Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৮ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বার ২০২১ | ১৩ আশ্বিন ১৪২৮ | ঢাকা, ২৫ °সে

লিবিয়ায় ২৬ বাংলাদেশি হত্যা: মামলাটি এখন বিচার শুরুর অপেক্ষায়

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৫২ AM
আপডেট: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৮:৫২ AM

bdmorning Image Preview


চাকরিতে ভালো বেতনের আশ্বাসে মোটা অংকের টাকা নিয়ে বাংলাদেশিদের পাচার করা হতো লিবিয়ায়। ২০২০ সালের ২৭ মে লিবিয়ায় পাচার হওয়া ২৬ বাংলাদেশিকে সাহারা মরুভূমি অঞ্চলের মিজদায় একসঙ্গে বৃষ্টির মতো গুলি করে নির্বিচারে হত্যা করে লিবিয়ার মাফিয়ারা। এতে আহত হন আরও ১২ বাংলাদেশি।

ওই ঘটনায় রাজধানীর পল্টন থানার মামলায় সম্প্রতি ৪১ জনকে অভিযুক্ত করে মানবপাচার আইনের ৬/৭/৮/১০ এবং পেনাল কোডের ৩০২/৩২৬/২৬ ধারায় আদালতে চার্জশিট দিয়েছে সিআইডি। চার্জশিটে এসব কথা উল্লেখ করেছেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পুলিশ পরিদর্শক আছলাম আলী।

চার্জশিট আমলে নিয়ে পাঁচজনকে অব্যাহতি দিয়েছেন ঢাকার মানবপাচার অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল। মামলাটি এখন বিচার শুরুর অপেক্ষায় রয়েছে।


মামলার তদন্তকালে পাওয়া সাক্ষ্য-প্রমাণ ও ঘটনার পারিপার্শ্বিকতায় জানা যায়, ২০১৯ সালের জানুয়ারি থেকে পরের বছরের মে মাস পর্যন্ত আসামিরা লিবিয়ায় ভালো বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে প্রতারণামূলকভাবে আন্তর্জাতিক রুট ব্যবহার করে বিভিন্ন অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ভিকটিমদের লিবিয়ায় পাচার করেন। মামলার ভিকটিম সাইদুল, তরিকুল ও আসামিদের স্বেচ্ছায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং সাক্ষীদের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, পাচারের পর নিহতদের পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হতো মোটা অঙ্কের টাকা। টাকা না দিলে তাদের করা হতো অমানবিক নির্যাতন।


মামলার চার্জশিটে তদন্তকারী কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, নিহত বিজয়ের পরিবারের কাছ থেকে আসামি জাফর চার লাখ ২০ হাজার টাকা আদায় করেন। এরপর আসামি তানজিম, নাজমুল, জোবর আলী, হেলাল মিয়া, হাজি কামাল, আলী হোসেন, শাহাদত, শহীদ মিয়া, খবির উদ্দিনের মাধ্যমে আসামি জৌতি নুর শাওন ভারতের ওয়ানওয়ে ট্যুরিস্ট ভিসা দিয়ে বাসে করে ঢাকা থেকে কলকাতায় ভিকটিমকে পাঠান। সেখান থেকে প্লেনে মুম্বাই হয়ে দুবাই পাঠানো হয়। মুম্বাই থেকে মিসর হয়ে নেওয়া হয় লিবিয়ার বেনগাজীতে।

আহত সাইদুলের পরিবারের কাছ থেকে আসামি সজিব ও রবিউল চার লাখ ৫০ হাজার টাকা আদায় করেন। এরপর আসামি নজরুল মোল্লা, জাহিদুল শেখ, জাকির মাতুব্বর, আমির হোসেন, জুলহাস সরদার, বুবু বেগম, নুর হোসেন শেখ, ইমাম হোসেন শেখ, আকবর হোসেন, নাসির বয়াতি, রেজাউল বয়াতি ও রব মোড়লের সহায়তায় একইভাবে বেনগাজীতে পাঠানো হয়।

ভিকটিম তরিকুলের পরিবার থেকে আসামি হাজি কামাল সাড়ে চার লাখ টাকা নিয়ে তাকে লিবিয়ায় পাঠান। এরপর লিবিয়ায় থাকা বাংলাদেশি দালাল জাফর, স্বপন, মিন্টু, আমির, নজরুল, ইসলাম মোল্লা, তানজিলুর ও শাহাদত হোসেনরা লিবিয়ায় তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ক্যাম্পে ভিকটিমদের আটক রাখেন। সেখান থেকে ১০-১৫ দিন পার হওয়ার পরও ভিকটিমদের কোনো কাজ না দিয়ে তাদের নির্যাতন করতে থাকেন।


মামলার চার্জশিটে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ভিকটিমরা দীর্ঘ চার মাস লিবিয়ার ওই ক্যাম্পে মানবেতর জীবনযাপন করেন। এরপর উন্নত জীবনযাপনের আশ্বাসে ২০২০ সালের ১৬ মে ইতালিতে পাঠানোর জন্য তিনটি মাইক্রোবাসে করে বিজয়, সাইদুল ও তরিকুলসহ ৩০ জন বাঙালিকে ত্রিপলির উদ্দেশ্যে রওয়ানা করানো হয়। মাগরিবের নামাজের আগে বিস্তীর্ণ মরুভূমির ফাঁকা রাস্তায় পৌঁছালে লিবিয়ার অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীরা ভিকটিমদের মাইক্রোবাসকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়। এরপর রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পিকআপ ভ্যানে উঠিয়ে গোপন আস্তানায় নিয়ে মুক্তিপণ দাবি করে।

সেখানে তিনদিন আটকে রাখার পর ২৯ জন বাংলাদেশিকে মিজদার আরেক মাফিয়ার কাছে বিক্রি করে দেয়। মিজদার মাফিয়ারা পরের দিন মরুভূমির ভেতর একটি গোপন ক্যাম্পে নিয়ে যায়। সেখানে ৩৮ জন বাংলাদেশি এবং প্রায় ১৫০ জন আফ্রিকান (ঘানা, নাইজেরিয়া ও সুদানের নাগরিক) আটক ছিল। মাফিয়ারা বাংলাদেশিসহ আটকদের প্লাস্টিকের পাইপ, লোহার শিকল ও ইলেক্ট্রিক শক দিয়ে নির্যাতন করতে থাকে। ভিকটিমদের নির্যাতনের চিৎকার ইমোতে ভয়েস কলের মাধ্যমে তাদের পরিবারের কাছে পাঠিয়ে ১২ হাজার ইউএস ডলার মুক্তিপণ দাবি করে। মুক্তিপণের জন্য মাফিয়াদের নির্যাতনের মাত্রা দিনের পর দিন বাড়তে থাকে। আটক আফ্রিকানদের নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করে মুক্তিপণের জন্য ভীতি ও ত্রাসের সৃষ্টি করে।

এ অবস্থায় ২৭ মে সকাল ৯টায় মাফিয়ারা ক্যাম্পে ঢুকে মুক্তিপণের জন্য পুনরায় আফ্রিকানদের ওপর নির্যাতন করতে থাকে। আফ্রিকানরা মাফিয়াদের উপর পাল্টা আক্রমণ করলে মাফিয়ারা তাদের পিস্তল দিয়ে গুলি করে ২/৩ জন আফ্রিকান ও বাঙালিকে হত্যা করে। দুপুর ১২টার দিকে ক্যাম্পে আটক আফ্রিকানরা প্রতিশোধের জন্য মাফিয়াদের লিডারকে পিটিয়ে হত্যা করে। এর জেরে মাফিয়ারা তাদের লিডার হত্যার বিষয়টি তাদের সহযোগী অন্যান্য অজ্ঞাতপরিচয় মাফিয়াদের মোবাইল ফোনে জানায়।

দুপুর ২টার দিকে অস্ত্রধারী মাফিয়ারা ট্যাংক ও গাড়িসহ ক্যাম্পে ঢুকে প্রতিশোধ হিসেবে একযোগে বৃষ্টির মতো আফ্রিকান ও বাঙালিদের উপর নির্বিচারে গুলি চালাতে থাকে। এতে ভিকটিম বিজয়সহ ২৬ বাংলাদেশি নিহত হন এবং ভিকটিম সাইদুল ও তরিকুলসহ ১২ জন গুরুতর আহত হন।

সন্ত্রাসীরা আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে করে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যায়। হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে আহতদের অবস্থা গুরুতর হওয়ায় রাতে তাদের মরুভূমির ভেতরে একটি ডাস্টবিনের কাছে ফেলে রেখে চলে যায়। সকালে মরুভূমির পথ ধরে দেড় কিলোমিটার হেঁটে যাওয়ার পথে দুজন লোকের সঙ্গে দেখা হওয়ায় ভিকটিমরা তাদের ঘটনার বিষয়ে সব জানানোর কিছু পর লিবিয়ান সেনাবাহিনী এসে ১২ জনকে উদ্ধার করে ত্রিপলীর ইউনিভার্সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যায়। পরে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতবাসের সহায়তায় ভিকটিমদের হাসপাতলে ভর্তি করে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে সুস্থ হলে দেশে ফেরত পাঠায়।

এ ঘটনায় ২০২০ সালের ২ জুন ৩৮ জনকে আসামি করে রাজধানীর পল্টন থানায় মামলা করেন পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) উপ-পরিদর্শক (এসআই) এইচ এম রাশেদ ফজল। মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে এবং হত্যার অভিযোগে মামলাটি দায়ের করা হয়। মামলা নম্বর- ১(৬)২০। মামলার এজাহারে আসামি হিসেবে ৩৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অজ্ঞাতপরিচয় আসামি করা হয়েছে ৩০-৩৫ জনকে।

মামলার অভিযুক্তরা হলেন- তানজিদ ওরফে তানজিমূল ওরফে তানজিরুল (৩৬), জোবর আলী (৬২), জাফর মিয়া (৩৮), স্বপন মিয়া (২৯), মিন্টু মিয়া (৪১), শাহিন বাবু (৪৫), আলী হোসেন (৩৭), আমির হোসেন (৫৫), নজরুল মোল্লা (৪৩), আ. রব মোড়ল (৪০), সজীব মিয়া (২৫), মুন্নী আক্তার রূপসী (২০), রবিউল মিয়া (৪২), রুবেল শেখ (৩৬), আসুদুল জামান (৩৪), বাহারুল আলম (৬৭), নাজমুল হাসান (২৫), হেলাল মিয়া (৪২), কামালউদ্দিন (৫২), কামাল হোসেন (৪০), রাশিদা বেগম (৪২), নুর হোসেন শেখ (৫৫), ইমাম হোসেন শেখ (৩৫), আকবর হোসেন শেখ (৩২), বুলু বেগম (৩৮), জুলহাস সরদার (৪৫), দিনা বেগম (২৫), শাহাদাত হোসাইন (৩০), জাহিদুল আলম (৪২), জাকির মাতুব্বর (৬০), লিয়াকত আলী শেখ (৫০), নাসির বয়াতী (২৫), রেজাউল বয়াতী (৩৮), হাজী শহীদ মিয়া (৬৩), খবির উদ্দিন (৪৭), পারভেজ হাসান, কামছার মুন্সি (৩৫), মাহাবুব মুন্সি (৫৩), পারভেজ আহমেদ (৩৩), নজরুল ইসলাম সুমন (৩৮) ও কাউসার (৪০)।

অন্যদিকে শেখ মো. মাহাবুবুর রহমান (৪৯) ও শেখ সাহিদুর রহমানের (৪০) বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের অব্যাহতির আবেদন করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা। এছাড়া সাদ্দাম (২৬), কুদ্দুস বয়াতি (২৭) ও লালনের নাম ঠিকানা সঠিক না থাকায় তাদের মামলার দায় থেকে অব্যাহতি দিতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা।

Bootstrap Image Preview