Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ১৫ বৃহস্পতিবার, এপ্রিল ২০২১ | ২ বৈশাখ ১৪২৮ | ঢাকা, ২৫ °সে

যে কারণে নতুন পাবলিক টয়লেট তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে না

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ২১ জুলাই ২০১৯, ১১:৩৫ AM
আপডেট: ২১ জুলাই ২০১৯, ১১:৪১ AM

bdmorning Image Preview


উদ্যোগ ও অর্থ থাকলেও জায়গার অভাবে ঢাকায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা সম্ভব হচ্ছে না। তবে নারী বান্ধব, নিরাপদ ও পরিচ্ছন্ন টয়লেটের সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পাওয়ায় ব্যবহারকারিদের অনেকেই সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

“একটা সময় ছিল যখন পানি কম খেয়ে বের হতাম, যাতে পথে টয়লেটে যাওয়ার প্রয়োজন না পড়ে। ঢাকার পাবলিক টয়লেট এতটাই অপরিচ্ছন্ন ছিল যে, সেখানে যাওয়ার কথা ভাবাই যেত না,” বেনারকে বলেন উম্মে সালমা, তিনি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং কর্মকর্তা।

তাঁর মতে, এখন পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে। বেশ কিছু স্থানে আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে।

“বছর কয়েক আগে পাবলিক টয়লেটে ঢুকতে নারীরা যেন ভয় পেত। এখন সংখ্যায় কম হলেও পরিবেশ ভালো হওয়ায় অনেক নারী পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করছেন,” বলেন সালমা।

ঢাকার চারটি পাবলিক টয়লেট সরেজমিন ঘুরে জানা যায়, সালমার মতো কর্মজীবী নারীদের অনেকেই এখন সন্তুষ্ট। তবে পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করা নারীর সংখ্যা এখনও বেশ কম।

আন্তজার্তিক বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়াটার এইডের হিসেবে, এখন ঢাকার পাবলিক টয়লেট ব্যবহারকারীদের মধ্যে নারীর সংখ্যা বড়জোর ২০ শতাংশ। ওয়াটার এইড ঢাকায় ৩৩টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করেছে।

“সিটি করপোরেশনকে সাথে নিয়ে আমরা হাই কোয়ালিটির টয়লেট নির্মাণের চেষ্টা করেছি। গত তিন–চার বছরের অভিজ্ঞতায় এগুলো ভালোভাবে ব্যবহার হচ্ছে। ফিডব্যাকও বেশ ভালো,” বেনারকে বলেন ওয়াটার এইডের কান্ট্রি ডিরেক্টর খায়রুল ইসলাম।

রাজধানীর ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ ফার্মগেট এলাকায় রয়েছে ওয়াটার এইড নির্মিত দুটি দৃষ্টিনন্দন পাবলিক টয়লেট, সেখানকার একাধিক ব্যবহারকারী জানালেন তাঁদের সন্তুষ্টির কথা।

ওয়াটার এইডের পাবলিক টয়লেটের প্রজেক্ট ম্যানেজার এ বি এম মোবাশ্বের হোসেন বলেন, ফার্মগেটের এই দুটি টয়লেট প্রতিদিন দুই হাজারের বেশি লোক ব্যবহার করে। ব্যবহারকারীদের মধ্যে পুরুষের সংখ্যাই বেশি।

তাঁর মতে, নিরাপত্তা বা পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি চিন্তা করেই হয়তো নারীরা এখনো পাবলিক টয়লেট ব্যবহারে ততটা আগ্রহী হচ্ছেন না।

একটি রাইড শেয়ারিং কোম্পানীর মোটরসাইকেল চালক আরিফুর রহমান বলেন, “মাত্র পাঁচ টাকার বিনিময়ে আধুনিক মানের সেবা মেলে এসব পাবলিক টয়লেটে। ব্যবহারকারী হিসেবে আমি সন্তুষ্ট।”

তবে উন্নয়ন কর্মী সৈয়দ সাইফুল আলম শোভন মনে করেন, ছিন্নমূল মানুষের টয়লেটের ব্যবহারের সুযোগ ফ্রি হওয়া উচিত।

“দৈনিক কমপক্ষে তিনবার টয়লেটে যেতে হলে একজন মানুষকে ১৫-৩০ টাকা খরচ করতে হয়, যা ছিন্নমূল মানুষের পক্ষে দেওয়া প্রায় অসম্ভব। তাঁদের জন্য আলাদা টয়লেট নির্মাণ করা যেতে পারে। অন্যথায় মার্কেটসহ শহরের বিভিন্ন স্থানের টয়লেট ব্যবহারের সুবিধা তাঁরা যেন পান, সেই সুযোগ রাখতে হবে।”

বৃহস্পতিবার রাজধানীর তেজগাঁও ট্রাক স্ট্যান্ড মোড়ে নির্মিত প্রতিবন্ধীবান্ধব টয়লেটে দেখা যায়, সেখানে নারী-পুরুষদের জন্য আলাদা চেম্বার, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা, বিশুদ্ধ খাবার পানি, সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ, স্যানিটারি ন্যাপকিন, লকার, নিরাপত্তার জন্য সিসিটিভি ক্যামেরাসহ পেশাদার পরিচ্ছন্নকর্মী ও মহিলা কেয়ারটেকারের ব্যবস্থা রয়েছে।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী অনিতা রাণী বলেন, “ভোর ছয়টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত খোলা থাকে এই টয়লেট। প্রতিদিন প্রায় চারশ লোক যাওয়া–আসা করে। তবে ছেলেদের সংখ্যাই বেশি।”

খায়রুল ইসলাম বলছিলেন, “আমাদের মূল লক্ষ্য নারীরা। নারীদের যাতে পানি কম খেয়ে রাস্তায় বের না হতে হয় সেটাই ছিল অন্যতম লক্ষ্য। তা ছাড়া এমন পাবলিক টয়লেট করতে চেয়েছিলাম, যেখানে মেয়েরা নিরাপদ বোধ করবে।”

“তবে এসব টয়লেট এখনও পুরোপুরি নারীবান্ধব সেটা বলতে পারছি না। কারণ, নারীদের ব্যবহারের হার পুরুষের তুলনায় ২০ থেকে ২১ শতাংশ। আশা করি নারীরা এ ধরনের টয়লেট ব্যবহারে আগ্রহী হবেন,” বলেন তিনি।

সংবাদকর্মী জাকিয়া আহমেদ বেনারকে বলেন, “পাবলিক টয়লেটের কথা মনে পড়লেই নোংরা–দুর্গন্ধযুক্ত পরিবেশের কথা মাথায় আসে। এ জন্য দিনের বড় অংশ বাইরে থাকলেও পাবলিক টয়লেট ব্যবহার করি না।”

চাহিদার তুলনায় সংখ্যা কম

ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা বলছেন, জনসংখ্যা অনুপাতে ঢাকায় অন্তত দুইশ নতুন পাবলিক টয়লেট প্রয়োজন। এখন চালু আছে ৭৭টি।

উল্লেখ্য, সর্বশেষ ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী রাজধানী ঢাকার জনসংখ্যা এক কোটি ৩০ লাখ।

এখন নতুন করে দুই সিটিতে আরও ২৮টি পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করা হচ্ছে, বেশ কয়েকটির নির্মাণকাজও শেষ পর্যায়ে।

দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল) মুন্সী মোহাম্মদ আবুল হাশেম বেনারকে বলেন, “পরিকল্পনা ছিল নতুন ৪৫টি আধুনিক পাবলিক টয়লেট তৈরি করা, কিন্তু নতুন ১৭টি পাবলিক টয়লেটের জন্য জমি বা স্থান পাওয়া যায়নি।”

“ফলে আপাতত ২৮টি টয়লেট নির্মাণ করা হচ্ছে, বেশিরভাগ কাজ ইতিমধ্যে শেষ হয়েছে,” বলেন তিনি।

উত্তর সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিবেশ, জলবায়ু ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সার্কেল) তারিক বিন ইউসুফ জানান, “উত্তর সিটিতে মোট ৭৩টি আধুনিক পাবলিক টয়লেট নির্মাণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। তবে বাস্তবতা হলো জায়গার অভাবে এই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা কঠিন। এখন ২০টি করতে পারলেই আমরা ‍খুশি।”

“যেখানে পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করতে যাই, বাধা আসে। সবাই বলে পাবলিক টয়লেট দরকার, কিন্তু এটা করতে কেউ জায়গা দিতে চাইছে না। পাবলিক টয়লেটের পরিবর্তে দোকানপাট করা লাভজনক, এমন পারসেপশন আছে সবার মধ্যে,” বলেন ওই কর্মকর্তা।

জায়গা নিয়ে বিকল্প ভাবনা

সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারা জানান, ঢাকার ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার কথা মাথায় রেখে দুই সিটিতে আরো বেশি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থ ও উদ্যোগের অভাব নেই, প্রয়োজন জায়গা।

উন্নয়ন কর্মী সাইফুল আলম শোভন বলেন, “বাড়ির ছাদে সবুজায়ন করার জন্য ট্যাক্স মওকুফের সুবিধা দেওয়া হয়েছে, বিভিন্ন স্থানে টয়লেট নির্মাণের জন্য বাড়ি বা মার্কেট মালিকদের সুবিধা দেওয়া যেতে পারে।”

ওয়াটার এইডের বাংলাদেশ প্রধান খায়রুল ইসলাম বলেন, “জনবহুল এই ঢাকায় প্রতি এক থেকে দুই কিলোমিটার পর পর পাবলিক টয়লেট নির্মাণের জন্য জায়গা পাওয়া অসম্ভব ব্যাপার। তাই যে কোনও মার্কেট, সিএনজি স্টেশন, হাসপাতালের আউটডোর, মসজিদসহ প্রভৃতি স্থানের টয়লেটগুলো সবাইকে ব্যবহার করার সুযোগ দিতে হবে।”

“তবে সেগুলো পরিচ্ছন্ন এবং নারী বান্ধব হতে হবে,” যোগ করেন তিনি।

Bootstrap Image Preview