Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৯ শনিবার, জানুয়ারী ২০২২ | ১৬ মাঘ ১৪২৮ | ঢাকা, ২৫ °সে

সাকরাইন উৎসবে মাদক সেবন ও ডিজে পার্টি ঘিরে আতঙ্ক

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:১৯ PM
আপডেট: ১৪ জানুয়ারী ২০২২, ০৭:১৯ PM

bdmorning Image Preview


হঠাৎ ব্যস্ত হয়ে পড়ে ফায়ার সার্ভিস ও জাতীয় জরুরিসেবা ৯৯৯-এর হটলাইন নম্বরগুলো। মাত্র ২০ মিনিটের ব্যবধানে অগ্নিকাণ্ড ঘটে দেশের ২০০ স্থানে। ভয়ঙ্কর আওয়াজে প্রকম্পিত আকাশ-বাতাস। যেন কামানের গোলা ছোড়া হচ্ছে। বারবার কেঁপে উঠছিল চার মাস বয়সের শিশু তানজীম উমায়ের। দ্রুত হাসপাতালের পথে দৌড়াচ্ছিলেন তানজীমের বাবা-মা। কিন্তু তানজীমকে বাঁচানো যায়নি। 

আতঙ্কের রাত কেটেছিল তানজীমের মতো এমন শত শত শিশু ও হূদরোগে আক্রান্ত বয়ষ্কদের। এটি কোনো যুদ্ধ কিংবা রাজনৈতিক সহিংসতার গল্প নয়, গত ৩১ ডিসেম্বর মধ্যরাতে ইংরেজি নববর্ষ উদযাপনের সময় ঘটে যায় এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাগুলো। দুই সপ্তাহের মাথায় আরো একটি আতঙ্কের রাত আজ। এবার নতুন শঙ্কা সাকরাইনকে ঘিরে। 

আজ ৩০ পৌষ পুরান ঢাকায় ঐতিহ্যবাহী পৌষসংক্রান্তির ‘সাকরাইন উৎসব’। দিনটি শিশুদের কাছে ‘ঘুরি উৎসব’ নামেও পরিচিত। বর্তমানে পুরান ঢাকায় সাকরাইন উৎসব সর্বজনীন ঢাকার উৎসবে রূপ নিয়েছে। সারা দিন ঘুড়ি উড়ানো, বাড়িঘর ছাদে জমকালো আলোকসজ্জা, আগুন নিয় খেলা, সন্ধ্যায় বর্ণিল আতশবাজি ও ফানুসে ছেয়ে যায় পুরান ঢাকার আকাশ। সাকরাইন উৎসব উপলক্ষে পুরান ঢাকার গলিতে গলিতে নানা রঙ-আকার-আকৃতির ঘুড়ি-নাটাইয়ের পসরা সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সাথে আছে নাটাই আর মাঞ্জা দেয়া সুতা। পৌষসংক্রান্তি উপলক্ষে প্রস্তুত পুরান ঢাকা। 

সূত্রাপুর, লক্ষ্মীবাজার, গেণ্ডারিয়া, সদরঘাট, তাঁতীবাজার, হাজারীবাগ, নবাবপুর এসব এলাকায় প্রতি বছরই ঘটা করে পালিত হয় এই উৎসব। প্রায় ২০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী এই উৎসবকে ঘিরে তৈরি হয়েছে আতঙ্ক। কারণ বর্তমানে উৎসবগুলোতে বিকট আওয়াজে আতশবাজি করা হয়। যা মারাত্মক শব্দদূষণ সৃষ্টি করে। পাশাপাশি উৎসবে উড়ানো ফানুস থেকে অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনা ঘটছে। বিকট শব্দে শঙ্কা তৈরি হচ্ছে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের। 

মানুষ ও জীববৈচিত্র্যের জন্য ক্ষতিকর হওয়ায় সাকরাইন উৎসবসহ সব ধরনের উৎসবে বাজি, শব্দ ও বায়ুদূষণকারী কার্যক্রম নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র-ক্যাপস। ইংরেজি নববর্ষবরণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানোকে কেন্দ্র করে দুর্ঘটনার ঘটনা তুলে ধরে গতকাল বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে দেয়া বিবৃতিতে ক্যাপস জানায়, বর্ষবরণের রাতে ক্যাপসের গবেষণায় অন্য সময়ের তুলনায় ৭৮ শতাংশ বেশি শব্দ ও ৩৩ শতাংশ বেশি বায়ুদূষণের তথ্য উঠে এসেছে। 

ক্যাপসের প্রধান এবং স্ট্যামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জমান মজুমদার বলেন, ‘সাকরাইন ঢাকার একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ঘুড়ি ওড়ানোর পাশাপাশি এই উৎসবে ফানুস ওড়ানো এবং আতশবাজিসহ শব্দ ও বায়ুদূষণকারী নানা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এটি দেশের প্রচলিত পরিবেশ সংরক্ষণ আইন এবং শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ বিধিমালায় সুস্পষ্ট অপরাধ হলেও দূষণ নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি।’ 

তিনি বলেন, ‘অযথা শব্দ ও বায়ুদূষণ করা আইনত নিষিদ্ধ থাকার পরও প্রশাসনের নীরব ভূমিকার কারণে গত ৩১ ডিসেম্বর থার্টিফাস্ট নাইট এবং বর্ষবরণে এটি অতিরিক্ত মাত্রায় পৌঁছেছে। যা উৎসবকে সন্ত্রাসের পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এতে ভীত হয়ে একটি শিশুর প্রাণ ঝরেছে, আগুনে সর্বস্ব হরিয়েছেন অনেকে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো— এসব দেখেও কিছুই না দেখার ভান করে আছে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের নীরবতার সুযোগে ক্রমশ বেড়েই চলেছে উৎসবের নামে শব্দসন্ত্রাস। গত পাঁচ বছর ধরে জাতীয় উৎসবকেন্দ্রিক শব্দ ও বায়ুদূষণ পর্যবেক্ষণ করে আসছে ক্যাপস। 

এতে নিশ্চুপ ভূমিকায় না থেকে সাকরাইন উৎসবের আগেই আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানো বন্ধের দাবি জানান বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র-ক্যাপসের প্রধান। একই সাথে অন্তত জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় বিয়ে অনুষ্ঠানসহ সব ধরনের উৎসবে আতশবাজি নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এর ক্রেতা ও বিক্রেতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানান এই বায়ুমান গবেষক। 

এর আগে ২০২১ সালে সাকরাইনে ডিজে পার্টি, আতশবাজি, ফানুস ও মাদক নিষিদ্ধের কার্যকর নীতিমালা চেয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছেন পুরান ঢাকার ৮৩ ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালা।

চিঠিতে পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বলেন, আগামী ১৪-১৫ জানুয়ারি পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় ‘সাকরাইন’ নামে একটি অনুষ্ঠান পালিত হতে যাচ্ছে। এ অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে শাঁখারিবাজার, তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর, লক্ষ্মীবাজার, সূত্রাপুর, গেণ্ডারিয়া, লালবাগসহ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকার বাড়ির ছাদে নানান আয়োজন হয়। এরমধ্যে আছে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা, ডিজে পার্টি, আতশবাজি, ফানুস ওড়ানো। এ বছরও একই ধরনের ও বড় পরিসরে এ উৎসব আয়োজন করা হবে বলে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বলেন, মূলত সাকরাইন নামের এ আয়োজনে ব্যাপক জনসমাগম ঘটে। এ সময় শুধু পুরান ঢাকার বাসিন্দারাই নয় বরং নতুন ঢাকার মানুষও পুরান ঢাকার ছাদগুলোতে ভিড় জমাতে থাকেন। অথচ করোনা মহামারিকালে যেকোনো ধরনের জনসমাগমের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। এ বছরও সাকরাইন উপলক্ষে হাজার হাজার ছাদে লাখ লাখ লোকের ভিড় তথা জনসমাগম ঘটার আশঙ্কা আছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি ডেকে আনতে পারে।

তারা আরো বলেন, সাকরাইনকে কেন্দ্র করে প্রতিটি বাড়ির ছাদ থেকে ফানুস ওড়ানো ও আতশবাজি পোড়ানো হয়। অথচ ডিএমপির পক্ষ থেকে ২০১৮ সালে ফানুস ওড়ানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া ‘বিস্ফোরক আইন, ১৮৮৪’ অনুসারে রঙিন আতশবাজি রাখা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। বলার অপেক্ষা রাখে না, ফানুস ও আতশবাজি থেকে ভয়াবহ ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটনার আশঙ্কা থাকে। সম্প্রতি থার্টি ফার্স্ট নাইট উপলক্ষে ওড়ানো ফানুস থেকে রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের একটি বহুতল ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে। ভবনটিতে প্রায় ৮০টির মতো পরিবার বসবাস করতো, অগ্নিকাণ্ডের খবর শুনে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে অনেকেই আহত হন। এছাড়া বিদ্যুতের তারে ফানুস আটকে থাকার ছবিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয়।

চিঠিতে আবেদনকারীরা বলেন, পুরান ঢাকা জনবসতিপূর্ণ ও ঘিঞ্জি এলাকা। ২০১৯ সালে চকবাজারের চুড়িহাট্টার ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ক্ষত এখনো শুকিয়ে যায়নি। ওই ঘটনার পর থেকে পুরান ঢাকায় বিভিন্ন দাহ্য পদার্থের গোডাউনের ওপর সরকার নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। পুরান ঢাকায় দাহ্য পদার্থ নিয়ে যেখানে এত সতর্কতা, সেখানে আতশবাজির মতো বিস্ফোরক পদার্থ ফুটলে তা অবশ্যই ভয়ানক বটে। যদি আতশবাজি ও ফানুস থেকে পুরান ঢাকায় কোনো অগ্নিকাণ্ড ঘটে, তবে একদিকে যেমন সরু গলিতে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে না পেরে বিপুল জানমালের ক্ষতি হবে, অন্যদিকে পুরান ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যেও পড়বে কালো ছায়া। ক্ষতিগ্রস্ত হবেন ব্যবসায়ীরা, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দেশের অর্থনীতি।

তারা বলেন, আতশবাজির পরিবেশগত বিরূপ প্রভাব বিদ্যমান। আতশবাজির কারণে বায়ুতে বিষাক্ত কণা ছড়িয়ে পড়ে, যার কারণে পাখিসহ বিভিন্ন প্রাণীর মৃত্যু ঘটে। এছাড়া বিস্ফোরকের উচ্চ ও ভীতিকর শব্দে অসুস্থ রোগীদের হৃদযন্ত্রজনিত রোগ বৃদ্ধি পায়।

ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা বলেন, সাইকরাইনকে কেন্দ্র করে মুখের মধ্যে কেরোসিন নিয়ে ‘আগুন খেলা’ নামে ভয়ঙ্কর খেলা প্রদর্শিত হয়, যা করতে গিয়ে অনেকের মুখ ঝলসে যাওয়ার ঘটনা ঘটে অহরহ। এছাড়া ঘুড়ি ওড়াতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটে। এ সময় ছাদগুলোতে বিকট শব্দে রাতভর গান বাজানো হয়, যা চারপাশের জনগণকে মারাত্মক বিরক্ত করে। অথচ এত উচ্চশব্দে গান বাজানো ‘শব্দদূষণ (নিয়ন্ত্রণ) বিধিমালা-২০০৬’ অনুসারে অপরাধ।

চিঠিতে সাকরাইন উপলক্ষে ডিএমপির কাছে পুরান ঢাকার ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালারা দুটি দাবি করেন, অনলাইন বা মাঠপর্যায়ে (দোকানে) যারা আতশবাজি বা ফানুস ক্রয়-বিক্রয় করছে তাদের গ্রেপ্তার করা এবং আইনত শাস্তির মুখোমুখি করা। কোনো বাড়ির ছাদে কোনো আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কাজ (ফানুস ওড়ানো, আতশবাজি, ডিজে পার্টি, জনসমাগম, মদ-গাঁজা-ইয়াবা সেবন, আগুন খেলা, উচ্চস্বরে গান বাজানো ইত্যাদি) সংঘটিত হলে তার দায় ওই বাড়ির বাড়িওয়ালার এবং এর জন্য ওই বাড়িওয়ালাকেই আইনের কাছে জবাবদিহি করতে হবে- এই মর্মে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা।

এদিকে সাকরাইনে বিকট শব্দের আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানোয় নিষেধাজ্ঞা জারি করা হবে বলে জানিয়েছেন ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আমরা সাকরাইন উৎসবে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ব্যবস্থা করছি। আর যেন এভাবে উদযাপন না করা হয় সে জন্য পুরান ঢাকার বিভিন্ন কমিউনিটির নেতাদের সাথে কথা বলব। 

তিনি বলেন, মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন। আমরা পুরান ঢাকার সর্দারদের নিয়ে বসে এ বিষয়ে কথা বলব, এগুলো বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছি। এর আগে গত মঙ্গলবার সাকরাইন তথা ঘুড়ি উৎসবে ডিজে পার্টি, আতশবাজি, ফানুস ও মাদক নিষিদ্ধের কার্যকর নীতিমালা চেয়ে ডিএমপি কমিশনার বরাবর চিঠি দেন পুরান ঢাকার ৮৩ জন ব্যবসায়ী ও বাড়িওয়ালা। 

ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তারা বলছেন, ঢাকা শহরের মতো ঘনবসতি এলাকায় ফানুস ওড়ানোর কারণে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি হতে পারে। থার্টিফার্স্ট নাইটে ওড়ানো ফানুসগুলো যদি রাজধানীর কোনো বস্তি এলাকায় পড়ত, তাহলে আরও ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনার সাক্ষী হতো দেশ। তাই উৎসবে ফানুস ওড়ানো বন্ধ চায় ফায়ার সার্ভিস। 

ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের ঢাকা জেলার উপ-পরিচালক দিলমনি শর্মা বলেন, ‘জনগণের স্বার্থে ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা উচিত। এবারের অবস্থা দেখে আমাদের মনে হয়েছে, নববর্ষের উদযাপন অনুষ্ঠানে ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা দরকার।’ অগ্নি ও দুর্যোগ বিশেষজ্ঞ মেজর এ কে এম শাকিল নেওয়াজ বলেন, ‘ফানুসের কারণে এক্সিডেন্টাল আগুন ধরে কলকারখানা, জনবসতি ও গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে। ফানুস ওড়ানো বন্ধ করা উচিত। তবে অনুমতি সাপেক্ষে এটি ওড়ানো যেতে পারে। কিন্তু তা কোনো জনবসতি, শহর কিংবা কলকারখানা এলাকায় নয়। সমুদ্রের তীরে এটি ওড়ানো যেতে পারে।’ 

তিনি বলেন, ‘পুলিশের মাধ্যমে এটি নির্দেশনা দেয়া যেতে পারে, যাতে ফানুস উড়িয়ে অনাকাঙ্ক্ষিত কেউ অগ্নিকাণ্ড না ঘটাতে পারে।

১৭৪০ সালের এই দিনে মোগল আমলে নায়েব-ই-নাজিম নওয়াজেশ মোহাম্মদ খানের আমলে ঘুড়ি উড়ানো হয়। সেই থেকে এই দিনটি কেন্দ্র করে বর্তমানে এটি একটি অন্যতম উৎসব ও আমেজের পরিণত হয়েছে। ধর্ম-বর্ণ ভেদাভেদ না রেখে সবাই এই উৎসব পালন করে থাকে। দিনব্যাপী নানা আয়োজনের মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করে পুরান ঢাকাইয়ারা।

সরেজমিন দেখা যায়, শাখারী বাজার, লক্ষ্মী বাজার, গেন্ডারিয়া এলাকায় ব্যস্ত সময় পার করছেন ঘুড়ি-নাটাই দোকানিরা। সাকরাইন উপলক্ষে বাজারে এসেছে রং-বেরঙের ঘুড়ি। অলি-গলিতে কিশোর-তরুণরা ছুটছে ঘুড়ির নাটাই আর সুতোর টানে। প্রতি বছরের মতো এবারো কয়েক লাখ ঘুড়ি বিক্রির আশা করছেন সেখানকার ব্যবসায়ীরা। দোকানগুলো সাজিয়ে রেখেছে নানা রঙের ঘুরি দিয়ে। এর মাঝে রয়েছে চিল ঘুড়ি, বাদুড় ঘুড়ি, ময়ূর, চাঁনতারা, চলনদার, পেটিদার, পাংদার,পাঞ্জাব, চোখদার, পানদার, কথাদার, মালাদার, পঙ্খিরাজ,  প্রজাপতি, দাপস, চিলসহ বিভিন্ন নকশা ও আকৃতির ঘুড়ি। আকার ও দাম ভেদে বিভিন্ন রঙের ঘুড়ি রয়েছে। সর্বনিম্ন ৫ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা দামের ঘুড়িও রয়েছে দোকানগুলোতে। 

শাঁখারী বাজারের দোকানদার রবিন হালদার বলেন, ‘আমরা সব সময়ই ঘুড়ি বিক্রি করি, প্রতিবছর এদিনটার দিকে তাকিয়ে থাকি। এসময় আমাদের ব্যবসা চলে। গত বছর করোনার কারণে ব্যবসা ভালো হয়নি; এবার আশা করছি ভালো ব্যবসা হবে। এবার বেচাকেনাও অনেক বেশি হচ্ছে।’

ঘুড়ি কিনতে স্বপন তালুকদার জানায়, ‘কাল সাকরাইন তাই আজ কেনাকাটা করতে আসছি। প্রতিবছর এদিনের অপেক্ষা করি আমরা। এদিনটি আমাদের খুবই ভালো লাগে।’ বাংলা ক্যালেন্ডারের নবম মাস পৌষের শেষ দিনটি পালিত হয়। আজ পুরান ঢাকার এলাকা গেন্ডারিয়া, সূত্রাপুর, দয়াগঞ্জ, নারিন্দা, ওয়ারী, মুরগিটোলা, কাগজিটোলা, ধূপখোলা মাঠ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, শাঁখারী বাজার, সদরঘাট, কোর্টকাচারী, তাঁতীবাজার, গোয়ালনগর, লক্ষ্মীবাজার ও লালবাগের আশপাশের এলাকাগুলোতে সাকরাইনের উৎসব পালিত হচ্ছে।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, প্রায় ৪০০ বছর ধরে ঢাকায় এ উৎসব হচ্ছে। ধারণা করা হয়, ১৭৪০ সনে নবাব নাজিম মুহাম্মদ খাঁ ঘুড়ি উৎসবের সূচনা করেন। অতীতে সাকরাইনে পুরান ঢাকায় শ্বশুরবাড়ি থেকে জামাইদের নাটাই, বাহারি ঘুড়ি উপহার দেয়া এবং পিঠার ডালা পাঠানো ছিলো অবশ্য পালনীয়। ডালা হিসেবে আসা ঘুড়ি, পিঠা আর অন্যান্য খাবার বিলি করা হতো আত্মীয়-স্বজন এবং পাড়া-প্রতিবেশীদের মাঝে। একটা নীরব প্রতিযোগিতা চলতো কার শ্বশুরবাড়ি হতে কত বড় ডালা এসেছে। আজ এই সব চমৎকার আচারগুলো বিলুপ্তির পথে। ঢাকার আদি বসবাসকারী সকল মানুষ আজও এই ঐতিহ্যগুলোর স্মৃতিকে স্মরণ করে।

দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে পৌষের বিদায়লগ্নে এই উৎসব পালনের রীতি চালু আছে। ভারতে মকরসংক্রান্তি, উত্তর ভারতীয় এ ঘুড়ি উৎসবটিকে স্থানীয়রাও ‘সাকরাইন’ নামে অভিহিত করে। এছাড়া নেপালে বলে মাঘি, থাইল্যান্ডে সংক্রান, মিয়ানমারে থিং ইয়ান, কম্বোডিয়ায় মহাসংক্রান নামে অভিহিত করেন। সেখানের মানুষ সুন্দর সুন্দর ঘুড়ির মাধ্যমে সূর্যদেবতার কাছে নিজেদের ইচ্ছা ও আকুতি প্রেরণ করেন।

এদিকে পুরান ঢাকার ঐতাহ্যবাহী সাকরাইন উৎসবে এবার নিষিদ্ধ থাকছে ফানুস ও দবে আতশবাজি। পৌষ মাসের শেষ দিন পৌষ সংক্রান্তির এ অনুষ্ঠান ঘিরে ইতোমধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের এ সংক্রান্ত নির্দেশনা দিয়েছে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি)।

আজ পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাকরাইন উৎসব উদযাপন করা হচ্ছে। ঘুড়ি ওড়ানো, আতশবাজি ও ফানুস ওড়ানোর মধ্য দিয়ে এ উৎসব উদযাপন করা হয়। তবে এ বছর থার্টিফার্স্টে ফানুস পড়ে ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অগ্নিকাণ্ড ঘটায় সাকরাইন উৎসব নিয়ে সতর্ক অবস্থানে যাচ্ছে পুলিশ। 

আতশবাজির বিকট শব্দে নগরবাসীর ভোগান্তির বিষয়টিও বিবেচনায় আনা হয়েছে। এ বিষয়ে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা সাকরাইন উৎসবে নিষেধাজ্ঞা দেয়ার ব্যবস্থা করছি। তারা যাতে এমন উদযাপন না করে সেজন্য পুরান ঢাকার বিভিন্ন কমিউনিটির নেতাদের সঙ্গেও কথা বলবো। মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে এ ধরনের কার্যক্রম বন্ধ করা কঠিন। কমিউনিটি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে এগুলো বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছি। এবার থার্টিফার্স্ট নাইটে ফানুস থেকে অনেকগুলো অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। মাত্র ২০ মিনিটের মধ্যে সারা দেশ থেকে প্রায় ২০০টি অগ্নিকাণ্ডের খবর আসে ফায়ার সার্ভিসের কাছে। কয়েকটি আগুন আতশবাজির কারণেও হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।

এছাড়া আতশবাজির বিকট শব্দে হূদরোগে আক্রান্ত তানজীম উমায়ের নামে চার মাস বয়সি এক শিশুর মৃত্যু হয়েছিল বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়। এ মৃত্যুর ঘটনায় ব্যাপক সমালোচনা সৃষ্টি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফানুস ওড়ানো ও আতশবাজি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে।

Bootstrap Image Preview