Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৯ বৃহস্পতিবার, সেপ্টেম্বার ২০২২ | ১৪ আশ্বিন ১৪২৯ | ঢাকা, ২৫ °সে

শ্রীলংকাকে ডলার ধার দেবে না বাংলাদেশ

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩১ মার্চ ২০২২, ০৮:২৯ AM
আপডেট: ৩১ মার্চ ২০২২, ০৯:১০ AM

bdmorning Image Preview
ছবি সংগৃহীত


ইতিহাসের ভয়াবহতম সংকটে দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপদেশ শ্রীলংকা। স্বাভাবিকের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি দাম দিয়েও বাজারে খাদ্য ও জ্বালানি পণ্য পাচ্ছে না দেশটির সাধারণ মানুষ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীনতা লাভের পর থেকে কখনো এতটা দুরবস্থায় পড়েনি দেশটি। দেশটির অর্থনীতিকে বেসামাল করে তুলেছে বৈদেশিক মুদ্রার তীব্র সংকট।

গত বছরের মাঝামাঝি সময়ে রিজার্ভ থেকে ২৫ কোটি ডলার ধার দিয়ে শ্রীলংকার পাশে দাঁড়িয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। শর্ত ছিল, তিন মাসের মধ্যে ঋণের অর্থ পরিশোধ করবে দেশটি। যদিও সে শর্ত পরিপালনে অনেক আগেই ব্যর্থ হয়েছে শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংক। দেশটির অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে এ ঋণের মেয়াদ আরো এক বছর বাড়িয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। বর্তমানে সেটিও ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। আগের ঋণ পরিশোধ না করলেও কারেন্সি সোয়াপের আওতায় বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভ থেকে আরো ২৫ কোটি ডলার চেয়েছে শ্রীলংকা। যদিও বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় দেশটিকে নতুন করে আর কোনো অর্থ না দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।

এ বিষয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বক্তব্য হলো বর্তমান পরিস্থিতিতে শ্রীলংকাকে অর্থ ধার দিলে তা ফেরত পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। সংশয় রয়েছে এরই মধ্যে দেয়া ২৫ কোটি ডলার আদায় নিয়েও। অন্যদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও কমতে শুরু করেছে। আমদানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। এছাড়া রূপপুরসহ বিদেশী অনেক বড় ঋণের কিস্তি পরিশোধের সময়ও ঘনিয়ে এসেছে। এ অবস্থায় রিজার্ভ থেকে ডলার ধার দেয়ার ঝুঁকি নিতে চাচ্ছে না বাংলাদেশ ব্যাংক।

আরো ডলার চেয়ে করা শ্রীলংকার প্রস্তাব এরই মধ্যে ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর কাজী ছাইদুর রহমান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, শ্রীলংকাকে আর কোনো ডলার ধার দেয়া হবে না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থানকে যুক্তিসংগত বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বর্তমান বাস্তবতায় শ্রীলংকাকে ডলার ধার দেয়ার প্রশ্ন ওঠাই অযৌক্তিক। বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, রিজার্ভ থেকে শ্রীলংকাকে যে ২৫ কোটি ডলার দেয়া হয়েছে, সেটিও আদায়ের সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে। ওই অর্থের জামানত হিসেবে শ্রীলংকা নিজেদের মুদ্রা জমা রেখেছে। বর্তমান বাজারে শ্রীলংকান রুপির কোনো মূল্য নেই। যে পরিস্থিতিতে শ্রীলংকা পড়েছে, সেটি থেকে উত্তরণ ঘটাতে বহু বছর সময় লাগবে।

শ্রীলংকার দেউলিয়াত্বের পরিস্থিতি থেকে অন্য দেশগুলোর শেখার রয়েছে বলে মনে করছেন আহসান এইচ মনসুর। তিনি বলেন, বিদেশী ঋণ নিয়ে অপ্রয়োজনীয় মেগা প্রকল্প তৈরি করতে গেলে কী হয়, শ্রীলংকা তার উদাহরণ তৈরি করেছে। মেগা প্রকল্পের নামে মেগা লুটপাট হলে কোনো দেশের অর্থনীতি টেকসই হয় না।

দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে শ্রীলংকার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে এসেছে। এ অর্থ দিয়ে এক মাসের প্রয়োজনীয় আমদানি চালানোও মুশকিল হয়ে উঠেছে দেশটির জন্য। আবার চলতি বছরেই দেশটিকে ৭ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। বৈদেশিক মুদ্রার সংকট ও বিদেশী ঋণের ভারে জর্জরিত শ্রীলংকার পরিস্থিতি এমন অবস্থায় ঠেকেছে, দেশটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় মেটাতে পারছে না। বরং পুরনো ঋণের দায় মেটাতে এক প্রকার বিনামূল্যেই পণ্য রফতানি করতে হচ্ছে দেশটিকে। এরই মধ্যে ইরানের কাছ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি বাবদ আড়াইশ মিলিয়ন ডলার পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছে শ্রীলংকা। এর বিনিময়ে প্রতি মাসে পাঁচ মিলিয়ন ডলারের চা ইরানে রফতানির মাধ্যমে এ অর্থ পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দেশটি।

বৈদেশিক মুদ্রার চরম সংকটের মধ্যে গত বছরের মার্চে শ্রীলংকান প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসের অনুরোধে দেশটিকে ২৫ কোটি ডলার ঋণসহায়তা দিয়ে পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। মুদ্রা বিনিময় বা কারেন্সি সোয়াপ চুক্তির আওতায় এ অর্থ ধার দেয়া হয়। ২০২১ সালের ১৮ আগস্ট প্রথম কিস্তিতে শ্রীলংকাকে ৫ কোটি ডলার দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। ৩০ আগস্ট আরো ১০ কোটি ডলার শ্রীলংকায় পাঠানো হয়। এভাবে গত বছরের মধ্যেই দেশটিকে ২৫ কোটি ডলার ঋণসহায়তা দেয়া হয়।

ঋণসহায়তা দেয়ার সময় শর্ত ছিল, প্রথম কিস্তি পরিশোধ করার জন্য শ্রীলংকা তিন মাস সময় পাবে। এ সময় সুদের হার হবে লাইবরের (লন্ডন আন্তঃব্যাংক সুদের হার) সঙ্গে অতিরিক্ত ২ শতাংশ। প্রথম তিন মাসে ঋণ শোধ করতে না পারলে শ্রীলংকাকে আরো তিন মাস সময় দেয়া হবে। দ্বিতীয়বারের তিন মাসেও সুদের হার সমান থাকবে। তবে ছয় মাস পার হওয়ার পর থেকে পরের তিন মাসে সুদের হার হবে লাইবরের সঙ্গে অতিরিক্ত আড়াই শতাংশ।

শর্ত অনুযায়ী, শ্রীলংকার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি নির্দিষ্ট হিসাবে ২৫ কোটি ডলার পাঠায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ওই হিসাবে আগে থেকেই ডলারের সমপরিমাণ প্রায় ৪৯ দশমিক ৫ বিলিয়ন শ্রীলংকান রুপি জামানত হিসেবে জমা রাখে শ্রীলংকা। কথা ছিল পরবর্তী সময়ে শ্রীলংকা ওই হিসাবে ডলার জমা দিয়ে ক্রমান্বয়ে তাদের ঋণ পরিশোধ করবে। প্রতি বছর ৫ থেকে সাড়ে ৫ কোটি ডলার মূল্যের পণ্য আমদানি করে বাংলাদেশ। শ্রীলংকা ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে এ আমদানি পণ্যের মূল্য ওই হিসাবে জমা থাকা শ্রীলংকান মুদ্রা দিয়ে পরিশোধ করা হবে।

শ্রীলংকার সঙ্গে বাংলাদেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের পরিমাণ খুবই কম। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে শ্রীলংকা থেকে বাংলাদেশে আমদানি হয়েছে মাত্র ৪৬৩ কোটি টাকার পণ্য। একই অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে মাত্র ৩২৫ কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, শ্রীলংকার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ঋণটির মেয়াদ এক বছর বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। তবে দেশটি থেকে নতুন করে ঋণের আবেদন করার বিষয় সম্পর্কে আমি জ্ঞাত নই। এ বিষয়ে দুই দেশের সরকারের মধ্যে আলোচনা হয়ে থাকতে পারে।

শ্রীলংকার সরকার এ মুহূর্তে এক প্রকার নিরুপায় অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। খাদ্য, ওষুধ ও নিত্যপণ্যের আমদানি বন্ধ থাকায় বাজার নিয়ন্ত্রণে আনার সক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছে দেশটির সরকার। দ্বিগুণ-তিন গুণ দাম দিয়েও বাজারে খাদ্য কিনতে পারছে না সাধারণ লংকাবাসী। শিশুখাদ্যেরও অভাব দেখা দিয়েছে। পরিস্থিতিকে আরো প্রতিকূল করে তুলেছে জ্বালানি পণ্যের অভাব। কেরোসিনের জন্য জ্বালানির দোকানে লম্বা লাইনে দীর্ঘ সময় ধরে অপেক্ষারত মানুষের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। জ্বালানির অভাবে দেশটির বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকেও অলস বসিয়ে রাখতে হচ্ছে। যেটুকু উৎপাদন হচ্ছে, তা দিয়ে বাসাবাড়ি ও কারখানাগুলোয় দিনে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা যাচ্ছে মাত্র ৪ ঘণ্টা করে। বাকি ২০ ঘণ্টা ব্ল্যাক আউটেই থাকছে শ্রীলংকা। প্রয়োজনীয় মুদ্রণ উপকরণের অভাবে দেশটির সংবাদপত্রগুলোর এখন বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। যেগুলো টিকে রয়েছে সেগুলো কোনোমতে সংক্ষিপ্ত কলেবরে প্রকাশিত হচ্ছে। কাগজের অভাবে দেশটির শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় এখন পরীক্ষা নেয়াও বন্ধ। সব মিলিয়ে দেশটির সাধারণ নাগরিকদের স্বাভাবিক জীবনযাপনের পথ এখন পুরোপুরি রুদ্ধ। এরই মধ্যে মানুষকে বাস্তুচ্যুত করতেও শুরু করেছে শ্রীলংকার চলমান সংকট। জাফনা ও মান্নার উপদ্বীপ হয়ে শরণার্থী হিসেবে শ্রীলংকানরা ভারতে পালিয়ে যেতে শুরু করেছে।

বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের নাজুক পরিস্থিতি কাটাতে অনেক আগে থেকে ভারতের সঙ্গে কারেন্সি সোয়াপ করে আসছে শ্রীলংকা। ভারতের সঙ্গে শ্রীলংকার বিনিময়কৃত মুদ্রার পরিমাণ ৪০ কোটি ডলার। চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের নভেম্বর পর্যন্ত এ কারেন্সি সোয়াপের মেয়াদ রয়েছে। তবে শ্রীলংকা কারেন্সি সোয়াপের আওতায় সবচেয়ে বেশি ঋণ নিয়েছে চীনের কাছ থেকে। গত বছরের মার্চে চীনের সঙ্গে দেড় বিলিয়ন ডলার বা ১০ বিলিয়ন চাইনিজ ইয়েন সোয়াপ করার চুক্তি হয়। শ্রীলংকার ভৌত অবকাঠামো খাতে নির্মাণ ও উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ করেছে চীন। দেশটির মোট বৈদেশিক ঋণের ১০ শতাংশের জোগান এসেছে চীন থেকে।

রিজার্ভ সংকট কাটিয়ে উঠতে সম্প্রতি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) সঙ্গে আলোচনায় বসেছে শ্রীলংকান সরকার। আইএমএফের কাছ থেকে ঋণ পেতে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে দেশটি। গতকালও মুদ্রাবাজারে শ্রীলংকার মুদ্রায় ডলারের বিনিময় হার ছিল ২৯৫ রুপি করে। অথচ ২০১৮ সালের মাঝামাঝিতেও প্রতি ডলারের বিপরীতে হাতবদল হয়েছে ১৫৭ শ্রীলংকান রুপি।

আইএমএফ ছাড়াও বর্তমানে চীন ও ভারতের কাছে আরো ঋণের আবেদন করেছে শ্রীলংকা। জরুরি খাদ্য, ওষুধ ও জ্বালানি কেনার জন্য গত সপ্তাহেই শ্রীলংকাকে এক বিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে ভারত।

সূত্র:  বণিক বার্তা

Bootstrap Image Preview