Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৭ বুধবার, এপ্রিল ২০২৪ | ৪ বৈশাখ ১৪৩১ | ঢাকা, ২৫ °সে

সাধ্যের মধ্যে ঘুরে আসতে পারেন প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমির দেশ মালয়েশিয়া থেকে

হৃদয় দেবনাথ, মৌলভীবাজার প্রতিনিধিঃ
প্রকাশিত: ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২২ PM
আপডেট: ১৯ নভেম্বর ২০১৮, ০৯:২৬ PM

bdmorning Image Preview


যান্ত্রিক জীবনের কোলাহলে জীবন যখন অতিষ্ঠ হয়ে ওঠে তখন প্রকৃতি, পাহাড় এবং সমুদ্র মনকে তরতাজা আর চাঙ্গা করে তুলে। সোজা কথা বিষন্নতা আর একঘেয়েমি কাটিয়ে উঠতে চাইলে ভ্রমণের কোনো বিকল্প নেই। তাই হাতে কয়েকদিনের সময় নিয়ে বেড়িয়ে পড়তে পারেন, ঘুরে আসতে পারেন দেশের বাইরে থেকে। খুব বেশি দূরে যাওয়ার সময় না পেলে যেতে পারেন সাধ্যের ভেতর পর্যটকদের পছন্দের তালিকার অন্যতম এশিয়ার দেশ মালয়েশিয়ায়।

দেখার মতো অনেক কিছুই রয়েছে এই দেশটিতে সমুদ্র, পাহাড়, দ্বীপ কি নেই এখানে? মালয়েশিয়া ভ্রমণ করতে হলে প্রথমে যা করতে হবে তা হচ্ছে ভিসা। মালয়েশিয়ার ভিসা পাওয়া অনেক দেশের তুলনায় সহজ। ভিসা পেতে আপনাকে যা করতে হবে তা হলো প্রথমে ভিসার জন্য যেসব তথ্য ও কাগজপত্র দেওয়া প্রয়োজন তা দিতে হবে। এসবের মধ্যে আবেদনের তারিখ হতে গত তিন মাসের ব্যাংক হিসেবে বিবরণী (স্টুডেন্ট হলে ব্যাংকে ৫০-৬০ হাজার টাকা রেখে একটা স্টেটমেন্ট নিয়ে নিন)।

তারপর ঢাকাস্থ মালয়েশিয়া এম্বেসী কর্তৃক রিক্রুটেট এজেন্সিতে অর্থাৎ ভিসা সেন্টারে ভিসার জন্য আবেদন করুন। খুব একটা ঝামেলা ছাড়াই ভিসা পেয়ে যাবেন। তবে মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশনের হয়রানি এড়াতে রিটার্ন টিকেট এবং অগ্রিম হোটেল বুকিং করে যাওয়াটাই উত্তম অন্যথায় মালাই ইমিগ্রেশন ঝামেলা করতে পারে।

কিভাবে যাবেন:

মালয়েশিয়া ভ্রমণ করতে চাইলে আপনাকে বেছে নিতে হবে আকাশপথ। ঢাকা থেকে মালয়েশিয়ায় যেতে বাংলাদেশ বিমান, মালয়েশিয়ান এয়ারওয়েজ, ইউনাইটেড এয়ার, রিজেন্ট এয়ারওয়েজ থেকে টিকিট কাটতে হবে। তবে বিভিন্ন এয়ারলাইন্সে সময়ভেদে টিকেটের দাম কম বেশি হয়ে থাকে। সাধারণত যাওয়া আসা খরচ বাংলাদেশ বিমান, ইউনাইটেড এয়ার ও রিজেন্ট এয়ারওয়েজে টিকিটের দাম পড়বে ২২ হাজার টাকা থেকে ২৬ হাজার টাকার মধ্যে। তবে মালয়েশিয়ান এয়ারলাইন্সে যেতে হলে টাকার পরিমাণটা গুনতে হবে প্রায় ৩০ হাজার।

কোথায় খাবেন:

প্রায় সবধরনের খাবারে স্বাদ পাবেন আপনি মালয়েশিয়ায়। কুয়ালালামপুর, পুত্রজায়া, বাটু কেভ, লাঙ্কাউই প্রায় সমস্ত মালয়েশিয়া জুড়ে কম বেশি বাংলাদেশি হোটেল রয়েছে মালয়েশিয়াতে। সেই সাথে ইন্ডিয়ান খাবার, চাইনিজ এবং থাই খাবারের হোটেল তো রয়েছেই। এছাড়াও পাবেন কাচ্চি বিরিয়ানি, তান্দুরি চিকেন, কাবাব ইত্যাদি। ২০ রিঙ্গিত বা ৫শ' টাকার মধ্যে একেবারে ভরপেট খেতে পারবেন এই রেস্তোরাগুলোতে।

কেনাকাটা কোথায় করবেন:

কেনাকাটার জন্য মালয়েশিয়ায় রয়েছে অনেকগুলো নামি দামি শপিংমল। পেট্রোনাস টুইন টাওয়ারকে বলা হয় মালয়েশিয়ার সর্ববৃহৎ শপিংমল। এখানে বিশ্বের সকল নামকরা ব্র্যান্ডের শুরোম পাবেন। এছাড়া আরও যেতে পারেন প্যাভিলিয়ন, টাইমস স্কয়ার, বিবি প্লাজা, সানওয়ে পিরামিড মার্কেট ইত্যাদি শপিংমলগুলোতে। ইলেক্ট্রনিকস পণ্য কিনতে চাইলে অবশ্যই যেতে হবে ল-ইয়েট প্লাজায়। এ মার্কেটে প্রচুর বাংলাদেশিদের দোকান রয়েছে তাই অনেকে এটাকে বাংলাদেশি মার্কেটও বলে থাকে।

কোথায় থাকবেন:

কুয়ালালামপুরে থাকার জন্য সবচেয়ে সুবিধাজনক স্থান হলো- কে-এল সেন্ট্রার, বুকিত বিন্তাং অথবা মসজিদ জামেক এলাকা। এসব এলাকার সুবিধা হলো, এখান থেকে মালয়েশিয়ার যেকোনো স্থানে যাতায়াত করা সহজ। হোটেল ভাড়া পরবে প্রতি রাত ১২০-১৫০ রিঙ্গিত। (১ রিঙ্গিত = ২৬ টাকা)।

এখান থেকে ঘুরে আসতে পারেন কুয়ালালামপুর এর ঐতিহাসিক টুইন টাওয়ার। মাত্র ৬০ রিঙ্গিত দিয়ে টিকেট কেটে টু-ইন টাওয়ারের উঁচুতে ঘুরে আসতে পারবেন।

কোথায় বেড়াবেন:

পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি মালয়েশিয়ার শহুরে স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন পেট্রোনাস টুইন টাওয়ার। এখনো এটি পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ জমজ ভবন বলেই পরিচিত। ভূমি থেকে ৪৫০ মিটার দীর্ঘ এই টাওয়ারে ৮৮ তলা আছে যেখানে বিভিন্ন কর্পোরেট অফিস রয়েছে। এই টাওয়ারের সবচেয়ে আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হলো এর ডাবল ডেকার ব্রীজ যা টাওয়ারের ৪১ ও ৪২ তলাকে যুক্ত করেছে। এই ব্রীজ থেকে মালয়েশিয়ার সমস্ত শহরের অসাধারণ দৃশ্য উপভোগ করা যায়। তবে নিঃসন্দেহে রাতের টুইন টাওয়ারের ঝলমলে আলো আপনাকে মুগ্ধ করবেই। কারণ টু-ইন টাওয়ারের প্রকৃত সৌন্দর্য দিনের চেয়ে রাতের ঝলমলে আলোতে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ ধারণ করে, তখন কিছুক্ষণের জন্য হলেও আপনি হারিয়ে যাবেন কল্পনার রাজ্যে।

পুত্রজায়া 

কুয়ালালামপুর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে মালয়েশিয়ার প্রশাসনিক শহর পুত্রজায়া। এই জায়গায় রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় তাই আপনি পুত্রজায়া যাবেন আর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সামনে একটি ছবি তুলবেন না তা হতেই পারেনা।অবর্ণনীয় সুন্দর এবং সাজানো শহর এই পুত্রজায়া। স্থাপত্য শিল্পগুলো দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়। এছাড়াও পুত্রজায়ার লেকের সৌন্দর্য আপনাকে বিমোহিত করবে। 

পুত্রজায়া, কুয়ালালামপুর থেকে ১ ঘণ্টার রাস্তা। আপনি ইচ্ছে করলেই ট্যাক্সি অথবা রেলে চড়ে ঘুরে আসতে পারেন। খরচ হবে আনুমানিক ১০০-১৫০ রিঙ্গিত। 

পুত্রজায়ার অন্যান্য দর্শনীয় স্থানগুলো হলো- পুত্রজায়া আন্তর্জাতিক কনভেনশন সেন্টার (পিআইসিসি), পুত্রা মসজিদ, লৌহ মসজিদ (স্টিল মস্ক), প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও পুত্রজায়া ব্রিজ। আরও কিছু দর্শনীয় স্থান হলো- পেনাং, লংকাউই, মেলাকা, ক্যামেরন হাইল্যান্ড। 

আর কোথায় কোথায় ঘুরবেন: 

মালয়েশিয়ায় ঘুরার মত জায়গার অভাব নেই। আপনি যদি পাহাড়ের কোল ঘেঁষে কোন জঙ্গলে হারিয়ে যেতে চান সেটিও পারবেন আবার যদি সমুদ্রের তীরে অবসর সময়টুকু কাটাতে তাও পারবেন। মালয়েশিয়ায় আছে অসংখ্য দর্শনীয় স্থান। কুয়ালামপুর শহরেই আছে- চেন সি সো ইয়েন হাউস, মেনারা অলিম্পিয়া, ন্যাশনাল আর্ট গ্যালারি, পুত্রজায়া ব্রীজ, রয়্যাল প্যালেস, এগ্রিকালচারাল পার্ক, ন্যাশনাল বোটানিক্যাল গার্ডেন, অর্কিড পার্ক, বার্ড পার্ক প্রভৃতি জায়গা।

এছাড়া দেখতে পারেন, মালেশিয় সংস্কৃতি, হস্তশিল্পের নানা নিদর্শন। আরও রয়েছে, কর্মাশিয়াল সেন্টার, ইন্ডিপেণ্ডেন্ট স্কোয়ার, কিংস প্যালেস, ন্যাশনাল মিউজিয়াম, ইসলামিক আর্ট মিউজিয়াম, হাউস অব পালার্মেন্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ স্থাপনা টুইন টাওয়ার রয়েছে।

এছাড়াও যেতে পারেন, সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার মিটার উচুঁ বাটু কেভ দর্শনে। এটিতে উঠতে গেলে আপনাকে প্রায় ২৭০ খানা সিঁড়ি ভাঙতে হবে। উপরে উঠেই দেখতে পাবেন একটি গুহার নীচে আরেকটা অবাক করা গুহা যেখানে সারি সারি চিত্রকলা সাজানো রয়েছে। এছাড়াও থিম পার্কে প্রবেশ করে বিভিন্ন রাইডে আরোহণ করেও আনন্দ নিতে পারবেন।

মালয়েশিয়া গিয়ে লাঙ্কাউইতে যদি না যান তবে আপনার মালয়েশিয়ায় ঘুরতে যাওয়াটাই বৃথা। লাঙ্কাউইতে বিনোদনের সবকিছুই আপনি পাবেন কেবল কার, ঝর্ণা, সমুদ্রের নিচ দিয়ে রাস্তা, ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট আরও অনেক কিছু। লাঙ্কাউই যাত্রা পথে রাস্তার দুপাশে অসাধারণ সৌন্দর্য দেখে আপনি মুগ্ধ হয়ে যাবেন। বিশেষ করে রাস্তার ধারে অসংখ্য পাম ট্রি দেখে।

আপনি চাইলে মালয়েশিয়ার আশেপাশের দ্বীপগুলো থেকে ঘুরে আসতে পারেন। দ্বীপগুলিতে স্পীড বোট এ করে ঘুরিয়ে আনাকে আইল্যান্ড হপিং বলে। মালয়েশিয়া ঘুরতে গিয়ে আমি আইল্যান্ড হপিং এ একসাথে অনেকগুলো দ্বীপ ঘুরেছি আর তার মজাটাই আলাদা। এতে সময় ও টাকা দুই বাঁচবে। দ্বীপ, সমুদ্র দেখতে দেখতে একঘেয়ে চলে আসলে আপনি ঘুরে আসতে পারেন ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট থেকে। সেখানে দেখতে পাবেন বাদুরের গুহা, ঈগলের গুহা ইত্যাদি দর্শনীয় স্থান।

এছাড়াও মালয়েশিয়ায় দেখতে যেতে পারবেন গেন্টিং হাইল্যান্ড, ওয়াটার ওয়ার্ল্ড, দ্বীপ মাবুল, পেনাং আরও অনেক অনেক দর্শনীয় স্থান। তবে হাতে যথেষ্ট সময় নিয়ে যেতে হবে। আপনি ইচ্ছে করলে প্যাকেজেও ঘুরতে যেতে পারেন। হোটেল কর্তৃপক্ষকে জানালে তারাই প্যাকেজের ব্যবস্থা করে দেয়। তাছাড়া বিভিন্ন হোটেলেই ঘুরতে যাওয়ার প্যাকেজ থাকে। যেমন, সিটি টাওয়ার, গেন্টিং হাইলং, পুত্রজায়া ঘুরতে যাওয়া ইত্যাদি। আপনি চাইলে আপনার পছন্দের প্যাকজটি সংগ্রহ করে নিতে পারেন আপনার হোটেল থেকে।

সাবধানতা এবং সতর্কতা:

মালয়েশিয়া এয়ারপোর্টে গিয়ে নামার পর কোথায় কোথায় যাবেন, কি কি দেখবেন অগ্রিম হোটেল বুকিং, রিটার্ন এয়ার টিকেট এই বিষয়গুলো একটু মাথায় রাখতে হবে কারণ ইমিগ্রেশন অফিসার হঠাৎই আপনাকে এসব বিষয়ে প্রশ্ন করতে পারে এবং দেখতেও চাইতে পারে। আপনি যদি ঠিকঠাক উত্তর দিতে ব্যর্থ হন তবে তারা ধরে নিবে আপনি অবৈধভাবে মালয়েশিয়াতে থেকে যাবেন। ইমিগ্রেশনের কাজ শেষ হওয়ার পর ইমিগ্রেশন এরিয়া অতিক্রম করে সামনে এগিয়ে গেলেই কিছু মালাই লোকজন আপনাকে গেইটে আটক করে, ডলার আছে কিনা? কোথায় থাকবেন? এসব বিভিন্ন ধরণের প্রশ্ন করবে এবং ইমিগ্রেশনের লোক বলে পরিচয় দিবে।

তবে ঐ প্রতারক দলটার সকলেই অফিসিয়াল টাইপ পোশাক পরিহিত থাকে। দেখতেও তাদের অফিসারের মতই মনে হয়, তাই আপনার মনেই হবে তারা সত্যিই ইমিগ্রেশনের লোক ইমিগ্রেশনের লোক পরিচয় দিয়ে প্রথমেই আপনার পাসপোর্ট দেখবে, ডলার দেখবে, হোটেল বুকিং কিনা জানতে চাইবে। সেই সাথে উল্টাপাল্টা বুঝিয়ে আপনি বুঝে ওঠার আগেই দুই'শ বা তার চেয়েও বেশি ডলার হাতিয়ে উধাও হয়ে যাবে।  

Bootstrap Image Preview