Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৮ মঙ্গলবার, জুন ২০২৪ | ৪ আষাঢ় ১৪৩১ | ঢাকা, ২৫ °সে

পায়ে হেটে বই বিক্রির ৬২ বছর

জাহিদ রিপন, পটুয়াখালী প্রতিনিধি
প্রকাশিত: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৪২ PM
আপডেট: ০৫ ডিসেম্বর ২০১৮, ০৪:৪৪ PM

bdmorning Image Preview


পথ থেকে প্রান্তরে, হাট থেকে বাজারে, হেটে হেটে ৬২ বছর ধরে বই বিক্রি করছেন গীতিকবি আবদুল হালিম। বয়েসের ভাড়ে নুয়ে পড়লেও থেমে নেই তার পথচলা। চোখের জ্যোতি কিছুটা কমে এলেও এখনও লাঠি ছাড়া হেটে চলেন মাইলের পর মাইল। ৮২ বছরের এ অদম্য মানুষটি এভাবেই হেটে হেটে বিক্রি করছেন স্বরচিত গীতি কবিতা ছাড়াও ধর্মীয় এবং শিশুতোষ বই। নিজ কন্ঠে সুরের ছন্দ তুলে বই বিক্রি করেই এখনো চলছে জীবন জীবিকা। খুঁজে পান মানসিক প্রশান্তি।

পটুয়াখালীর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের আউলিয়াপুর গ্রামের মৃত্যু আবদুর রহমান গাজীর ছেলে কবি আবদুল হালিম। ক্লাশ ফাইভ পাশ করার পরে মক্তব্যের শিক্ষক গীতিকবি আবদুল মান্নানের অনুপ্রেরণায় শুরু করেন তার লেখা বই বিক্রি। তখন থেকেই শিক্ষা গুরুকে অনুসরণ করে নিজেই লেখা শুরু করেন গীতি কবিতা, গান, আঞ্চলিক ভাষার ছড়া। মক্তব শিক্ষক গীতিকবি আবদুল মান্নানের উৎসাহে তার সাথে একত্রে গান, কবিতা ও ছড়া মিলিয়ে প্রকাশিত হয় প্রথম বই। গ্রামগঞ্জ থেকে শহরের হাটে বাজারে পায়ে হেটে বিক্রি করেন নিজেই।

পাঠকের আগ্রহেই এরপর শুরু করেন এককভাবে লেখা প্রকাশের কাজ। সমসাময়িক আলোচিত ঘটনা ছাড়াও পাঠকের চাহিদার বিবেচনায় লিখতে শুরু করেন একের পর এক গীতিকবিতা। স্বাধীনতার ইতিহাস, সাত খুনির ফাঁসি, এরশাদ শিকদের ফাঁসি, শহার ভানুর স্বামী উদ্ধার, আবদুল আলী গারুলি ও নিবারুনের করুন কাহিনীসহ এমন সব ঘটনার প্রায় শতাধিক বই তিনি রচনা করেছেন। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর জীবনী, ১৫ই আগস্টের মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডসহ তার তনয়া শেখ হাসিনাকে নিয়েও লিখেছেন বেশ কয়েকটি গীতি কবিতার বই। 

কবি আবদুল হালিম বিডিমর্নিংকে জানান, পত্রিকা কিনে পড়তাম। পাঠকের আগ্রহকে গুরুত্ব দিয়ে সে সমস্ত ঘটনার উপড় লিখতাম। অনেক সময় টাকা থাকতনা। ধার-দেনা করতাম। না পেলে ছাপাখানার মালিককে ধরে সে সব ছাপাতাম। এই বই বিক্রি করেই টানাপোড়নেই ৬২ বছর ধরে চালিয়েছেন পরিবারের ভরণ-পোষণ। সন্তানদের লেখাপড়া। বড় ছেলে মতিউর রহমান মাওলানা পাশ করে স্থানীয় একটি নুরানী মাদ্রাসায় চাকরি করছেন। মেয়ে কাজল রেখা পরিবার পরিকল্পনায় চাকরি করছে। ছোট ছেলে আনিসুর রহমান পটুয়াখালী সরকারি কলেজে (বিএ) লেখাপড়া করছেন।

তিনি আরও জানান, এত সব কিছু সম্ভব হতনা যদি তার জীবনসঙ্গী তাকে সহায়তা না করত। উৎসাহ না যোগাত। অনেকটা আক্ষেপ করেই বলেন, এখন আর আগের মত তার গীতি কবিতার বই বিক্রি হয় না। টেলিভিশন আর মোবাইলে গ্রামের মানুষও সব খবর জেনে যায়। তাই বাধ্য হয়ে এখন দেশের নামকরা সাহিত্যিক ও কবিদের লেখা বইও বিক্রি করছেন। শিশুদের আদর্শ লিপি ছাড়াও বিভিন্ন ধর্মীয় বই বিক্রি করছেন।

কবি আবদুল হালিমের ছোট ছেলে আনিসুর রহমান বিডিমর্নিংয়ের এই প্রতিনিধিকে বলেন, গভীর রাত অবধি বই লেখেন বাবা। সুরে সুরে মোহিত করেন আমাদের। বইগুলো গ্রামে গ্রামে ঘুরে পরিশ্রম করে বিক্রি করেন। আমার বাবাকে নিয়ে আমরা গর্ব করি।

আজিজ আহমেদ নামে এক ক্রেতা  বলেন, সেই ছোট বেলা থেকেই আবদুল হালিমকে কলাপাড়াসহ বিভিন্ন হাটে বই বিক্রি করতে দেখছি। সমসাময়িক ঘটনার উপড় তার লেখা অনেক কবিতার বই কিনে পড়েছি।

জীবনের শেষ ইচ্ছের কথা জানাতে গিয়ে আবদুল হালিমের চোখে বেয়ে নেমে আশে জল। বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জাতির পিতাকে নিয়ে একটি গীতি কবিতা লিখেছিলাম। ওই গানটি যদি শেখ হাসিনাকে শোনাতে পারতাম তাহলে মনে হয় মরে গিয়েও শান্তি পেতাম।

আউলিয়াপুর ইউপি সদস্য আলতাফ হোসেন ভুট্যু বিডিমর্নিংকে বলেন, কবি আবদুল হালিম একজন গুনী ব্যক্তি। ছোট বেলা থেকেই দেখছি তিনি গীতি কবিতা ছাড়াও বাচ্চাদের জন্য ছড়া, কবিতা, গান ও গল্পের বই লিখেছেন। হাটে বাজারে ঘুরে ঘুরে এসব বই বিক্রি করছেন। ছোট বেলায় আবসর সময়ে তার কাছে ছুটে যেতাম। তার গলায় ছন্দ সুরে শুনতাম কবিতা।

Bootstrap Image Preview