Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৯ সোমবার, নভেম্বার ২০১৮ | ৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

জীবনের কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা মনের গভীরে দাগ কাটে

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৯ জানুয়ারী ২০১৮, ০৫:০০ PM
আপডেট: ১৯ জানুয়ারী ২০১৮, ০৫:০০ PM

bdmorning Image Preview


অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান চৌধুরী   জীবনের প্রতিটি দিন আমাদের কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাগুলো আমাদের ভাবতে শিখায় এবং অন্যকে জানতে শিখায়। এ ধরনের জীবন থেকে নেওয়া কিছু বাস্তব অভিজ্ঞতা আমাদের মনের গভীরে দাগ কেটে যায়। হয়ত এটাই জীবন। এটাই পথচলা। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপনা করার সূত্রে শিক্ষা ও গবেষণা আমার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় বিষয়। প্রতিদিন নতুন কিছু ছাত্রদের কাছে জানা ও শেখার আগ্রহ নিয়ে ক্লাস নিতে যাই। এমনই একদিন ক্লাসে পড়ানোর সময় লক্ষ্য করলাম একটা ছেলে কি যেন বলতে চায়। আসলে তার চোখের দৃষ্টি আর মুখের নিরব ভাষায় তা আমার কাছে স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। আমি ছেলেটাকে দাঁড়াতে বললাম। ছেলেটা কিছুটা অস্বস্তিবোধ করে দাঁড়াল। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম তুমি কি আমার কাছে কিছু জানতে চাও। ছেলেটা আমাকে আমতা আমতা করে বললো, স্যার কত টাকা উপার্জন করলে আমি বিত্তশালী হতে পারব। আমি অনেক অনেক টাকার মালিক হতে চাই। আমি মৃদু হাসলাম। আমি তাকে একটা গল্প শুনালাম। সম্বভত এরিস্টেটল তার দর্শন থেকে এই গল্পটি লিখেছেন- কোন এক এলাকায় একজন জমিদার বাস করতেন। তার অর্থ ও সম্পদের কোন অভাব ছিল না। একদিন জমিদার এক ভিখারীকে ডেকে বললেন- তোমাকে আমি অনেক জমি দিতে চাই। ভিখেরীর শখ হলো বড়লোক হবার। তবে জমিদার তাকে একটা সহজ শর্ত দিলেন। শর্তটি ছিল এরকম তোমাকে এই গোল দাগ থেকে সূর্যোদয়ের সময় যাত্রা শুরু করতে হবে এবং তুমি দৌড় দিয়ে যত বেশী জায়গা নিতে পারবে তত বেশী তুমি জমির মালিক হবে, কিন্তু সুর্যাস্তের আগেই তোমাকে এই গোল দাগে ফিরে আসতে হবে। পরেরদিন সূর্যোদয়ের সময় ভিখেরী দৌড় দিয়ে তার যাত্রা শুরু করল। যতই সামনের দিকে দৌড়ায় ততই তার আরও জায়গা পাওয়ার ব্যকুলতা জাগে। ফলে সে লোভে পড়ে সামনের দিকে অবিরাম ছুটতে থাকে। ছুটতে ছুটতে একসময় তার খেয়াল হয় সূর্য প্রায় অস্তগামী। কিন্তু সে যতটা জায়গা দৌড়ে এসেছে পূর্বের জায়গায় ফিরে যাওয়া তার পক্ষে কেবল অসম্ভবই নয় অবাস্তবও। ফলে যখন সে আগের গোল দাগের দিকে ছুটতে গেল সাড়ে তিন হাত ছোটার পরই একটা জায়গায় এসে সারাদিনের ক্লান্তিতে ও অস্থিরতায় সে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। আমি ছাত্রটিকে বললাম গল্পটি কি তুমি বুঝতে পেরেছ। আসলে একজন মানুষের জন্য যতটুকু জায়গা দরকার ততটুকুই তার প্রয়োজন। এর বেশী নয়। কাজেই তোমার যতটুকু উর্পাজন করা দরকার তার বেশী লোভ করা কখনই ভাল নয়। আমার মনে হয় মানুষ যদি একথা বুঝতে পারত তবে সে যান্ত্রিক না হয়ে মানবিক হয়ে উঠত। ২ আমার এক ছাত্র একটি বিদেশী কম্পানীতে চাকরী করত। বেশ ভালই কাটছিলো তার দিনগুলো। ছেলেমেয়ে ঘর সংসার নিয়ে সুখেই তার জীবন চলছিলো। একদিন বাজার করতে গিয়ে দেখলাম আমার ঐ ছাত্রটি বিবর্ণ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখের হাসির সেই উচ্ছলতা নেই। ভেঙ্গে পড়া নদীর মত মনে হলো তাকে। কাছে গিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম কি হয়েছে তোমার। উত্তরে সে বললো, স্যার আমার কম্পানীটি বন্ধ হয়ে গেছে। আমার চাকরিও চলে গেছে। সে আমাকে প্রশ্ন করল স্যার বলতে পারেন আমার কম্পানীটি বন্ধ হওয়ার পিছনে কে দায়ী। আমি তাকে একটা গল্প শুনালাম- কোন একটা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। সবাই চাকুরী হারাবার ভয়ে আক্রান্ত হয়েছে। বেতন ও বন্ধ আছে বেশ কয়েকমাস। তাদের মধ্যে একজন ব্যক্তি এসে বললো আমাদের প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংস হওয়ার পিছনে যে দায়ী, সে আজ মারা গেছে। তার লাশটি ঐ হল রুমে রাখা আছে। প্রতিষ্ঠানের সবাই ঐ মৃত লোকটিকে গালমন্দ করে দোষারোপ করল। কেউ কেউ আবার ঘৃণা প্রকাশ করে থুথু ফেলল। তবে তাদের প্রত্যেকের জানার আগ্রহ হলে কে সেই ব্যক্তি। এরপর হলরুমের মধ্যে রাখা খোলা কফিনের দিকে প্রত্যেকে তাকিয়ে তাকিয়ে কফিনের ভিতরটা দেখল এবং নিরব হয়ে একটা জায়গায় এসে জমা হলো। আমি জিজ্ঞাসা করলাম বলতে পার ঐ কফিনের ভিতর কি ছিল। ছাত্রটি কোন উত্তর দিতে পারল না। আমি তাকে বললাম ঐ কফিনের ভিতর রাখা ছিল একটি আয়না। যখন সবাই কফিনটি দেখে দেখে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল তখন তারা সে আয়নার মধ্যে নিজের প্রতিবিম্বটি দেখতে পেয়েছিল। বিষয়টা বুঝতে পেরেছে কিনা তা জিজ্ঞাসা করতেই ছাত্রটি বললো স্যার আমিও অন্যদের মতো কম্পানীটি বন্ধ হওয়ার জন্য দায়ী। আসলে তিল তিল করে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠানটি ধ্বংসের পেছনে সবারই কিছু না কিছু অবদান আছে। যেমন আমারও আছে। আমরা আমাদের দেশকে নিয়ে অনেক স্বপ্নের কথা ভাবি। অনেক স্বপ্ন যখন বাস্তবে পরিণত হয় না তার জন্য যে আমরা সবাই কিছু না কিছু দায়ী একথাটা আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে। তাহলেই কেবল আমরা স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারব। না হলে স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যাবে। ৩ আমার এক অনেক দিনের পুরানো বন্ধু অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলো। তাকে একদিন দেখার জন্য হাসপাতালে গেলাম। কিন্তু দেখলাম আমার যে বন্ধুটি জীবনের স্বপ্ন দেখত ও দেখাত তা যেন আজ মরিচীকা হয়ে গেছে। বন্ধুটির পাশে বসতেই সে হু হু করে কেঁদে উঠে বললো আমি হয়ত আর বাঁচব না। তোমরা আমার সংসারকে দেখো। আমি তাকে একটি গল্প শুনালাম- একজন বাবা তার তিন মাসের শিশুকে শুণ্যে ছুড়ে মারছে, আবার শক্তভাবে তাকে তার দুই হাতের মধ্যে ধরে ফেলছে। শিশুটি যখন শুণ্যে ভাসছে তখন সে হিঃ হিঃ করে হেসে উঠছে। কিন্তু আমরা যদি একটু চিন্তা করি তবে মনে হতে পারে শিশুটি যখন শুণ্যে ভাসছে তখন তার মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা কাজ করতে পারে। তখন তো তার হাসার কথা নয়। বরং কাঁদার কথা। কিন্তু সে হাসছে। কারণ সে জানে তার বাবা তার দুটো শক্ত হাত দিয়ে তাকে ধরে ফেলবে। এটাই ভরসা। কোন এক অঞ্চলে অনেকদিন ধরে বৃষ্টি হচ্ছিল না। খরতাপে মাটি চৌঁচির হয়ে গিয়েছিলো। ঐ এলাকার সব লোক সিদ্ধান্ত নিলো তারা একটি মাঠে এসে ঈশ্বরের কাছে বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করবে। সবাই প্রার্থনা করার জন্য মাঠে এলো কিন্তু একটা ছোট ছেলে মাঠে আসার সময় একটা ছাতা মাথায় দিয়ে প্রার্থনা সভায় যোগ দিলো। ব্যাপারটা দেখে সবাই অবাক হলো। ছেলেটাকে বললো বৃষ্টি তো হচ্ছে না, আমরা বৃষ্টির জন্য প্রার্থনা করতে এসেছি। তবে তুমি কেন ছাতা নিয়ে এসেছ। ছেলেটা বললো আমি জানি আমাদের প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে ধরণীর বুকে বৃষ্টি নেমে আসবে। এটাই বিশ্বাস। প্রতিদিন ঘড়িতে এলার্ম দিয়ে আমরা ঘুমাতে যাই। এর কারন হচ্ছে আগামীকাল সকালে উঠে আমার অফিসে যেতে হবে। কিন্তু আমরা কি বলতে পারি আগামীকাল সকালে আমরা ঘুম থেকে আর উঠতে পারবো কিনা। কেননা, আমার রাতের মধ্যেই তো মৃত্যু হতে পারে। আমি যে বেঁচে থাকব এর তো কোন নিশ্চয়তা নেই। তা সত্ত্বেও আগামী দিন জেগে ওঠার জন্য আমরা ঘড়িতে এলার্ম দেই। এটাই আশা। বন্ধুকে ভরসা, বিশ্বাস ও আশা এই তিনটি বিষয়ের কথা বলার সাথে সাথেই তার মুখে হাসি ফুটে উঠল। তার যে মনটা মরে গিয়েছিলো বিশ্বাস, আশা ও ভরসার মধ্যে দিয়ে তা যেন আবার জেগে উঠল। মৃত্যু পথযাত্রী বন্ধুটির মুখে দেখলাম বেঁচে উঠার আলো। আমার এ লেখার সমাপ্তিটুকু এ ভাবে করতে চাই- জীবনের প্রতিটি মুহুর্তই আমাদের জন্য একটি গল্প। আর সেই গল্প মানুষকে বদলে দেয়, তাকে চিন্তুা করতে শিখায় এবং মানুষ হিসেবে নতুন করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। কারণ মানুষ আর জীবনের গল্প নিয়েই আমাদের সময়ের পথে অগ্রসর হতে হয়। এ যাত্রা অন্তহীন. শিক্ষাবিদ, কলামিষ্ট ও লেখক ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর
Bootstrap Image Preview