Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ০৫ রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২৩ মাঘ ১৪২৯ | ঢাকা, ২৫ °সে

প্রভাবশালীরা এখন গিলে খাচ্ছে ব্যাংক

সিপিডির সংলাপে বিশিষ্টজন

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৫৮ PM
আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:৫৮ PM

bdmorning Image Preview


এই মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকট ব্যাংক লুট। ব্যাংক ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে গেছে। প্রভাবশালীরা এখন ব্যাংক গিলে খাচ্ছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লুটেরা গোষ্ঠী ব্যাংক করছে। এ কারণে মানুষ ব্যাংকের প্রতি আস্থা হারিয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ব্যাংক লুট হচ্ছে। খেলাপি ঋণের টাকা ও অবৈধ আয় পাচার করা হচ্ছে। এর সঙ্গে রাজনীতিক, আমলা ও ব্যবসায়ীরা জড়িত।

গতকাল শনিবার অর্থনীতির সংকট নিয়ে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডি আয়োজিত সংলাপে এসব কথা বলেছেন বিশিষ্টজন। তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দিয়ে ব্যাংক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার কথা বলেছেন তাঁরা। এ পথে না গেলে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লুটেরা গোষ্ঠী নতুন করে ব্যাংক করবে। আবার কয়েক দিন পর লুট করবে।

'সংকটে অর্থনীতি: কর্মপরিকল্পনা কী হতে পারে' শিরোনামে এ সংলাপ রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার ইনে অনুষ্ঠিত হয়। সিপিডির চেয়ারম্যান বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান এতে সভাপতিত্ব করেন। সিপিডির উপস্থাপনায় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন সূচকের ওপর পর্যালোচনা তুলে ধরা হয়। প্রায় সব সূচকের অবনতির কথা বলা হয়। সংলাপে প্রধান অতিথি পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, মূল্যস্ম্ফীতি চার মাস ধরে কমছে। মজুরি বাড়ছে। করোনা থেকেও সফলভাবে উত্তরণ হওয়া দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম উঠে এসেছে। মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হয়েছে। তবে সরকার আত্মতুষ্টিতে ভুগছে না। মানসম্পন্ন শিক্ষাসহ আরও কিছু বিষয়ে ঘাটতি রয়েছে। এসব বিষয়ে কাজ করছে সরকার।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, অর্থনীতির নানা সংকট নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে সিপিডিসহ অনেক পক্ষ থেকে। তবে এগুলো আমলে নেওয়া হয়নি। এ কারণে অর্থনৈতিক সংকটের উপসর্গ এখন ক্যান্সারে পরিণত হয়েছে। এগুলো সামাজিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিণাম। কেন সংকট তৈরি হলো তা খুঁজে বের করতে হবে এবং সমাধান বের করতে হবে। ব্যাংকিং খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ঋণ পুনঃতপশিলের ঘটনা কেন বছরের পর বছর চলবে। ব্যাংকিং সমস্যা সমাধানে একটি কমিশন করা হয়েছিল। তবে আর কোনো অগ্রগতি নেই। তাঁর আশঙ্কা, জীবদ্দশায় এ খাতের অগ্রগতি হবে না। সংলাপে যাঁরা আছেন, তাঁদের কারও জীবদ্দশায় হবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে।

তিনি বলেন, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে সরকার 'বীরোচিত' কিছু করতে পারবে না। তবে কার্যকর নীতির মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারে। তিনি বলেন, সরকারের অর্জনও রয়েছে। বিশেষ করে অবকাঠামো এবং জীবনযাত্রার মানে উন্নয়ন হয়েছে। তবে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক সংকট নিয়ে উঠে আসা বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ অবহেলা করা সরকারের উচিত হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকিং খাতের সব সুবিধা নিচ্ছে ক্ষমতাবানরা। ২ শতাংশ সুদে পুনঃতপশিলি করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে তাদের। ব্যাংক খাতে নতুন করে অর্থ দেওয়া হলে সব টাকা নিয়ে যায় প্রভাবশালীরা। খেলাপিদের সুবিধা দেওয়ার জন্য ঋণ অবলোপন করা হয় সারাজীবনের জন্য। এক পরিবার থেকে ৪ জন পরিচালক করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, হোটেলে বসে সুদহার নির্ধারণ করা হয়েছে। পৃথিবীতে এ রকম নজির আর দ্বিতয়টি নেই। বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো কোনো ব্যবসায়ীর স্বার্থে সিদ্ধান্ত নেয়। ব্যাংকের এমডি আর চেয়ারম্যানের মধ্যে 'কমফোর্ট জোন' আছে। এগুলো অর্থনীতির জন্য ভুল বার্তা। ব্যাংক ব্যবস্থাসহ সার্বিক অর্থনীতি যে জায়াগায় এসে পৌঁছেছে তাকে করোনা কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাব বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। এটা উত্তরাধিকারের সমস্যা। ব্যাংক ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং সুশাসন প্রতিষ্ঠা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন তিনি।

জাতীয় পার্টির সাংসদ এবং আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার শামীম পাটোয়ারী বলেন, এ মুহূর্তে অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সংকটের নাম ব্যাংক লুট। ব্যাংক ব্যবস্থা বিনষ্ট হয়ে গেছে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে লুটেরা গোষ্ঠী ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করছে। কয়েক দিন পর আবার লুট করছে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও এত টাকা লুট করেনি। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে অর্থ পাচার করা হয়েছে। ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সব রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের নিয়ে কমিটি করার প্রস্তাব দেন তিনি।

গবেষণা সংস্থা পিআরআইর নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, সার্বিক অর্থনৈতিক সংকট এবং ব্যাংক ব্যবস্থায় আস্থা কমে আসার কারণে মানুষ ব্যাংক থেকে টাকা তুলে তুলনামূলক ভালো ব্যাংকে জমা রাখছে। এগুলো ব্যাংকিং খাতের সংকটের আলামত। সংস্কার পরিকল্পনা ছাড়া শরিয়াহ ব্যাংকগুলোকে ৫ হাজার ২০০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকার বোঝাতে চায়, ব্যাংক খাতে সমস্যা নেই। তিনি বলেন, আসলেই যদি কোনো ব্যাংকে সমস্যা থাকে, তা চিহ্নিত হওয়া উচিত। না হলে তা গোটা ব্যাংকিং খাতকেই সমস্যায় ফেলবে। নির্বাচন সামনে রেখে আগামীতে অর্থ পাচার আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ২০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। আরও ২৫ হাজার কোটি টাকা বাজারে ছাড়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে মূল্যস্ম্ফীতি বাড়বে। মূল্যস্ম্ফীতি ধনীর কোনো সমস্যা নয়। এতে মধ্যবিত্তের সঞ্চয় কমে। আর দরিদ্রদের জন্য তা জীবিকার সংকট।

স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী নাসের এজাজ বিজয় বলেন, খেলাপি ঋণ আরও বাড়তে পারে। কারণ সময়মতো ঋণ ফেরত আসা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এর মধ্যে সঞ্চয় কমলে অনেক ব্যাংক সমস্যায় পড়বে। তিনি বলেন, অর্থনীতির আকারের তুলনায় ৬১টি ব্যাংক সংখ্যায় অনেক বেশি। পাচার বন্ধে আন্ডার ইনভয়েসিং এবং ওভার ইনভয়েসিং শনাক্ত করার কথা বলেন তিনি।

বার্জার পেইন্ট বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রূপালী চৌধুরী বলেন, মুদ্রার বিনিময় হারের ক্ষতি এবং কাঁচামাল উৎপাদন কম হওয়ায় সংকটে আছে ক্ষুদ্র মাঝারি শিল্প। এসএমই বিলুপ্ত হওয়ার পথে। আলাদা ব্যাংক করে এসএমইকে সহয়তা দেওয়ার কথা বলেন তিনি।

উন্মুক্ত আলোচনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমানতের সুদের হার ৬ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়নি। তিন মাসের মূল্যস্ম্ফীতির গড়ের কথা বলেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, অর্থনীতির কোনো দিকই ভালো নেই। খেলানি ঋণ এবং বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ব্যবসায়ীদের কারণে এই অর্থনৈতিক সংকট। এগুলো বন্ধ না হলে সংকট কখনও যাবে না। সাবেক বাণিজ্য সচিব সোহেল আহম্মেদ চৌধুরী বলেন, 'সের' দরে ব্যাংকের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এত ব্যাংকের কারণে সেবার মান কমেছে।

সুশাসনের অভাবে দুর্বল হচ্ছে ব্যাংক খাত: সিপিডির পক্ষে অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন। তিনি বলেন, দেশের ইতিহাসে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার এত সংকট আগে কখনও দেখা যায়নি। সুশাসনের অভাবে দুর্বল হচ্ছে ব্যাংক খাত। এ কারণে খেলাপি ঋণ বাড়ছে। খেলাপি ঋণ এখন ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। যা দেখানো হয় বাস্তবে তা আরও বেশি। খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১০ বছরে ৩ গুণ হয়েছে। খেলাপি ঋণ বাড়ার বড় কারণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ব্যাংক পরিচালকদের নিয়োগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ অনুমোদন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বাধীনতার অভাব। এ ছাড়া ঋণখেলাপিদের সুবিধা দেওয়া, স্বার্থান্বেষীদের পক্ষে ব্যাংকিং কোম্পানি আইনের সংশোধনী এবং অর্থঋণ আদালত আইনের দুর্বলতা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ বড় কারণ হলেও আগে থেকেই মূল্যস্ম্ফীতি বেশি ছিল। দেশে মূল্যবৃদ্ধির অনেক কারণ রয়েছে। বর্তমান অনেক পরিবার খাদ্য তালিকা থেকে মাছ ও মাংস বাদ দিয়ে আপস করছে। তিনি বলেন, রিজার্ভের হিসাব নিয়ে নানা জটিলতা তৈরি হয়েছে। রিজার্ভের কারণে এলসি খোলা কিংবা আমদানির ক্ষেত্রে চাপ তৈরি হয়েছে।

Bootstrap Image Preview