Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ শুক্রবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৪ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

আজও সংরক্ষণ হয়নি আঁখিরা পুকুর পাড়ের বদ্ধভূমি

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০৭:৪৮ PM
আপডেট: ১৬ এপ্রিল ২০১৮, ০৭:৪৮ PM

bdmorning Image Preview


হারুন উর-রশিদ, ফুলবাড়ী (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:

আগামীকাল ১৭ এপ্রিল দিনাজপুরের ফুলবাড়ী আঁখিরা গণহত্যা দিবস। আজকের এই দিনে ১৯৭১ সালে উপজেলার আলাদীপুর ইউনিয়নের বারাইহাট থেকে ১০০ গজ দূরে আঁখিরা নামক পুকুর পাড়ে বর্বর খান সেনাদের হাতে নির্মম ভাবে প্রাণ হারিয়েছিল ভারতে আশ্রয় নিতে যাওয়া ফুলবাড়ী, নবাবগঞ্জ, পার্বতীপুর ও বদরগঞ্জ উপজেলার প্রায় ৫শতাধিক নারী-পুরুষ ও শিশুরা।

আজও অনেকে এই ঘটনার বেদনাবিধুর স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। কিন্তু স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরেও আজও সংরক্ষণ করা হয়নি ঐতিহাসিক ঐ বদ্ধভূমিটি। ফলে নতুন প্রজন্মের নিকট অজানা থেকে যাচ্ছে এই্ ঐত্যিহাসিক স্থানটি তথা এর মর্মান্তিক কাহিনী।

মুক্তিযোদ্ধা ও সেই সময়কার প্রত্যক্ষদর্শীদের নিকট জানা গেছে, ১৯৭১ সালের এই দিনে পাক হানাদার বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পেতে ফুলবাড়ী উপজেলার রামভদ্রপুর, নবাবগঞ্জ উপজেলার খোশলামপুর ও পার্বতীপুর উপজেলার হামিদপুর ইউনিয়নের বাধদিঘী গ্রামের এবং রংপুর জেলার বদরগঞ্জ উপজেলার ফুলবাড়ী সংলগ্ন গ্রামগুলোর প্রায় ৫শতাধিক হিন্দু সম্প্রদায়ের নারী, পুরুষ ও শিশুদের নিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়ার জন্য চেষ্টা করলে রামভদ্রপুর গ্রামের কুখ্যাত রাজাকার কেনান সরকার তাদেরকে ভারতে পৌছে দেয়ার কথা বলে তাদের নিকট থেকে সোনা-দানা ও নগদ অর্থ হাতিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।

৫ শতাধিক মানুষের ঐ দলটি শিবনগর ইউনিয়নের শিবনগর গ্রামের মধ্য দিয়ে সমশেরনগর গ্রাম হয়ে বারাইহাট পার হয়ে আঁখিরা পুকুরপাড়ে পৌছা মাত্র কুখ্যাত রাজাকার কেনান সরকার ও তার সঙ্গীরা এই নিরীহ মানুষদেরকে পাক হানাদার বাহিনীর হাতে তুলে দেয়। পাক হানাদার বাহিনী সদস্যরা এই ৫ শতাধিক মানুষকে এক লাইনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে মার্মান্তিক ভাবে গনহত্যা চালায়।

ভাগ্যের জোরে বেঁচে যাওয়া ওই দলের সহযাত্রী উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাসিন্দা রাখাল চন্দ্র (৬০) জানান, কুখ্যাত রাজাকার কেনান সরকারের কথায় বিশ্বাস করে যাত্রা শুরু করেছিল ৪ উপজেলার প্রায় ৫শতাধিক মানুষ। কিন্তু তাদের বিশ্বাস এভাবে ধ্বংস হয়ে যাবে তারা বিন্দুমাত্র বুঝতে পারেননি।

এদিকে  আখিঁরা গণ হত্যা বর্ণনা করতে গিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী বারাইহাট বাজারের পল্লী চিকিৎসক অনিল কুমার (৬৪) বলেন এই গণহত্যার সময় তিনি পাশ্বেবর্তী বড়গাছা গ্রামে একটি ঝোপে লুকিয়ে পড়েন। এরপর খান সেনারা চলে গেলে তিনি এসে দেখতে পান শত শত নারী-পুরুষ ও শিশুর গুলি বিদ্ধ মৃতদেহ। এ সময় একটি এক থেকে দেড় বছর বয়সে শিশু তার মৃত্যু মায়ের স্তন পান করছিল বলে তিনি জানান।

এরপর অনেক লোক সেখানে এসেছে তাদের মধ্যে কেউ জীবিত বাচ্ছাটিকে নিয়ে গিয়েছেন। একই কথা বলেন আর এক প্রত্যক্ষদর্শী বড়গাছা গ্রামের আব্দুল খালেক, তিনি বলেন বহু দিন পর্যন্ত এই পুকুরটিতে মানুষের হাড় ও মাথার  খুলি পড়ে ছিল। সে দিনের সেই স্মৃতি তার চোখের সামনে আজও ভেসে ওঠে।

ফুলবাড়ী উপজেলা সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার লিয়াকত আলী বলেন, ফুলবাড়ীর যে কয়টি ঘৃনিত কু-কর্মের অধিকারী রাজাকার ছিল তাদের মধ্যে কেনান সরকার অন্যতম। সে শুধু ওই ৫শতাধিক ব্যক্তির প্রাণই নেয়নি তার হাতে নিহত হয়েছে ফুলবাড়ীসহ কয়েকটি উপজেলার কয়েক হাজার নিরীহ মানুষ। এ জন্য যুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে তার মৃত্যু হয়েছে। তার অনেক সঙ্গী এখন ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়িত। তিনি আজও এই ঐতিহাসিক বদ্ধ ভূমিটি সরকারি উদ্যোগে সংরক্ষণ না করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

তিনি আরও বলেন, কয়েক দফায় এই আঁখিরা নামক জায়গাটি পরিদর্শন করা হয়েছে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এখনও এই ঐতিহাসিক আঁখিরা নামক জায়গাটি সংরক্ষণ না হওয়ায় ঐ এলাকার কৃষকেরা চাষাবাদ করছে। ঐতিহাসিক এই বদ্ধভূমিটি সংরক্ষণ না করায় হারিয়ে যাচ্ছে এর মর্মান্তিক স্মৃতি।

Bootstrap Image Preview