Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৯ শনিবার, জানুয়ারী ২০২২ | ১৬ মাঘ ১৪২৮ | ঢাকা, ২৫ °সে

সপ্তাহখানেক ধরে ত্রিপুরায় চলছে মুসলিমবিরোধী সহিংসতা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ৩১ অক্টোবর ২০২১, ০২:২৭ PM
আপডেট: ৩১ অক্টোবর ২০২১, ০২:২৭ PM

bdmorning Image Preview
ছবি সংগৃহীত


এক সপ্তাহের বেশি সময় ধরে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, দোকানপাট, মসজিদে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলেও উত্তেজনা রয়েছে এবং মাঝেমধ্যেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে সংঘাত বাধছে বলে একটি মানবাধিকার সংগঠনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

মানবাধিকার সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রটেকশন অব সিভিল রাইটসের (এপিসিআর) সদস্য নুরুল ইসলাম বড়ভূঁইয়া জানান, তাঁরা বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে দেখে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করছেন।

নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সব তথ্য হাতে পাওয়ার পরেই আমরা পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ করতে পারব। তবে প্রাথমিক অনুসন্ধানে এটা বুঝেছি, অন্তত তিনটি মসজিদে আগুন লাগানো হয়েছে। গোটা দশেক মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।’ ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদগুলোর মধ্যে উনকোটি ও সিপাহীজলা জেলায় একটি করে মসজিদ রয়েছে বলে জানান তিনি।

পানিসাগর শহরের একটি মসজিদে অগ্নিসংযোগের খবরকে ‘ভুয়া’ বলেছে পুলিশ। ত্রিপুরা পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল (আইনশৃঙ্খলা) সৌরভ ত্রিবেদী কয়েক দিন আগে বলেন, দেশবিরোধী দুষ্কৃতকারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য প্রকাশ করছে। পানিসাগর নিয়ে যে ভিডিও ও ছবি প্রকাশ করা হয়েছে, তার সঙ্গে পানিসাগরের ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। কোনো মসজিদে আগুন লাগানো হয়নি।

পুলিশের এই বক্তব্যকে সঠিক বলেছেন উনকোটি জেলার একজন স্কুলশিক্ষক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশ, প্রচারমাধ্যম ও হিন্দু সংগঠনের তরফে বারবার বলা হচ্ছে, পানিসাগরের ঘটনাটি নিয়ে ভুল তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক যে বেশ কিছু মসজিদ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু তা নিয়ে কোনো খবর প্রকাশ করা হচ্ছে না।

পরিস্থিতিকে ‘অত্যন্ত উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেন ওই শিক্ষক। তিনি বলেন, এই মুহূর্তে কৈলাসহর থানার উল্টো দিকে মুসলিম সমাজের ২০০-২৫০ মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছেন। কারণ, একটু আগে স্থানীয় স্কুলে সংঘাত হয়েছে। রোজই কোথাও না কোথাও সংঘাত হচ্ছে। বাড়িঘর, দোকানপাট পুড়ছে। কিন্তু পত্রপত্রিকায় কোথাও কোনো সংবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর আক্রমণের জেরে ত্রিপুরায় হিন্দুত্ববাদী সংগঠনসহ সব দলই রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ মিছিল করছিল। সেই মিছিল থেকে দোকানপাট, বাড়িঘর ইত্যাদির ওপরে হামলা চালানো হয়, মসজিদেও ভাঙচুর করা হয় বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের ভাষ্য। তাঁদের তথ্য অনুযায়ী, এই সময় প্রশাসন হামলাকারীদের থামায়নি, ফলে আক্রমণের তীব্রতা বেড়েছে। এই সংঘাতে এখন পর্যন্ত কারও প্রাণহানি হয়নি বলে তাঁরা জানিয়েছেন।

বাম-মনস্ক পর্যবেক্ষকদের একাংশের বক্তব্য, বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপরে আক্রমণের ঘটনায় ত্রিপুরায় যেভাবে প্রতিবাদ হয়েছে, তার অংশবিশেষ প্রতিবাদও এখন এই রাজ্যে হচ্ছে না। ত্রিপুরার মহারাজা প্রদ্যুৎ মানিক্য দেববর্মন বলেছেন, ত্রিপুরায় কী ঘটছে, তা জানতে মানুষ গভীরে গিয়ে কিছু দেখছে না। কংগ্রেস ও কমিউনিস্ট দুই পক্ষই এখন চুপ করে রয়েছে।

এর কারণ হিসেবে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনের কথা বলছেন বিশেষজ্ঞরা। ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন অধ্যাপক বলেন, সব দলই ভয় পাচ্ছে রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করতে। কারণ, ত্রিপুরায় মুসলমান জনসংখ্যা ও ভোট ১০ শতাংশের নিচে। সংখ্যালঘুদের হয়ে কথা বললে সংখ্যাগুরু অর্থাৎ হিন্দুদের ভোট বিপক্ষে চলে যাবে, যা ৯০ শতাংশের বেশি। ফলে সবাই চুপ। এর মধ্যে তৃণমূল কংগ্রেসও রয়েছে, যারা এত দিন এখানে বিরাট বিজেপিবিরোধী আন্দোলন করার চেষ্টা করছিল।

ত্রিপুরা কংগ্রেসের সভাপতি বদরুজ্জামান এই ঘটনাকে হিন্দু-মুসলমান মেরুকরণের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে দেখছেন। কোথায় ও কীভাবে মুসলমানদের ওপরে আক্রমণ হয়েছে, তা নিয়ে একটি বিস্তৃত হিসাব দিয়েছেন তিনি। অন্তত ৩০০ মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে কৈলাসহরের উত্তর অংশে আশ্রয় নিয়েছে বলে বদরুজ্জামান জানিয়েছেন।

ত্রিপুরা বাংলাদেশের তিন দিক দিয়ে ঘেরা এবং পার্শ্ববর্তী রাজ্য আসামের সাথে একটি পাতলা করিডোর দ্বারা সংযুক্ত। ২৫ বছরের কমিউনিস্ট শাসনের পর ২০১৮ সাল থেকে রাজ্যটি ভারতের ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) পরিচালনা করছে। গত চার দিনে উত্তর ত্রিপুরা জেলা থেকে ১০টিরও বেশি ধর্মীয় সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। সীমান্তবর্তী শহর পানিসাগরে মঙ্গলবার রাতের সহিংসতার পরে কর্তৃপক্ষ বড় জমায়েতের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল যেখানে একটি মসজিদ এবং মুসলমানদের কয়েকটি দোকান ভাঙচুর করা হয়। কট্টরপন্থী হিন্দু সংগঠন, বিজেপির ঘনিষ্ঠ মিত্র বিশ্ব হিন্দু পরিষদ (ভিএইচপি)-এর একটি সমাবেশ থেকে এ হামলা হয় পানিসাগরের একজন সিনিয়র পুলিশ আধিকারিক সৌভিক দে বলেন, প্রায় সাড়ে ৩ হাজার লোক সমাবেশে অংশ নিয়েছিল। দে বলেন, ‘র‌্যালিতে অংশগ্রহণকারী কিছু ভিএইচপি কর্মী চামটিলা এলাকায় একটি মসজিদ ভাংচুর করে। পরে, প্রথম ঘটনার থেকে প্রায় ৮০০ গজ দূরে রোয়া বাজার এলাকায় তিনটি বাড়ি ও তিনটি দোকান ভাংচুর করা হয় এবং দুটি দোকানে আগুন দেওয়া হয়’।

পুলিশ জানিয়েছে, ভাংচুর করা দোকান এবং বাড়িগুলো মুসলমানদের এবং তাদের একজনের অভিযোগের ভিত্তিতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। আরেকটি কট্টরপন্থী হিন্দু গোষ্ঠী বজরং দলের স্থানীয় নেতা নারায়ণ দাস দাবি করেছেন, মসজিদের সামনে কিছু যুবক তাদের গালাগাল করেছে এবং তলোয়ার ছুঁড়েছে। এটি এমন অভিযোগ যা স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায় না। ত্রিপুরা পুলিশ টুইট করেছে যে, ‘কিছু লোক গুজব ছড়াচ্ছে এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে উস্কানিমূলক বার্তা প্রচার করছে’ এবং মানুষকে শান্তি বজায় রাখার জন্য আবেদন করেছে।

গত সপ্তাহে মুসলিম সংগঠন জমিয়ত উলামা-ই-হিন্দের রাজ্য ইউনিট অভিযোগ করেছিল যে, জনতা মুসলিম অধ্যুষিত মসজিদ এবং আশেপাশের এলাকায় আক্রমণ করেছে। ত্রিপুরা পুলিশ জানিয়েছে যে, তারা রাজ্যের ১৫০টিরও বেশি মসজিদের নিরাপত্তা দিচ্ছে। ত্রিপুরার ৪২ লাখ জনসংখ্যার ৯ শতাংশেরও কম মুসলিম।

ত্রিপুরা-ভিত্তিক লেখক বিকাশ চৌধুরী বলেছেন, ‘যদিও ত্রিপুরার জনসংখ্যার একটি সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ এখনকার বাংলাদেশ থেকে হিন্দু উদ্বাস্তু, তবে প্রতিবেশী দেশে পূর্ববর্তী ধর্মীয় বিশৃঙ্খলার পর এখানে মুসলমানদের বিরুদ্ধে কখনো কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি’। বিরোধী দলগুলো মুসলিমদের ওপর হামলার জন্য বিজেপির ঘনিষ্ঠ ‘রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ফ্রেঞ্জ এলিমেন্টস’কে দায়ী করেছে। আঞ্চলিক তৃণমূল কংগ্রেস দলের একজন সাংসদ সুস্মিতা দেব বিবিসিকে বলেছেন যে, বিজেপি বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সহিংসতাকে নভেম্বরে রাজ্যের পৌর নির্বাচনের আগে ভোটারদের ‘মেরুকরণ’ করতে ব্যবহারের চেষ্টা করছে। ত্রিপুরার সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী রতনলাল নাথকে ফোন করলেও সাড়া মেলেনি। কিন্তু একজন বিজেপি নেতা নাম না প্রকাশের শর্তে, কারণ তিনি মিডিয়ার সাথে কথা বলার জন্য অনুমোদিত নন, বিবিসিকে বলেছেন যে, বিরোধীদের ‘বাংলাদেশে হিন্দুদের ওপর ব্যাপক হামলার প্রতিক্রিয়া হিসাবে কয়েকটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা থেকে রাজনৈতিক পুঁজি করার চেষ্টা উচিত নয়’। তিনি দাবি করেছেন যে, ‘রাজ্য সরকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে যা করা দরকার তা করেছে’।

এদিকে, গুরগাঁওয়ে গত সপ্তাহেও নামাজ চলাকালীন একদল কট্টরপন্থী হিন্দুকে ‘জয় শ্রীরাম’ েস্লাগান দিতে দেখা গিয়েছিল। চলতি সপ্তাহে ফের নামাজে বিঘ্ন ঘটানোর ঘটনায় নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। ইতিমধ্যেই সেখানে মোতায়েন করা হয়েছে প্রচুর পরিমাণে পুলিশ। আপাতত পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে বলেই জানিয়েছেন গুরগাঁওয়ের পুলিশ কর্মকর্তা। জানা গিয়েছে, গুরগাঁওয়ের সেক্টর ৪৭ এলাকায় এক মসজিদে নামাজ চলাকালীন সেখানে হাজির হয় কট্টর হিন্দুত্ববাদীরা। তাদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড। তাতে লেখা ছিল ‘গুরগাঁও প্রশাসন ঘুম থেকে জেগে ওঠো।’ পরিস্থিতি সম্পর্কে বলতে গিয়ে গুরগাঁওয়ের এসডিএম অনীতা চৌধুরী এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘এখন এই এলাকা শান্তিপূর্ণই রয়েছে। যারা নামাজে বাধা সৃষ্টি করছিল তাদের আটক করা হয়েছে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই তাদের সম্পর্কে খবর আসছিল। অবশেষে আজ পদক্ষেপ নেয়া সম্ভব হল।’

ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভের ভিডিও ফুটেজ। সেখানে দেখা গিয়েছে তাদের ‘বন্ধ করো, বন্ধ করো’ সেøাগান দিতে। তাদের হাতে ছিল নানা রকম পোস্টার ও প্ল্যাকার্ড। অধিকাংশেরই মুখে মাস্ক পরা ছিল না। আরেকটি ভিডিওতে দেখা গিয়েছে, ঘটনাস্থলে হাজির হয়েছেন পুলিশকর্মীরা। কট্টরপন্থীদের ঠেকাতে পুলিশ ব্যারিকেড তৈরি করা হয়েছে। এই নিয়ে টানা তিন সপ্তাহ ওই এলাকায় নামাজ পড়ার সময় এই ধরনের ঘটনা ঘটল। গত সপ্তাহে সেক্টর ১২-এ অঞ্চলে কট্টরপন্থীদের ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিতে দেখা গিয়েছে। গত তিন বছর ধরে নামাজ পড়তে আসা এক ব্যক্তির দাবি, কয়েক সপ্তাহ ধরেই এমন হচ্ছে। আসলে এখানে অশান্তি সৃষ্টি করতে চাইছে কিছু মানুষ।

সূত্র: প্রথম আলো, ডন, বিবিসি নিউজ।

Bootstrap Image Preview