Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ০৮ সোমবার, আগষ্ট ২০২২ | ২৩ শ্রাবণ ১৪২৯ | ঢাকা, ২৫ °সে

নাচোলের রাণী; শুভ জন্মদিন

প্রথম বাঙালি মেয়ে যিনি ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন

অধরা ইয়াসমিন
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০১৮, ০৮:২১ PM
আপডেট: ১৮ জুলাই ২০২২, ০৩:৪৩ PM

bdmorning Image Preview


অধরা ইয়াসমিন ।। ‘সময়টা তখন ১৯৫০ সালের ৭ জানুয়ারি। সাঁওতাল বেশ ধারণ করে ভারতে যাওয়ার সময় সীমানা পার হওয়ার আগেই রোহনপুর রেলওয়ে স্টেশনে ধরা পড়ে যান। ধরে আনা হয় নাচোল স্টেশনে আর শুরু হয় পুলিশের অমানুষিক নির্যাতন। কারণ যেভাবেই হোক স্বীকার করাতে হবে পুলিশ কর্মকর্তা ও কনস্টেবল হত্যার অএছনে তার উন্ধন ও পরিকল্পনা রয়েছে। টানা চার দিন প্রচন্ড অত্যাচারের পর নাচোল স্টেশন থেকে তাকে নবাবগঞ্জ পুলিশ স্টেশনে নিয়ে আসা হয়। গায়ে অসহনীয় জ্বরের সাথে শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্ত ঝরছিল তার। তবুও নির্যাতন থেমে থাকেনি। চলেছে শরীরের নাজুক অংশে বুটের আঘাত, অনাহারে রাখা, পায়ের গোড়ালি দিয়ে লোহার পেরেক ঢুকানোর মতো অমানসিক অত্যাচার। কিন্তু আশ্চর্য্যের বিষয় এই যে এতোসব অত্যাচারের পরেও আর স্বীকারোক্তি আদায় করতে পারেনি।‘

বলছিলাম বাংলার কৃষকের রানিমা ও তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী ইলা মিত্রের কথা।

জন্ম, শৈশব ও পড়াশোনা

বাংলার শোষিত ও বঞ্চিত কৃষকের অধিকার আদায়ে এগিয়ে আসা এই নারী ১৯২৫ সালের আজকের দিনে (১৮ অক্টোবর) জন্মগ্রহণ করেন কলকাতায়। জন্মের পর নাম রাখা হয় ইলা সেন। বাবা নগেন্দ্রনাথ সেন ছিলেন ব্রিটিশ সরকারের অধীনে বাংলার অ্যাকাউন্ট্যান্ট জেনারেল। মা মনোরমা সেন গৃহিণী। তাদের আদি নিবাস ছিল তৎকালীন যশোরের ঝিনাইদহের বাগুটিয়া গ্রামে। ঝিনাইদহের শৈলকুপা শহর থেকে পূর্ব দক্ষিণে ১৩ কিলোমিটার দূরের গ্রাম বাগুটিয়া। গ্রামের একপ্রান্তে কাঁচা রাস্তার পাশে চুন-সুড়কি দিয়ে গাঁথা ৯ রুমের পুরাতন একটি দ্বিতল বাড়ি। অধিকাংশ মানুষ জানে না বাড়িটির ইতিহাস। বাড়িটি এক সংগ্রামী মানুষের-এটুকু জানে গ্রামবাসী। সংগ্রামী মানুষটি হচ্ছেন তেভাগা আন্দোলনের নেত্রী, নাচোলের রানী ইলা মিত্র তা অনেকেরই অজানা।

কলকাতার বেথুন স্কুল ও কলেজের পর কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে এমএ ডিগ্রি লাভ করেন ইলা মিত্র।

পড়াশোনার পাশাপাশি পারদর্শী ছিলেন খেলাধুলাতেও। ১৯৩৫ সাল থেকে ১৯৩৮ সাল পর্যন্ত তিনি ছিলেন রাজ্য জুনিয়র অ্যাথলেটিক্সে চ্যাম্পিয়ন। সাঁতার, বাস্কেটবল ও ব্যাডমিন্ট খেলায়ও ছিলেন পারদর্শী। তাছাড়া আরো একোটি তথ্য রয়েছে যা আপনাদের আরো খানিক তাক লাগিয়ে দিবে। আর তা হলো, ইলা মিত্রই প্রথম বাঙালি মেয়ে যিনি ১৯৪০ সালে জাপানে অনুষ্ঠিতব্য অলিম্পিকের জন্য নির্বাচিত হন। যুদ্ধের জন্য অলিম্পিক বাতিল হয়ে যাওয়ায় তার অংশগ্রহণ করা হয়নি। খেলাধুলা ছাড়াও গান, অভিনয়সহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডেও সমানভাবে পারদর্শী ছিলেন এই উদ্যমী নারী।

বিবাহ ও কর্মজীবন

ইলা মিত্রের জন্ম কলকাতায় হলেও ছোটবেলায় তিনি বেশ কয়েকবার বাগুটিয়া গ্রামে এসেছেন। ১৯৪৫ সালে চাঁপাইনবাবগঞ্জের রামচন্দ্রপুরের জমিদার বাড়ির রমেন্দ্রনাথ মিত্রের সঙ্গে ইলা সেনের বিয়ে হয়। বিয়ের পর বেথুনের তুখোর ছাত্রী ইলা সেন হলেন জমিদার পূত্রবধু ইলা মিত্র। কলকাতা ছেড়ে চলে এলেন শশুরবাড়ি রামচন্দ্রপুর হাটে। হিন্দু রক্ষণশীল জমিদার পরিবারের নিয়মানুসারে অন্দরমহলেই থাকতেন ইলা মিত্র। তখনও তিনি মা হননি তাই হাতে অফুরন্ত অবসর। এই বন্দী জীবনে মুক্তির স্বাদ নিয়ে এলো গ্রামবাসীর একটি প্রস্তাব।

স্বামীর সাথে ইলা মিত্র

রমেন্দ্র মিত্রের বন্ধু আলতাফ মিয়ার পৃষ্ঠপোষকতায় বাড়ির কাছেই কৃষ্ণগোবিন্দপুর হাটে মেয়েদের জন্য একটি স্কুল খোলা হলো। গ্রামের সবাই দাবি জানালেন তাঁদের নিরক্ষর মেয়েদের লেখাপড়া শেখাবার দায়িত্ব নিতে হবে বধুমাতা ইলা মিত্রকে। বাড়ি থেকে অণুমতিও মিললো কিন্তু বাড়ির চার'শ গজ দুরের স্কুলে যেতে হয় গরুর গাড়ি চরে। মাত্র তিনজন ছাত্রী নিয়ে স্কুলটি শুরু হলেও ইলা মিত্রের আন্তরিক পরিচালনায় তিনমাসের মধ্যে ছাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায। আর এর মধ্যে তিনি হেঁটে স্কুলে যাওয়ার অণুমতি লাভ করতেও সক্ষম হন। সংগ্রামী নেত্রী এভাবেই অন্দর মহল থেকে বের হয়ে এসে আবার নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেন বৃহত্তর সমাজ সেবার কাজে। হয়ে ওঠেন এলাকার রানীমা। এ সময়ে তিনি স্বামী রমেন্দ্র মিত্রের কাছে জমিদার ও জোতদারের হাতে বাংলার চাষীদের নিদারুণ বঞ্চনা শোষণের কাহিনী শোনেন। আরো শোনেন এই শোষণের বিরুদ্ধে তাঁদের আন্দোলনের প্রচেষ্টার কথা। কমিউনিস্ট রামেন্দ্র মিত্র এর আগেই জমিদারি প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নিজের পারিবারিক ঐতিহ্য ও মোহ ত্যাগ করে কৃষকের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। রমেন্দ্র মিত্র, ইলা মিত্রকে তাঁদের কাজে যোগ দিতে উৎসাহিত করেন। ছাত্রী জীবনেই ইলা মিত্র কমিউনিস্ট আদর্শের সংস্পর্শে এসেছিলেন, তাই স্বামীর আদর্শ ও পথ চলার সাথে সহজেই নিজেকে যুক্ত করতে পেরেছিলেন। ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর নবাবগঞ্জ অঞ্চলে তেভাগা আন্দোলনে নেতৃত্ব দান করেন ইলা মিত্র।

তেভাগা আন্দোলনে যোগদান ও নেতৃত্ব

১৯৪০ সালে ফজলুল হক মন্ত্রিসভার উদ্যোগে বাংলার ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারের প্রস্তাব দেয় ফাউন্ড কমিশন। এ কমিশনের সুপারিশ ছিল জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ করে চাষিদের সরাসরি সরকারের প্রজা করা এবং তাদের উৎপাদিত ফসলের তিন ভাগের দুই ভাগের মালিকানা প্রদান করা। এ সুপারিশ বাস্তবায়নের আন্দোলনের জন্য কৃষক সমাজ ঐক্যবদ্ধ হতে থাকে। এ ছাড়া জনসাধারণের কাছ থেকে হাটের তোলা ও লেখাইসহ নানা কর আদায় করা হতো। এসব বন্ধের জন্য আন্দোলন জোরদার হয়। চল্লিশের দশকে এসব আন্দোলনে ইলা মিত্রকে নেতৃত্ব দিতে দেখা যায়।

১৯৪২ সালে যুদ্ধের পরবর্তী সময়ে বাংলায় দেখা দেয় দুর্ভিক্ষ। এ দুর্ভিক্ষের সময় কৃষকের ওপর শোষণের মাত্রা ভয়াবহ রূপ ধারণ করে। এ সময়কার অর্থনৈতিক দুরবস্থা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার ফলে মরিয়া হয়ে ওঠে শোষিত কৃষকরা। তিন ভাগের দুই ভাগ ফসল কৃষকের এ দাবি নিয়ে বেগবান হয় তেভাগা আন্দোলন। ১৯৪৬-৪৭ সালে দিনাজপুরে কমরেড হাজি দানেশের প্রচেষ্টায় সূচিত হয় এক যুগান্তকারী তেভাগা আন্দোলন। কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সমিতি প্রান্তিক চাষিদের সংগঠিত করে আন্দোলনকে জোরদার করতে থাকে। পার্টি থেকে রমেন্দ্র মিত্রকে গ্রামের কৃষক সমাজের মধ্যে কাজ করার দায়িত্ব দিয়ে কলকাতা থেকে নিজ গ্রাম রামচন্দ্রপুর হাটে পাঠালে স্বামীর সঙ্গে ইলা মিত্র সরাসরি মাঠ পর্যায়ে কৃষক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হন।
১৯৪৬ সালে হিন্দু মুসলিম দাঙ্গা শুরু হলে কমিউনিস্ট পার্টি দাঙ্গা বিধ্বস্ত এলাকায় সেবা ও পুনর্বাসনের কাজ করতে এগিয়ে আসে। এ সময় ইলা মিত্র নোয়াখালীর দাঙ্গা বিধস্ত গ্রাম হাসনাবাদে পুনর্বাসনের কাজে চলে যান। তখন নোয়াখালীতে মহাত্মা গান্ধী সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার বিরুদ্ধে জনগণকে সংগঠিত করছিলেন। ইলা মিত্রের এ সাহসী পদক্ষেপ সে সময় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভাগের পর মিত্র পরিবারের জমিদারি অঞ্চল রামচন্দ্রপুর হাট পূর্ব পাকিস্তানের রাজশাহী জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। পূর্ব পাকিস্তানের বেশিরভাগ হিন্দু পরিবার সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ভারতে চলে যায়। কিন্তু ইলা মিত্রের শাশুড়ি এখানেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। ফলে ইলা মিত্র ও রমেন্দ্র মিত্র পূর্ব-পাকিস্তানেই রয়ে গেলেন। পাকিস্তান হওয়ার পরও তেভাগা আন্দোলন অব্যাহত থাকে। পূর্ব-পাকিস্তানের অনেক স্থানে কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র আন্দোলন হয়। মুসলিম লীগ সরকার পূর্ব পাকিস্তানে ক্ষমতাসীন হলে তারা কঠোর হাতে এ আন্দোলন দমন করে। কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। পার্টির শীর্ষ স্থানীয় হিন্দু নেতাদের প্রায় সবাইকেই দেশ ছাড়া করা হয়। সরকারের এ দমন নীতির ফলে কমিউনিস্ট ও কৃষক আন্দোলনের নেতারা আত্মগোপন করে কাজ করতে থাকেন। ইলা মিত্র ও রমেন্দ্র মিত্রও নাচোলের চণ্ডীপুর গ্রামে আত্মগোপন করেন।

স্বীকৃতি ও সম্মাননা

হিরোশিমার মেয়ে বইটির জন্য তিনি 'সোভিয়েত ল্যান্ড নেহেরু' পুরষ্কার লাভ করেন। এ্যাথলেটিক অবদানের জন্য পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া ভারত সরকার তাঁকে স্বাধীনতা সংগ্রামী হিসেবে স্বতন্ত্র সৈনিক সম্মানে "তাম্রপত্র পদক" এ ভূষিত করে সম্মানিত করে। কবি গোলাম কুদ্দুস তাকে নিয়ে 'ইলা মিত্র' কবিতায় লেখেন "ইলা মিত্র স্তালিন নন্দিনী, ইলা মিত্র ফুচিকের বোন"।

সংগ্রামী ও মানবতাবাদী আর বঞ্চিত মানুষের প্রতিনিধির নাম ইলা মিত্র। সাধারণ মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য স্বেচ্ছায় জীবনের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়েছেন। ভোগ করেছেন অমানুষিক নির্যাতন। তবু জীবনের শেষ পর্যন্ত আদর্শের লড়াই থেকে একবিন্দুও বিচ্যুত হননি। ঐতিহাসিক তেভাগা আন্দোলন ও নাচোল বিদ্রোহের নেতৃত্বদানকারী এ মহীয়সী নারী ৭৭ বছর বয়সে ২০০২ সালের ১৩ অক্টোবর মৃত্যুবরণ করেন।

ছবি- উইকিপিডিয়া 

Bootstrap Image Preview