Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ০৫ রবিবার, ফেব্রুয়ারি ২০২৩ | ২৩ মাঘ ১৪২৯ | ঢাকা, ২৫ °সে

ছাত্রলীগ নেত্রী তিলোত্তমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার রহস্য

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৪:২৪ PM
আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২২, ০৪:২৪ PM

bdmorning Image Preview
ছবি সংগৃহীত


২০১২-১৩ সেশনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগে ভর্তি হয়ে ক্লাস শুরু করেন ছাত্রলীগ নেত্রী তিলোত্তমা শিকদার। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্যও। তবে ৯ বছর ১০ মাস পার হতে চললেও এখনো তিনি তৃতীয় বর্ষের গণ্ডি পেরোতে পারেননি। যদিও তার বিভাগের সহপাঠীরা ২০১৮ সালে অনার্স শেষ করেছেন।

বিভাগে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ২০১২-১৩ সেশনের শিক্ষার্থীরাই ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের প্রথম ব্যাচ। আর সেই ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন তিলোত্তমা শিকদার। এক বছরের সেশনজটসহ সেই ব্যাচের নিয়মিত অনার্স শেষ হয় ২০১৮ সালে। আর তিলোত্তমা সেই ব্যাচের সঙ্গে সর্বশেষ ২০১৬ সালে তৃতীয় বর্ষের পঞ্চম সেমিস্টারের পরীক্ষা দিয়েছেন। কিন্তু পঞ্চম সেমিস্টারের রেজাল্ট শিটে তার নাম না আসায় তিনি ষষ্ট সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের একটি আদেশে বলা আছে, আট বছরের বেশি কোনো শিক্ষার্থী ঢাবির নিয়মিত ছাত্র হিসেবে অধ্যয়ন করতে পারবে না। এই আট বছরের ভেতর ছয় বছরে স্নাতক ও দুই বছরের মধ্যে স্নাতকোত্তর করতে হবে। কিন্তু তিলোত্তমা এখনো অনার্সের গণ্ডিও পার হতে পারেননি।

এ বিষয়ে বিভাগের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তা বলেন, আমাদের বিভাগ সেমিস্টার সিস্টেম। দুই সেমিস্টার মিলিয়ে একটা ইয়ার। প্রতি ইয়ারের দুই সেমিস্টারের কোনো একটির যেকোনো কোর্সে ফেল হলেও যদি কারও গড় জিপিএ ২.২৫ এর উপরে হয় তাহলে সে পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হতে পারবে। আর ‍যে কোর্সগুলোতে সে ফেল করেছে পরবর্তী দুইটা ব্যাচের সঙ্গে সেই কোর্সগুলোর ইমপ্রুভমেন্ট দিতে পারবে। আর যদি দুইটা ব্যাচ ওভার করে ফেলে তাহলে তাকে স্পেশাল পারমিশন নিয়ে সেই কোর্সের পরীক্ষা দিতে হবে।

এ কর্মকর্তা বলেন, তার (তিলোত্তমা) প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বর্ষের গড় জিপিএ ২.২৫ এর উপরে না আসায় তার নাম রেজাল্ট শিটে আসেনি। তার প্রথম সেমিস্টারের ১টি, দ্বিতীয় সেমিস্টারের দুইটি আর চতুর্থ সেমিস্টারে একটি কোর্সে ফেল আছে। সুতরাং গড় জিপিএ ২.২৫ এর উপরে না আসার এটাও একটা কারণ হতে পারে। এখন তিনি যদি চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হতে চান তাহলে তাকে পূর্বের বাকি থাকা চার কোর্সের ফলোন্নয়ন পরীক্ষা দিতে হবে। এসব পরীক্ষা দিয়ে সেসব পরীক্ষার রেজাল্ট মিলিয়ে যদি তার সিজিপিএ ২.২৫ এর উপরে হয় তাহলে তিনি চতুর্থ বর্ষে উত্তীর্ণ হতে পারবেন।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এখন এই চার কোর্সের কোনো একটিতে যদি তিনি আবার ফেল করেও সিজিপিএ ২.২৫ এর উপরে চলে আসে তাহলে তিনি পরবর্তী বর্ষে উত্তীর্ণ হতে পারবেন কিন্তু সেই বর্ষের কোর্সসমূহের সাথে ফেল করা কোর্সের ফলোন্নয়ন পরীক্ষা দিতে হবে। কারণ আট সেমিস্টারের সকল কোর্সের মধ্যে যদি একটা কোর্সেও কোন শিক্ষার্থী ফেল করেন সেই কোর্সে পাস না করা অবধি কেউ অনার্স পাস করতে পারবে না।

বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০১৬ সালে তৃতীয় বর্ষের রেজাল্ট শিটে যখন তিলোত্তমার নাম আসেনি সে সময় থেকে চলতি বছরের অক্টোবরের মাঝামাঝি পর্যন্ত তিনি বাকি থাকা চার কোর্সের কোনো ফলোন্নয়ন পরীক্ষা দেননি এবং পরীক্ষার জন্য আবেদনও করেননি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলছেন, এখন কেউ যদি ফলোন্নয়নের জন্য আবেদন না করেন তাহলে তো আমরা কিছু করতে পারি না। শিক্ষার্থীই তো সিদ্ধান্ত নেবেন তিনি পরীক্ষা দেবেন কী দেবেন না।

এর মধ্যে তিলোত্তমা শিকদার ২০১৯ সালে ছাত্রলীগের প্যানেল থেকে সদস্য পদে ডাকসু নির্বাচন করে নির্বাচিত হন। এরপর জুন মাসে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান তাকে সিনেট সদস্য পদে মনোনয়ন দেন। ২০১৯ এবং ২০২২ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫২ ও ৫৩তম সমাবর্তনে সিনেট সদস্য হিসেবে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া এই সময়ে অনুষ্ঠিত সিনেটের বিভিন্ন অধিবেশনে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি হিসেবে বক্তব্য রাখেন।

সর্বশেষ গত মাসের শেষ সপ্তাহে তিনি চার কোর্সের ফলোন্নয়ন পরীক্ষার জন্য স্পেশাল অনুমোদনের আবেদন করেন। সে সময় অনুষ্ঠিত হওয়া ডিনস কমিটির সভায় এটি অনুমোদন হয়।

বিভাগের সেই কর্মকর্তা বলেন, তার আবেদন এপ্রুভ হয়েছে। এখন তার এই পরীক্ষাগুলো কবে নেওয়া হবে সেটি বিভাগের অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। একটা নিয়মিত পরীক্ষার যত কার্যক্রম স্পেশাল পরীক্ষারও তত কার্যক্রম। সেই স্পেশাল পরীক্ষা একজন দিলেও। এখন তার জন্য আমাদের পরীক্ষা কমিটি গঠন করতে হবে, রুটিন প্রণয়ন করতে হবে। তার পরীক্ষা নেওয়ার পর দুইজন শিক্ষক ট্যাবুলেশন করবে এরপর রেজাল্ট।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিলোত্তমা শিকদার বলেন, আমি ২০১২-১৩ সেশনে ভর্তি হয়েছিলাম কিন্তু বিভাগের প্রথম ব্যাচ হওয়ায় আমাদের দুই বছর লেট হয়েছে। আমি অনার্সের সব পরীক্ষা দিয়েছি কিন্তু দুই সেমিস্টারে ফেল থাকায় সার্টিফিকেট তুলতে পারিনি। তৃতীয় ও ৬ষ্ঠ সেমিস্টারে আমার ফেল আছে। এখন এসব পরীক্ষা দেওয়ার জন্য আমি আবেদন করেছি এবং অনুমতি পেয়েছি।

তিনি বলেন, আমার সঙ্গে আরও ৬ জন আছে তারাও পরীক্ষার অনুমতি পেয়েছে। লেট হলেও বিশেষ বিবেচনায় এবং নিজস্ব অর্থায়নে আমরা পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ পাচ্ছি। প্রতি কোর্সের জন্য ১২ হাজার টাকা করে লাগছে।

একজন শিক্ষার্থী কত বছরের মধ্যে অনার্স শেষ করতে পারে জানতে চাইলে কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আব্দুল বাছির ঢাকা পোস্টকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী ৬ বছরের মধ্যে একজন শিক্ষার্থী অনার্স কমপ্লিট করতে হবে। কিন্তু এর বাইরেও অনেক কিছু হয়। অনেক সময় বিভাগ থেকে পরীক্ষা নিতে দেরি হয় কিংবা করোনার কারণে লস হলে সেখানে তো শিক্ষার্থীর দোষ নেই। সেক্ষেত্রে তো তাকে সুযোগ দিতে হবে। তবে বিস্তারিত আমার জানা নেই, দেখে জানাতে হবে।

এই বিষয়ে ডিজাস্টার সায়েন্স অ্যান্ড ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক জিল্লুর রহমানকে ফোন দিয়ে জানতে চাইলে তিনি ব্যস্ত আছেন জানিয়ে পরে কথা বলবেন বলে জানান।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাকসুদ কামাল বলেন, একজন শিক্ষার্থীকে ছয় বছরের মধ্যে অনার্স শেষ করতে হয়। তার পরীক্ষার অনুমোদনের বিষয়টা কবে এপ্রুভ হয়েছে সেটি আমার মনে পড়ছে না। সর্বশেষ ডিনস কমিটিতে এরকম কিছু এপ্রুভ হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না।

১০ বছর পর্যন্ত ছাত্রত্ব থাকার সুযোগ আছে কী-না জানতে চাইলে মাকসুদ কামাল বলেন, কারও কারও ক্ষেত্রে যদি টাইমবার্ড না হয় কিন্তু ফেল করা কোনো একটা কোর্সের পরীক্ষা দিলে যদি তার সিজিপিএ ২.২৫ এর উপরে এসে উত্তীর্ণ হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে তাহলে আমরা সেটির অনুমোদন দিই। আর টাইমবার্ড হয়ে গেলে তো এরকম অনুমোদন আমরা দিই না। এ ক্ষেত্রে (তিলোত্তমার) কী হয়েছে সেটি আমার জানা নেই।

কে এই তিলোত্তমা

কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তিলোত্তমা শিকদার নানা কারণে বারবার আলোচনায় এসেছেন। গত ২৬ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সংঘর্ষের ঘটনায় তিলোত্তমার একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগ-মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় হাতে লাঠি ও হেলমেট পরা অবস্থায় দেখা যায় তাকে। এ ঘটনায় তিলোত্তমা শিকদারসহ ৩২ নেতার বিরুদ্ধে মামলাও হয়।

এছাড়া সম্প্রতি ইডেন কলেজ ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষের পর ঘটনা তদন্তে দুই সদস্যের কমিটি গঠন করে ছাত্রলীগ। সেই কমিটির একজন তিলোত্তমা। সেই সময় তিলোত্তমা-নিশির (তদন্ত কমিটির অন্য সদস্য বেনজির হোসেন নিশি) তদন্ত কমিটি মানেন না জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কলেজ ছাত্রলীগের একটি অংশ। তাদের অভিযোগ, কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি সাধারণ সম্পাদক এই দুইজনের আস্থাভাজন। তদন্ত কমিটির দায়িত্ব পেয়ে তিনি ঠিকভাবে দায়িত্ব পালন না করে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের পক্ষ নিয়েছেন।

তারা অভিযোগ করে বলেন, তদন্ত কমিটিতে রাখা হয়েছে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহসভাপতি তিলোত্তমা শিকদার এবং যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বেনজির হোসেন নিশিকে। এর আগে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি তামান্ন জেসমিন রিভার অডিও ফাঁস হয়েছে সেটিরও তদন্ত করতে দেয়া হয় নিশি-তিলোত্তমাকে। তারা সেই তদন্তের কোনো রিপোর্ট আমাদের জানায়নি। নিশি আর তিলোত্তমার তদন্ত কমিটি আমরা মানব না।

এছাড়া ইডেন কলেজে সংঘর্ষের পর কলেজ ছাত্রলীগের বিদ্রোহী অংশের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করে বলেন, ইডেনে তিলোত্তমা শিকদার এবং বেনজির হোসেন নিশির নামে রুম বরাদ্দ আছে। তারা সেখান থাকা শিক্ষার্থীদের কাছে টাকা তুলেন। যদিও এসব অভিযোগ সে সময়ই অস্বীকার করেছেন তিলোত্তমা।

এর আগে সাত বছরেও অনার্সের গণ্ডি পার হতে না পেরে আলোচিত হয়েছিলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও ডাকসুর এজিএস সাদ্দাম হোসেন। আইন বিভাগের চার বছরের এই কোর্স শেষ করতে তিনি ৮ বছর সময় নেন।

Bootstrap Image Preview