Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ৩০ শুক্রবার, সেপ্টেম্বার ২০২২ | ১৫ আশ্বিন ১৪২৯ | ঢাকা, ২৫ °সে

মহাসড়কের ত্রাস এক রতন ডাকাতের গল্প

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৯ আগস্ট ২০২২, ০৮:৩৭ AM
আপডেট: ০৯ আগস্ট ২০২২, ০৮:৩৭ AM

bdmorning Image Preview


রতন হোসেনের বয়স সবে ২১ বছর। পড়াশোনা করেছে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। গ্রামের বাড়ি টাঙ্গাইলের ধলপুরের কুরালিয়ায়। এই বয়সেই মহাসড়ক ঘিরে একটি বড় সংঘবদ্ধ ডাকাত চক্রের নেতৃত্ব দিয়ে আসছিল সে। এর মধ্যে দুই দফায় ২০ মাস কারাভোগ করেছে। ৯ মাস আগে জেল থেকে বেরিয়ে ফের ডাকাতি শুরু করে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে ১০টি ডাকাতিতে অংশ নেয় তার দল। তার মধ্যে চারটি ঘটনায় বাসের মধ্যে ধর্ষণে সরাসরি জড়িত সে। সর্বশেষ গত ২ আগস্ট টাঙ্গাইলের মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি এবং এক নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে রতনের দল। র‌্যাবের হাতে রতন ও তার চক্রের ১০ সদস্য গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে। টাঙ্গাইলের ঘটনা ছাড়া আরও তিনটি বাসে যাত্রীকে ধর্ষণের কথাও স্বীকার করেছে রতন।

তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, রতনের বাহিনীর সেকেন্ড ইন কমান্ড হলো ঝটিকা পরিবহনের গাড়িচালক রাজা মিয়া। ওই পরিবহনের বাসে অন্তত পাঁচবার যাত্রীদের সবকিছু লুট করেছে তার দল। রতন পেশাও বদল করেছে বারবার। কখনও বাসের হেলপার, কখনও পোশাক কারখানায় চাকরি করে। এক সময় ঢাকায় ছোটখাটো ছিনতাইও করত। সেখানে হাত পাকানোর পর মহাসড়ক ঘিরে আরেক ডাকাত গ্রুপ নেতা আয়নালের লোক হিসেবে কাজ করত। সেখানে ৪-৫ বছর কাজ করার পর নিজের নেতৃত্বে ডাকাত দল গঠন করে। রতন এতটাই দুর্ধর্ষ, প্রতি সপ্তাহে অন্তত একবার ডাকাতির ছক কষে। কোনো সপ্তাহে ব্যর্থ হলে পরের সপ্তাহের টার্গেট ঠিক করে। বাসে যাত্রীর সবকিছু লুট করার পর নারীদের টার্গেট করে দলবদ্ধ ধর্ষণের নেতৃত্ব দেয় সে।

তদন্ত-সংশ্নিষ্ট উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা জানান, রতন বিয়েও করেছে একাধিক। প্রথমে ফাঁদে ফেলে চট্টগ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া এক তরুণীকে বিয়ে করেছিল সে। কিছুদিন পর ওই তরুণী এবং তাঁর পরিবার জানতে পারে- সে পেশাদার ডাকাত। এরপর ভেঙে যায় সেই সংসার। ওই ঘটনার পর আকলিমা খাতুন নামে এক পোশাককর্মীকে বিয়ে করে গাজীপুরে সংসার পাতে। সর্বশেষ নিজ গ্রুপের আরেক ডাকাত সদস্যের স্ত্রীকে নিয়ে সংসার করছে।
টাঙ্গাইলের ঘটনার দু'দিন আগে সাভারের জিরানী এলাকায় বৈঠক করে রতন। এর এক দিন আগে সে রাজা মিয়াকে যুক্ত হওয়ার প্রস্তাব দেয়। এরপর মান্না, জীবন, দীপু, আউয়াল ও নুরনবীকে পরিকল্পনার কথা জানায়। রতনের নেতৃত্বে ১৩ জন ডাকাত অংশ নেয় ওই ঘটনায়। ডাকাতির প্রাথমিক খরচ মেটানোর জন্য সে পাঁচ হাজার টাকা লগ্নি করে। ওই টাকা দিয়ে দেশীয় অস্ত্র কেনা হয়। কার কী দায়িত্ব, তা আগে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ছক মোতাবেক ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের এলেঙ্গা মোড়ের একটি দোকান থেকে চারটি চাকু, দুটি ধারালো কাঁচি এবং একটি ক্ষুর সংগ্রহ করে রতন। র‌্যাবের অভিযানে ১০ ডাকাত গ্রেপ্তারের পর প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে এসব তথ্য বেরিয়ে আসে।

গ্রেপ্তার ওই ১০ জন হলো- রতন হোসেন, মো. আলাউদ্দিন, সোহাগ মণ্ডল, খন্দকার মো. হাসমত আলী দীপু, বাবু হোসেন জুলহাস, মো. জীবন, আব্দুল মান্নান, নাঈম সরকার, রাসেল তালুকদার ও আসলাম তালুকদার রায়হান। ঢাকা, গাজীপুর ও সিরাজগঞ্জ এলাকায় অভিযান চালিয়ে তাদের ধরা হয়। গ্রেপ্তারদের মধ্যে ছয়জনের বয়সই ১৮ থেকে ২১ বছরের মধ্যে। তারা সবাই বিভিন্ন পরিবহন এবং পোশাক কারখানার শ্রমিকের আড়ালে ডাকাত দলের সক্রিয় সদস্য। এর আগে টাঙ্গাইল জেলা পুলিশ রাজা মিয়া, আব্দুল আউয়াল ও নুরনবীকে গ্রেপ্তার করে।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ওই বাসে একাধিক ধর্ষণের মতো ঘটনা ঘটেছে। তদন্তে সেটার বিস্তারিত ওঠে আসবে। ঘটনার রাতে সিরাজগঞ্জ এলাকায় ঘোরাঘুরি করতে থাকে ডাকাত দলের সদস্যরা। রাত আনুমানিক ১টার দিকে কুষ্টিয়া থেকে নারায়ণগঞ্জগামী ঈগল এক্সপ্রেস পরিবহনের বাসটি সিরাজগঞ্জ এলাকায় পৌঁছলে রতন থামার সংকেত দেয়। যাত্রীবেশে প্রথমে রতন, রাজা, মান্নান ও নুরনবী বাসে ওঠে। পরে দুই দফায় ডাকাত চক্রের অন্যরা বাসে ওঠে। ঢাকার বাইপাইলে যাবে বলেন জানিয়েছিল তারা। ওই সময় বাসে যাত্রী ছিলেন ২৪ জন। বাসটি বঙ্গবন্ধু সেতু পার হওয়ার পর ধূমপানের কথা বলে আউয়াল বাসের দরজার সামনে যায়। তার ইশারায় রাজা, রতন, মান্নান ও নুরনবীও সামনের দিকে যায়। এরপর চালক, সুপারভাইজার ও হেলপারের কাছ থেকে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ নেয় তারা। দলের বাকি সদস্যরা বাসের পর্দা দিয়ে যাত্রীদের হাত-পা বেঁধে, বাসের সিট কভার দিয়ে মুখ ঢেকে দেয়। যাত্রীদের নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও মূল্যবান জিনিসপত্র লুট করার পর ধর্ষণ ও শ্নীলতাহানির ঘটনা ঘটায়।

র‌্যাবের মুখপাত্র আরও জানান, লুটের মালপত্র নিয়ে রতন গাজীপুরের বোর্ডবাজার এলাকায় চলে যায়। মান্নান, আলাউদ্দিন ও বাবু পৃথকভাবে আশুলিয়ার জিরানী বাজার এলাকায় গিয়ে গা-ঢাকা দেয়। আসলাম, নাঈম ও রাসেল সিরাজগঞ্জের কামারখন্দে পালায়। জীবন আত্মগোপন করে কোনাবাড়ীতে। দীপু প্রথমে টাঙ্গাইলের পিরোজপুর গ্রামে, এরপর গাজীপুরের কালিয়াকৈর এলাকায় যায়। সোহাগ প্রথমে জিরানী বাজার ও পরে জামালপুর জেলায় এবং পরে আবার জিরানী বাজারে গা-ঢাকা দেয়।

Bootstrap Image Preview