Bootstrap Image Preview
ঢাকা, ৩০ শনিবার, মে ২০২০ | ১৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৭ | ঢাকা, ২৫ °সে

এক শিশি করোনার 'ওষুধে'র দাম ৬ হাজার টাকা

বিডিমর্নিং ডেস্ক
প্রকাশিত: ০৭ মে ২০২০, ০৭:৪৫ PM
আপডেট: ০৭ মে ২০২০, ০৭:৪৫ PM

bdmorning Image Preview


করোনা ভাইরাস চিকিৎসায় বেশ কার্যকর অ্যান্টিভাইরাল ড্রাগ ‘রেমডেসিভির’। তাই এরইমধ্যে ওষুধটির অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সেই ধারাবাহিকতায় ইতোমধ্যে দেশের ছয় ওষুধ কোম্পানিকে রেমডেসিভির উৎপাদনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ।ছয়টি ওষুধ কোম্পানিকে দেশে করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ওষুধ 'রেমডেসিভির' উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর। কোম্পানিগুলো হলো- বেক্সিমকো, বীকন, এসকেএফ (এসকে-এফ), ইনসেপ্টা, স্কয়ার ও হেলথকেয়ার।

এদিকে বেক্সিমকোর রেমডিসিভির বানানো নিয়ে রয়টার্সের সূত্রে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস।

প্রতিবেদনে বেক্সিমকোকে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ ওষুধ কোম্পানি হিসেবে উল্লেখ করে বলা হয়, এ মাসেই করোনার পরীক্ষামূলক এন্টিভাইরাল ওষুধ রেমডিসিভির উৎপাদনে যাচ্ছে কোম্পানিটি। 

মঙ্গলবার বেক্সিমকোর চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজা শীর্ষ কর্মকর্তা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

মার্কিন কোম্পানি গিলিড সায়েন্সেস কোম্পানির বানানো এই ওষুধ করোনা পরিস্থিতিতে বেশ সাড়া ফেলে। এ নিয়ে নানা বিতর্কের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ প্রশাসন গত সপ্তাহে করোনার ওষুধ হিসেবে রেমডিসিভিরকে অনুমোদন দেয়। করোনা প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি দেশ এই ওষুধ উৎপাদন করছে।

রাব্বুর রেজা জানান, তাদের উৎপাদিত রেমডিসিভিরের মূল্য হতে পারে এক ছোট শিশি ৫ হাজার থেকে ৬ হাজার টাকা। করোনায় আক্রান্ত একজন রোগীর চিকিৎসায় ৫ থেকে ১১ শিশি রেমডিসিভির লাগতে পারে। 

তিনি বলেন, আমাদের স্টাডি শেষ হলে বুঝতে পারব একজন রোগীর জন্য ঠিক কতটুকু ওষুধ প্রয়োজন হবে। 

বেক্সিমকোর এই কর্মকর্তা আশা করেন, ওষুধটির দাম আরও কমিয়ে আনতে বাংলাদেশ সরকারকে তারা পাশে পাবেন। 

এই মাসে উৎপাদন শুরু হতে হওয়া ওষুধগুলো প্রাথমিকভাবে দেশীয় চাহিদা মেটানোর জন্য ছাড়া হবে বলে তিনি জানান। 

'রেমডেসিভির' করোনাভাইরাসের বিরুদ্ধে কতটা কার্যকর?

রেমডেসিভির ওষুধটির পেটেন্ট যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক বায়োফার্মাসিউটিকাল কোম্পানি গিলিয়াড সায়ন্সেস-এর।

ওষুধটি প্রথমে ইবোলা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের জন্য তৈরি করা হয়েছিল।

ক্লিনিক্যাল পরীক্ষায় দেখা গেছে, নভেল করোনাভাইরাস সহ আরো কিছু ভাইরাস মানুষের দেহে প্রবেশ করে যেভাবে বংশবৃদ্ধি করে এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, সেই প্রক্রিয়াটি কিছুটা হলেও থামানোর সক্ষমতা রয়েছে এই ওষুধের।

কোভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় এই ওষুধ কার্যকর হতে পারে, এমন গবেষণার তথ্য গিলিয়াড সায়ন্সেস প্রকাশ করার পর গত সপ্তাহে করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগীদের জরুরি ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এই ওষুধ ব্যবহারের অনুমোদন দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

বলা হচ্ছে, এই ওষুধের প্রয়োগ বেশী অসুস্থ রোগীদের হাসপাতালে থাকার সময়কাল চার দিন পর্যন্ত কমাতে পারে।

রেমডেসিভিরের পেটেন্টের মালিকানা গিলিয়াড সায়ন্সেস-এর, অর্থাৎ শুধুমাত্র তাদেরই এই ওষুধ তৈরির অধিকার রয়েছে। কিন্তু জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকায় নাম থাকায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি অনুযায়ী এই ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে ওই নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশের ওপর প্রযোজ্য হবে না।

ওষুধের দাম কত হবে?

এসকায়েফের মার্কেটিং ও সেলস বিভাগের পরিচালক মোহাম্মদ মুজাহিদুল ইসলাম জানান, এই ওষুধটি ইনজেকশন প্রক্রিয়ায়, অর্থাৎ রোগীর শরীরে সুঁইয়ের মাধ্যমে প্রবেশ করাতে হয়।

"যেসব রোগীদের অবস্থা গুরুতর, তাদের ব্যবহারের জন্য মূলত এই ওষুধ। পাঁচ দিন ও দশ দিন - এই দুই ধরণের মেয়াদে বা কোর্সে ওষুধটি প্রয়োগ করার অনুমোদন দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ওষুধ কর্তৃপক্ষ।"

মুজাহিদুল ইসলাম জানান, পাঁচ দিনের মধ্যে যাদের রোগ সারবে না, তাদের ক্ষেত্রে দশ দিনের কোর্সের পরামর্শ দেয়া হবে।

যারা পাঁচ দিন ধরে চিকিৎসা নেবেন তাদের জন্য রেমডেসিভিরের ৬টি ভায়াল, আর দশ দিনের চিকিৎসা নেয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে ১১টি ভায়াল প্রয়োজন হবে বলে জানান তিনি।

মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, "প্রতিটি ভায়ালের দাম হবে বাংলাদেশি মুদ্রায় ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে।"

অর্থাৎ যারা পাঁচদিন চিকিৎসা নেবেন তাদের রেমডেসিভির ওষুধ কিনতে খরচ হবে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। আর যারা দশ দিন চিকিৎসা নেবেন তাদের খরচ পড়বে ৬০ হাজার টাকার মতো।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালসের চিফ অপারেটিং অফিসার রাব্বুর রেজাও জানিয়েছিলেন যে তাদের প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা রেমডেসিভিরের প্রতিটি ভায়ালের দাম ৫ থেকে ৬ হাজার টাকার মধ্যে নির্ধারণ করা হবে।

অর্থাৎ কোভিড-১৯ চিকিৎসায় রেমডেসিভির ব্যবহার করতে হলে বেশ বড় অংকের অর্থ খরচ করতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।করোনাভাইরাস চিকিৎসার কার্যকর ওষুধ তৈরির উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করছে

কোথায় পাওয়া যাবে এই ওষুধ?

বাংলাদেশ ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মাহবুবুর রহমান বলেন, শুরুর দিকে শুধু সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই ওষুধ সরবরাহ করার পরিকল্পনা থাকলেও পরে বেসরকারি পর্যায়ে বাজারজাতকরণের অনুমোদন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তারা।

"যেহেতু বিভিন্ন জায়গায় এই ওষুধের প্রয়োজন হবে, তাই সীমিত পরিসরে এর যোগান দিলে হয়তো অনেক মানুষই ওষুধ পাবেন না। তাই আমরা এটি বাজারজাতকরণের অনুমোদন দিচ্ছি।"

তবে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এই ওষুধ যেন বিক্রি করা না হয়, এই শর্তে ওষুধ বাজারজাত করা হবে বলে জানান তিনি।

"সরকারিভাবে যেন এই ওষুধের বিপণন করা হয়, আমরা সেই পরামর্শ দিয়েছি। তবে তার মানে এই নয় যে এটি বেসরকারিভাবে দেয়া যাবে না। একমাত্র শর্ত হলো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি ব্যবহার করা যাবে না।"

মাহবুবুর রহমান বলেন, "নিয়ন্ত্রিতভাবে এই ওষুধ বাজারে ছাড়া হবে। সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোও এটি সরবরাহ করতে পারবে। তবে ফার্মেসিতে খুচরো কেনার জন্য সেভাবে পাওয়া যাবে না এই ওষুধ।"

তিনি এমন ধারণা দিয়েছেন যে মূলত সেসব হাসপাতাল এ ওষুধ পাওয়া যাবে, যেগুলো করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসা দেয়।

ওষুধ প্রশাসন বেসরকারি পর্যায়ে এই ওষুধ বাজারজাত করার কথা বললেও এসকায়েফের মার্কেটিং বিভাগের পরিচালক মুজাহিদুল ইসলাম অবশ্য জানিয়েছেন যে কোভিড-১৯ এর চিকিৎসা দেয়া সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই ওষুধ সরবরাহ করার শর্তে এটি তৈরির অনুমোদন দিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

ওষুধের দাম নিয়ে কী চিন্তা করছে সরকার?

যেহেতু রেমডেসিভির বেশ উচ্চ মূল্যের ওষুধ হবে, তাই বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে তা থাকবে কি-না, সেটি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

বাংলাদেশে রেমডেসিভিরের দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে সরকার কোনো পদক্ষেপ না নিলেও সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই ওষুধের দাম কিছুটা কম হতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন ওষুধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক।

মাহবুবুর রহমান বলেন, "সরকারি হাসপাতালে ওষুধ তৈরির প্রতিষ্ঠানগুলো ওষুধ বিক্রি করার সময় প্রস্তাবিত মূল্য ঘোষণা করে। সে সময় কোনো প্রতিষ্ঠান যদি কম মূল্য চায়, তখন ওষুধের দাম কমে আসবে।"

তবে এর বাইরে ওষুধের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রে প্রশাসন কোনো ধরণের হস্তক্ষেপ করবে না বলে জানান তিনি।

সূত্রঃ বিবিসি বাংলা/ দেশ রূপান্তর 

Bootstrap Image Preview