Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৮ বুধবার, অক্টোবার ২০২০ | ১৩ কার্তিক ১৪২৭ | ঢাকা, ২৫ °সে

৭০ বছরের বৃদ্ধকে বিয়ের কথা বলে ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা নিয়ে গেলো সাদিয়া

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ০৭:০২ PM
আপডেট: ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:৫২ PM

bdmorning Image Preview


সাদিয়া জান্নাত ওরফে জান্নাতুল ফেরদৌস (৩৮)। শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস। ‘কানাডার সিটিজেন ডিভোর্সি ও সন্তানহীন নামাজি নারীর জন্য পাত্র চাই’- সংবাদপত্রে এমন চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়ে বহু মানুষের কাছ থেকে ৩০ কোটিরও বেশি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

তার কথাবার্তা ও চলনে কানাডা প্রবাসী ভেবে ভুল করেছেন অনেকে। তার ফাঁদে পড়ে খুইয়েছেন কোটি কোটি টাকা। গত ১১ বছর ধরে পত্রিকায় এমন বিজ্ঞাপন দিয়ে প্রতারণার মাধ্যমে এসব টাকা হাতিয়ে নেন সাদিয়া।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ পেয়ে বৃহস্পতিবার বিকালে রাজধানীর গুলশান এলাকা থেকে সাদিয়াকে আটক করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। অভিযানে তার কাছ থেকে ভুক্তভোগীদের অনেক পাসপোর্ট, ১০টি মোবাইল ফোন, ৩টি মেমরি কার্ড, ৭টি সিল, অসংখ্য সিম ও প্রতারণার মাধ্যমে আত্মসাত করা টাকার একটি হিসাব বই উদ্ধার করেছে সিআইডি।

এ বিষয়ে শুক্রবার দুপুরে রাজধানীর মালিবাগে সিআইডির কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি শেখ রেজাউল হায়দার।

সিআইডির অতিরিক্ত ডিআইজি বলেন, সাদিয়া গত ৯ জুলাই একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন দেয়- প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, কানাডার সিটিজেন, ডিভোর্সি, সন্তানহীন, বয়স ৩৭, ৫.৩ ফুট লম্বা, নামাজি পাত্রীর জন্য ব্যবসার দায়িত্ব নিতে আগ্রহী বয়স্ক পাত্র চাই। যোগাযোগের জন্য ঠিকানা দেয়া হয় বারিধারা। একটি মোবাইল নম্বরও দেয়া হয়। বিজ্ঞাপন দেখে মো. নাজির হোসেন নামের এক ব্যক্তি সাদিয়ার মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। একপর্যায়ে গত ১২ জুলাই গুলশান-১ থাই সিগনেচার রেস্টুরেন্টে দেখা করেন। বিয়ের পর তাকে কানাডায় নিয়ে যাবে এবং সেখানে তার ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা দেখভাল করবেন, সাদিয়ার এসব কথায় বিশ্বাস করে ভুক্তভোগী প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা ও পাসপোর্ট দেন। পরে প্রতারক সাদিয়া জানায়, কানাডায় প্রচণ্ড শীত তাই সেখান থেকে তার দুইশত কোটি টাকা ফেরত নিয়ে আসবেন। পরে দেশেই ব্যবসা করবে।

সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, ডিএইচএল’র মাধ্যমে ওই টাকা ফেরত আনতে ভুক্তভোগী নাজির হোসেনের কাছ থেকে বিভিন্ন তারিখে ট্যাক্স/ভ্যাট/ডিএইচএল বিল বাবদ সর্বমোট ১ কোটি ৭৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেয়। এরপর ফোন বন্ধ করে দেয় প্রতারক সাদিয়া।

পুরান ঢাকার প্রতারিত সেই ব্যবসায়ী ভোজ্য তেলের ব্যবসা করেন। দেশে সয়াবিন তেল আমদানিকারকদের প্রথম দিককার একজন তিনি। তার স্ত্রী মারা গেছেন। দুই ছেলে সন্তানের জনক তিনি। এ ঘটনায় গুলশান থানায় করা মামলায় প্রতারণার পুরো ঘটনা তুলে ধরে তিনি বলেছেন, পত্রিকায় বিজ্ঞাপন দেখে ১২ জুলাই গুলশানের একটি রেস্টুরেন্টে প্রথম সাদিয়ার সঙ্গে তার দেখা হয়। তখন সাদিয়া জানান কানাডায় তার ২০০ কোটি টাকার ব্যবসা আছে। তিনি এবং তার এক ভাই মিলে দেখাশোনা করেন। আলাপের একপর্যায়ে সাদিয়া পাত্র হিসেবে তাকে পছন্দ হয়েছে এবং বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে যাবেন বলে জানান।

কথা অনুযায়ী ব্যবসায়ী ১৫ জুলাই সাদিয়াকে তার পাসপোর্ট দেন। এরপরই শুরু হয় টাকা নেওয়া। মামলায় ব্যবসায়ী বলেছেন, সাদিয়া কানাডার ভিসার আবেদনের জন্য প্রথম তার কাছে দেড় লাখ টাকা নেন। সেই টাকা দেওয়ার পর ভিসার জন্যই আরও ৭০ হাজার টাকা নেন। নগদ সেই টাকা দেওয়ার পর ট্রাভেল ডকুমেন্টস তৈরি করা বাবদ আইনজীবীকে দেওয়ার জন্য নেন আরও ছয় লাখ টাকা। এরপর ‘কানাডার সোশ্যাল সিকিউরিটির’ জন্য নেন ৬০ লাখ টাকা। ১২ আগস্ট সেই টাকা নেওয়ার পর রাতে সাদিয়া তাকে ফোন করে বিভিন্ন লোভ দেখাতে থাকেন। তিনিও তার মিষ্টি কথায় ভুলতে থাকেন।

ব্যবসায়ীর বর্ণনা অনুযায়ী এরপরই সাদিয়া অন্য ফন্দি আঁটেন। তিনি ব্যবসায়ীকে বলেন কানাডায় শীত বেশি হওয়ায় সেখানে তিনি টিকতে পারবেন না। বরং সেখানে ব্যবসায় খাটানো তার ২০০ কোটি টাকা ফেরত নিয়ে এসে দেশেই দুজন মিলে ব্যবসার প্রস্তাব দেন। ব্যবসায়ী সেই প্রস্তাবেও রাজি হন। তখন শুরু হয় কানাডা থেকে টাকা নিয়ে আসার যাত্রা।

ব্যবসায়ী বলেছেন, কানাডা থেকে টাকা নিয়ে আসার জন্য বাংলাদেশ সরকারকে ভ্যাট দেওয়ার কথা বরে ২৩ লাখ টাকা নেন সাদিয়া। এরপর সাদিয়া জানান, বাংলাদেশ সরকার টাকা আনার অনুমতি দিয়েছেন কিন্তু কানাডা সরকার টাকা পাঠানোর অনুমতি দেয়নি। সে জন্য কানাডা সরকারকে ৭২ লাখ টাকা দিতে হবে। সেই টাকা দেওয়ার পর সাদিয়া তার কাছ থেকে আরও দশ লাখ টাকা নেন। সেই টাকাটি তিনি নেন ২০০ কোটি আসার কুরিয়ার ফি হিসেবে।

ব্যবসায়ীর বর্ণনা অনুযায়ী বিয়ে করে কানাডায় নিয়ে যাওয়ার কথা বলে সাদিয়া তার কাছ থেকে তিন দফায় টাকা নেন। আবার কানাডা থেকে ২০০ কোটি টাকা নিয়ে আসার কথা বলে আরও তিন দফায় টাকা নেন। সবি মিলে টাকা নেন এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। এরপর গত এক সেপ্টেম্বর গুলশান দুই নম্বরের একটি বিদেশি বহুজাতিক কুরিয়ার সার্ভিসের কার্যালয়ের ভেতর থেকে একটি বক্স এনে তার হাতে ধরিয়ে দেন। সেখানে ২০০ কোটি টাকা মূল্যের ডলার আছে বলে জানান। বক্সটি বাসায় নিয়ে খুলতে বলেন সাদিয়া। তার কথামতো বাসায় এসে ব্যবসায়ী যখন বক্সটি খোলেন তখন সেখানে এ-৪ সাইজের ৫০০ টি সাদা কাগজের একটি বান্ডিল পান।

সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, এভাবেই সে (সাদিয়া ২০১০ সাল থেকে বিভিন্ন মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে আসছিল। সে তার প্রথম স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে দ্বিতীয় স্বামীর সঙ্গে মিলে এই প্রতারণা শুরু করে। ঢাকা ও এর আশপাশে তার ২০ কোটি টাকার সম্পত্তির সন্ধান আমরা পেয়েছি।

সিআইডি কর্মকর্তা বলেন, গত ১১ বছরে অসংখ্য মানুষের সঙ্গে প্রতারণা করে অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে সাদিয়া। তার একটি হিসাব খাতা জব্দ করা হয়েছে। সেখানে প্রায় ২৫-৩০ কোটি টাকার হিসাব আমরা পেয়েছি। তার চারটি ব্যাংক হিসাবে আমরা ১ কোটি টাকা পেয়েছি।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা নেয়ার পরই প্রতারক সাদিয়া মোবাইল নম্বর বন্ধ করে দিত। আমরা এই চক্রের আরও সদস্যদের গ্রেফতারের চেষ্টা চলছে বলে জানান তিনি।

Bootstrap Image Preview