Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৫ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২০২৪ | ১২ বৈশাখ ১৪৩১ | ঢাকা, ২৫ °সে

এই শীতে ঘুরে আসুন চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:০৬ PM
আপডেট: ২৩ নভেম্বর ২০১৮, ০৮:০৬ PM

bdmorning Image Preview


হৃদয় দেবনাথ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধি:

যত দূর চোখ যায় কেবল সবুজের হাতছানি। চা বাগানের সারি সারি টিলা, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ আর ঘন সবুজ অরণ্যের অপরূপ সৌন্দর্য যে কাউকে আকৃষ্ট করে। তাই পর্যটকরা বার বার ছুটে যায় চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলের চিরসবুজের শোভা আর বৃষ্টিস্নাত পাহাড়ি সৌন্দর্য দেখতে।

১৯টি চা বাগানের সতেজ সবুজ পাতায় পূর্ণ হয়ে আছে শ্রীমঙ্গলের নিসর্গশোভা। পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে এবং চায়ের রাজধানী হিসেবে মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গল উপজেলার খ্যাতি সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে।

প্রকৃতির বৈরিতার মাঝেও এ বর্ষায় চা বাগান ঘেরা শ্রীমঙ্গল যেন সেজেছে নতুন সাজে। যেদিকে চোখ যায় উঁচু নিচু পাহাড়, পাহাড়ের বুকজুড়ে চা বাগানের সারি, পাহাড়ি ঝরনা, চারদিকে প্রকৃতির নজরকাড়া সৌন্দর্য, হাজার প্রজাতির গাছ-গাছালি, দিগন্তজোড়া হাওর আর নীল জলরাশি ঢেউয়ের ছন্দে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। চা-শিল্পের জন্য শ্রীমঙ্গলের সুনাম ও পরিচিতি বিশ্বব্যাপী।

আয়তনের এ জনপদের সঙ্গে রেল ও সড়কপথে যোগাযোগ রয়েছে সারাদেশের। চা, রাবার, লেবু, পান, আনারস ও মূল্যবান কাঠসহ বিভিন্ন আদিবাসী সম্প্রদায়ের বসবাসের কারণে শ্রীমঙ্গলের খ্যাতি রয়েছে সর্বত্র। দেশি-বিদেশি পর্যটকদের পদভারে বছরের প্রতিটি দিন মুখরিত শ্রীমঙ্গল। 

দর্শনীয় স্থান-
 

বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিটিআরআই): বিচিত্র সব ফুল চারদিকে। এর সঙ্গে বাড়তি পাওনা সারিবদ্ধ পাম, ইউক্যালিপটাস ইত্যাদি বৃক্ষরাজির শোভা। লেকের জলে ফুটন্ত লাল পদ্মফুল। এসবের মাঝে দাঁড়িয়ে আছে চা গবেষণা ইনস্টিটিউট। এ ছাড়াও এখানে রয়েছে একটি চা প্রক্রিয়াজাত কেন্দ্র। কর্তৃপক্ষের অনুমিত সাপেক্ষে চা কারখানাসহ পুরো এলাকাটি আপনি দেখে নিতে পারেন। মনোমুগ্ধকর এ এলাকাটি শ্রীমঙ্গল শহর থেকে এক কিলোমিটার দূরে হলেও রিকশায় ১০-১৫ মিনিটের পথ। ভাড়া ১০ টাকা।

লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান- শ্রীমঙ্গল শহর থেকে ৮ কিলোমিটার দূরে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একমাত্র ন্যাশনাল পার্ক লাউয়াছড়ার অবস্থান। ১৯২০ সালে ১ হাজার ২৫০ হেক্টর জায়গাজুড়ে প্লান্টেশন করে তৈরি ধনরাজি এখন ঘন প্রাকৃতিক বনের আকার ধারণ করেছে। জীববৈচিত্র্যে ভরপুর এই পার্কে দেখা মেলে বিভিন্ন বিরল প্রজাতির পশুপাখি। এখন এই পার্কটি ধীরে ধীরে দেশের শিক্ষা, গবেষণা, ইকো-ট্যুরিজম স্পট হয়ে উঠেছে। শ্রীমঙ্গল থেকে গাড়ি রিজার্ভ করে অথবা বাসে আপনি আসতে পারেন এ বনে। এখানে আসার পথে রাস্তার দুই ধারে দেখতে পাবেন সবুজ অরণ্য। দেখতে পাবেন বিচিত্র সব পশুপাখি। এসব প্রাণি দেখতে বনের একটু গভীরে যেতে হবে।

বাইক্কা বিল- বাইক্কা বিল একটি অনন্য স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম এবং জলচর পাখির বিচরণভূমি। এর আয়তন ১০০ হেক্টর। বাংলাদেশের অন্যতম জলাশয় হাইল-হাওরে এর অবস্থান। ২০০৩ সালের ১ জুলাই ভূমি মন্ত্রণালয় বাইক্কা বিলকে একটি স্থায়ী মৎস্য অভয়াশ্রম হিসেবে সংরক্ষণের সিদ্ধান্ত নেয়। হাওরটি বর্ষায় ১৪ হাজার হেক্টর এলাকায় বিস্তৃত হয়। আর শুষ্ক মৌসুমে পানি কমে গিয়ে ১৩৩টি বিল ও বেশ ক’টি খালে খণ্ডিত হয়ে মোট ৪ হাজার হেক্টর এলাকায় সংকুচিত হয়ে পড়ে। বাইক্কা বিলের প্রধান আকর্ষণ পাখি। সারা বছর বিভিন্ন প্রজাতির জলজ পাখির বিচরণে মুখরিত থাকে এ বিলটি। তবে শীত মৌসুমে প্রচুর পরিযায়ী পাখির দেখা মেলে।

পশু-পাখি সেবাশ্রম- এক সময়ের সিতেশ বাবুর চিড়িয়াখানার নাম পরিবর্তিত হয়ে এখন হয়েছে বন্যপ্রাণি ফাউন্ডেশনের পশু-পাখি সেবাশ্রম। সিতেশ রঞ্জন দেবের এই সংগ্রহশালায় রয়েছে সাদা বাঘ, মেছো বাঘ, সোনালি বাঘ, মায়া হরিণ, অজগর সাপ,  বানর, লজ্জাবতী বানর, সজারু, সোনালি কচ্ছপ, বনমোরগ, ময়না, বন্য খরগোশ, সাইবেরিয়ান ডাক, পাহাড়ি বকসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্যপ্রাণি।

ভাড়াউড়া লেক- শ্রীমঙ্গল শহর থেকে দুই কিলোমিটার দূরে জেমস ফিনলে কোম্পানির চা-বাগান। ভাড়াউড়ায় রয়েছে একটি লেক, রয়েছে জলপদ্মের মেলা। চা বাগানের বুকে এই লেকটির আকর্ষণ কম নয়। এখানে আছে বানর আর হনুমানের বিচরণ। শীতে দল বেঁধে আসে অতিথি পাখি। পাহাড়ের কাছাকাছি গেলেই দেখতে পাবেন এক সাথে অনেক বানর। চার পাশে সতর্ক দৃষ্টি রাখুন দেখবেন বানরগুলো আপনাকে ভেঙচি কাটছে।

নিম্মাই শিববাড়ি- আজ থেকে প্রায় ৫৫৩ বছর আগে ১৪৫৪ খ্রিস্টাব্দে শ্রীমঙ্গলের বালিশিরা পরগনার শংকরসেনা গ্রামে নিম্মাই শিববাড়ি প্রতিষ্ঠিত হয়। চতুর্দশ শতাব্দিতে বালিশিরা অঞ্চলের ত্রিপুরার মহারাজা রাজত্ব করতেন। প্রবল শক্তিশালী এ রাজার বিরুদ্ধে কুকি সামন্ত রাজা প্রায়ই বিদ্রোহ ঘোষণা করতেন। এরকম কোনো একদিন কুকি রাজার বিদ্রোহের সংবাদ পেয়ে মহারাজা একদল সৈন্য পাঠান বিদ্রোহ দমনের জন্য। তুমুল এ যুদ্ধে কুকি রাজা পরাজিত হলেও মহারাজার প্রধান সেনাপতি রণক্ষেত্রে নিহত হন। বিয়ের অল্প ক’বছরের মধ্যেই স্বামীহারা হন মহারাজার কন্যা নিম্মাই। তখনকার দিনে ভারতবর্ষে সহমরণ প্রথা চালু ছিল। কিন্তু রাজকন্যা সহমরণে রাজি না হয়ে স্বামী নিহত হওয়ার স্থানে এসে শিবের আরাধনা শুরু করেন এবং সিদ্ধিও লাভ করেন। তার নামেই শিববাড়ির নামকরণ করা হয় নিম্মাই শিববাড়ি। ঐতিহাসিক এই স্থানটি ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনী, সনাতন হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের আচার-আচরণে একটি অন্যতম তীর্থস্থানের মর্যাদায় সুপ্রতিষ্ঠিত।

মাগুরছড়া খাসিয়াপুঞ্জি- মাগুরছড়ায় রয়েছে খাসিয়াপুঞ্জি। উঁচু পাহাড়ের ওপর বিশেষভাবে নির্মিত তাদের আবাস। খাসিয়া সম্প্রদায় গোষ্ঠীবদ্ধভাবে বাস করে এখানে। প্রতিটি পুঞ্জিতে একজন করে মন্ত্রী (খাসিয়াদের হেডম্যান) থাকেন। তার অনুমতি নিয়ে পুঞ্জি এলাকা ঘুরে দেখতে পারেন। যতদূর দৃষ্টি যায় শুধু পান গাছের সারি চোখে পড়বে। সারি সারি উঁচু পাহাড়ি গাছগাছালি পরম মমতায় পানের লতাকে বুকে ধারণ করে আছে, যা অন্যরকম এক সৌন্দর্য। খাসিয়াপুঞ্জি ভ্রমণ করে আপনি সহজেই খাসিয়াদের স্বতন্ত্র এবং বিচিত্র জীবনধারা, কৃষ্টি, সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে পারেন। 

পাহাড় ডোবা লেক: শ্রীমঙ্গলের বন-পাহাড়, হাওর-বিল আর সবুজের সমারোহে একাকার হয়ে গড়ে ওঠা হ্রদটির নাম পাহাড় ডোবা লেক। বিলাসছড়া চা বাগানের পাদদেশে এই জলাশয়ের অবস্থান। প্রচার না হওয়ায় পর্যটক তথা এলাকাবাসীর পদচারণা খুব একটা হয়নি এ জলাশয় এলাকায়। শ্রীমঙ্গল শহর থেকে কালীঘাট রোড ধরে দলই চা বাগানের রাস্তা ধরে বিলাসছড়া পৌঁছা যায়। বিলাসছড়া অফিস ও লিপ হাউস ছাড়িয়ে কিছু সামনে এগুলেই দেখা যায় লেকটি। এটি চা বাগানের ১০ নম্বর সেকশনে অবস্থিত। সবুজ বন বনানী বেষ্টিত পাহাড় ডুবে পরিণত হয়েছে বিশাল জলরাশিতে। পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে জলের পাশ দিয়ে নতুন একটি রাস্তা করা হয়েছে। এলাকাটির প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত। তবে বিলাসছড়া চা বাগানের সুপারিনটেনডেন্টের অথবা বিটিআরআই কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে বেড়ানো যায় এখানে। 


 

Bootstrap Image Preview