Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ২৮ বুধবার, অক্টোবার ২০২০ | ১২ কার্তিক ১৪২৭ | ঢাকা, ২৫ °সে

নারায়ণগঞ্জে মসজিদে বিস্ফোরণ; ‘সবাই দায়ী’

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:০৮ PM
আপডেট: ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০, ১০:০৯ PM

bdmorning Image Preview


নারায়ণগঞ্জের পশ্চিম তল্লা বাইতুল সালাত জামে মসজিদে বিস্ফোরণে ৩১ জন নিহত ও আরও ৭ জন গুরুতর আহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটি। এ প্রতিবেদনে মসজিদ নির্মাণ, গ্যাস লিকেজ, অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হলেও কোনও প্রতিষ্ঠানকে এককভাবে দায়ী করা হয়নি।

বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক খাদিজা তাহেরা ববির নেতৃত্বে কমিটির পাঁচ সদস্য উপস্থিত হয়ে জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিনের হাতে আনুষ্ঠানিক ভাবে এ তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন।

এসময় উপস্থিত ছিলেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এ টি এম মোশারফ হোসেন, ডিপিডিসির পূর্ববিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী গোলাম মোরশেদ,  ফায়ার সার্ভিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফিন, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির উপ-মহাব্যবস্থাপক মফিজুল ইসলাম। এ কমিটি গঠনের পর ১০ কার্যদিবসে জমা দেওয়া প্রতিবেদনটি মোট ৪০ পৃষ্ঠার। এতে এককভাবে কাউকে দায়ী না করা হলেও ভবিষতে এ ধরনের দুর্ঘটনা রোধে তদন্ত কমিটি ১৮টি সুপারিশ করছে বলে জানান কমিটি প্রধান খাদিজা তাহেরা ববি।

 প্রতিবেদন হাতে পেয়ে যা বললেন জেলা প্রশাসক:

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পেয়ে জেলা প্রশাসক মো. জসিম উদ্দিন জানান, জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি ১০ কার্যদিবসে তিতাস গ্যাস, ডিপিডিসি, মসজিদ কমিটিসহ বিস্ফোরণে সময় প্রত্যক্ষদর্শী এবং আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে তদন্ত রিপোর্ট তৈরি করে জমা দিয়েছেন। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে পাঠানো হয়েছে। সচিব তদন্ত রিপোর্ট পেয়ে যাদের অবহেলা বা ত্রুটির কারণে এই দুর্ঘটনা ঘটেছে সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়কে অবহিত করবেন এবং তদন্ত প্রতিবেদন ও কমিটির দেওয়া সুপারিশগুলো বিবেচনা করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। 

একইসঙ্গে তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে তিতাস গ্যাসের লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়ে মসজিদের ভেতরে জমাট গ্যাস এবং বিদ্যুতের ত্রুটির কারণে স্পার্ক থেকে আগুন ও বিস্ফোরণের সূত্রপাত ঘটে ৩৭ জন কিভাবে আহত হলো ও পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাদের ৩১ জনের মৃত্যু হলো তার বিস্তারিত বর্ণনা আছে। এই প্রতিবেদনে মসজিদ কমিটির মসজিদ নির্মাণসহ বিভিন্ন পর্যায়ে যে গাফিলতি ছিল তাও তদন্তে উঠে এসেছে।

তিনি বলেন, এই মামলাটি বর্তমানে সিআইডি পুলিশ তদন্ত করছে। এই তদন্ত রিপোর্ট সিআইডির তদন্তে যাতে সহায়তা করতে পারে সেই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

যা বললেন তদন্ত কমিটির প্রধান:

এ ব্যাপারে তদন্ত কমিটির প্রধান খাদিজা তাহেরা ববি জানান, মসজিদের সামনে মাটির নিচ দিয়ে তিতাস গ্যাসের যে পাইপ চলে গেছে সেটির লিকেজ থেকে গ্যাস নির্গত হয়েছে। মসজিদের ভেতরে দরজা জানালা বন্ধ থাকায় এবং নামাজের সময় বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় বিদ্যুৎ লাইন চেঞ্জ করার সময় স্পার্ক থেকে আগুন লেগে বিস্ফোরণের ঘটে। এছাড়া তদন্তে তিতাস গ্যাস ও বিদ্যুৎ বিভাগের ত্রুটি, মসজিদ কমিটির গফিলতি, রাজউক এবং মসজিদের সামনের রাস্তাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গাফিলতি রয়েছে তা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। তবে তদন্তে বিস্ফোরণের জন্য একক ভাবে কাউকে দায়ী করা হয়নি।

তিনি বলেন, তদন্ত কমিটির ৪০ পৃষ্ঠার প্রতিবেদনে বিস্তারিত বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এসব রোধে মোট ১৮টি সুপারিশ করেছে কমিটি। তার মধ্যে রয়েছে মসজিদ বা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণ করতে হলে দক্ষ প্রকৌশলী দিয়ে ডিজাইন করা, ড্রয়িং করা ডিজাইন অনুযায়ী কাঠামো নির্মাণ করা, প্রতিষ্ঠানের বিদ্যুৎ লাইন সংযোজন, গ্যাস লাইনের সংযোগ সব কিছুই ডিজাইন ম্যাপে রাখা।

তদন্ত প্রতিবেদনে বিস্ফোরণ ঘটার মুহূর্তের যে বর্ণনা আছে:

জেলা প্রশাসনের তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, প্রায় ১৫/১৬ বছর আগে পশ্চিম তল্লা জামে মসজিদটির পাকা স্থাপনা নির্মাণ করা হয়।  মসজিদে প্রবেশ পথে একটি কলাপসিবল গেইট, দুটি কাচের টানা দরজা ছিল। মসজিদের বারান্দা থেকে ভেতরের অংশ থাই অ্যালুমিনিয়ামের শিট দিয়ে সাঁটানো ছিলো। এ অংশের ভেতরে ১৫টি জানালা, ৬টি এয়ার কন্ডিশন, ২৬টি সিলিং ফ্যান, ৭০টি সুইচ সকেট ছিল। মসজিদে বিদ্যুৎ প্যানেল বোর্ড ও  ডিস্ট্রিবিউশনের বিদ্যুতের দুটি লাইন ব্যবহার করা হতো। যার একটি লাইন ছিল বৈধ, অন্যটি ছিল অবৈধ। একটি লাইন ম্যানুয়ালি এবং একটি লাইন অটো ব্যবহার হতো। যা মসজিদ কমিটির সাক্ষ্যসহ অনেকের বক্তব্যে ফুটে এসেছে। ঘটনার দিন (৪ সেপ্টেম্বর) শুক্রবার সকাল থেকেই মসজিদে গ্যাসের গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল। মুসল্লিরা এশার নামাজের ফরজ আদায় করে অনেকে মসজিদ থেকে বের হয়ে যান। আনুমানিক ৮ টা ৪৫ মিনিটের সময় মসজিদের বিদ্যুৎ চলে যায়। এসময় অনেক মুসল্লি সুন্নতসহ অন্যান্য নামাজ আদায় করছিলেন। মসজিদের মুয়াজ্জিন দেলোয়ার হোসেন মসজিদের বিদ্যুতের লাইন চেঞ্জ করার সময় স্পার্ক হয়। যেহেতু দরজা জানালা বন্ধ তাই মসজিদের ভেতরে আগে থেকেই গ্যাস নির্গত হয়ে জমাট বেঁধে ছিল। বিদ্যুৎ স্পার্ক করার সঙ্গে সঙ্গে আগুন ধরে ছড়িয়ে পড়ে পুরো মসজিদে। এতে মসজিদের ভেতরে থাকা মুসল্লিদের শরীরের কাপড়চোপড়সহ শরীর পুড়ে যায়। পুড়ে যায় মসজিদের ভেতরের ৬টি এয়ারকন্ডিশনের প্লাষ্টিকের কভার, জায়নামাজসহ অন্যান্য জিনিসপত্র। তবে মসজিদে লাগানো এসির গ্যাস ননফেমাবেল ফেয়ন বিনষ্ট হয়নি আগুনে। এসি বিস্ফোরণের কোনও আলামতও পাওয়া যায়নি।  শুধু ইনার ইউনিটের সফট অংশ আগুনের তাপে গলে গেছে। মসজিদে বিদ্যুতের একটি অবৈধ সংযোগ ছিল তার প্রমাণ মিলেছে। এছাড়া মসজিদটি যেখানে নির্মাণ করা হয়েছে সেই রাস্তা অনেক সরু এবং নিচু এলাকা হওয়ায় দগ্ধ ও হতাহতের সংখ্যা বেড়েছে।

উল্লেখ্য, গত শুক্রবার ৪ সেপ্টেম্বর ফতুল্লার তল্লা বায়তুস সালাত জামে মসজিদে এশার নামাজের ফরজ আদায় শেষে মুসল্লিরা যখন সুন্নতসহ অন্যান্য নামাজ আদায় করছিলেন সে সময় আচমকা বিস্ফোরণে ৩৭ জন আহত হন। তাদের তাৎক্ষণিক ঢাকা মেডিকেল কলেজের শেখ হাসিনা বার্ন ইনস্টিটিউটে এনে সর্বোচ্চ চিকিৎসা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও মারা যান ৩১ জন। আহত ৭ জনের মধ্যে পাঁচজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাকি দুইজনকে চিকিৎসাসেবা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

Bootstrap Image Preview