Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ রবিবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৫ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

বেগম রোকেয়ার কপাল ভালো এই শতাব্দিতে জন্ম হয়নি!

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৫ জানুয়ারী ২০১৮, ০৯:১৯ PM
আপডেট: ২৩ জানুয়ারী ২০১৮, ০২:৪১ PM

bdmorning Image Preview


তানভীর রাফি-

সে এক শতাব্দী আগের কথা। তখন বাঙালি নারীদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা গ্রহণের নূন্যতম কোনো সুযোগ ছিল না। নারীদের শিক্ষালাভের এই অন্ধ ব্যবস্থার মাঝে জন্ম হয়েছিল একজন প্রগতিশীল নারীর। দূরদর্শী সমাজ চিন্তক, নিভৃতচারি নারীটি ছিলেন 'বেগম রোকেয়া'। বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া মেয়েদের শিক্ষার জন্য প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একটি গার্লস স্কুল। মাত্র ৮ জন ছাত্রী নিয়ে যাত্রা শুরু করেন।

সে সময়ের ইতিহাস, পত্র-পত্রিকা ও বেগম রোকেয়ার লেখনি থেকে জানতে পারা যায়, কতটা কষ্ট, লাঞ্ছনা সহ্য করে ছাত্রী সংগ্রহ করেন তিনি। স্কুল পরিচালনা করতে গিয়ে বারবার তাকে পড়তে হয়েছে বিরূপ সমালোচনা ও প্রতিবন্ধকতার মুখে। তিনি সবকিছুকে মোকাবিলা ও উপেক্ষা করেই স্কুলটিকে সেযুগে মেয়েদের শিক্ষালাভের অন্যতম প্রতিষ্ঠানে পরিণত করেছিলেন।

কিন্তু একবিংশ এই শতাব্দীতে এসে আমি বলতে চাই, বেগম রোকেয়ার কপাল অত্যন্ত ভালো কারণ এই শতাব্দীর প্রাক্কালে তার জন্ম হয়নি। এই শতাব্দীতে জন্ম নিলে তাকে হয়তো চাপাতির কোপের আঘাতে থামিয়ে দেওয়া হতো। তথ্য প্রযুক্তির এই স্বর্ণযুগে হয়তো স্কুলগামী ছাত্রীদের ভিডিও ধারণ করা হতো।

তারপর সেই ভিডিও প্রচার করে হয়তো বলা হতো, 'কতিপয় স্কুলগামী নির্লজ্জ-বেহায়া ছাত্রীদের ভিডিও দেখুন।' শতাব্দীর সেই অতীতের কথা থেকে আমি ফিরে আসতে চাই। চলে যেতে চাই আধুনিক এই সমাজ ব্যবস্থার প্রাক্কালের সময়ে। একটা সময় হয়তো কেউ কল্পনা করেনি ঢাকা শহরের রাস্তায় কোনো মেয়ে জিন্স-টপস পরিহিত অবস্থায় চলাচল করবে। কিন্তু বিশ্বায়নের আধুনিকতার সাথে তাল মিলিয়ে আস্তে আস্তে বাঙালি মেয়েরাও রাস্তায় জিন্স-টপস পরিহিত অবস্থায় রাস্তায় চলাচল শুরু করে। একবিংশ শতাব্দীতে এটা হয়তো কোনো বিষয়ের মাঝেই পড়ে না। কিন্তু হঠাৎ করে মেয়েদের স্বাধীনভাবে রাস্তায় চলাফেরার শুরুটা খুব একটা সুখকর ছিলনা। তাদের সেই চলাফেরায় নানা-রকম বিদ্রুপ অবস্থার সম্মুখীন হতে হতো। শিকার হতে হতো শতরকমের অপমার আর লাঞ্চনার। তখনকার ভাষায় সহজ করে বলতে গেলে তাদেরকে সম্মোহিত করা হতো বেশ্যা, মাগি মত অদ্ভুদ সব অশ্লীল শব্দে। কিন্তু আমার মনে হয়, মেয়েদের কপাল অত্যন্ত ভালো। কারণ তাদের স্বাধীন চলাফেরার পরিবর্তনের ঐ সময়টাতে পৃথিবী আধুনিক প্রযুক্তিতে এতো ঠাসা ছিল না। যদি থাকতো তবে হয়তো কোনো জিন্স-টপস পরিহিত মেয়ের চলাফেরার অবস্থা ভিডিও ধারণ করা হতো। তারপর সেইসব ভিডিও বিদ্রুপভাবে বিভিন্ন মাধ্যমে প্রচার করা হতো। সেইসব ভিডিও হয়তো গোপন সব ভিডিও মতই মানুষের কাছে আর্কষণীয় রূপ ধারণ করতো। উপরের এইসব ঘটনা বলার কারণ কিন্তু একটাই। কারণ হলো কতিপয় কিছু পুরুষের অদ্ভুদ সব বিশ্লেষণ, দৃষ্টিভঙ্গি আর মতামত।

তাদের মূল বিশ্লেষণটাই ছিল, মেয়েরা কেন পুরুষের মত আচরণ করবে? মূল দৃষ্টিভঙ্গিটা ছিল, নারী-পুরুষ আলাদা। নারী-পুরুষ কখনো সমকক্ষ হতে পারে না। আর মূল মতামতটা ছিল, এই সমস্ত নারীদের কখনোই পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া উচিত না। আর এতোসব কথা বলার মূল কারণ হলো, গত কয়েকদিনে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটা ভিডিও।

ভিডিওটা ছিল উন্মুক্ত পরিবেশে মেয়েদের সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে। সিগারেটের ব্যাপারটাই আগে বলতে চাই। ধুমপানের বিষয়ে অন্য দশজন মানুষের মতই আমার স্পষ্ট অভিমত 'না'। নারী-পুরুষ আলাদা করে না বলে বলতে চাই, বলতে চাই মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সিগারেট অত্যন্ত ক্ষতিকর। এবিষয়ে কখনোই কারো দ্বিমত থাকতে পারে না।

আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্যবিষয়ক অধিদপ্তর (WHO)'র মতে আগামী একশ বছরের মধ্যে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি হচ্ছে তামাক। আমার মনে হয়না এ ব্যাপারে বিস্তারিত আর কিছু বলার প্রয়োজন আছে। সিগারেট ধুমপানকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে সামাজিক সচেতনমূলক ভিডিও তৈরী হয় এটা অত্যন্ত পজিটিভ একটা দিক। আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ব্যবহারের মাধ্যমে এইসব সচেতনমূলক ভিডিও তৈরী হবে এটাই স্বাভাবিক। সাধুবাদ জানানোর মত বিষয়। কিন্তু সমস্যাটা তখনই তৈরী হয় যখন সিগারেট ধুমপানকে কেন্দ্র করে নারী-পুরুষকে আলাদাভাবে উপস্থাপন করা হয়। বিষয়টাতে তখন ঠিক সেই আগের প্রতিচ্ছবি ভেসে আসে। আগের মতই উপস্থাপিত হয় এটা পুরুষের কাজ, নারীদের নয়। নারীকে তখন 'কতিপয়' শব্দে পূঞ্জীভূত করতে হয়।

নারীদের পুঞ্জিভূত করে এই ভিডিও বানানোর মূল কারণটি ছিল, ভিডিও পরিচালক একদিন বাসে মেয়েদের সংরক্ষিত আসনে বসেছিল তাই তাকে গালি দেওয়া হয়। তার ক্ষোভ মেয়েদের সব জায়গায় পুরুষের সমান অধিকার দেওয়া হয় কেন? পরিচালকের কি জানা নেই আড়াই কোটি জনসংখ্যার ব্যস্ত শহর এই ঢাকা। যেখানে পুরুষদের হুড়োহুড়ি করে বাসে চড়তে হয় সেখানে মেয়েদের বাসে জড়া কতোটা দুঃসাধ্য একটা ব্যাপার। তার বোঝা উচিত ছিল তাকে যখন গালি দেওয়া হয় তখন কোনো পুরুষ তার হয়ে প্রতিবাদ করেনি। কারণ তিনি ছিলেন 'কতিপয়' সেই পুরুষদের মাঝে একজন।

আর মজার ব্যাপার হলো নারী-পুরুষের এই অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি সিগারেটের সত একটা বিষয়কে টেনে নারীদের 'কতিপয়' বানিয়ে দিয়েছেন। তারচেয়েও মজার ব্যাপার হলো, তিনি যদি নারীকে কেন্দ্র করে সিগারেটের ক্ষতিকর বিষয় তুলে ধরতেন তবে সেটা বিদ্বেষমূলক হলেও সমাজের জন্য একটা বার্তা থাকতো। কিন্তু তার পয়েন্ট অফ ভিউ ছিল নারীদের উন্মুক্ত পরিবেশে সিগারেট খাওয়া মানায় না। ভিডিওটিতে সর্বশেষ যে বার্তাটি ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ ব্যাপার।

বার্তাটি ছিল মেয়েদের সিগারেট খাওয়া ভিডিও করে সেটা সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা, যাতে আর কোনো মেয়ে উন্মুক্ত পরিবেশে সিগারেট খাওয়ার সাহস না পায়। কারো অনুমতিবিহীন ভিডিও ধারণ করা আর সেটা জনসম্মুখে প্রচার করা বৈধ নাকি অবৈধ সেটা বলার আর প্রয়োজন মনে করছি না। আমার শুধু ভয় হয় হচ্ছিল এরা যদি বেগম রোকেয়ার সময়ে এরকম সুযোগ পেতো তাহলে হয়তো এভাবেই স্কুলগামী ছাত্রীদের ভিডিও ধারণ করে প্রচার করতো। এরা যদি নারীদের স্বাধীন চলাফেরার শুরুর সময়টাতে এরকম সুযোগ পেতো তাহলে হয়তো একই ভাবে ভিডিও করে প্রচার করতো। আসলে তারা নারীদের 'কতিপয়' শব্দে সীমাবদ্ধ করতে গিয়ে যে নিজেরাই 'কতিপয়' পুরুষ শব্দে সীমাবদ্ধ হয়েছে সেটা হয়তো আন্দাজ করতে পারেনি। এই জন্যই হয়তো হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন, 'পুরুষতান্ত্রিক সভ্যতার শ্রেষ্ঠ শহীদের নাম নারী।

Bootstrap Image Preview