Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ৩০ শুক্রবার, সেপ্টেম্বার ২০২২ | ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ | ঢাকা, ২৫ °সে

‘স্যাটানিক ভার্সেস’-এ কী লিখেছিলেন রুশদি? কেন তার প্রতি ইরানের এতো ক্ষোভ?

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৩ আগস্ট ২০২২, ০৯:০২ PM
আপডেট: ১৩ আগস্ট ২০২২, ০৯:০২ PM

bdmorning Image Preview


শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের শাটাকোয়া ইনস্টিটিউশনে ভাষণ দিতে গিয়ে ছুরিকাহত হয়েছেন বিশ্বখ্যাত লেখক ও ঔপন্যাসিক সালমান রুশদি। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ২০ সেকেন্ডের মধ্যে ১০-১৫ বার কোপানো হয়েছে রুশদিকে। তার ঘাড়েও কোপ মারা হয়েছে।

হামলার পরপরই হাসপাতাল নেওয়া হয়ে বুকারজয়ী এই লেখককে। তিনি এখন ভেন্টিলেটর সাপোর্টে রয়েছেন বলে জানিয়েছেন তার এজেন্ট অ্যান্ড্রু ওয়াইলি। তিনি জানিয়েছেন, রুশদির ‘খবর ভালো নয়’। তিনি কথা বলতে পারছেন না, সম্ভবত একটি চোখ হারাতে পারেন। তার বাহুর স্নায়ু বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে এবং লিভার ছুরিকাঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

রুশদির ওপর হামলা চালিয়েছে হাদি মাতার নামের এক ২৪ বছর বয়সী যুবক। প্রাথমিক তদন্তে নিউ ইয়র্ক পুলিশ জানতে পেরেছে, ইসলাম ধর্মাবলম্বী হাদি শিয়া সম্প্রদায়ের। জন্ম ক্যালিফোর্নিয়ায় হলেও আদতে ইরানি বংশোদ্ভূত। শিয়া কট্টরপন্থায় বিশ্বাসী হাদির আনুগত্য রয়েছে ইরানের ‘ইসলামিক রেভলিউশনারি গার্ড’-এর প্রতি। তবে তিনি সরাসরি কোনও কট্টরপন্থী সংগঠনের সদস্য কি না, তা এখনও জানা যায়নি।

প্রসঙ্গত, বিতর্কিত উপন্যাস ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ লেখার পর ১৯৮৯ সালে রুশদিকে খুনের ফতোয়া জারি করেছিলেন ইরানের শীর্ষ ধর্মীয় নেতা আয়াতোল্লা খোমেনি। ধারণা করা হচ্ছে, ওই ফতোয়া বাস্তবায়ন করতেই এই হামলা চালিয়েছে হাদি। অথচ ওই ফতোয়ার ১০ বছর পরে জন্ম হয় তার!

কিন্তু প্রশ্ন হলো ‘স্যাটানিক ভার্সেস’-এ আসলে কী লিখেছিলেন রুশদি, কেন তার প্রতি এতো ক্ষোভ মুসলিমদের?

১৯৮৮ সালে সালমান রুশদির চতুর্থ উপন্যাস ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ প্রকাশের পরপরই বিশ্বজুড়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের মধ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে।

তার এক বছর পর ১৯৮৯ সালে ইরানের তৎকালীন শীর্ষ নেতা আয়াতুল্লাহ খোমেনি রুশদির মাথার দাম ঘোষণা করেন ৩০ লাখ ডলার। ঘোষণায় তিনি আরও বলেন, রুশদিকে হত্যা করতে গিয়ে কেউ নিহত হলে সে শহীদের মর্যাদা পাবে এবং জান্নাতে যাবে।

এই ফতোয়া দেওয়ার চার মাসের মাথায় মারা যান খোমেনি। তবে তার সেই ঘোষণা এখনও বহাল আছে। খোমেনির মৃতুর পর এ বিষয়ে আর এগোয়নি ইরান। কিন্তু ২০২১ সালে দেশটির সরকার সমর্থিত একটি ধর্মীয় ফাউন্ডেশন পুরস্কারের অংকের সঙ্গে আরও ৫ লাখ ডলার যুক্ত করে।

তার বই দ্য স্যাটানিক ভার্সেস প্রথম নিষিদ্ধ হয়েছিল তার নিজের দেশ ভারতে। ফলে, মাতৃভূমি থেকেও তার প্রতি কোনো প্রকার সহযোগিতার আশা ছিল না। তাই খোমেনি মাথার দাম ঘোষণার পর থেকেই জীবন বাঁচাতে ফেরারি জীবন শুরু হয় সালমান রুশদির।

যুক্তরাজ্য তাকে আশ্রয় দিতে সম্মত হয়, তবে সরকারের পক্ষ থেকে শর্ত দেওয়া হয়- নাম পরিচয় গোপন করে থাকতে হবে তাকে। উপয়ান্তর না থাকায় সে শর্ত মেনে নিয়ে ‘জোসেফ অ্যান্টন’ ছদ্মনামে প্রায় ১৩ বছর ব্রিটেনে ছিলেন তিনি।

১৩ বছরে নিরাপত্তার প্রয়োজনে বেশ কয়েকবার ঠিকানা বদলাতে হয়েছে তাকে। তার এই নির্বাসিত জীবনকে আরও দুঃসহ করে তোলে তার সে সময়ের স্ত্রী মার্কিন ঔপন্যাসিক ম্যারিয়েন উইগিংনসের সঙ্গে বিচ্ছেদ। ১৯৯৩ সালে বিচ্ছেদ হয় তাদের।

নিজের ডায়রিতে এ প্রসঙ্গে নিজের ডায়রিতে তিনি বলেন, ‘এখানে আমি বন্দির থেকেও বন্দি। কথা বলার মতো একটা মানুষও এখানে নেই। পরিবারকে সময় দেওয়া, আমার ছেলের সঙ্গে ফুটবল খেলা, আর দশজনের মতো সাদাসিধা জীবন কাটানো- এটাই এখন আমার একমাত্র স্বপ্ন এবং বর্তমান মুহূর্তে মনে হচ্ছে এটি একটি অসম্ভব স্বপ্ন’।

‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসে যা লিখেছিলেন রুশদি

উপন্যাসটির প্রেক্ষাপট ছিল ইসলামপূর্ব আরব সমাজ এবং ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মহানবী (সা.), ইসলামের আবির্ভাবের পূর্বে আরবে পূজিত তিন দেবী আল্-লাত (আলিলাত), আল্-উজ্জা (আলিজা) ও মানাহ এবং শয়তানকে উপন্যাসটির চরিত্র হিসেবে হাজির করেছিলেন তিনি।

উপন্যাসটির কাহিনী খুব সংক্ষেপে বলতে গেলে- ইসলাম ধর্ম প্রচারের সময় তৎকালীন আরবের পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বীদের হাতে ব্যাপক বাধার সম্মুখীন হন মহানবী (সা.)। সে সময় শয়তান তাকে প্রস্তাব দেয়- মহানবী যদি আরবের পূজিত তিন দেবীকে তার হাতে তুলে দেন, তাহলে আরবে একেশ্বরবাদ প্রতিষ্ঠিত হবে। এবং মহানবী (সা.) সেই প্রস্তাব মেনে ওই তিন দেবীকে শয়তানের হাতে তুলে দেন।

যাদু বাস্তবতা (ম্যাজিক রিয়েলিজম) ঘরানায় লেখা এই উপন্যাসটি প্রকাশিত হওয়ার পর বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে ধর্মদ্রোহীতার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিক্ষোভ শুরু হয়, সেই সঙ্গে দেশে দেশে নিষিদ্ধ হতে থাকে বইটি।

এ পর্যন্ত ২০টি দেশে নিষিদ্ধ হয়েছে ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’। সবার আগে বইটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে রুশদির জন্মভূমি ভারত। ১৯৮৮ সালে বইটি প্রকাশের পর ভারতের মুসলিমরা বিক্ষোভ শুরু করলে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী রাজিব গান্ধী বইটি সে দেশে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেন।

পরের বছর, ১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে যুক্তরাজ্যের উত্তরাঞ্চলীয় শহর ব্র্যাডফোর্ডে বিক্ষোভ মিছিল শেষে একদল মুসলিম প্রকাশ্যে বইটির বেশ কিছু কপি পোড়ায়।

তার পরের মাসে রুশদির ফাঁসির দাবিতে ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য কেন্দ্রে হামলা চালায় কয়েকহাজার পাকিস্তানি মুসলিম। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে গুলি ছুড়তে হয়েছিল পুলিশকে এবং তাতে নিহত হয়েছিলেন ৫ জন।

তার মধ্যেই খোমেনির ফতোয়া পশ্চিমা বিশ্বে উস্কে দেয় ভীতি। এই ভীতির কারণে ইউরোপ ও যুক্তরাজ্যের সঙ্গে ইরানের কূটনৈতিক সম্পর্ক ২ বছরের জন্য বিচ্ছিন্ন ছিল।

মুসলিমদের শান্ত করতে ও আত্মপক্ষ সমর্থনে ১৯৯০ সালে ‘সরল বিশ্বাসে’ (ইন গুড ফেইথ) নামে একটি নিবন্ধ লেখেন রুশদি। সেখানে তিনি স্বীকারোক্তি দেন, তার এই উপন্যাসের প্রধান এবং একমাত্র উদ্দেশ্য সাহিত্যসৃষ্টি। কাউকে আঘাত করার অভিপ্রায় নিয়ে তিনি এটি লেখেননি। কিন্তু তার এই আত্মপক্ষ সমর্থন কট্টরপন্থী মুসলিমদের শান্ত করতে পারেনি।

যুক্তরাজ্যে দুই বছরেরও বেশি সময় ‘আন্ডারগ্রাউন্ডে’ থাকার পর ১৯৯১ সাল থেকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক জীবনে প্রবেশ শুরু করেন তিনি। কিন্তু উপন্যাসটি জাপানি ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন  যিনি, তিনি ওই বছরই আততায়ীর হামলায় নিহত হন।

জাপানি অনুবাদক নিহত হওয়ার কয়েকদিন পর ছুরি হামলায় নিহত হন উপন্যাসটির ইতালীয় অনুবাদক ও নরওয়েতে যে প্রকাশক বইটি প্রকাশ করেছিলেন, তাকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এসব হত্যার পেছনে ইরানের ইন্ধন ছিল কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়।

তুরস্কের লেখক আজিজ নেসিন তুর্কি ভাষায় বইটির অনুবাদ করছিলেন। এই অভিযোগে ১৯৯৩ সালে তুরস্কের মধ্যাঞ্চলীয় শহর সিভাসের একটি হোটেল ১৯৯৩ সালে জ্বালিয়ে দেয় বিক্ষুব্ধ মুসলিমরা। সেসময় হোটেলটিতে ছিলেন আজিজ। তবে সৌভাগ্যক্রমে অগ্নিদগ্ধ হওয়ার হাত থেকে বেঁচে গেলেও আগুনে পুড়ে মরেছিলেন ৩৭ জন মানুষ।

১৯৯৮ সালে ইরানের সংস্কারপন্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ খাতামি অবশ্য ব্রিটেনকে আশ্বাস দেন, রুশদি ওপর জারি করা ফতোয়া কার্যকর হবে না। তবে খোমেনির উত্তরাধীকারী আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি ২০০৫ সালে ঘোষণা দেন, রুশদি একজন ধর্মত্যাগী এবং তাকে হত্যা করতে হবে।

Bootstrap Image Preview