Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৩ মঙ্গলবার, অক্টোবার ২০১৮ | ৮ কার্তিক ১৪২৫ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘নবীন লেখকদের বই প্রকাশের আগে প্রচুর পড়াশুনা দরকার’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ১২:৫৭ PM
আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০১৭, ০৪:৪৮ PM

bdmorning Image Preview


দেশে শিক্ষিতের হার যে হারে বাড়ছে পাঠক সেভাবে বাড়ছে কী না, নবীন লেখকদের ক্ষেত্রে করণীয়,পাঠক সংখ্যা বাড়াতে বইমেলা কী যথেষ্ট ভূমিকা রাখে? লেখক, প্রকাশক, পাঠক সর্ম্পক কেমন হওয়া উচিত? বই লেখা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে সমস্যা সম্ভাবনা প্রভূতি বিষয় নিয়ে বিডিমর্নিংয়ের সাথে কথা বলেছেন স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠিান `সূচীপত্র' প্রকাশনীর প্রধান নির্বাহী সাঈদ বারী। পুরান ঢাকার বাংলাবাজারে তার বাসায় সাক্ষাৎকার নিয়েছেন 'বিডিমর্নিং' প্রতিনিধিআল-আমিন হুসাইন ও ক্যামেরায় ছিলেন মো. সাব্বির হোসেন

আল-আমিন হুসাইন: সাঈদ বারী বিডিমর্নিংয়ের পক্ষ থেকে আপনাকে স্বাগত। কেমন আছেন আপনি?

সাঈদ বারী: আপনাদেরকেও ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

আল-আমিন হুসাইন: আপনার পরিচয় দুটো লেখক ও প্রকাশক। শুরুতে জানতে চাইবো লেখালেখির হাতেখড়িটা কীভাবে হলো? আর প্রকাশনার সাথে কীভাবে যুক্ত হলেন?

সাঈদ বারী: মূলত ছোট বেলা থেকে বই পড়ার অভ্যাসটা তৈরি হয় এবং বই পড়তে পড়তে নিজেও একটু আধটু লেখালেখি শুরু করা। প্রথমে ছড়া লেখা, ছোটদের জন্য গল্প লেখা, পত্রিকায় ছাপতে দেওয়া এবং পত্রিকায় প্রকাশ পাওয়ার পর নিজেও উৎসাহিত হওয়া। এভাবে মূলত লেখালেখিটা শুরু। তারপরে আমি একটি বইয়ের দোকান করার স্বপ্ন দেখি। তারপর একটা পর্যায়ে ‘সূচীপত্র’ নামে আমি একটা বইয়ের দোকানও করি। তারপর সেখান থেকে মূলত প্রকাশনা শুরু। ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে আমরা ‘সূচীপত্র’ প্রকাশনা প্রতিষ্ঠা করি।

আল-আমিন হুসাইন: আপনি মূলত ছোটদের জন্য লেখালেখি করেন। কোন চিন্তা থেকে ছোটদের জন্য লেখালেখি। আর এটাতে সাড়া পান কেমন?

সাঈদ বারী: ছোটবেলা থেকে আমি ছোটদের জন্য লিখি। আর ছোটদের জন্য লিখতে লিখতে তাদের প্রতি এক ধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়। প্রচুর শিশুসাহিত্যের বই পড়ি এবং নিজেও শিশুসাহিত্যের সাথে জড়িয়ে যাই। এবং শিশুদের জন্য লিখতে ভাল লাগে। কারণ আমি মনে করি শিশুরা হলো জাতির ভবিষাৎ। শিশুদের উপর দেশের ভবিষাৎ নির্ভর করে। এবং তাদের হাতে যদি ভাল বই তুলে দেওয়া যায়, তাহলে তারা জাতি গঠনে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে পারে। ফলে এরকম চিন্তা থেকে শিশুদের জন্য আমার লেখালেখি। ছোটদের জন্য নানা রকম বই লেখা এবং সেগুলো প্রকাশ করা। আর ছোটদের জন্য বই লিখে আমি ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। আর ছোটদের জন্য যখন আমরা বই লিখি তখন বেসরকারি পর্যায়ে খুব বেশি প্রকাশক শিশুদের বই প্রকাশ করতেন না। আমরা শুধুমাত্র তখন শিশুদের জন্য বই প্রকাশ করতাম। অন্য বই প্রকাশ করতাম না। সরকারি পর্যায়ে বাংলাদেশ শিশু একাডেমী থেকে শুধুমাত্র বই প্রকাশ হতো তখন শিশুদের জন্য। আর আমরা সূচীপত্র থেকে তখন শুধু ছোটদের জন্য বই প্রকাশ করতাম। সেসময় আমরা বলতামও বেসরকারি পর্যায়ে আমরা একমাত্র শিশু-কিশোরদের বইয়ের প্রকাশক। এই পর্যায়টা অনেক দিন ছিল। এবং আমরা তখন ব্যাপক সাড়া পেয়েছি। পরে আস্তে আস্তে আমরা বড়দের বইয়ের দিকে ঝুকে পড়ি। এবং দেখা যায় যে, অন্যান্য প্রকাশকরাও ছোটদের জন্য বই প্রকাশ করা শুরু করে। নতুন নতুন অনেক প্রকাশকও তখন শুধুমাত্র ছোটদের জন্য বই প্রকাশ করতে শুরু করে।

আল-আমিন হুসাইন: শিনিন রিকি পিপিলের গল্প, দুই যে ছিল নিকি ও রিকি, তোমাদের জন্য লিখি, ঈশপের নীতির গল্প, ইষ্টিকুটুম মিষ্টিকুটুম আপনার কয়েকটি শিশুতোষ গল্পের বই। কোনটাতে আপনি সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছেন?

সাঈদ বারী: ‘দুই ছিল রিকি ও নিকি’ বইটা লিখে আমার নিজেরও অনেক ভাল লেগেছে। বইটি পুরস্কৃতও হয়েছে। ২০০৩ সালে বইটি জাতীয় শিশুতোষ গ্রন্থকেন্দ্র থেকে সেরা শিশুতোষ বই হিসাবে পুরস্কৃতও হয়। এবং এই বইটি ছোটদের কাছে অনেক পপুলার(জনপ্রিয়) হয়। এর মধ্যে একটি ম্যাসেজ(বার্তা) দেওয়া আছে ছোটদের জন্য। নৈতিকতা, মূল্যবোধের কথা এখানে তুলে ধরা হয়েছে। এই বইটিতে সবচেয়ে বেশি সাড়া পেয়েছি।

আল-আমিন হুসাইন: নিজেকে আপনি কোন পরিচয় দিতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন একজন লেখক না প্রকাশক?

সাঈদ বারী: এখন মূলত একজন প্রকাশক হিসাবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করি। কারণ লেখক হিসাবে হয়ত আমি আমার বই লিখতে বা প্রকাশ করতে পারি কিন্তু প্রকাশক হিসাবে অনেক লেখকের বই প্রকাশ করতে পারি, এটা একটা আনন্দের ব্যাপার। অনেক বইয়ের লেখকের সাথে পরিচেয় হয়, সর্ম্পক তৈরি হয়। অনেক নতুন লেখার সাথে সর্ম্পক তৈরি হয়। অনেক লেখক তৈরির ব্যাপারে ভূমিকা রাখতে পারি। আর প্রকাশক হিসাবে একটা সোস্যাল কমিটিম্যান্ট রক্ষা করতে পারি। এই কারণে আমি এখন প্রকাশক হিসাবে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি।

আল-আমিন হুসাইন: প্রকাশনা বিষয়ে যদি জানতে চাই যে, প্রকাশনা ব্যবসাটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে বাধা কোথায়?

সাঈদ বারী: আমাদের আর্থ-সামাজিক বিষয়েও চিন্তা করতে হবে। আমাদের মত একটা উন্নয়নশীল দেশে আমরা নানান রকম সংকটের মধ্যে আছি। আমাদের অর্থনৈতিক অবস্থা খুব একটা আশাপ্রদ না। ফলে হয় কি বই পড়ার ব্যাপারটি অনেক পরের হয়ে দাড়ায়। আমাদের মৌলিক চাহিদা পূরণের ব্যাপার রয়ে গেছে। শিক্ষা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থানের ব্যাপার রয়ে গেছে। এগুলোর অনেক পরে আসে বই পড়াটা। আমার মনে হয় আমাদের আর্থিক অবস্থার যখন আরো উন্নয়ন ঘটবে, বই পড়ার ব্যাপারটা তখন আরো বেশি উন্নত হবে। এবং একটা পর্যায়ে গিয়ে এটি শিল্প হিসাবে প্রতিষ্ঠা পাবে। এ ব্যাপারে সরকারেও ব্যাপক ভূমিকা থাকা দরকার। সরকারি পৃষ্টপোষকতা ছাড়া প্রকাশনা শিল্প বিশেষ করে সৃজনশীল প্রকাশনা শিল্প নিজের পায়ে দাঁড়ানোর মতো অবস্থা হতে অনেক সময় লাগবে।

আল-আমিন হুসাইন: দেশে শিক্ষিতের হার যে হারে বাড়ছে সে হারে পাঠক বাড়ছে কী না?

সাঈদ বারী: না, আমার মনে হয় না সেভাবে বাড়ছে। এটা একটা দুঃখজনক চিত্র। এ ব্যাপারে আমাদের সচেতন হওয়া দরকার। আমাদের একটি রিডিং সোসাইটি এখনও পর্যন্ত গড়ে উঠেনি। আমরা প্রায় স্বাধীনতার ৫০ বছরের কাছাকাছি চলে এসেছি। আমাদের একটা আকাঙ্ক্ষা ছিল যে, আমাদের একটি ‘রিডিং সোসাইটি’ গড়ে উঠবে। ‘রিডিং সোসাইটি’ বলতে যে যে পেশায় আছে সে অন্তত তার বিষয়ের বইগুলো পড়বে। তাকে অন্য বিষয়ে পড়ার দরকার নেই। তাকে গল্পের বই পড়তে হবে না, তাকে উপন্যাস পড়তে হবে না। একজন ব্যাংকার তার ব্যাংকের বিষয়ের বই পড়বেন। একজন শিল্পপতি তার প্রয়োজনের বইটি পড়বে। একজন চাকুরীজীবী তার প্রয়োজনের বইটি পড়বেন। যিনি ভ্রমণ পছন্দ করেন, তিনি ভ্রমণবিষয়ক বই পড়বেন। একজন ছাত্র তার প্রয়োজনীয় বইটি পড়বেন। এভাবে যদি একটা সমাজ গড়ে উঠে সেটিকে আমরা বলি `রিডিং সোসাইটি’। কিন্তু এখানে সেই অবস্থাটা তৈরি হয়নি। এখানে বই পড়ার যে পাঠক সেই সংখ্যাটাও কম। আমরা দেখি যে, বই মেলার সময় একটু বই নিয়ে কথা হয়। তারপর কিন্তু সারা বছর আর বই নিয়ে কথা হয় না।

আল-আমিন হুসাইন: সম্প্রতি সময়ে পাঠ্য বইয়ে বানান ভুলসহ বিভিন্ন ভুল পাওয়া যায়। এগুলোর সমাধানে প্রকাশকদের ভূমিকা কতটুকু?

সাঈদ বারী: মূলত পাঠ্য বই ছাপার ব্যাপারটি সরকার নিয়ন্ত্রণ করে। তারা এটি টেন্ডারে দেন। এবং এটি প্রেস মালিকরা এখানে কিন্তু প্রকাশকের সরাসরি কোন ভূমিকা নাই। এখানে টেন্ডারে দেওয়া হয় এবং ছাপাখানাগুলো অংশ নেয়। তারা টেন্ডারে অংশ নিয়ে তারা কাজটি পায় এবং তারা কাজটি করে। এখানে তাদেরও কিন্তু ভুল করার সুযোগ নেই। টেক্সটবুক থেকে যেটা সরবরাহ করা হবে সেটিই তারা ছাপবে। সেখানে কিন্তু তাদের নিজেদের কাছে কিছু থাকেনা।

আল-আমিন হুসাইন: একাডেমিক বইয়ের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে কম দাম নির্ধারণ করা হয় কী না?

সাঈদ বারী: হ্যাঁ, এটা করা হয়। আমাদের বাংলাদেশ ‘পুস্তক প্রকাশক বিক্রি সমিত’ রয়েছে। তারা এ ব্যাপারটি নিয়ন্ত্রণ করে। যদিও সব ক্ষেত্রে সেটি রক্ষা করা হয়ে উঠে না। তারপরও তাদের চেষ্টা থাকে। এই ধরনের বইয়ের দাম আনুপাতিক হারে কম নির্ধারণ করা।

আল-আমিন হুসাইন: বইয়ের ছাপা ও কাগজের উপর নির্ভর করে যে দাম নির্ধারণ করা হয় সেটা কতটুকু যৌক্তিক বা সঠিক?

সাঈদ বারী: হ্যাঁ, অবশ্যই। এটা কিন্তু শুধু বইয়ের ছাপা ও কাগজের উপর নির্ভর করে না। বইয়ের সাথে কিন্তু অনেকগুলো বিষয় জড়িত। বিশেষ করে সম্পাদনা। সৃজনশীল বইয়ের ক্ষেত্রে সম্পাদনা একটা বড় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এখানে দেখা যায় যে, আমাদের কে কখনও কখনও অনেক বেশি ব্যয় করতে হয় এখানে। কারণ একটা ভাল বইয়ের জন্য ভাল সম্পাদনা দরকার। এই কারণে শুধু যদি আমরা কাগজ আর ছাপানোর বিষয়টি শুধু উল্লেখ করি, তাহলে আমরা ভুল করবো। কারণ সৃজনশীল বইয়ের ব্যাপারে, মানসম্পন্ন বইয়ের ব্যাপারে আমাদেরকে সম্পাদনা, প্রুফ রিডিং এসব বিষয়ে অনেক জোর দিতে হয়। এখানে অনেক বড় রকম ব্যয় হয়। সে জন্য আমার মনে হয় এখন বাজারে যেমন বইয়ের দাম নির্ধারণ করা হয়। অন্যান্য পণ্যর মূল্য হিসেবে বা বিদেশি বইয়ের দামের হিসেবে আমাদের বইয়ের দাম খুব বেশি বলে মনে হয় না।

আল-আমিন হুসাইন: নতুন লেখক তৈরির ক্ষেত্রে প্রকাশকরা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে?

সাঈদ বারী: হ্যাঁ, প্রকাশকরা তো অবশ্যই ভূমিকা রাখতে পারেন এবং সেটা রাখেনও। না হলে বছরে প্রায় সাড়ে চার হাজার বই প্রকাশিত হয়, এটা কীভাবে সম্ভব হয়? তবে আমার মনে হয় যে তরুণ এবং নবীন লেখকদেরও নিজেদের ব্যাপারে আরো সচেতন হওয়া দরকার। তাদের লেখালেখিতে আরো দক্ষ হওয়া দরকার। বই প্রকাশকের আগে তাদের প্রচুর পড়াশুনা দরকার এবং লেখালেখির ব্যাপারেও তাদের প্রচুর অনুশীলন দরকার। পত্রিকায় লেখা ছাপা হওয়া দরকার। তারপর অনেকদিন পরে এসে হয়ত একটি বই প্রকাশ করার কথা চিন্তা করা যেতে পারে। কিন্তু অনেকে দেখি যে একটা লেখা লিখেই সেটি বই আকারে প্রকাশ করার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এই প্রক্রিয়াটা বা কাজটা কিন্তু শুভ নয়। একজন লেখককে গড়ে উঠতে হয়। গড়ে উঠার সময় দিতে হয়। তাহলে একটি ভাল বই হতে পারে, একজন ভাল লেখক তৈরি হতে পারে।

আল-আমিন হুসাইন: গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকদের কোন অনীহা আছে কী না?

সাঈদ বারী: না মোটেও না। আমার মনে হয় এই বিষয়ে প্রকাশকরা আরো বেশি সচেতন, আরো বেশি আগ্রহী। এটা ধরেন দশ বছর আগেও এ রকম ছিল না। কিন্তু এখন এ ব্যাপারে আমার যতটুকু দেখা বা অভিজ্ঞতা যে এই ধরনের বই, গবেষণাধর্মী বই প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রকাশকদের মধ্যেও এক ধরনের প্রতিযোগিতা আছে যে, কে কত ভাল বই প্রকাশ করতে পারে। পাঠকের দিকে না তাকিয়ে একটা ভাল বই প্রকাশ করে সুনাম অর্জনও কিন্তু অনেক আকাক্ষিত। আমি হয়ত একটা ভাল বই করলাম যার পাঠক হয়ত খুব বেশি নেই। তারপরও হয়ত আমি সুনাম অর্জন করলাম। সেটিও কিন্তু অনেকে চাই বা আমরা চাই। যেমন আমি এবার একটা বই করলাম প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ রমেশ চন্দের ‘জীবনের স্মৃতি দ্বীপে’ তার একটি আত্মজীবনীমূলক বই। সেটি কিন্তু খুব বেশি বিক্রি হয়নি। তারপরও বইটি প্রকাশ করে আমি প্রচুর প্রশংসা পেয়েছি। এটিও কিন্তু আমাদের অনেকের চাওয়া। আমরা চাই একটি বইয়ের প্রশংসা করুক, সবাই পজিটিভভাবে দেখুক।

আল-আমিন হুসাইন: সেক্টরভিত্তিক বই, যেমন ধরুণ পরিবেশ জ্বালানি, পরিবহন বা পরিবেশবিষয়ক বই প্রকাশ হয় না কেন?

সাঈদ বারী: হ্যাঁ, পরিবেশ বিষয়ে হয়। যেমন আমি নিজেও পরিবেশ বিষয়ে কয়েকটি বই প্রকাশ করেছি। কিন্তু জ্বালানি, পরিবহন বিষয়ে আমাদের লেখক পাওয়া মুশকিলের ব্যাপার। যদি এই ধরনের লেখক পাওয়া যায় তাহলে অবশ্যই আমরা সেটি প্রকাশ করবো। বিশেষ করে সূচীপত্র বৈচিত্রময় বই প্রকাশ করে থাকে। যেমন আমরা আদিবাসীদের উপর অনেক বই করেছি, জেন্ডার ইস্যুর উপর অনেক বই করেছি। আমরা বিষয় বৈচিত্রের উপর অনেক নজর দেই যেমন, আমরা আত্মজীবনীমূলক অনেক বই করেছি, ভ্রমণের উপর অনেক বই করেছি। আমরা যদি বিভিন্ন বিষয়ের উপর বই পাই তাহলে আমরা অবশ্যই প্রকাশ করবো।

আল-আমিন হুসাইন: লেখক, পাঠক ও প্রকাশকের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটিকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

সাঈদ বারী: অবশ্যই, এটি একটি অন্তরঙ্গ সর্ম্পক। এটি যতবেশি অন্তরঙ্গ হবে প্রকাশনা শিল্পটি ততবেশি সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। এখানে কোন ব্যবধান থাকলে চলবে না। আমাদের এখানে যেটা হয় যে, বইমেলাকে কেন্দ্র করে চমৎকার একটা সম্পর্ক তৈরি হয় পাঠকের সাথে, লেখকের সঙ্গে, প্রকাশকের সঙ্গে। তাদের সাথে সমন্বয় ঘটানো বা তাদের সঙ্গে একসাথে হওয়া। এটা কিন্তু বইমেলার একটি উপাদানও। এটা হয়ত আপনি অন্য কোন ভাষায় অন্য দেশে এমনটা পাবেন না। কিন্তু আমাদের দেশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে পাঠক, লেখক, প্রকাশকদের মধ্যে যে মিলনমেলা হয়। সেটা কিন্তু অভূতপূর্ব। এবং এটি দিনদিন বাড়ছে বলেই আমার মনে হয়।

আল-আমিন হুসাইন: বই প্রকাশের সাথে যারা সম্পৃক্ত যেমন ধরুণ, বাঁধায়কর্মী, ছাপাখানায় যারা কাজ করে, তাদেরকে শিক্ষার আলোয় আনতে লেখক, প্রকাশকরা কী ধরনের ভূমিকা রাখতে পারে বলে আপনি মনে করেন?

সাঈদ বারী: এটি আসলে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এখানে আসলে সে ধরনের উদ্যোগ এখনও সত্যি বলতে নেয়া হয়নি। আপনি একটি সুন্দর প্রশ্ন তুলেছেন। আমার মনে হয় আমাদের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। বিশেষ করে আমাদের প্রকাশনাশিল্পের স্বার্থে আমাদের নজর দেওয়া উচিত। এবং আমরা চাইবো যে এ ব্যাপারে সরকারেও আমাদের সাথে একটা মনোভাব থাকবে। এবং জাতীয় গ্রন্থমেলা যেহেতু সরকারিভাবে বই নিয়ে কাজ করে। তারা এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে পারেন। তাহলে মনে হয় আমরা এ ব্যাপারটা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারি।

আল-আমিন হুসাইন: ই-বুকের ভিড়ে প্রকাশনাশিল্প কী হারিয়ে যাচ্ছে বা বেঁচে থাকা কতটুকু কঠিন?

সাঈদ বারী: না, আমার মনে হয় না যে, ই-বুক একটি সমস্যার ব্যাপার। এটা আধুনিক একটি প্রযুক্তি। আধুনিক প্রযুক্তি বিভিন্ন সময়ে, বিভিন্ন যুগে আধুনিক প্রযুক্তি আসবে। কিন্তু এটা একটা সহায়ক ভূমিকা রাখবে। সারা পৃথিবীতে ই-বুক কিন্তু সাদা কাগজের সহায়ক হিসাবে ভূমিকা রাখে। আমার মনে হয় এখানেও তাই রাখেবে। এখানে কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা নাই, এটা বিকল্পও না। আমার মনে হয় এটা সহায়ক হিসাবেই কাজ করবে।

আল-আমিন হুসাইন: এক সময় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোতে পাঠক সমাগম লেগেই থাকতো। এখন পাঠক ঘরে বসেই অনলাইনে বই পাচ্ছে। আপনার কী মনে হয়?

সাঈদ বারী: এটি আসলে সময়ের বাস্তবতা। মানুষের ব্যস্ততা বেড়ে গেছে। রাস্তাঘাটের আবস্থা ভালো না, অনেক জ্যাম থাকে ফলে হয় কি মানুষ এখন চাইবে ঘরে বসেই অন্য পণ্যের মতো অনলাইনে বই পেতে। অনলাইনে অর্ডার দিয়ে ঘরে বসেই বই কেনার। শুধুমাত্র বই নয়, অন্যান্য পণ্যও ঘরে বসে কেনার প্রবণতা তৈরি হচ্ছে এবং সেটা জনপ্রিয় হচ্ছে। তবে বই কেন বাদ থাকবে? এবং বই যে অনলাইনে বিক্রি হচ্ছে তাতে আমরাও খুশি। আমরা সূচীপত্রও অনলাইনে বই বিক্রি করে থাকি।

আল-আমিন হুসাইন: মান-সম্মত লেখক সংকট না পাঠক সংকট? আর এটা থেকে উত্তরণের উপায় কী?

সাঈদ বারী: আমার মনে হয় যে, একটা আরেকটার পরিপূরক। আমাদের পুরো প্রকাশনাশিল্পেই যেমন সংকট আছে তেমনি আমাদের প্রকাশনায়ও আছে। যেমন ভাল মানের পাণ্ডলিপির অভাব। ফলে আমরা পাঠককে ভাল কিছু দিতে পারি না। পাঠকরা ভাল কিছু পায় না। ফলে আমরা কোনটি নির্ধারণ করবো যে কোনটি আগে কোনটি পরে। আমার মনে হয় যে, সময়ের সাথে সাথে এই সমস্যাটা আমরা কাটিয়ে উঠতে পারবো।

আল-আমিন হুসাইন: বিজয়ের মাসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কোন বই প্রকাশিত হয়েছে কী না? আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের চাহিদা কেমন? সাঈদ বারী: কিছুদিন আগে আমরা ‘মার্কিন ডকুমেন্টে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ৭১’ পিনাকী ভট্টাচার্যের লেখা। বইটি ইতিমধ্যে গত তিন মাসে পঞ্চম সংস্কার হয়েছে। তা ছাড়া বিজয়ের মাসে আমরা মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইগুলো ডিসকাউন্ট দিয়ে রকমারী.কমের সাথে যৌথভাবে বিক্রি করছি। আর মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইয়ের আলাদা চাহিদা আছে। বিশেষ করে পাঠাগারগুলো সংরক্ষণের জন্য মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক বইগুলো সংগ্রহ করে থাকে।

আল-আমিন হুসাইন: আগামী বইমেলাকে কেন্দ্র করে আপনাদের প্রস্তুতি কেমন? আর নতুন লেখকদের কোন বই আসছে কিনা? লেখকদের সাড়া পাচ্ছেন কেমন?

সাঈদ বারী: আমাদের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে বেশ কিছুদিন আগে থেকেই। এবার বলতে গেলে আমরা একটু আগেই শুরু করেছি। কারণ প্রত্যেকবার আমাদের দেরি হয়ে যায়। এবার আমি আমাদের লেখকদের আগে থেকেই বলে রেখেছি যে, এবার একটু আগে থেকেই শুরু করতে হবে। সবাই করে কী শেষ সময়ে এসে অনেক তাড়াহুড়ো করে। এই কারণে আমাদের যারা লেখক ছিল তাদের কে বলে রেখেছি যে, আমাদের অনেক আগে থেকেই শুরু করতে হবে। এবার আমরা একটু আগেই থেকেই শুরু করতে পেরেছি এটা একটি পজিটিভ দিক। ইতিমধ্যে আমার হাতে ৫০ টির মত পাণ্ডলিপি চলে এসেছে। আরো কিছু পাণ্ডলিপি আসবে। এবং আমাদের কার্যক্রম ইতিমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। বইমেলার সময় হয় কী, সে সময় অনেক বই ছাপা হয় এই কারণে বইয়ের মান ধরে রাখার ক্ষেত্রে একটু কঠিন হয়ে পড়ে। এই কারণে আমরা আগ থেকে শুরু করেছি। এবার আমাদের হাতে যে পাণ্ডলিপিগুলো আছে। তার একটা বড় অংশই নতুন লেখক বা নবীন লেখকদের। আমরা চাচ্ছি যে এগুলো একটি ভাল সম্পাদনা, ভাল প্রুফ রিডিংয়ের মাধ্যমে ভাল একটা বই হিসেবে প্রকাশিত হোক। এবং আমি আশা করি যে, এই লেখকরা ভবিষাতে আরো ভাল লিখবেন এবং বাংলা ভাষা ও সাহিত্যকে অনেক বেশি সমৃদ্ধ করবে।

আল-আমিন হুসাইন: সাইদ বারী বিডিমর্নিংকে সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে অনেক ধন্যবাদ।

সাইদ বারী: বিডিমর্নিং ও আপনাকেও অনেক ধন্যবাদ।

 
Bootstrap Image Preview