Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২০ মঙ্গলবার, নভেম্বার ২০১৮ | ৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

আন্দোলনের শিক্ষক আর ক্লাসের শিক্ষক! আমি কোথায় খুঁজি তারে?

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৩:৪০ PM
আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৮:০৩ PM

bdmorning Image Preview


আরিফ চৌধুরী শুভ-

এই মুহূর্তে ঢাকা শহরের মোট জনসংখ্যার চেয়ে অতিরিক্ত আরো অর্ধলক্ষ মানুষ জেগে আছে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। এই সংখ্যা কমছে না বরং ক্রমাগত বাড়ছে। ২৯ ডিসেম্বর ৩৮তম বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নিতে এই শহরের বুকে আরো দুই লক্ষাধিক মানুষ যোগ হবে। ঢাকার শরীরে জনসংখ্যায় এখন বড় সমস্যা। একদিকে প্রাথমিক সমাপনীর ফলাফল ও বই উৎসব, অন্যদিকে শিক্ষকদের আমরণ অনশন শিক্ষাব্যবস্থার জন্যে আশনি সংকেত। তবুও আন্দোলন চলছে। চলবেই। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে অনশনরত মানুষগুলো দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। এ সমাজের বিবেক ও মানুষ গড়ার কারিগর। আমরা যখন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, তখন তাঁদের বই হাতে ক্লাসে দেখেছি, আর এখন দেখছি পোস্টার হাতে রাস্তায়। তখন তাঁদের কণ্ঠে ছিল বর্ণমালার আওয়াজ, আর এখন কণ্ঠে স্লোগান ‘দাবি মোদের একটাই, প্রধান শিক্ষকের পরের ধাপে বেতন চাই’। এরা এসেছেন প্রধান শিক্ষককের সাথে সহাকারী শিক্ষকদের বেতন গ্রেড বৈষম্য মেটাতে। এ দাবি আক্ষেপ নাকি আশার, তা এখনো স্পষ্ট বলা যাচ্ছে না। কিন্তু জাতির বিবেকের কাছে প্রশ্ন, আমাদের শিক্ষকরা আন্দোলনে রাস্তায় কেন? শিক্ষরাতো ক্লাসে থাকার কথা। তাঁদের স্থান ক্লাসে, আমাদের হৃদয়ে। রাস্তা বা শহীদ মিনারে নয়।

দুদিন আগেও এই শহর জানতো না জাতির কারিগররা তার বুকে এমন একটি দাবি নিয়ে আমরণ অনশন করবে। এই জন্যে এই শহর নিজেকে বড়ই দুর্ভাগা ও অভিশপ্ত মনে করছে নাতে? কিন্তু আমরা নিজেদের দুর্ভাগা মনে করছি। এই শহরের নিউরন কখনো হেফাজত, কখনো গণজাগরণ, কখনো রাজনৈতিক দলের সভা সমাবেশ দ্বারা উদগিরীত হয়। শিক্ষার্থীরাতো বছরের বেশির ভাগ সময় এই শহরকে জিম্মি করে রাখে দাবির স্লোগানে। ২০১৫ সালে বেসরকারি উচ্চ শিক্ষায় কর বসানোর প্রতিবাদে ‘নো ভ্যাট অন এডুকেশন আন্দোলন’র ডাক দিয়ে আমরাও প্রায় ৪ মাস শহরকে জিন্মি করে দাবি আদায় করেছি। এত আন্দোলন, এত অনশন। এত দাবি আমাদের। চারপাশে শুধু না পাওয়ার হাহাকার।

কিন্তু শিক্ষকদের এমন অনশন কাণ্ড এই শহর ও আমরা এভাবে দেখতে প্রস্তুত ছিলাম না। অর্থমন্ত্রীতো বিরক্ত হয়ে আদা-জল ছেড়েছেন ‘শিক্ষকদের আন্দোলন অনর্থক। শিক্ষামন্ত্রী কি এই অনর্থকতার আর্থ খুঁজছেন পরিস্থিতি শান্ত করতে। কালক্ষেপনই কি কোন কৌশল, না দীর্ঘ মেয়াদি অভিশাপ থেকে শিক্ষাব্যবস্থাকে মুক্তির পথ আবিষ্কার?

শিক্ষককেরা জ্ঞানের মানুষ। যথেষ্ট পড়ুয়া মানুষ। তাই তারা আমাদের চেয়ে ভালো বোঝেন কখন ঝোঁপ বুজে কোপ মারতে হবে। দাবি যত অর্থক আর অনর্থকই হোক ২০১৭ সালের সমাপনীর ফলাফলকে সামনে রেখে দাবির বাস্তবায়নটা যতটা সহজ, বছরের অন্য সময় তা হয়তো পাত্তাই পেত না সরকারের কাছে। তাই সরাসরি বসে পড়লেন আমরণ অনশনে। কিন্তু একটা আন্দোলনের এটা যে সর্বশেষ ধাপ এটা শিক্ষক নেতারা স্বার্থে ভুলে গেছেন। বাংলাদেশ সহকারী প্রাথমিক শিক্ষক মহাজোটের নেতারা আল্টিমেটাম দিয়েছেন, দাবি আদায় না হলে প্রাথমিক সমাপনীর ফলাফল আটকে দেওয়া হবে। তাহলে বই উৎসব হবে না। আন্দোলনের মোটিভ সরল অংকের মতো পরিষ্কার। বেকায়দায় সরকার আর উভয় সংকটে আছি আমরা যারা সমাপনীর ফল প্রত্যাশী শিক্ষার্থীদের অভিভাবক। প্রায় ৩১ লক্ষ প্রাথমিক শিক্ষার্থীর ফলাফল এই শিক্ষকদের হাতে। গত ১৯ নভেম্বর এই পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়েছে। পরীক্ষার্থীর সংখ্যা বিবেচনায় এটিই দেশের সবচেয়ে বড় পাবলিক পরীক্ষার ফলাফল। শিক্ষক নেতাদের এমন হুশিয়ারি বছরের শুরুতে ফলাফল প্রকাশ, বই উৎসব ও পাঠদানকে অনিশ্চিতায় ফেলেছে। তাই সমাধান যাই হোক খুব দ্রুত হওয়া দরকার।

শিক্ষকদেরকে আন্দোলনে বা রাজপতে আমরা অতীতেও দেখতে চাইনি আজও চাইবো না। এটি কোন সভ্য সমাজেরও কাম্য হতে পারে না। কিন্তু এই বাংলাদেশ আজ দেখেছে শিক্ষকরা টাকার জন্যে মরণের হুমকি দিচ্ছেন সরকারকে। ছাত্র আর শিক্ষক এক সাথে সিগারেট আর মদ খাচ্ছেন। প্রাচ্যের অক্সফোর্ডেও শিক্ষকরা মারামারি করেছেন ছাত্রদের সামনে। অকথ্য ভাষায় আচরণ করছেন সহশিক্ষকদের সাথে। শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একপক্ষের শিক্ষকরাই ছাত্রদের ইন্দন দিয়ে মাইর দিয়েছেন অন্য পক্ষের শিক্ষকদের। শিক্ষকরাই প্রশ্ন ফাঁস করছেন ছাত্রদের জন্যে। তাহলে জাতি কার কাছে শিক্ষা চাইবে? প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কোথায় খুঁজি শিক্ষক? শিক্ষকদের এমন আচরণের কারণে স্বয়ং শিক্ষামন্ত্রীই বলতে বাধ্য হয়েছেন, ‘আমাদের আরো নৈতিকতাবোধ সম্পন্ন শিক্ষক বেশি দরকার’।

দু:খ হয় তখনই যাদের কাছে নীতি নৈতিকতা শিখবে জাতি, তারাই আজ নৈতিকতার প্রশ্নের মুখোমুখি। আমরা আজ প্রাথমিক স্তর অতিক্রম করা যে মেধাহীন বড় একটি প্রজন্মকে মাধ্যমিক স্তরে পাচ্ছি এই শিক্ষকদের মাধ্যমে, এই দায় কার? সরকারের শতভাগ পাশের ঘোষণায় প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা ব্যবস্থা আজ শিক্ষকদের লুডু খেলার মাঠে পরিণত হয়েছে। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আজ যে সমাবেশ সেটি জাস্ট হাজারো সমস্যার একটির প্রকাশ মাত্র। ছাঁকা দিলে ১০ শতাংশ শিক্ষকও পাওয়া যাবে কিনা সন্দেহ আছে, যারা শিক্ষকতার ব্রত নিয়ে এই মহান পেশায় এসেছেন।

বেতন বৈষম্যের জন্যে আজ যে শিক্ষকেরা আমরণ অনশনে, তারা এই বৈষম্য কার সাথে করেছেন। তারই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককের সাথে সহকারী শিক্ষকদের। এটা একটা পরিবারকে অশান্তিতে পরিণত করার একটি অশুভ চিন্তা মাত্র। একটা বিদ্যালয়ে ৭ জন সহকারী শিক্ষক থাকলে প্রধান শিক্ষক থাকেন একজন। কতটা বৈষম্য সে হিসাব না হয় পরে করলাম, কিন্তু ঘরের লোকের বিরধিতা করে কিভাবে একসাথে ঘর করবেন এই শিক্ষকরা? সহকারী শিক্ষকরা কি প্রধান শিক্ষককে টেনেহিছড়ে নিজেদের চেয়ারে নামিয়ে আনলেই খুশি হবেন। সরকারের উচিত তাদের দাবির প্রেক্ষিতে ঘোষণা দিয়ে দেওয়া যে আজ থেকে কোন প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আর প্রধান শিক্ষক থাকবে না। প্রধান শিক্ষকদের শিক্ষা ডিপার্টমেন্টের অন্য কাজে নিয়োজিত করুক। যেহেতু প্রধান শিক্ষক বেশি বেতন পাচ্ছেন, সেহেতু সবাই সহকারি শিক্ষক থাকবেন। প্রধান শিক্ষকের যে দায়িত্ব, তা পালা করে সহকারী শিক্ষকরাই করবেন। তাতে কি তারা সম্মতি দিবেন? নাকি আবারো আন্দোলনে নামবেন?

প্রধান শিক্ষক না থাকলে কারো কোন জবাব দিহিতার প্রয়োজনই পড়বে না। ক্লাসে কে ঘুমান আর কে পড়ান, কে আগে আসেন, কে আগে যান, তার কৈফিয়ত কেউ রাখবে না। এই আন্দোলন যতটা না বেশি স্বার্থের তার চেয়ে বেশি লজ্জার ও কলঙ্কের। আমরা শিক্ষককদের ক্লাসে দেখতে চাই। রাস্তায় বা শহীদ মিনারে নয়। আর যাই হোক রাস্তার শিক্ষকরা ক্লাসের জন্যে কতটুকু পারপেক্ট হতে পারেন তা আগামীর বাংলাদেশই বলবে। আন্দোলনে অংশগ্রহণকারির সংখ্যা বেশি হলেই সেই আন্দোলনকে যোক্তিক আন্দোলন বলা যাবে না। অন্তত আমি বলছি না।

সহকারী শিক্ষকদের বোঝা উচিত তাঁরা আজ রাষ্ট্রেকে যে হুমকি দিচ্ছেন, তা শুধু রাষ্ট্র নয়, নিজেরাই নিজেদেরকে হুমকি দিচ্ছেন। এই শিক্ষকদের সন্তানরাও সমাপনীর ফল প্রত্যাশি, বই উৎসবের অপেক্ষায় আছে। তাই হুমকি নয়, দাবি আদায়ের ঘোষণা থাকা দরকার ছিল আলোচনার ও যোগ্যতা ভিত্তিতে এবং সময় নিয়ে। এই আন্দোলনে যারা অংশ নিয়েছেন, তারা বেশির ভাগই প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে এসেছেন। সরকার যে গ্রেডে একজন সহকারী শিক্ষককে নিয়োগ দেন, তা পড়ে বুঝে শুনেই এ পেশায় যোগদান করেছেন প্রত্যেকে। তাহলে আজ আন্দোলন কেন? লক্ষ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে কেউ শিক্ষকতায় সুযোগ পেলে তিনি বড়জোর একটি চাকুরী পেয়েছেন জীবিকার জন্যে, কিন্তু শিক্ষক হি হতে পারেছেন? এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের কেউ কেউ যে এমনভাবে শিক্ষকতায় আসেননি তা উড়িয়ে দিচ্ছি না। আপনাদের কাছেই প্রশ্ন, শিক্ষকতা কি একটি মহান পেশা, না জনপ্রিয় চাকুরি?

যিনি প্রধান শিক্ষক তার কাজের পরিধি ও যোগ্যতাটা একবার ভাবুন। নিজেকে এ পদের যোগ্য মনে করলে প্রমাণ করুন। সবাই প্রধান শিক্ষক হলে সহকারী শিক্ষক হবেন কে? তাই সবাই নিজের অবস্থানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সরকার পরিকল্পনায় করছে বিসিএস নন-ক্যাডার থেকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পদটি পূরণ করবেন সামনে, কিন্তু আজকের এই অবস্থার জন্যে ভবিষ্যতে ননক্যাডাররা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কাজ করতে নিরুৎসাহিত হবেন। কদিন আগেই সারাদেশের কাওমি মাদ্রাসাগুলো জাতীয়করণের জন্যে আন্দোলনে নেমেছে মাওলানারা। কিন্তু জাতীয়করণ হওয়ার পরে বেতন বৈষম্যের দাবি নিয়ে মাওলানারা যে আপনাদের মতো রাস্তায় দাঁড়াবে না, আমরণ অনশনে বসবে না, তার নিশ্চয়তা কে দিবে? দেশটার বয়স মাত্র ৪৬। এই বয়সে দেশ আমাদের যা দিয়েছে, আমরা দেশকে কতটুকু দিচ্ছি সেই প্রশ্নটাকি একবারও করেছি নিজেকে?

যে শিক্ষকরা আজ বেতন বৈষম্যের জন্যে শহীদ মিনারে আমরণ অনশনের ডাক দিয়েছেন, তারা আন্দোলন শেষে ক্লাসে ফিরে শিক্ষার্থীদের সামনে মাথা উঁচু করে নিজেকে উপস্থাপন করে বলতে পারবেন, আমরা তোমাদের মানুষ বানানোর জন্যে আন্দোলনের মাধ্যমে আমাদের বেতন ভাতা বাড়িয়েছি। সরকার আমাদের দাবি মানতে চায়নি, কিন্তু আমরা তোমাদের ফল আটকে দেবার ঘোষণা দিয়ে সরকারকে দাবি মানতে বাধ্য করেছি। আন্দোলনরত শিক্ষকরা কি আন্দোলনের সময়ে নিজের ছোট সন্তানের কচিমুখটির কথা একবারও কল্পনা করেননি? একবারও কি ভাবেননি কচিকচি বাচ্চারা অপেক্ষা করছে কখন বছর শেষ হবে, সমাপনীর ফল বের হবে, হাসিমুখে বই উৎসবে যোগ দিবে। আমার বিশ্বাস এই আন্দোলনে যেই শিক্ষকরা এসেছেন, বেশির ভাগই বেতন বৈষম্যের দাবিটি এভাবে আদায়ের পক্ষে নয়। বেশির ভাগ শিক্ষকই এখনও বিশ্বাস করেন সরকার দাবি মানুক আর না মানুক, তাদের আমরণ অনশনে যাওয়ার সিদ্ধান্তটা জাতির কাছে শিক্ষক সমাজকে খাটো করেছে, উঁচু নয়। তাই ভবিষ্যতে আন্দোলনের প্রয়োজনে আন্দোলনের ভাষা ও উদ্দেশ্য আরো যোক্তিক হবে বলে আশা করি।

সরকারকে বোঝা উচিত, এই সহকারি শিক্ষকরাই প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রাণ। প্রধান শিক্ষক না থাকলে চলে কিন্তু সহকারী শিক্ষক না থাকলে বাচ্চাদের পাঠদান থমকে যাবে। বাচ্চাদের পড়ানো কতটা কষ্টের তা সহকারি শিক্ষকরাই বোঝেন। প্রধান শিক্ষককের বেতন বাড়বে সহকারি শিক্ষকদের বাদ দিয়ে সেটি সমিচীন নয়। আমাদের কাছে শিক্ষক শিক্ষকই। এই পার্থক্য আরো কমিয়ে আনা উচিত।

শিক্ষকরা যখন বেতন বৈষম্য দাবি নিয়ে যখন ঢাকামুখি, তখন আমার শ্রদ্ধাভাজন বহু শিক্ষক আমাকে বিভিন্নভাবে অনুরোধ করেছেন আমি যেন বিষয়টি নিয়ে একটু লেখি। অনেকে বলেছেন আমার লেখা পজিটিভ হলে আমি বাংলাদেশের শিক্ষক সমাজের কাছে পজিটিভ হয়ে যাবো। যে কলম সত্য লেখে সেটি পজিটিভ হলেও সত্য লিখবে, নেগেটিভ হলেও সত্য লিখবে। আমি জানি আমার লেখা আপনাদের সফলতা বা বিফলতার কিঞ্চিত পরিপন্থি হবে না। তবুও ৩৮তম বিসিএস এর ব্যস্তাতার মাঝে আপনাদের অনুরোধে লিখার চেষ্টা করেছি।

আমার মতে, যিনি একশত টাকা বেতন পান, আর যিনি একলক্ষ টাকা বেতন পান, সমাজের চোখে দুজনই শিক্ষক। যিনি বেশি বেতন পান তিনি বেশি সম্মান পাবেন, আর যিনি কম বেতন পান তিনি কম সম্মান পাবেন তাতো নয়। বরং পাঠখড়ির শিক্ষকদের আমরা জীবনের প্রতিটি মুহুর্তে মনে রাখি বেশি। আইনস্টাইন তার সন্তানের পাঠখাড়ির শিক্ষককেই জীবনের সেরা চিঠিটি লিখেছেন। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সেই চিঠি এখনো ঝুলিয়ে থাকতে দেখা যায়। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. আতিউর রহমানের প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষক তার পড়াশুনার জন্যে গঞ্জে গামছা পেতে টাকা তুলেছেন। আমরা কেন তাদের কথা চিন্তা করি না। আমার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শহীদ উদ্দিনও দিনের বেশির ভাগ না খেয়ে আমাদের পড়াতেন। এখন লিভারের জটিলতায় ভুগছেন। মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করা এমন একজন শিক্ষকই অজোপাড়ার একটি বিদ্যালয়কে এ গ্রেডের বিদ্যালয়ে পরিচিত করেছেন।

শতাধিক শিক্ষার্থীই তার হাতে গ্রামের একটি বিদ্যালয় থেকে বৃত্তি পেয়েছে। আমি হয়েছি কুমিল্লা অঞ্চলে প্রাথমিক বৃত্তিতে প্রথম। চারমাস হলো তিনি অসুস্থতার কারণে বাধ্যতামূলক অবসরে চলে গেছেন। এই শিক্ষক মাত্র ৪০০ টাকা বেতনে শিক্ষকতার চাকুরি শুরু করেছেন। এই শিক্ষককের মুখে নিজের বেতন কত সেকথা কখনো বলতে শুনিনি। এ কথা কখনো বলতে শুনিনি, সরকার আমার বেতন না বাড়ালে তোমাদের বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল আটকিয়ে দিবো। তার নাম শুনলে এখনো আমাদের শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। এমন শিক্ষকদেরই বাংলাদেশ চায়।

অথচ আজ তারই সহকর্মীরা বেতন বৈষম্য দূর করার জন্যে গ্রাম থেকে ঢাকায় এসে শীতের মধ্যে আমরণ অনশনে যোগ দিয়েছেন। রাস্তায় বসে বসে স্লোগান দিচ্ছেন। বিশ্ববাসিকে বলছেন, প্রধান শিক্ষকের সাথে তাদের বেতন বৈষম্যের কথা। এটা শিক্ষকদের জন্যে যতটুকু দু:খের সংবাদ, পুরো জাতির জন্যে তার চেয়ে বেশি লজ্জার। সহকর্মীদের কষ্টের কথা শুনে আমার শিক্ষক শহীদ উদ্দিন টেলিফোনে দু:খ প্রকাশ করেছেন ওপ্রান্ত থেকে। আমিও দু:খ প্রকাশ করছি আপনাদের জন্যে। আশা করি খুব শিগ্রই আপনারা ফিরে যাবেন খুশি মনে।

যে শহীদ মিনারে শিক্ষকরা বেতন বৈষম্যের দাবি তুলেছেন মৃত্যুর হুশিয়ারি দিয়ে, সেই শহীদ মিনার ভাষা আন্দোলনে আত্মদানকারী জাতির বীর সন্তানদের ইতিহাস হয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে। এই শহীদ মিনার আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় সকল বীরদের কথা। এই শহীদ মিনারই একদিন আমাদের মনে করিয়ে দিবে আমরণ অনশনকারি শিক্ষকদের আন্দোলননের কথা।

তারিখ: ২৫/১২/২০১৭ লেখক: সাংবাদিক, উদ্যোক্তা ও সংগঠক, নো ভ্যাট অন এডুকেশন

Bootstrap Image Preview