উদ্ধার করে।

Bootstrap Image Preview