Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২১ বুধবার, নভেম্বার ২০১৮ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

শিক্ষকদের আমরণ অনশন ও ঘুমন্ত জাতি

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৫ জানুয়ারী ২০১৮, ০১:১২ PM
আপডেট: ০৫ জানুয়ারী ২০১৮, ০৬:২০ PM

bdmorning Image Preview


হাকিম মাহি

দক্ষিণ আফ্রিকার একটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের ফটকে লেখা আছে, একটি জাতিকে চূড়ান্ত ধ্বংস নিশ্চিত করতে কামান ব্যবহার করে যুদ্ধের প্রয়োজন নেই, বরং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দিলেই যথেষ্ট। নব্বইয়ের দশকের কলকাতা বাংলার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে ‘হীরক রাজার দেশে’ ছবিটি প্রণিধানযোগ্য। এই চলচ্চিত্রের উপজীব্য বিষয় ছিলো, শিক্ষাহীন জাতি মেরুদণ্ডহীন। এরা পরজীবী, এরা কূপমণ্ডূক।

একমাত্র শিক্ষক ও শিক্ষিতরাই মুক্তচিন্তার অধিকারী, আর বাকি সবার চিন্তাই নির্দিষ্ট পরিসরে আবদ্ধ। এহেন হীরক রাজার স্বৈরাচারী মননের প্রধান কৌশল ছিলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া। তাই তিনি বলেছেন, লেখাপড়া করে যে, অনাহারে মরে সে। হয়তোবা আমাদের দেশের শিক্ষক সমাজ শিক্ষা গ্রহণের জন্যেই অনাহারে মরছেন।

গত ২৬ ডিসেম্বর ২০১৭ সাল থেকে আজ অবধি ননএমপিও ভুক্ত শিক্ষকদের আমরণ অনশন এবং বেতন-ভাতার জন্য এদের রাস্তায় অবস্থান একটি সভ্য জাতির নিরলজ্যতার সর্বশেষ সীমানা। বাটখারা দিয়ে যেমন পণ্যের ভাঁড় মাপা যায়, থার্মোমিটার দিয়ে যেমন রোগীর জ্বর মাপা যায়, সিস্মোগ্রাফি যন্ত্র দিয়ে যেমন ভূমিকম্পের মাত্রা পরিমাপ করা যায়, তেমনি জাতিকে শিক্ষিত করে আর শিক্ষকদের মর্যাদা দিয়ে একটা জাতি কতটুকু উন্নত ও সভ্য তা মাপা যায়।

একটা দেশের প্রধান চালিকা শক্তিই শিক্ষক সমাজ। তাই তো ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিদের সর্বশেষ কূটকৌশল ছিলো মনীষীদের হত্যা করা। আর ওরা ১৪ ডিসেম্বর তাই করেছিলো। ডেকে ডেকে নিয়ে হত্যা করেছিলো জাতির বিবেকদের। ওরা জানতো বাঙালির জয় সুনিশ্চিত। তাই প্রত্যক্ষ মুক্তিযুদ্ধে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলেও হাজার বছরের জন্য আমরা পরাধীন। কারণ একটা কথা আছে, যেটি যুগ যুগ ধরে প্রমাণিত। তোমরা যদি একটা জাতিকে সমূলে ধ্বংস করতে চাও, তাহলে ঐ জাতির লাইব্রেরিগুলো পুড়িয়ে ফেলো, আর মনীষীদের হত্যা করো। তাহলে দেখবে বিনা যুদ্ধে ঐ জাতি ধ্বংস হয়ে গেছে।

শিক্ষকদের উপর হামলা, মামলা, নিপীড়ন, নির্যাতন, অপমান এটি আজ নতুন নয়, নিত্য নিত্যনৈমিত্তিক। খ্রিস্টপূর্ব ৪৭০ অব্দে মহামতি শিক্ষক সক্রেটিসকে হেমলক পান করিয়ে মৃতদণ্ড দিয়েছে। এর প্রধান কারণ ছিলো ঐ যুগে সহজ-সরল মানুষগুলোকে শিক্ষিত করে ফেলছে সক্রেটিস। মানুষ যদি শিক্ষিত হয়, তাহলে তাদেরকে আর শোষণ করা যাবে না অনৈতিকভাবে। এভাবেই শাসক আর শোষণের বিরুদ্ধে চলে গেলেন সক্রেটিস। জীবন দিতে হলো তাঁকে।

প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখা যায় এখানে শিক্ষক লাঞ্ছিত, ওখানে শিক্ষিকরা বঞ্চিত। কিন্তু কেন? এর পেছনে মূল কারণ হলো, শিক্ষকরা অর্থনৈতিকভাবে শিক্ষকরা সমাজে পেছনে পড়ে আছে। যেখানে বাংলাদেশের বর্তমান মাথাপিছু ব্যয়ে একজন মানুষের ৬/৭ হাজার টাকা মাসে প্রয়োজন হয়। সেখানে একজন শিক্ষক ৮/১০ হাজার টাকা বেতন পেয়ে কিভাবে ৩/৪ জনের সংসার চলবে। অনেকে ভাত যোগাতে গিয়ে কাপড় যোগাতে পারেন না, চিকিৎসার অভাবে অনেকে মারাই যায়। সরকারি শিক্ষকরা তো কিছু টাকা মাসিক হিসেবে নিশ্চিত পান। কিন্তু বেসরকারি শিক্ষকদের তো তারও নিশ্চয়তা নেই। রাস্তায় বসে আজ শিক্ষকদের কান্না, শুধুই নিষ্ফল আবেদনই মনে হয়। আমাদের দেশের শিক্ষার এই অবহেলার পেছনে অনেকগুলো কারণ রয়েছে। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো আমাদের ষীক্ষা ব্যবস্থা কর্মমুখী নয়। কয়েক দশক আগে চীনে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বন্ধ করে কারিগরি শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করে ১২ বছরের জন্য। কারণ তারা দেখেছিলেন প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ শিক্ষিত বেকার যুবক বসে থাকে। তাই কর্মমুখী শিক্ষা চালু করেন। আজ চীন সারা বিশ্বকে অর্থনৈতিক দিক থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শুধু শিক্ষা ব্যবস্থা পাল্টানোর জন্য।

আরেকটি কারণের মধ্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস। শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হয়ে থাকে, আর মনীষীদের মৃত্যই যদি জাতি ধ্বংসের কারণ হয়, তাহলে প্রশ্ন ফাঁস করে অজ্ঞ জাতি তৈরি করাও একটি কারণ। সুতরাং যে কোন মূল্যে প্রশ্ন ফাঁস ঠেকানো। তানা হলে এই জাতি মহাকালের পতন কেউ ঠেকাতে পারবে না সুনিশ্চিত।

আজ আমাদের এই সোনার বাংলা সারা বিশ্বব্যাপী সকল দিক থেকে তিল তিল প্রশংসা কুড়িয়েছে। আমরা আমাদের এই সুনামকে ধুলোয় মলিন হতে দেবো না। সুতরাং আমাদের কাজী নজরুলের সকাল বেলার পাখি হলো শিক্ষক মহোদয়গণ। তাঁদের রাস্তায় বসে দাবি দাওয়া আদায় করাটা নির্লজ্জতাকেও হার মানায়। তাই আমাদের সরকারের উচিত সঠিক ও গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে এই সমস্যার সমাধান করে শিক্ষাগুরুদের মর্যাদা রক্ষা করা। কারণ এই মানবতার মহান কাণ্ডারি শিক্ষকরা না জাগলে কেমনে আমাদের সফলতার শুভ সকাল হবে! সুতরাং জাগো জাতি, খোলো চোখ। এই মাথার তাজ তোল্য শিক্ষকরাই আমাদের সোনালী ভবিষ্যৎ।

লেখক: শিক্ষার্থী, জার্নালিজম, কমিউনিকেশন অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগ; স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও কর্মী 'নো ভ্যাট অন এডুকেশন'
Bootstrap Image Preview