Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ০১ বুধবার, ডিসেম্বার ২০২১ | ১৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৮ | ঢাকা, ২৫ °সে

লোকজনের চোখে-মুখে আতঙ্ক : চারদিকে পোড়া গন্ধ আর বিলাপ

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৮ PM
আপডেট: ১৮ অক্টোবর ২০২১, ১২:৪৮ PM

bdmorning Image Preview


রংপুরের পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুর কসবা গ্রামের হিন্দু অধ্যুষিত উত্তরপাড়ায় রোববার রাতে ঘটেছিলো বিভীষিকাময় পরিস্থিতি।  রাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা ধরে চলা হামলায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে এলাকাটি। এই গ্রামের দক্ষিণপাড়াটি অবশ্য রক্ষা পেয়েছে পুলিশি প্রতিরোধের কারণে।

জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) বিপ্লব কুমার সরকার জানান, হামলায় জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করতে অভিযান শুরু করা হয়েছে। সোমবার সকাল ১০টা পর্যন্ত আটক হয়েছে ৪০ জন।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, গ্রামের উত্তরপাড়ার অন্তত ২৩ বাড়িতে ভাঙচুর ও আগুন দেয়া হয়েছে। অনেক বাড়ির সামনে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ভাঙা আসবাব, লোকজনের চোখে-মুখে আতঙ্ক আর ক্ষোভ। চারদিকে পোড়া গন্ধ আর বিলাপ।

গ্রামজুড়ে টহল দিচ্ছে পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি। নিরাপত্তা তদারকিতে আছেন জেলা পুলিশ সুপার (এসপি) বিপ্লব কুমার সরকার।

ক্ষতিগ্রস্ত বাড়ির সামনে শূন্য দৃষ্টিতে বসে থাকা নন্দ রানী বলেন, ‘গাড়ি পুড়ি ফেলাইছে, গরু নিয়ে গেছে, চাউল-ডাউল, ট্যাকা-পয়সা সব নিয়ে গেছে, সোনা আছলো এক ভরি- তাকো নিয়ে গেছে। হামরা এখন কী করি খামো বাবা, কী করি খামো।’

ক্ষতিগ্রস্ত আরেক বাড়ির কিরোন বালা বলেন, ‘এই দ্যাশোত থাকার চাইয়ে মরি যাওয়াই ভালো। ভয়ে রাইতোত পালাইয়ে ছিলাম। পরে পুলিশ আসি কয় তোমরা পলাইচেন ক্যান। আইজ আইচচি, আসি দেখি কিচ্চু নাই। সোনা বানা সোহ নিচে।’

(এই দেশে থাকার চেয়ে মরাই ভালো। ভয়ে রাতে পালায় ছিলাম। পরে পুলিশ এসে বলে তোমরা পালাও কেন। এখন এসেছি, দেখি কিছু নাই। সোনা-দানা নিয়ে গেছে।)

বিকাল বাবু নামের একজন জানান, হামলাকারীরা বাড়িঘরে আগুন দিতে শুরু করলে তিনি শিশুসন্তানকে নিয়ে পাশের ক্ষেতে লুকিয়ে ছিলেন।

তিনি বলেন, ‘যেলা আগুন নাগি দিচে, তখন আমি বাচ্চাক নিয়ে ঘাস বাড়ি যায়া নুকাইচিনুং। বাড়ির সোগ টাকা-পইসে নিচে, এখন ছৈলক বিস্কুট কাওয়ামো তার টাকা-পয়সা নাই।’

(যখন আগুন দেয়, তখন আমি বাচ্চা নিয়ে ঘাসের জমিতে লুকিয়ে ছিলাম। বাড়ির সব টাকা-পয়সা নিয়ে গেছে। বাচ্চাকে বিস্কুট কিনে খাওয়ানোর মতো টাকাও নেই।)

এসপি ও গ্রামবাসী জানায়, গ্রামের দক্ষিণপাড়ায় হিন্দু ধর্মাবলম্বী ১৫ বছরের এক কিশোর রোববার বিকেলে ফেসবুকে কোনো একটি পোস্টে আপত্তিকর একটি কমেন্ট করে।

মুহূর্তে এর স্ক্রিনশট আশপাশের গ্রামের মুসল্লিদের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে একদল লোক ওই কিশোরের গ্রামে উপস্থিত হয়।

পুলিশ জানায়, তারা খবর পাওয়ামাত্র সন্ধ্যায় ঘটনাস্থলে গিয়ে বিক্ষুব্ধ লোকজনকে বুঝিয়ে ফেরত পাঠায়। তবে এর দুই ঘণ্টা পর শুরু হয় আকস্মিক হামলা।

গ্রামবাসী জানায়, রাত সাড়ে ৮টার দিকে কয়েক শ লোক লাঠিসোঁটা নিয়ে দক্ষিণপাড়া থেকে কিছুটা দূরে ক্ষেতের ওপারে স্থানীয় মসজিদে জড়ো হয়। পরে রাশেদ নামের এক ব্যক্তির নেতৃত্বে তারা গ্রামের উত্তরপাড়ায় প্রবেশ করে ধ্বংসযজ্ঞ শুরু করে।

হামলাকারীরা বাড়িঘরে ভাঙচুর ও আগুন দিতে থাকে। দুটি মন্দিরও ভাঙচুর করা হয়। লুট করা হয় স্বর্ণালংকার, টাকাসহ দরিদ্র পরিবারের নানা জিনিসপত্র। রাত ১১টা পর্যন্ত চলে এ অবস্থা। ফায়ার সার্ভিসের পাঁচটি ইউনিট গিয়ে আগুন নেভায়।

ক্ষতিগ্রস্তরা বলছেন, গায়ের কাপড় ছাড়া তাদের আর কিছু অক্ষত নেই। ওই পাড়ার অর্ধশত পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তাদের অনেকে আছে খোলা আকাশের নিচে।

নারায়ণ চন্দ্র নামের একজন বলেন, ‘আমি বইনের (বোন) বাড়িতে আসছি। রাইতে খেয়ে বসে আছি। হুনতেছি (শুনছি) ওই গ্রামে একজন ফেসবুকে কী লিখছে, পুলিশ আসছে। আমরা শুনতেছি। এর কিছুক্ষণ পর হৈ দিয়ে মানুষ আসলো। ভাঙচুর আর আগুন দেয়া শুরু করল। ভয়ে ভাগনেকে নিয়ে পালায়ে গেছি। পরে ওমরা (হামলাকারীরা) যাবার পর বাড়ি আসি।’

পুলিশ মোতায়েনের পরও কীভাবে এত বড় হামলা হলো জানতে চাইলে এসপি বিপ্লব কুমার সরকার জানান, যে কিশোরকে ঘিরে ঘটনার শুরু, তার বাড়ি গ্রামের দক্ষিণপাড়ায়। সন্ধ্যার পর থেকে মূলত ওই পাড়ায়ই থানা পুলিশ মোতায়েন ছিল।

এসপি বলেন, ‘সন্ধ্যা থেকেই ওই কিশোরের বাড়ির আশপাশে থানা পুলিশের সদস্যরা মোতায়েন ছিলেন। সেখানে পুলিশ ক্ষুব্ধ মানুষজনকে বোঝাতে চেষ্টা করে। ওই কিশোরকে আইনের আওতায় আনা হবে বলা হলে তারা শান্ত হয়ে চলে যায়। সে সময় পুলিশ দক্ষিণপাড়ায় অবস্থান করছিল।

‘তবে রাতে উত্তরপাড়ায় হাজার হাজার মানুষ উগ্রবাদী স্টাইলে হামলা চালায়। খবর পেয়ে অতিরিক্ত পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করে। এ সময় হামলাকারীদের রাবার বুলেট ছুড়ে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা চলে।’

এসপি বিপ্লব আরও বলেন, ‘আমাদের কাছে অনেক তথ্য এসেছে, সেগুলো যাচাই-বাছাই করছি। যাদের আটক করেছি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খুঁজে খুঁজে অন্য হামলাকারীদের বের করা হচ্ছে। যারাই এই ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, তাদের প্রত্যেককে আইনের আওতায় আনা হবে।’

ফেসবুকে আপত্তিকর কমেন্ট করা কিশোরকেও পুলিশ খুঁজছে জানিয়ে তিনি বলেন, ওই কিশোরকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

সোমবার সকালে ঘটনাস্থল পরিদর্শনে যান বিভাগীয় কমিশনার আবাদুল ওয়াহাব ভুঞা, রংপুর রেঞ্জের ডিআইজি দেবদাস ভট্টাচার্য, জেলা প্রশাসক আসিব আহসানসহ প্রশাসনের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা। জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার আশ্বাস দেন তারা।

ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে জেলা প্রশাসন ও পুলিশের পক্ষ থেকে খাবার ও পোশাক বিতরণ করা হয়েছে।

এই হামলার প্রতিবাদে রোববার রাতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগ। এর নেতৃত্বে ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ সভাপতি তুষার কিবরিয়া। মিছিলে বক্তারা ঘটনায় জড়িত প্রত্যেককে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।

তিন জেলায় গ্রেপ্তার আরও ১০৫

দেশের বিভিন্ন স্থানে পূজামণ্ডপে হামলায় জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে পুলিশ, র‌্যাবসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা ইউনিটের সদস্যরা অভিযান চালাচ্ছেন। গত ২৪ ঘণ্টায় নোয়াখালী, সিলেট ও লক্ষ্মীপুর থেকে ১০৫ ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে এখনও কুমিল্লাসহ অন্যান্য জেলায় যারা পেছনে থেকে মূল ভূমিকা পালন করেছিল, তাদের ধরা যায়নি।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভাষ্য, গত কয়েক দিনের অপ্রীতিকর ঘটনায় কারা কোন পর্যায়ে সম্পৃক্ত ছিল, খুঁজে বের করতে দেশের সব গোয়েন্দা সংস্থা সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। যদিও বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ রয়েছে, পূজা ঘিরে এমন ঘটনা ঘটতে পারে- এ ব্যাপারে আগাম গোয়েন্দা তথ্য না থাকা এক ধরনের ব্যর্থতা। এ ছাড়া অনেক এলাকায় ঘটনা জানার পরও বিলম্বে সেখানে পৌঁছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও প্রশাসন। পূজা উদযাপন পরিষদের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নির্মল চ্যাটার্জি  সমকালকে বলেন, রোববার ফেনী ও নোয়াখালী এলাকা পরিদর্শন করেছি আমরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, নোয়াখালীতে হামলার বিষয় জানানোর অনেক পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে যান। তারা যথাযথ ভূমিকা পালন করেননি। ফেনীতেও ভাঙচুরের অনেক পর ঘটনাস্থলে যায় প্রশাসনের লোকজন। এ ছাড়া যখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা আক্রান্ত হন, তখন তারা স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সহায়তা চেয়েও পাননি।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্তত দু'জন কর্মকর্তা বলেন, ঘটনার নেপথ্যে যারা ভূমিকা রেখেছিল তাদের শনাক্ত করার বিষয়ে জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি যারা মিছিলে সক্রিয় থেকে হামলা-ভাঙচুরে নেতৃত্ব দেয় ও অংশ নেয় তারা ছাড় পাবে না। এ ছাড়া ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যারা গুজব ছড়িয়ে উস্কানি দিয়েছে, তাদের খুঁজে বের করার কাজ চলছে।

আরেকজন উচ্চপদস্থ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, গত কয়েক দিনের ঘটনায় আগাম গোয়েন্দা তথ্য অনেক এলাকায় না থাকা ব্যর্থতা। তবে এ ধরনের ইস্যু ঘিরে হামলা-ভাঙচুরে শত শত লোক অংশ নেয়। এমন পরিবেশ শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য দিয়ে মোকাবিলা করা কঠিন। এমনকি গুলি বা টিয়ারশেল প্রয়োগ করেও অনেক ক্ষেত্রে তা নিয়ন্ত্রণ করা কষ্টসাধ্য। এ ধরনের পরিস্থিতিতে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মী ও সমাজের সব শ্রেণির মানুষের সম্মিলিত প্রয়াস জরুরি।

পীরগঞ্জে হিন্দুপল্লিতে হামলা, লুট: পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি জানান, রংপুরের পীরগঞ্জে ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে হিন্দুপল্লিতে হামলা, লুট ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ঘটনার সময় স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে ৯৯৯-এ ফোন করেও প্রয়োজনীয় সহায়তা মেলেনি বলে অভিযোগ করেছেন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এ ঘটনায় আহত হয়েছেন অর্ধশতাধিক। গতকাল বিকেলে উপজেলার রামনাথপুর ইউনিয়নের করিমপুর গ্রামের মাঝিপাড়ায় ঘটনার সূত্রপাত হয়। আগুন নেভাতে পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর ফায়ার ব্রিগেডের দুটি ইউনিটের সদস্যরা গতকাল রাত ১টায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত চেষ্টা চালাচ্ছিলেন।

এ বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি স্থানীয় প্রশাসন। তবে ঘটনা সম্পর্কে জানতে সমকালের পক্ষ থেকে পুলিশ সুপার বিপ্লব কুমার সরকারের নম্বরে একাধিকবার ফোন করলেও তিনি রিসিভ করেননি।

রাত ১টার পর সরেজমিনে গিয়ে ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হামলাকারীরা একটি মন্দিরসহ ৬০টির বেশি বাড়িতে ভাঙচুর ও লুটপাট চালিয়েছে। পুড়ে গেছে অন্তত ১০টি বাড়ি। জড়িত সন্দেহে পুলিশ তিনজনকে আটক করেছে।

রাজধানীতে ৩ মামলা: কুমিল্লার ঘটনার জেরে রাজধানীর কাকরাইল, পল্টন ও চকবাজারে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের ঘটনায় তিনটি মামলা হয়েছে। গত শনিবার রমনা, পল্টন ও চকবাজার থানায় পৃথক তিনটি মামলা করে পুলিশ। এতে আসামি করা হয়েছে প্রায় চার হাজার ব্যক্তিকে। ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) উপকমিশনার (মিডিয়া) ফারুক হোসেন সমকালকে জানান, তিনটি মামলায় মোট ২১ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। এসব মামলায় আসামির সংখ্যা প্রায় চার হাজার।

গত শুক্রবার জুমার নামাজের পর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররম থেকে প্রায় এক হাজার ব্যক্তি একটি মিছিল নিয়ে কাকরাইলের নাইটিংগেল মোড়ে যায়। সেখানে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ ও ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পুলিশকে লক্ষ্য করে বিক্ষোভকারীরা ইটপাটকেল ছোড়ে। শটগানের গুলি, কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জ করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে পুলিশ। এ ছাড়া চকবাজার এলাকায়ও পুলিশের সঙ্গে পৃথক একটি মিছিল থেকে পুলিশের ওপর ইট ছোড়া হয়। এ ঘটনায় শনিবার চকবাজার থানায় মামলা করে পুলিশ। এতে ৩৫-৪০ ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। এর মধ্যে গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে। রমনা থানায় আরেকটি মামলা করে পুলিশ। এতে ১০ ব্যক্তিকে এজাহারনামীয় আসামি ছাড়াও অজ্ঞাত প্রায় দেড় হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। গ্রেপ্তার হয়েছে ১০ জন। একই দিন পল্টন থানায় করা মামলায় এজাহারনামীয় আসামি ১১ জন। অজ্ঞাত আসামির সংখ্যা দুই হাজার থেকে আড়াই হাজার। গ্রেপ্তার হয়েছে ছয়জন।

নোয়াখালীতে গ্রেপ্তার ৯০: নোয়াখালী প্রতিনিধি জানান, বেগমগঞ্জ উপজেলায় মন্দির ও পূজামণ্ডপে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, দুইজন নিহত এবং অর্ধশত লোক আহত হওয়ার ঘটনায় মামলা হয়েছে। সব মিলিয়ে নোয়াখালীতে ১৮টি মামলা হয়েছে। রোববার দুপুরে চৌমুহনী ইসকন মন্দিরের অধ্যক্ষ রত্নেশ্বর দেবনাথ বাদী হয়ে বেগমগঞ্জ মডেল থানায় এ মামলা করেন। মামলায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ১৮০-২০০ জন অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিকে আসামি করা হয়েছে। মামলায় অতর্কিত হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট, লোকজনকে আহত ও দুই ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্যার কথা উল্লেখ রয়েছে। পুলিশ শুক্রবার রাত থেকে গতকাল পর্যন্ত ৯০ জনকে হামলার ঘটনায় জড়িত সন্দেহে গ্রেপ্তার করেছে। জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) মো. শাহ এমরান রোববার দুপুরে এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (বেগমগঞ্জ সার্কেল) মো. শাহ এমরান বলেন, রোববার সকালে হামলার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকা সন্দেহে ৯০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। বর্তমানে চৌমুহনীর পরিস্থিতি পুলিশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পুলিশ ও বিজিবি এবং র‌্যাব সদস্যরা টহল দিচ্ছেন।

তদন্ত প্রতিবেদন: কুমিল্লা প্রতিনিধি জানান, নগরীর সার্বিক পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসছে। তবে এখনও নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়েছে বিজিবি। গতকাল সকালে নগরীর কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন) কুমিল্লা শাখাসহ বিভিন্ন সংগঠন।

এদিকে জেলা প্রশাসনের গঠিত তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি আজ সোমবার তাদের তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারে বলে সন্ধ্যায় সমকালকে নিশ্চিত করেছেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান।

জেলা পুলিশ-ডিবি, সিআইডি, র‌্যাব, পিবিআইসহ পুলিশের সব ইউনিট ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কুমিল্লার পূজামণ্ডপের ঘটনায় জড়িত মূল হোতাকে চার দিনেও শনাক্ত করতে পারেনি। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সহিংসতায় জেলার কোতোয়ালি, সদর দক্ষিণ, দাউদকান্দি থানায় রোববার পর্যন্ত আটটি মামলা রেকর্ড হয়েছে। এসব মামলায় ৭৯২ জনকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় ৯২ জনের নাম এজাহারে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

গতকাল কুমিল্লা সদর আসনের এমপি আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহার নগরীর বিভিন্ন ক্ষতিগ্রস্ত পূজামণ্ডপের স্থানগুলো পরিদর্শন করে তাদের সান্ত্বনা ও সহযোগিতার আশ্বাস দেন। আজ সোমবার বিকেলে কুমিল্লা টাউন হল মাঠে মহানগর আওয়ামী লীগের উদ্যোগে বিশাল শান্তি সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে।

ফেনী শান্ত হলেও স্বস্তি ফেরেনি: নিজস্ব প্রতিবেদক, ফেনী জানান, ফেনীতে সহিংসতায় মূলে ছিল একই সময় তিনটি গ্রুপের কর্মসূচি। মসজিদের মুসল্লি, স্থানীয় যুবলীগ ও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কর্মসূচি শুরু হলে সংঘর্ষের সূচনা হয়। রোববার সকাল থেকে পরিস্থিতি শান্ত হলেও সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। নাশকতার আইনে ফেনী থানায় দুটি মামলা করা হয়।

হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টার ঐক্য পরিষদ ফেনী জেলা সভাপতি সুখদেব নাথ তপন জানান, হিন্দু ব্যবসায়ীরা রোববার দোকানপাট বন্ধ রেখেছেন। পরিস্থিতি দেখে তারা পরবর্তী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন।

ফেনী থানার ওসি (তদন্ত) মনির হোসেন জানান, ঘটনার সময় ১৫ পুলিশসহ প্রায় ৫০ জন আহত হয়েছেন।

ফেনীর এসপি খোন্দকার নুরুন্নবী বলেন, পুলিশ ঘটনা নিয়ন্ত্রণে চার শতাধিক রাউন্ড গুলি বর্ষণ করতে হয়েছে। এই ঘটনায় ফেনী থানায় পুলিশ বাদী হয়ে দুটি নাশকতার আইনে মামলা করেছে। মামলা দুটিতে অজ্ঞাত প্রায় ৪০০ জনকে আসামি করা হয়েছে।

রামগতিতে গ্রেপ্তার ৩: কমলনগর (লক্ষ্মীপুর) প্রতিনিধি জানান, রামগতিতে মন্দিরে হামলা ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শনিবার রাতে পুলিশ অভিযান চালিয়ে উপজেলার জমিদারহাট এলাকা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে। গ্রেপ্তারকৃতরা হচ্ছেন- ওই এলাকার আবদুল জাহেরের ছেলে মনির হোসেন, নুরুল আমিনের ছেলে মো. লিটন ও নজিব উল্যাহর ছেলে মো. সেলিম। রোববার তাদের আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

রামগতি থানার অফিসার ইনচার্জ মোহাম্মদ সোলাইমান জানান, ঘটনার পরদিন রামগতি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ইকবাল হোসেন বাদী হয়ে ২৫০ জনকে আসামি করে একটি মামলা করেছেন।

সিলেটে ১২ জন গ্রেপ্তার: সিলেট ব্যুরো জানায়, নগরীর আখালিয়া এলাকায় পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় নিয়োজিত স্বেচ্ছাসেবক দলের কর্মীসহ পুলিশের ওপর হামলা ও পূজামণ্ডপে হামলার চেষ্টার অভিযোগে ১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। 

সূত্রঃ নিউজবাংলা/ সমকাল 

Bootstrap Image Preview