Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ রবিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৬ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকারকারীদের নাগরিকত্ব বাতিল করা হোক!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ মার্চ ২০১৮, ০৫:১৪ PM
আপডেট: ১৭ মার্চ ২০১৮, ১০:২৩ PM

bdmorning Image Preview


আরিফ চৌধুরী শুভ।।

আজ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৯৯তম জন্মদিন। এই দিনটিতে যদি বঙ্গবন্ধু জন্ম না নিতেন, তাহলে হয়তো বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ শব্দটি আবিষ্কৃত হতো না। আমরা পেতাম না স্বাধীন ভূখণ্ড একটি বাংলাদেশ। নির্মেলেন্দুগুণের ‘স্বাধীনতা তুমি’ কবিতার অপ্রিয় সত্য কথা ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিও আমাদের হতো না। আমরা পেতাম না লাল সবুজের পতাকা।  আজ বঙ্গবন্ধুই আমাদের লাল সবুজের পতাকা।

পৃথিবীতে পরাধীনতার শিকলে বন্ধি জাতি কখনো পরিপূর্ণ মানবজাতি হতে পারে না। সেদিক থেকে অন্তত বিশ্বের বুকে আমরা একটি পরিপূর্ণ বাঙ্গালী জাতি। বুক ফুলিয়ে আজ এ দাবি করছি আমরা। পৃথিবীতে বহু জাতি আছে যাদের একজন বঙ্গবন্ধু ছিল না বলে আজ তারা এই দাবি করতে পারছে না। রোহিঙ্গাদের মতো হয়তো বিতাড়িত হন, না হয় মরেন শোষণের শিকার হয়ে। পালিয়ে বেড়ান স্বভূমি ছেড়ে। আমাদের পরিপূর্ণতার কারিগর আমাদের একজন খোকা। আমাদের একজন শেখ মুজিব। আমাদের একজন বঙ্গবন্ধু।

আমাদের ক্রিকেটারও এ পরিচয়ে আজ বিশ্ব দাপিয়ে বেড়ায়। বঙ্গবন্ধুর দেশের ক্রিকেটাররা যখন মাঠে খেলেন, তখন  প্রত্যেকেই যেন এক একজন বঙ্গবন্ধু হয়ে ওঠেন। হার না মানা বঙ্গবন্ধুর মতোই লড়াই করে যান বিজয়ের আগ পর্যন্ত। হারতে হারতেই জিতে যান তারা। এ আদর্শও বঙ্গবন্ধুর। আজ বাঙ্গালীর ভ্রুণেই এ আদর্শ ক্রমেই বৃদ্ধি হচ্ছে। এদেশের শ্রমিকরা বিদেশে গেলে বঙ্গবন্ধুর নামটি শুনে বিদেশিরা বলেন, ‘ও তোমরা শেখ মুজিবের দেশের লোক। তোমাদের তো মাথা তোলা সাহস ’।

বঙ্গবন্ধু নেই বাস্তবে, কিন্তু বঙ্গবন্ধু আছে আমাদের আদর্শে, আমাদের চিন্তায়, আমাদের মননে এবং আমাদের আদর্শে। রাষ্ট্রের শরীরকে যদি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ দিয়ে আবৃত্ত করা যেত, তাহলে এই রাষ্ট্র আরো কতো আগেই উন্নত বিশ্বের কাতারে নাম লেখাত। কংক্রিটের দেয়াল আর বড় বড় ফ্লাইওভার যদি  শুধু আধুনিকতার শর্ত হতো, তাহলে বিশ্বে বসবাসের অযোগ্য এবং দ্বিতীয় দূষিত শহরের মধ্যে ঢাকা দ্বিতীয় হতো না। বঙ্গবন্ধুর আধুনিকতা ছিল জনচিন্তা আর সম্প্রীতিতে। তার অস্তিত্বের খোরাক ছিল বাংলার সাতকোটি ত্যাগী বাঙ্গালী। সত্যের সাথে অনঢ় থেকে এই বাঙ্গালীরাই সেদিনের খোকাকে বানিয়েছেন একজন বঙ্গবন্ধু ও বাঙ্গালী মুক্তির প্রতীক হিসাবে। বঙ্গবন্ধু সফলও হয়েছেন।

কিন্তু আজ এই চেষ্টা করবে কে? নানামুখি অসুস্থ রাজনীতির প্রতিযোগিতায় বঙ্গবন্ধুর আদর্শ যেন বিলিন হয়ে যাচ্ছে অযোগ্যদের ভীড়ে। একজন শেখ হাসিনা কি একা সফল হওয়া সম্ভব? আমি বলবো না। পৃথিবীতে কোন নেতা যেমন একা নেতা হতে পারেননি তেমনি নেতা হবার জন্যে গণমানুষের ভূমিকা ছিল সবার আগে এবং এটাই প্রথম শর্ত। একজন বঙ্গবন্ধু যেমন একা সফল হননি, সমস্ত বাঙ্গালী জাতি ছিল তাঁর সাথে, তেমনি একজন শেখ হাসিনাও একা কখনো সফল হতে পারেন না। কোন ভাবেই পারবেনও না। তাই রুদ্ধদ্বার নয়, মুক্ত ধারের সন্ধানে বঙ্গবন্ধুর দেখানো পথে এ বাংলাদেশের পথচলা ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে।

বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ শব্দ দুটি অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। যদি না থাকতো তাহলে অপশক্তিরা বাংলাদেশের মসনদ আরো আগেই দখল করে নিতেন। মুক্তিযোদ্ধারা আবারো মরতেন একাত্তরের মতো। আজ বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে বাংলাদেশের মসনদে বসে আছেন, সেই বাংলাদেশের সৃষ্টিতে এই বঙ্গবন্ধুকে ‘৪ হাজার ৬৮২ দিন কারাবন্দি’ থাকতে হয়েছে। অভুক্ত থাকতে হয়েছে কারাগারে। সেই বাংলাদেশে যদি অন্তত একজন মানুষও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে বছরের পর বছর বিনাদোষে কারাবরণ করেন,  গুম হয়েছেন নিজ বাসা থেকে, নারী ধর্ষণের শিকার হোন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ক্ষমতার বলে,  কোটার ভীড়ে অধিকার বঞ্চিত হোন মেধাবিরা, আন্দোলন করতে হয় সরকারি চাকুরিতে বয়স বাড়ানোর দাবিতে, তাহলে এর চেয়ে দু:খজনক আর কি হতে পারে। বঙ্গবন্ধু নিশ্চয় এমন বাংলাদেশ দেখতে চাননি। বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম শুভ জন্মদিনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে কারবন্দি সকল মায়ের সন্তানদের মুক্তি কামনা করছি।

শুধু পাকিস্থান সরকারই নয়, ব্রিটিশ সরকারও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে আটকিয়ে রেখেছেন। অবশেষে বঙ্গবন্ধুর কারাবাসেই বাংলাদেশকে মুক্তি দিয়েছে। এ সত্য যতদিন বাংলাদেশ থাকবে, ততদিন আমাদের মানতেই হবে। কিন্তু কারা মানছে না? তারা কিভাবে আজও এদেশে বাস করে? তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি প্রধানন্ত্রীকে। না হয় জাতির জনকের স্বাধীন ভূমির জন্যে কারাবরণ আমাদের হৃদয়ে দু:খই দিবে দিনের পর দিন।

জাতির জনক, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার রাজনৈতিক জীবনে দীর্ঘ ৪ হাজার ৬৮২দিন কারাবাস কোন সহজ কথা নয়। বরং দু:সাহসিক ও দেশপ্রেমের কঠিন দৃষ্টান্ত বাঙ্গালী জাতির কাছে। বঙ্গবন্ধুই একমাত্র বাঙ্গালী যিনি এতবেশি কারাবাস খেটেছেন শুধু একটি জাতির মুক্তির জন্যে। কিন্তু সেই বঙ্গবন্ধুকেও হত্যা করেছে এ জাতির উশৃঙ্খল বিপথগামী নরপশুরা। হত্যা করতে পারেননি বঙ্গবন্ধুর আদর্শ আর চেতনাকে। তিনি আমাদের কাছে বাঙ্গালী জাতির জনক, আমাদের স্থপতি এবং লাল সবুজ পতাকার রূপকার। জন্মদিনের শুভেচ্ছা ও সেলুট চির অমর এই মহান বাঙ্গালী নেতাকে।

বঙ্গবন্ধু কারাবাসে না গেলে আমরা কখনো মুক্তি পেতাম না। মুক্তি পেত না বাঙ্গালী জাতির আত্মার স্ফূরণ। আজ সেই আত্মায় কি বঙ্গবন্ধুকে আমরা ধারণ করি? যারা আজও করছি না, তারা এক সাথে যেমন সত্যকে অস্বীকার করছি, তেমনি দেশদ্রোহীতার ভূমিকায় অবর্তীণ  হচ্ছি। এটা সীমা লঙ্গল হলেই বিপত্তি ঘটবে। আহত হবেন ড. জাফর ইকবালরা। ২১ আগষ্টের পুনরাবৃত্তিও ঘটতে পারে। তাই সজাগ থাকতে হবে সবাইকে। আর যাই হোক না কেন, যে বাঙ্গালী বঙ্গবন্ধুর অবদানকে স্বীকার করবে না, বঙ্গবন্ধুকে বাঙ্গালী জাতির জনক মনে করবে না, সে বাংলাদেশকে কোন ভাবেই ভালোবাসে না। বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে মানে না। বাংলাদেশে থাকার যোগ্যতাও সে হারায়। তার নাগরিকত্বের বিষয়টি রাষ্ট্রের বিবেচনায় আনা উচিত। তার নাগরিকত্ব বাতিল করার দাবি জানাচ্ছি আমি।

যে বঙ্গবন্ধু অধিকারের দাবিতেই তাঁর স্কুলজীবনেই ব্রিটিশ আমলে ৭দিন কারা ভোগ করেন, সেই বঙ্গবন্ধুকে কে দাবায়া রাখতে পারে?  ৫৫ বছর জীবনে ৫১ বছরই বঙ্গবন্ধু ছিলেন পাকিস্থান অধিনস্ত দেশে। ৪ হাজার ৬৭৫ দিন কারা ভোগ করেছেন পাকিস্তান সরকারের আমলে, কিন্তু আপোষ করেননি। জীবনের এতগুলো দিন কারাগারের অন্ধকার প্রকষ্টে থেকে মুক্তির আলো কামনা করেছেন শেখ মুজিবুর রহমান। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্টে বসেই বঙ্গবন্ধু স্বাধীন বাংলার পরিকল্পনা করেছিলেন। বঙ্গবন্ধু জীবনের ১৪টি বছর কারাগারে কাটিয়েছেন। স্কুলের ছাত্র অবস্থায় ১৯৩৮ সালে সর্ব প্রথম কারাগারে যান। ৭দিন কারাভোগের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধুর কারাভোগের ইতিহাস শুরু হয়। এরপর ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ থেকে ১৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি ৫দিন কারাগারে ছিলেন। একই বছর ১১ সেপ্টেম্বর কারাগারে গিয়ে তিনি মুক্তিপান ১৯৪৯ সালের ২১ জানুয়ারি। এ দফায় তিনি ১৩২ দিন কারাভোগ করেন।

বঙ্গবন্ধু ১৯৪৯ সালের ১৯ এপ্রিল আবারও কারাগারে গিয়ে ৮০দিন কারাভোগ করে মুক্তি পান ওই বছরের ২৮ জুন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি আবারও ২৭দিন কারাভোগ করেন। ১৯৪৯ সালের ২৫ অক্টোবর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৬৩ দিন তিনি কারাভোগ করেন। ১৯৫০ সালের ১ জানুয়ারি থেকে ১৯৫২ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি টানা ৭৮৭দিন বঙ্গবন্ধু কারা ভোগ করেন। এরপর ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়লাভের পরও বঙ্গবন্ধুকে কারাগারে যেতে হয়। এ দফায় বঙ্গবন্ধু ২০৬দিন কারা ভোগ করেন।

১৯৫৮ সালে আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারির পর বঙ্গবন্ধু ১১ অক্টোবর গ্রেফতার হন। এ সময়ে একটানা এক হাজার ১৫৩দিন তাকে কারাগারে কাটাতে হয়। বঙ্গবন্ধু একটানা সব চেয়ে বেশি সময় (৩ বছরের বেশি) কারাভোগ করেন। ১৯৬২ সালের ৬ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু আবারও গ্রেফতার হয়ে ওই বছরের ১৮ জুন মুক্তি পান। এ দফায় তিনি কারাভোগ করেন ১৫৮দিন। এরপর ৬৪ ও ৬৫ সালে বিভিণ্ন মেয়াদে তিনি ৬৬৫দিন কারাগারে ছিলেন।’

বঙ্গবন্ধু মুক্তির সনদ ৬ দফা দেওয়ার পর এর পক্ষে জনমত গড়ে তুলতে দেশের বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করতে গিয়ে কয়েক দফায় গ্রেফতার হন। তারপরেও মুক্তির আশা ছেড়ে দেননি। ৬ দফা দেওয়ার পর তাঁকে বিভিন্ন স্থানে সমাবেশ করতে গেলে পাকিস্তান সরকার তাকে গ্রেফতার করেছে। মুক্তি পেয়ে আবারও জনসভা করেছেন। আবারো গ্রেফতার হয়েছেন। এভাবে ৩২টি জনসভা করে বিভিন্ন মেয়াদে তিনি ৯০দিন কারাভোগ করেছেন। এরপর ৬৬ সালে ৮ মে আবারও গ্রেফতার হয়ে ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি মুক্তি পান। এ সময় তিনি এক হাজার ২১দিন কারাগারে ছিলেন।

পরাধীন রাষ্ট্রে পাকিস্থান সরকার শেখ মুজিবকে সর্বশেষ গ্রেফতার করে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পরপরই। পাকিস্তানের মিয়ানালি কারাগারে একটি সেলের মধ্যে রাখা হয়। সেখানে তাঁকে মেরে ফেলার জন্যে নানা কূটকৌশল করা হয়েছে। সবকিছু বুঝতে পেরে বঙ্গবন্ধু পাকিস্থানী কারারক্ষীদের অনুরোধ করে বলেছিলেন, তোমরা যদি আমাকে মেরে ফেল তাতে আমার আপত্তি নাই, কিন্তু মৃত্যুর পরে আমার লাশটা আমার বাঙ্গালীর কাছে ফিরিয়ে দিও। ২৮৮দিন জেলে থেকে ১০ জানুয়ারি স্বাধীন বাংলার মাটিতে বঙ্গবন্ধু ফিরে আসেন। শেষ হয় কারাবরণের ইতিাহাস।

আজ মনে পড়ে বঙ্গবন্ধুর আমর সেই বাণী ‘সাতকোটি বাঙ্গালীর ভালোবাসার কাঙ্গাল আমি। আমি সব হারাতে পারি। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা হারাতে পারবো না। সত্যি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের মানুষের ভালোবাসা আজও হারাননি। কখনো হারাবেনও না। হারাতে পারেনও না। বঙ্গবন্ধুর ভালোবাসার বাংলাদেশ নিরাপদ পথে হাঁটুক এটাই বঙ্গবন্ধুর ৯৯তম জন্মদিনে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আগামীর প্রত্যাশা।

সাংবাদিক ও লেখক, তরুণ উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন।
Bootstrap Image Preview