Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ রবিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৬ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

ঘুরে আসুন সৌন্দর্যের লীলাভূমি চাদঁপুর বড় স্টেশন

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ এপ্রিল ২০১৮, ০৭:৪১ PM
আপডেট: ১১ এপ্রিল ২০১৮, ০৭:৪১ PM

bdmorning Image Preview


নিজাম উদ্দিন শামীম, জবি প্রতিনিধিঃ 

ব্রিটিশ আমল থেকেই চাদঁপুর তার ঐতিহ্যগতভাবে কৃষ্টি, কালচারে সুখ্যাতি ও সুখস্মৃতি ধরে রেখেছে। প্রাচীন বাঙলায় চাঁদ ফকির নামে একজন লোকের নাম অনুুসারেই গড়ে উঠে সৌন্দর্যের লীলাভূমি চাদঁপুর নামে একটি জনপদ। ১৯৮৪ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারী জনপদটি মর্যাদা পায় জেলা হিসেবে।

বর্তমানে সমগ্র জেলা জুড়ে ঘুরে বেড়ানোর মতো অনেক জায়গা রয়েছে। এসবের মধ্যে পদ্মা-মেঘনা-ডাকাতিয়া ত্রি-নদের মিলনস্থল চাঁদপুর মোহনা, দেশী-বিদেশী পর্যটকদের আকর্ষণ করে ভিন্ন রূপে, ভিন্ন আমেজে। এটি এলাকাবাসীর কাছে বড় স্টেশন নামে অধিক পরিচিত।

চিত্রকর্ষক নয়ানাভিরাম এই চাঁদপুর শহর রক্ষা বাঁধের মোলহেড (বড় স্টেশন) এলাকায় প্রতিনিয়ত  সৌন্দর্যপ্রেমী মানুষের ঢল নামে। তিন নদীর কল-কল ধ্বনি, ঢেউয়ের অপরূপ নৃত্য, বর্ষার আকাশে সূর্যমামা আর মেঘমালার লুকোচুরি, কিংবা শেষ বিকেলে টকটকে লাল সূর্যে ঘুমিয়ে পড়ার দৃশ্য অবলোকন করতে দেশি বিদেশি হাজারো মানুষের পদচারনায় মুখরিত হয় এই জনপদ। বিশেষ করে বছরের দুই ঈদে কিংবা ছুটির দিন গুলিতে মানুষের ঢেউ নামে ।

ভোরের আকাশে পূর্বদিকে সূর্য যখন উকি দিয়ে দিগন্তকে আলোকিত করে ঠিক তখনি শহরের বিভিন্ন স্থান হতে ছোট বড় মাঝ বয়সী কিংবা বৃদ্ধ সবারই গন্তব্যস্থল হয়ে দাড়ায় চাঁদপুরের বড় স্টেশন। এখানে কিছুটা হাটাহাটি করে শরীরে চাঙ্গা ভাব আনার জন্য মিষ্টি সকালের এক কাপ চা খেতে সাধারণত কেউ ভূল করেন না । বেলা বাড়লেই ভীড় বাড়তে থাকে সব বয়সি মানুষের এই জনপদ ঘিরে। এখানে বয়সীরা ভূলে যান তাদের বয়সের কথা ডুবে যান অতিতের গহব্বরে ফেলে আসা অতিতের সোনালি দিনগুলোতে। মধ্য বয়সী জুটিদের ফেলে আসা দিনগুলো নিয়ে খুনসুটি এখানে নিত্য নৈমত্তিক।

দেশের খুব কম লোকেই আছে, যারা চাঁদপুরের মেঘনা ও পদ্মার রূপালী ইলিশের স্বাদ নেননি। চাঁদপুরের ইলিশ দেশি বিদেশের ক্রেতা সাধারণকে আকৃষ্ট করে। গত কয়েক বছর ত্রি-নদের অব্যাহত ভাঙ্গনের মুখে সরকারি ব্যবস্থাপনায় ভাঙ্গন প্রতিরোধে ব্লক ফেলে যতটুকু রক্ষা করা গেছে তার অংশবিশেষকেই চাঁদপুর মোহনা বা মোলহেড বলে ডাকা হয়। তবে স্থানীয়দের অনেকে একে সাবের গাজীর আস্থানা বলেও ডাকেন।

শহরের চার দেয়ালের মাঝে বন্দি আর অসহ্য যানযটে অতিষ্ট জীবনের হাত থেকে সাময়িক রেহাই পাওয়ার জন্য ও একটু বিনোদন পাওয়ার আসায় হাজারো মানুষ বছরের ছুটির দিনগুলিতে পাড়ি জমান চাঁদপুরের বিখ্যাত এই পর্যটন স্পটে। এখানে এসে তাদের সবচেয়ে ভালো লাগার যে বিষয়টি কাজ করে তা হল তিন নদীর তিন পাশ ঘিরে পানির ঢেউ আছড়ে পড়ার দৃশ্য, দখিনা বাতাস, নদী বন্দরে অপেক্ষমান লঞ্চ, মালবাহী ট্রলার, ডিঙ্গি নৌকা, জেলেদের মাছ ধরার নৌকা, পুরাণবাজারের সৌন্দর্য, ধু-ধু বালুচর পর্যটকদের উদ্বেলিত করে।

 দর্শক জনপ্রিয়তা বিবেচনা করে এ স্থানটিকে আরো আকর্ষণীয় করতে ব্যাপক পরিকল্পনা বাস্তবায়ন  করেছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। তা হল-পরিচ্ছন্নকর্মীরা প্রতিদিনই পরিষ্কার করে রাখছে এই অঙ্গনকে। ছোট-বড় মাঝারি বিভিন্ন প্রকার বৃক্ষের সমারোহ। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে রণাঙ্গনে শহীদ হওয়া বীর যোদ্ধাদের স্মরণে প্রাত্তন জেলা প্রশাসক প্রিয়তোষ সাহার নির্দেশনায় মোলহেডের প্রবেশ মুখে নির্মাণ করা হয়েছে স্মৃতিস্তম্ভ রক্তধারা। স্মৃতিস্তম্ভটি দূর দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের সহজেই আকৃষ্ট করে। তারা ঘুরে ঘুরে শিল্পীর কারুকার্য খচিত সৃষ্টিকর্ম প্রত্যক্ষ করে থাকে। অগণন শহীদের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জানায়। কেউবা আবার ব্যস্ত হয়ে পড়ে স্মৃতিস্তম্ভ ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ছবি তোলায় ।

এখানেই শেষ নয় মেলহেড থেকে একটু সামনে এগোলেই দেখতে পাওয়া যাবে হাতের বাম পাশে সুন্দর একটি বিশ্রামাগার। ছোট সোনামণিদের খেলনার দোকান। মা-বোনদের জন্যে দোকানিরা হরেক রকম জিনিসের পসরা সাজিয়ে বসে। এর পাশেই রয়েছে চটপটি-ফুচকা ঘর। আরেকটু সামনে গেলে চোখে পড়বে শত শত মোটর সাইকেল। দেখে মনে হবে যেন এখানে মোটর সাইকেলের মেলা বসেছে। এখানেই সারি বেঁধে বুট, বাদাম নিয়ে বসে ভ্রাম্যমাণ হকার।

চানাচুর বিক্রেতাদের দম ফুরোনোর সুযোগই নেই।শীত কালে এখানে প্রধান আকর্ষণ  শীতের পিঠা। নানা ধরনের বাহারি পিঠার মেলা বসে এইখানে। কথায় আছে শীতের পিঠা খাইতে মজা। এই স্থান ঘিরে ভালোলাগা মানুষের সংখ্যা নেহায়েৎ কম নয়।

কথা হয় তেমনি একজন পর্যটন পিপাসু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র মিজানুর রহমানের সাথে যিনি বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় চাঁদপুর জেলা ছাত্রকল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক। তার মতে চাঁদপুরের মেলহেড এ অবস্থিত এ স্থানটি সৌন্দর্য বিবেচনায় দেশের সেরা পর্যটন কেন্দ্রের  অন্যতম একটি। দেশে বিদেশের  দূর দূরান্ত থেকে মানুষ আসে এক নজর দেখতে । তাই সরকারের কাছে আমি সহ চাঁদপুরবাসির একটাই দাবি সরকারি ভাবে এ স্থানকে দেশের সেরা পর্যটন কেন্দ্রের একটি ঘোষণা করা হয় ।

ব্লকে বসে প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে সবচেয়ে সেরা ছবিটা তুলতে পারবেন এখানেই। আর পাখির মিষ্টি মধুর কিচির-মিচির শব্দতো হরহামেশাই শুনতে পারবে যে কেউ। ভয় নেই এখানকার পাখিগুলো যথেষ্ট ভদ্র। তারা প্রিয় মুহূর্তগুলোকে নষ্ট করার মতো দুষ্কর্ম করবে না। তবে হ্যাঁ, ছিন্নমূল পথশিশুরা আপনাকে কিছুটা অস্বস্তিতে ফেলতে পারে। সেটাও আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। এখন শিশুরা স্কুলগামী হচ্ছে। বিদেশী পর্যটকদের থাকা ও খাওয়ার জন্য উন্নতমানের হোটেল সুবিধা রয়েছে। নদীতে ঘুরতে চাইলে ইঞ্জিনচালিত নৌকার ব্যবস্থা রয়েছে। স্পীড বোটেও ঘুরে বেড়ানো যাবে।

মুসলিম পর্যটকরা নামাজ পড়তে পারবেন বড় স্টেশন মসজিদে। হিন্দু ধর্মাবলম্বী পর্যটকরা কালীবাড়ি মন্দিরে প্রার্থনা করতে পারবেন। পিকনিক স্পট রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষা সফরের জন্য বেছে নিতে পারেন মনোরম নদীকেন্দ্রিক এই লোকেশন। দর্শনাথীদের প্রবেশের জন্য কোনো ফি লাগে না। লঞ্চ,ট্রেন কিংবা বাস তিন ভাবেই আসার সুব্যবস্থা রয়েছে এ স্থানটিতে ।

প্রতি বছরের  ঈদের মৌসুমটাতে মোলহেড এলাকায় প্রতিদিনই অর্ধ লক্ষাধিক মানুষের ঢল নামে। যদিও বিশেষ দিন বাদেও প্রতিদিন অন্তত কয়েক হাজার মানুষের পদচারণায় মুখরিত হয়ে উঠে। ঈদ উপলক্ষে লক্ষ্মীপুর, নোয়াখালী, কুমিল্লা, ফেনী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকেও মোলহেড এলাকায় আসে অনেক পর্যটক। এখানে সারা বছরই দুপুর থেকে মধ্য রাত পর্যন্ত বসে মানুষের মিলনমেলা। যদিও ভ্রমনপিপাসুদের অভিযোগ আগে এ স্থানটিতে রাত্রের প্রকৃতি উপভোগের সুযোগ দিলেও বর্তমানে তা দেওয়া হচ্ছে না।

এ ব্যাপারে চাঁদপুরের পুলিশ সুপার শামছুন্নাহার বলেন, ঈদ উপলক্ষে মোলহেড এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে রয়েছে পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য।প্রতি বছরই ঈদে ছিনতাই, ইভটিজিং রোধে এখানে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। এ ছাড়াও দেশের বিভিন্ন স্থানে জঙ্গি হামলার কারণে জনগণের নিরাপত্তার খাতিরেই সন্ধ্যার পর মোলহেড এলাকাটি জনশূন্য রাখা হচ্ছে।

Bootstrap Image Preview